প্রাণিসম্পদে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার রোধ করতে হলে সরকারকে অমানবিক ও কঠোর হতে হবে, ব্যক্তিস্বার্থের বাইরে থাকতে হবে।।
মোহাম্মদ নুরুজ্জামান
সম্পাদক ও প্রকাশক | সাপ্তাহিক কৃষি ও আমিষ

প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য উৎপাদন খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার এখন শুধু প্রাণিস্বাস্থ্যের বিষয় নয়—এটি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) মোকাবিলায় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রাণীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, বিশেষ করে বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং সুস্থ প্রাণীতে নিয়মিত রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশেও এ বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে ফিড অ্যাডিটিভ, প্রিমিক্স, মিনারেল প্রিমিক্স বা অন্য কোনো পণ্যের আড়ালে অনুমোদনহীন বা নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক বাজারজাত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু আমদানিকারক নয়—ফিড মিল, হ্যাচারি, খামার এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজন হলে সন্দেহজনক পণ্যের নমুনা দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে Animal Health Companies Association of Bangladesh (AHCAB), সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং শিল্পখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত নিজেদের সদস্য ও বাজারজাত পণ্যের বিষয়ে আরও শক্তিশালী স্বনিয়ন্ত্রণ, পণ্যের উৎস ও সরবরাহের তথ্য অনুসরণের ব্যবস্থা এবং মান পর্যবেক্ষণ গড়ে তোলা।
সরকারের দায়িত্ব হবে ছোট-বড় সব ফিড ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়মিত পরীক্ষা করা, অনুমোদন ও সনদ যাচাই করা এবং লেবেলে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সনদ নম্বর নিশ্চিত করা। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক গোপনে বাজারজাত করার অভিযোগ থাকলে ব্যক্তিগত পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও পরীক্ষিত প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারণ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা একটি নির্দিষ্ট শিল্পের সমস্যা নয়। এটি মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশ—তিনটির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ‘ওয়ান হেলথ’ বিষয়।
তাই ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, AHCAB, ফিড মিল, অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানি, ভেটেরিনারিয়ান, পুষ্টিবিদ এবং খামারিদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বন্ধে কঠোরতা প্রয়োজন—তবে সেই কঠোরতা হতে হবে আইন, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।

খাদ্য উৎপাদনকারী প্রাণীতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে WHO-এর নির্দেশনা কী?
এখন প্রথমেই আমরা জেনে নিই, প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সব ধরনের খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনা কী।
হাঁস-মুরগি, গবাদিপ্রাণি এবং চাষের মাছে দ্রুত বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এসব প্রাণীর মাংস, ডিম বা দুধ খাওয়ার মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানুষের চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর কার্যকারিতা টিকিয়ে রাখতে প্রাণিজ খাদ্যে বা খাদ্য উৎপাদনকারী প্রাণীতে—গবাদিপ্রাণি, হাঁস-মুরগি ও মাছে—অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে।
WHO-এর মূল নির্দেশনাগুলো নিচে দেওয়া হলো।
বৃদ্ধিবর্ধক হিসেবে ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা
সুস্থ প্রাণীর দ্রুত বৃদ্ধি বা ওজন বাড়ানোর জন্য প্রাণিখাদ্য বা পানির সঙ্গে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রোগ প্রতিরোধের জন্য ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
কোনো খামারে বা প্রাণীর দলে রোগ দেখা দেওয়ার আগেই কেবল রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সুস্থ প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা যাবে না।
রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ
যদি খামারের কোনো প্রাণীর মধ্যে সংক্রামক রোগ ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, তবেই কেবল রোগের বিস্তার রোধ করতে অন্যান্য প্রাণীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও মানুষের চিকিৎসার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কেন এই নির্দেশনা?
খাদ্য উৎপাদনকারী প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগ তৈরি হয়। এসব প্রাণীর মাংস, দুধ বা ডিমের মাধ্যমে সেই প্রতিরোধী জীবাণু ও অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ফলে মানুষের সাধারণ রোগব্যাধিতেও প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আর কাজ করে না, যা বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি।
যেসব কোম্পানি ফিড অ্যাডিটিভের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক দেশে এনে কিছু অসৎ ফিড মিল মালিক, হ্যাচারি মালিক অথবা প্রান্তিক খামারিকে সরবরাহ করছে, তাদের মনে রাখা উচিত—তারা দেশের আপামর জনসাধারণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
এসব অসৎ, বর্বর, বাটপার ও চোর ব্যবসায়ীর ধারণা, তাদের ফিড অ্যাডিটিভে অ্যান্টিবায়োটিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করার মতো পরীক্ষাগার এ দেশে নেই। কাজেই বুক ফুলিয়ে দেদার এই ধীরগতির বিষ দিয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করছে। পাশাপাশি যারা এসব পণ্য কিনে ব্যবহার করছে, তারাও একই অপরাধে অপরাধী।
কিন্তু তারা জানে না, সেরের ওপর সোয়া সের আছে। ইতিমধ্যে বিদেশ থেকে এসব কোম্পানির নমুনা সংগ্রহ করে সিঙ্গাপুরের সেন্টার ফর অ্যানিমেল অ্যান্ড ভেটেরিনারি সায়েন্সেস (Centre for Animal and Veterinary Sciences—CAVS)-এর পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষাগার কর্তৃপক্ষ তারবার্তায় পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে বলেছে, “তোমাদের দেশে এমনটা সম্ভব হয় কী করে? এদের এখনই না রুখলে তোমরা তো মারা পড়বে!”

অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (AHCAB)
বাংলাদেশের প্রায় আটশ অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানি এই অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত বা নিবন্ধিত। অথচ সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রায় ৩৩টি নামজাদা উৎপাদনকারী কোম্পানি এই অ্যাসোসিয়েশনে নেই। এদের মধ্যে স্কয়ার, রেনাটা, ইনসেপ্টা, এসিআই, হেলথকেয়ার, বেক্সিমকো, নাভানা, পপুলার, অপসোনিন, এসকেএফ ও একমি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এসব কোম্পানির অনেকের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ১০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা। অথচ বছরে ২০–৩০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১–৩ কোটি টাকা টার্নওভারের বেশ কিছু কোম্পানির মালিক বা কর্ণধার AHCAB-এ নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।
এই আটশ কোম্পানির মধ্যেই ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে অনেক অবৈধ কোম্পানি, যাদের পণ্যের মান সম্পর্কে অনেকেই সন্দিহান। আরও আছে কিছু পিশাচের দল, যারা নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক বাজারজাত করে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
এই মুহূর্তে AHCAB-এর করণীয় হচ্ছে, যেসব কোম্পানি ফিড অ্যাডিটিভের নামে অ্যান্টিবায়োটিক বাজারজাত করছে, তাদের চিহ্নিত করা। প্রয়োজনে আলোচিত ফিড অ্যাডিটিভ বা মিনারেল প্রিমিক্স বিদেশে পাঠিয়ে পরীক্ষার ফলাফল সংগ্রহ করা। কারণ AHCAB চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারবে না যে তাদের নিবন্ধিত আটশ কোম্পানির সবাই তুলসীধোয়া বা ফেরেশতা।
AHCAB-কে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক একটি জাতীয় বিষয়, জনস্বার্থের বিষয় এবং মানুষের বাঁচা-মরার বিষয়—যার দায় আমাদের সবার ওপর বর্তায়।
চরম অপরাধী দেশের কিছু ফিড মিল ও অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানি
আমদানিকারকেরা অ্যান্টিবায়োটিক আমদানি করছে, কারণ তাদের কাছে অ্যান্টিবায়োটিকের ক্রেতা আছে। এসব ক্রেতার মধ্যে বড় ক্রেতা হলো ফিড মিল কোম্পানিগুলো। এরপরই রয়েছে প্রান্তিক খামারিরা।
সরকারের এই মুহূর্তে দরকার দেশের ছোট-বড় সব ধরনের ফিড কোম্পানির খাদ্য পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা। অন্যদিকে, ডিএলএস হোক অথবা বিএসটিআই হোক—সনদ থাকতে হবে এবং সনদের নম্বরসহ তা ফিডের মোড়কে উল্লেখ করতে হবে।
আমাদের দেশের নিরীহ, নির্বাক গবাদিপ্রাণিসহ সব প্রাণী আজ কিছুসংখ্যক অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানির কাছে অবহেলিত ও তাচ্ছিল্যের শিকার। শুধু এসব কোম্পানির ব্যক্তিস্বার্থের কারণে প্রাণীর চিকিৎসাসেবার মানও দিন দিন কমে যাচ্ছে।
অভিযোগ আসছে, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে Synergy Bioscience BD Limited-এর ডা. আজিমুল হক Quinocetol, quinoxalines, carbadox, olaquindox, mequindox ও quinocetone বাজারজাত করছেন। অভিযোগের তালিকায় ডা. এহসানুল ইসলামের নামও এসেছে। এ ছাড়া Agrobiotic Animal Health-এর Synerall Plus (Nosiheptide + Olaquindox + Lincomycin), Provet-এর ডা. শামীমের Virginiamycin এবং AG Vet Ltd-এর Vamdia (Nosiheptide + Olaquindox + Lincomycin) বাজারজাত করার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে কৃষিবিদ নজরুল সরকারের Silo Animal Health-এর EMS-40-এর ভেতরে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে আমাদের ওপর ‘ব্রাশফায়ার’ করা হচ্ছে।
আল্লাহ এদের হেদায়েত দান করুন। ‘Insafi Agrovet’-এর সারোয়ার Lincomycin—একটি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক—বাজারজাত করে প্রাণী, পাখি ও মানুষের ‘ইনসাফ’ করছেন।
অনেকের দাবি, এরা জাতীয় শত্রু। এদের এখনই চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় না আনলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কোনো চিকিৎসাই কাজে আসবে না। আমরা রোগপ্রতিরোধক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলব।
আমাদের শিক্ষিত সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে কৃষিবিদ, ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন (ডিভিএম) এবং অ্যানিমেল হেলথ বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা রয়েছেন। এই অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে আরও কিছু ডিভিএম, কৃষিবিদ ও পুষ্টিবিদের জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে, যা পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।
খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, গুটিকয়েক অর্থপিপাসু ও লোভী শিক্ষিত মানুষের জন্য আমরা নিজেরাও লজ্জিত এবং মর্মাহত।
লেখক:
মোহাম্মদ নুরুজ্জামান
সম্পাদক ও প্রকাশক
সাপ্তাহিক কৃষি ও আমিষ (১৯৯৭–২০২৬)
একাধিক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত
দীর্ঘ দুই যুগ ধরে VIV China ও VIV Asia-এর অফিসিয়াল মিডিয়া পার্টনার।























