ফিডে কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করার আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর
নিরাপদ ডিম উৎপাদন, রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন, নারী উদ্যোক্তা বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব
ড. বায়েজিদ মোড়ল, সম্পাদক-AgricultureNews24.com

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬: পোল্ট্রি ফিডে কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি। তিনি বলেছেন, ফিডে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বরদাস্ত করা হবে না। নিরাপদ ও উন্নত মানের ডিম উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ এবং রপ্তানির সক্ষমতা অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে এ বছরের প্রতিপাদ্য তুলে ধরা হয়—‘Protein That Powers and Protects’, অর্থাৎ ‘প্রোটিন, যা শক্তি দেয় ও সুরক্ষা করে’।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর সঙ্গে পণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ডিম ও মুরগির মাংস। তাই উৎপাদনের শুরু থেকেই নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। ফিড উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পোল্ট্রি খামারিদের উৎপাদন খরচ কমাতে ফিডের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা জরুরি উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা রয়েছে। খামারির উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলে তাঁদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং ভোক্তার কাছে সাশ্রয়ী দামে ডিম পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে।

দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির প্রস্তুতি

ডিম রপ্তানির সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বছর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নাইজেরিয়ায় হ্যাচিং ডিম রপ্তানি করেছে। এটি দেশের পোল্ট্রি খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক অর্জন।
তিনি বলেন, ভালো মানের পণ্য উৎপাদন করতে পারলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির সক্ষমতাও অর্জন করা সম্ভব। এ জন্য উন্নত মানের ডিম উৎপাদন, উৎপাদন খরচ কমানো এবং পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করা ও দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উল্লিখিত হ্যাচিং ডিম হলো বাচ্চা ফোটানোর জন্য ব্যবহৃত ডিম। ফলে এই রপ্তানি অর্জনের পাশাপাশি খাবার ডিমের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টিও পৃথকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা বাড়ানোর আহ্বান

পোল্ট্রি খাতে নারী উদ্যোক্তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ নারীদের হাঁস-মুরগি পালনে উৎসাহিত করতে হবে। বাড়ির আঙিনায় লালন-পালনের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাঁরা পরিবারের জন্য ডিম পাবেন এবং ডিম ও হাঁস-মুরগি বিক্রি করে আয় করতে পারবেন। এভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে নারীদের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা সম্ভব।
তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে বিভিন্ন এলাকায় হাঁস-মুরগি বিতরণের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০০১ সালে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হাঁস, মুরগি ও ছাগল বিতরণের কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন।
তরুণদের পোল্ট্রি খাতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
ডিমকে কম খরচে প্রোটিন পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিম সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় একটি করে ডিম রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

ফিড ও ভিটামিন প্রিমিক্সে ভেজাল বরদাস্ত করা হবে না
সভাপতির বক্তব্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান জানান, ২০০ কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ফিড ও ভিটামিন প্রিমিক্সে ভেজাল দেওয়া হলে তা বরদাস্ত করা হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যে পোল্ট্রি উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের মান নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। মানসম্মত ফিড ও প্রিমিক্স খামারের উৎপাদন এবং খামারির বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া ও অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া পৃথক বিষয়; সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাব ও যাচাইয়ের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়।

পোল্ট্রির বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও জৈবসার
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের আহ্বায়ক মসিউর রহমান পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও জৈবসার তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে খামারের বর্জ্যকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা উঠে আসে।
সঠিকভাবে পরিকল্পিত বায়োগ্যাস ব্যবস্থায় খামারের বিষ্ঠা থেকে জ্বালানি পাওয়া সম্ভব। প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর অবশিষ্ট উপাদান উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি, দুর্গন্ধ কমানো এবং জ্বালানি ও সারের খরচ সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করে খামারের আকার, বর্জ্যের নিয়মিত জোগান, উপযুক্ত প্রযুক্তি এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।

খামারের ছাদে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা
মসিউর রহমান পোল্ট্রি খামারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কথাও বলেন। খামারের ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ পূরণ এবং বিল কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে কতটা সাশ্রয় হবে, তা খামারের বিদ্যুৎ ব্যবহার, ছাদের উপযোগিতা ও প্রকল্পের ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে।
প্রতিমন্ত্রীও এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, পোল্ট্রি খামারগুলোকে কীভাবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় আনা যায়, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

