এক কেজি চালের দামে কৃষক কত পান—বাকি টাকা কোথায় যায়?
ধানের ন্যায্যমূল্য, চালের বাজারদর এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত খরচ ও মুনাফার অনুসন্ধান।।
কৃষি সাংবাদিক ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

একদিকে কৃষকের প্রশ্ন—ধান বিক্রি করে খরচ উঠবে তো? অন্যদিকে ভোক্তার প্রশ্ন—চালের দাম এত বেশি কেন? একই খাদ্যপণ্যের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে দুই পক্ষের এই উদ্বেগ আমাদের চালের বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আনে: ভোক্তা এক কেজি চাল কিনতে যে টাকা দেন, তার কতটুকু কৃষকের হাতে পৌঁছায়?
প্রশ্নটি সহজ হলেও উত্তর বের করতে সতর্ক হিসাব প্রয়োজন। কারণ কৃষক সাধারণত বিক্রি করেন ধান, আর ভোক্তা কেনেন চাল। ধান থেকে চাল হওয়ার পথে ওজন কমে, প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ হয় এবং উপজাত তৈরি হয়। এরপর পরিবহন, গুদাম, অর্থায়ন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার খরচ যুক্ত হয়।
তাই এক কেজি ধানের দাম থেকে এক কেজি চালের দাম বিয়োগ করে বাকি অংশকে ব্যবসায়ীদের লাভ বলা যাবে না। আবার সব ব্যবধানকে খরচ বলে দেখালেও প্রকৃত মুনাফা আড়ালে থেকে যেতে পারে। কৃষকের ন্যায্য পাওনা এবং ভোক্তার ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে এই দুই হিসাবই খুলে দেখা প্রয়োজন।
গবেষণায় কৃষকের প্রাপ্তি কত দেখা গেছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত A Study on Value Chain Efficiency of the Agricultural Products in Bangladesh (2nd Phase) গবেষণায় ২০২৫ সালের বোরো মৌসুমের ধান-চালের মূল্যপ্রবাহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ধান-চালের অংশে ছয় জেলার ২৭ জন কৃষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও মিলের তথ্য নেওয়া হয়।
গবেষণার চিত্রে মোটা চালের খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ৬১ টাকা; সেই চাল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ধানের কৃষক পর্যায়ের বিক্রয়মূল্যকে চালের সমতুল্য হিসাবে দেখানো হয়েছে প্রায় ৫০ টাকা। সরু চালের ক্ষেত্রে খুচরা দাম ৭৮ টাকা এবং কৃষকের ধানের সমতুল্য প্রাপ্তি প্রায় ৬৮ টাকা ৭০ পয়সা। এগুলো সীমিত নমুনার ২০২৫ সালের হিসাব—২০২৬ সালের বর্তমান বাজারদর বা দেশের সব কৃষকের গড় নয়।
এই অঙ্কের সরল অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট নমুনায় এক কেজি মোটা চালের বিপরীতে প্রয়োজনীয় ধান বিক্রি করে কৃষকের মোট প্রাপ্তি প্রায় ৫০ টাকা। এই ৫০ টাকা কৃষকের লাভ নয়। এর মধ্যেই ধান উৎপাদনের ব্যয় রয়েছে। পাশাপাশি সেই ধান থেকে চাল ছাড়াও উপজাত পাওয়া যায়; ফলে এটিকে শুধু চাল বিক্রির টাকার সরাসরি ভাগ হিসেবেও ধরা যাবে না।
পুরোনো গবেষণায় ভিন্ন ফলও পাওয়া গেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০১৩ সালে প্রকাশিত, ২০০৯–২০১০ সালের জরিপভিত্তিক গবেষণায় বাংলাদেশ ও ভারতের আলোচিত চালের মূল্যশৃঙ্খলে কৃষকের অংশ চূড়ান্ত শহুরে খুচরা মূল্যের প্রায় ৬০ শতাংশ বলা হয়েছে। সময়, নমুনা ও হিসাবের পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় এই ফলকে বর্তমান বাজারে বসানো ঠিক হবে না। তবে এটি বোঝায়, কৃষকের অংশ কোনো স্থির সংখ্যা নয়।
ধান আর চালের দাম তুলনা করতে সবচেয়ে বড় ভুল কোথায়?
