সচেতনতা ও প্রতিরোধে কমবে জলাতঙ্কে মৃত্যু: প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু
ড. বায়েজিদ মোড়ল//বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসের আলোচনা সভায় গ্রাম পর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার, কুকুরের টিকাদান সম্প্রসারণ ও কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান

ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬: জলাতঙ্কে মৃত্যু কমাতে রোগ দেখা দেওয়ার আগেই প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি। তিনি বলেছেন, আগেভাগে সচেতনতা তৈরি, কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সোমবার রাজধানীর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Stronger Together’—‘একসঙ্গে, আরও শক্তিশালী: জলাতঙ্কমুক্ত বিশ্ব গড়ি’। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এবারের প্রতিপাদ্যে মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোগ হওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের কাজটি শুরু হয় মানুষকে ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো, প্রাণীর টিকাদান নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের পর সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
শহর ও গ্রামের সচেতনতার পার্থক্য তুলে ধরে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, শহরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলক বেশি হলেও প্রান্তিক পর্যায়ে তা এখনও কম। ফলে ঝুঁকিতে থাকা অনেক মানুষ সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন না। শহরের পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়েও জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
এ লক্ষ্যে আগের মতো সারা দেশে কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছাতে আরও বেশি সেমিনার, প্রচার ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাঠে কর্মরত কর্মকর্তাদের কাজের তদারকি বাড়াতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কুকুরের ব্যাপক টিকাদান এবং কামড়ের পর মানুষের দ্রুত চিকিৎসাপ্রাপ্তি—দুটি ব্যবস্থাই জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকার আওতায় আনা মানুষের জলাতঙ্কে মৃত্যু প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত।
প্রাণিস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য একসঙ্গে দেখতে হবে

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের কার্যক্রমের লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ। মানুষ এখন খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা প্রাণীটি রোগমুক্ত ও নিরাপদ কি না, সে বিষয়েও সচেতন হচ্ছে। প্রাণীর রোগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রাণিস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সচেতনতামূলক পোস্টারে আক্রান্ত প্রাণীর ক্ষেত্রেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কামড়ানো বা সন্দেহভাজন প্রাণীকে নিরাপদে আলাদা রেখে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা ভেটেরিনারি হাসপাতালে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। পোস্টারে জানানো হয়েছে, সেখানে কুকুরের কামড়ানো প্রাণীর চিকিৎসা ও পরামর্শসেবা পাওয়া যায়।
জলাতঙ্ক প্রতিরোধেও এই সমন্বয়ের প্রয়োজন স্পষ্ট। প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সচেতনতা ও টিকাদান কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বাংলাদেশে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে গণহারে কুকুরের টিকাদানকে ‘ওয়ান হেলথ’ বা সমন্বিত স্বাস্থ্য উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
প্রান্তিক অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্ব উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কৃষক ও খামারিদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও তদারকির মাধ্যমে প্রতিরোধ কার্যক্রমকে কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
২০৩০ সালের লক্ষ্য নিয়ে প্রবন্ধ

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. আ. মান্নান মিয়া এবং পথকুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ বিস্তার রোধ প্রকল্পের পরিচালক ডা. মেহেদি হাসান ভূইয়া সচেতনতামুলক বক্তব্য দেন ও আগামী দিনের কর্ম কান্ডগুলো সবার সামনে উপস্থাপন করেন।এছাড়া প্রবন্ধে দেশে জলাতঙ্ক পরিস্থিতি, চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রম, কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়।
বিশ্বব্যাপী ২০৩০ সালের লক্ষ্যটি নির্দিষ্টভাবে কুকুরের মাধ্যমে সংক্রমিত জলাতঙ্কে মানুষের মৃত্যু শূন্যে নামানো। লক্ষ্য অর্জনে প্রাণীর টিকাদানের পাশাপাশি কামড়ের পর মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কামড় বা আঁচড়ের পর দেরি নয়
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি বার্তা হলো—কুকুর বা অন্য সম্ভাব্য সংক্রমিত প্রাণীর কামড় কিংবা আঁচড়কে অবহেলা করা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, এমন ঘটনার পর ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও প্রবাহিত পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুতে হবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসক ঝুঁকি বিবেচনা করে জলাতঙ্কের টিকা এবং প্রয়োজন হলে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।
কুকুর ছাড়াও বিড়াল, শিয়াল, বেজি, বানর ও বাদুড়সহ জলাতঙ্কের ঝুঁকিপূর্ণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর সতর্ক হতে হবে। আক্রান্ত প্রাণীর লালা ক্ষতস্থান কিংবা চোখ, নাক বা মুখের শ্লেষ্মাঝিল্লির সংস্পর্শে এলেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই প্রাণীটি দেখতে সুস্থ মনে হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করা উচিত নয়। প্রাণীকে পর্যবেক্ষণে রাখার প্রয়োজন হলে সেটি চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী করতে হবে; পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করে মানুষের চিকিৎসা শুরুতে দেরি করা যাবে না।

আলোচনা সভা ও র্যালি
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমান। বক্তব্য দেন পরিচালক (সম্প্রসারণ) ড. বেগম শামছুননাহার আহম্মদ। অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, ভেটেরিনারিয়ান, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা অংশ নেন।
আলোচনা সভার বক্তব্যে উঠে আসে একটি অভিন্ন অগ্রাধিকার: জলাতঙ্ক প্রতিরোধের বার্তা ও সেবা যেন শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রাম এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়। কুকুরের টিকাদান, মানুষের সচেতনতা এবং কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা—এই কাজগুলো একসঙ্গে এগোলেই জলাতঙ্কে মৃত্যু কমানোর লক্ষ্য বাস্তবের আরও কাছে আসবে।