ছোট খামারিদের সমৃদ্ধি জরুরি
ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন–বাংলাদেশ শাখার সিনিয়র সহসভাপতি মো. সিরাজুল হক পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নের সঙ্গে ছোট খামারিদের সমৃদ্ধির বিষয়টি যুক্ত করেন। তাঁর বক্তব্যে প্রান্তিক খামারিদের এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
ছোট খামারিরা লাভজনকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারলে স্থানীয় কর্মসংস্থান, ডিম-মাংসের সরবরাহ এবং গ্রামীণ আয় শক্তিশালী হয়। এ কারণে খাতের উন্নয়ন মূল্যায়নে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ছোট খামারির আর্থিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
খামারি ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ নিশ্চিত করার তাগিদ
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওয়ারা জাহান ফিডের দাম বৃদ্ধি ও খামারির ওপর এর প্রভাব নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি ফিডের দাম কমানো, খামারিদের স্বাবলম্বী করা এবং ভোক্তাদের কম দামে ডিম পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁর বক্তব্যে উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ একসঙ্গে বিবেচনার বিষয়টি উঠে আসে। খামারি উৎপাদন খরচ তুলতে না পারলে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়। আবার ডিমের দাম বেশি হলে সীমিত আয়ের মানুষের নিয়মিত ডিম কেনার সামর্থ্য কমে যায়।
ডিম খাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন রেজাউল আমিন

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক কৃষিবিদ মোহা. রেজাউল আমিন ডিম খাওয়ার গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য দেন। দৈনন্দিন খাবারে ডিমের মতো পরিচিত ও সহজে রান্না করা যায় এমন পুষ্টিকর খাদ্যের ভূমিকা আলোচনায় উঠে আসে।
ডিম উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজের উৎস। তাই বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে ডিম রাখা পুষ্টি চাহিদা পূরণে সহায়ক। ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনা, র্যালি ও ডিম বিতরণে দিবস উদ্যাপন

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমান দিবস উপলক্ষে গৃহীত কর্মসূচি ও উদ্যাপনের বিষয় তুলে ধরেন। আলোচনা সভার আগে র্যালি ও বিনামূল্যে ডিম বিতরণ করা হয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং নিয়মিত ডিম খাওয়ার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের প্রচারপত্রেও ডিমের পুষ্টি ও শক্তির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। আলোচনা সভায় নিরাপদ উৎপাদন, খামারির অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ভোক্তার কাছে ডিম সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

ডিমে রয়েছে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড
ডিমের প্রোটিনে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সব অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। অ্যামিনো অ্যাসিড হলো প্রোটিন তৈরির উপাদান। শরীর কিছু অ্যামিনো অ্যাসিড নিজে তৈরি করতে পারে না বলে খাবার থেকে গ্রহণ করতে হয়। শরীরের বৃদ্ধি, পেশি ও অন্যান্য কলা গঠন ও মেরামতে প্রোটিন প্রয়োজন। ডিমের সাদা অংশ এবং কুসুম—উভয় অংশেই প্রোটিন থাকে। এ কারণে ডিমকে উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ডিমের পুষ্টিগুণ নিয়ে পুষ্টিবিদের আলোচনা

পুষ্টিবিদ ইশরাত জাহাত ডিমের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান নিয়ে আলোচনা করেন। ডিমে প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন এ, বি১২, রিবোফ্লাভিন, ফোলেট, কোলিন এবং ফসফরাসসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। এসব উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। ডিম পুষ্টিকর হলেও সুষম খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, শস্য ও অন্যান্য খাবারেরও প্রয়োজন রয়েছে। একটি খাবারের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে বৈচিত্র্যময় খাবারের অংশ হিসেবে ডিম গ্রহণই পুষ্টির পূর্ণাঙ্গ চাহিদা পূরণের উপযোগী পথ।
কুসুমেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি
ডিমের কুসুমে প্রোটিন, চর্বি এবং বিভিন্ন ভিটামিনের পাশাপাশি কোলিন থাকে। কোলিন শরীরের কোষের আবরণ গঠন এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজে প্রয়োজন। কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিনও পাওয়া যায়। ফলে কুসুম বাদ দিলে ডিমের বেশ কিছু পুষ্টি উপাদানও বাদ পড়ে যায়। সাদা অংশ ও কুসুম মিলিয়েই একটি ডিমের পুষ্টিমান গড়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন–বাংলাদেশ শাখা এবং বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল যৌথভাবে এসব কর্মসূচির আয়োজন করে। ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন–বাংলাদেশ শাখা সাধারন সম্পদক ফায়েজুর রহমানের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।