ধরা যাক, কোনো কৃষক কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে ধান বিক্রি করলেন। সেই ধান থেকে উৎপাদিত চাল দোকানে বিক্রি হলো ৬০ টাকা কেজি। তখন অনেকে বলবেন, কৃষক পেলেন ৩০ টাকা, বাকি ৩০ টাকা অন্যরা নিয়ে গেলেন।
কিন্তু এই হিসাবে ধান থেকে চাল হওয়ার বিষয়টি বাদ পড়েছে।
শুধু বোঝানোর জন্য ধরা যাক, ১০০ কেজি ধান থেকে ৬৫ কেজি বিক্রয়যোগ্য চাল পাওয়া গেল। তাহলে এক কেজি চালের জন্য ধান লাগবে প্রায় ১ দশমিক ৫৪ কেজি। কৃষক ৩০ টাকা কেজি দরে সেই ধান বিক্রি করলে এক কেজি চালের সমতুল্য ধানের জন্য তাঁর মোট প্রাপ্তি হবে প্রায় ৪৬ টাকা ১৫ পয়সা।
| হিসাবের বিষয় | উদাহরণে ধরা মূল্য বা পরিমাণ |
|---|---|
| কৃষকের ধান বিক্রির দাম | ৩০ টাকা/কেজি |
| ১০০ কেজি ধান থেকে চাল | ৬৫ কেজি |
| এক কেজি চালের জন্য প্রয়োজনীয় ধান | প্রায় ১.৫৪ কেজি |
| প্রয়োজনীয় ধান বিক্রি করে কৃষকের মোট প্রাপ্তি | প্রায় ৪৬.১৫ টাকা |
| খুচরা চালের দাম | ৬০ টাকা/কেজি |
| চালের দাম ও ধান কেনার ব্যয়ের ব্যবধান | প্রায় ১৩.৮৫ টাকা |
এটি হিসাব বোঝানোর উদাহরণ, কোনো এলাকার জরিপে পাওয়া বাজারদর নয়। ধানের জাত, আর্দ্রতা, চালের মান এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ অনুযায়ী চাল পাওয়ার পরিমাণ বদলাবে।
উদাহরণের ১৩ টাকা ৮৫ পয়সাও সরাসরি নিট লাভ নয়। এখান থেকে ধান সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিক্রির খরচ বিবেচনা করতে হবে। আবার ধান থেকে পাওয়া উপজাতের আয়ও যোগ করতে হবে।
অর্থাৎ পুরো হিসাব দাঁড়ায়:
চাল ও উপজাতের মোট আয় − ধান কেনার ব্যয় − প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের মোট ব্যয় = সংশ্লিষ্ট ব্যবসার নিট লাভ।
বাকি টাকা কোথায় যায়?
ধান মাঠ থেকে ভোক্তার রান্নাঘরে পৌঁছানোর পথে কয়েক ধরনের কাজ হয়। প্রতিটি কাজের প্রয়োজনীয়তা এবং তার জন্য নেওয়া মূল্য আলাদাভাবে যাচাই করা দরকার।
স্থানীয় ধান সংগ্রহকারী বিভিন্ন কৃষকের কাছ থেকে অল্প অল্প ধান কিনে বড় চালান তৈরি করেন। এতে ওজন করা, বস্তা, শ্রমিক, ওঠানো-নামানো ও পরিবহনের খরচ হতে পারে। আড়ত পর্যায়ে যুক্ত হতে পারে কমিশন, গুদাম এবং অর্থায়নের ব্যয়।
মিলে ধানকে খাদ্যোপযোগী চালে রূপান্তর করা হয়। সিদ্ধ চালের ক্ষেত্রে ভেজানো, সিদ্ধ করা ও শুকানোর কাজ থাকে। এরপর খোসা ছাড়ানো, প্রয়োজনমতো পালিশ, বাছাই ও প্যাকেটজাত করা হয়। এখানে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শ্রম, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং মূলধনের খরচ হিসাব করতে হয়।
চাল উৎপাদনের পর মিল থেকে পাইকার এবং পাইকার থেকে খুচরা দোকানে পৌঁছায়। পরিবহন, দোকানভাড়া, কর্মচারী, পুঁজি আটকে থাকা এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম পর্যায়ের গবেষণায় কৃষক, ফড়িয়া, ধানের আড়তদার, মিল, চালের পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাকে মূল্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই গবেষণায় মিলের লাভ হিসাবের সময় উপজাতের মূল্য অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে।
এই কাজগুলো করতে খরচ হয়। কিন্তু কোন খরচ কত, কোন পর্যায়ে কত লাভ এবং কোথাও অযৌক্তিক মূল্য যোগ হচ্ছে কি না—সেটি শুধু বাজারদর দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রয়োজন ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ ও ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব।
মিলের উপজাতের আয় বাদ দিলে হিসাব অসম্পূর্ণ
ধান থেকে শুধু চাল পাওয়া যায় না। তুষ, কুঁড়া এবং ভাঙা চালেরও অর্থনৈতিক মূল্য থাকতে পারে। কোনো উপজাত বিক্রি হয়, কোনোটি মিলের নিজস্ব কাজে ব্যবহৃত হয়।
এখানে হিসাবের নিয়ম স্পষ্ট হওয়া জরুরি। ভাঙা চাল যদি বিক্রয়যোগ্য চালের মোট পরিমাণের মধ্যে ধরা হয়, তাহলে আবার আলাদা উপজাত হিসেবে তার আয় যোগ করা যাবে না। একইভাবে তুষ নিজের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করলে তার সাশ্রয় এবং জ্বালানি ব্যয় যেন দুবার গণনা না হয়।
একটি মিলের প্রকৃত লাভ বুঝতে তাই জানতে হবে—কত ধান কেনা হলো, কত চাল পাওয়া গেল, কত উপজাত তৈরি হলো, সেগুলো কত দামে বিক্রি হলো এবং সব মিলিয়ে কত খরচ হলো।
এই তথ্য ছাড়া মিল লোকসান করছে কিংবা অতিরিক্ত লাভ করছে—দুই দাবিই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কৃষকের মোট প্রাপ্তি বেশি দেখালেও লাভ কম হতে পারে
কৃষকের ধান বিক্রির টাকা তাঁর আয়। সেই আয় থেকে উৎপাদনের সব ব্যয় বাদ দিলে লাভ পাওয়া যায়।
খরচের তালিকায় বীজ, জমি তৈরি, সার, সেচ, প্রয়োজনীয় বালাই ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের পাশাপাশি জমির ইজারা, ঋণের সুদ এবং নিজের পরিবারের শ্রমও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরেকটি উদাহরণ ধরা যাক। একজন কৃষক ধান বিক্রি করলেন ৩০ টাকা কেজি দরে। সব ব্যয়সহ তাঁর উৎপাদন খরচ হলো ২৭ টাকা। তাহলে কেজিপ্রতি লাভ ৩ টাকা। ১০০ কেজি ধানে মোট লাভ ৩০০ টাকা।
একই দামে অন্য কৃষকের উৎপাদন খরচ যদি ৩২ টাকা হয়, তিনি কেজিপ্রতি ২ টাকা লোকসান করবেন। ভালো ফলন, জমির মালিকানা, সেচের সুবিধা ও শ্রমের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী দুই কৃষকের ফলাফল আলাদা হতে পারে।
তাই ‘কৃষক কত পান’ প্রশ্নের সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন রাখতে হবে: সব খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে কত থাকে?
চালের দাম বাড়লেই কৃষকের লাভ বাড়ে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে বিক্রির সময় দেখতে হবে।
একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো, কৃষক ধান কাটার পর ঋণ ও শ্রমিকের পাওনা মেটাতে দ্রুত বিক্রি করলেন। কয়েক মাস পরে সেই ধান থেকে তৈরি চালের দাম বাড়ল। কৃষক যেহেতু আগেই ধান বিক্রি করেছেন, পরের মূল্যবৃদ্ধির টাকা তাঁর হাতে পৌঁছাবে না।
আবার কৃষকের নিজের কাছে ধান মজুত থাকলেও তাঁর শুকানো, সংরক্ষণ এবং অপেক্ষা করার খরচ রয়েছে। পরে বেশি দামে বিক্রি করলেই পুরো বাড়তি মূল্য লাভ হবে না।
এ কারণে ফসল কাটার সময়ের ধানের দাম এবং কয়েক মাস পরের চালের দাম পাশাপাশি বসিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হতে পারে। অনুসন্ধানে একই জাতের ধান-চাল, কাছাকাছি সময় এবং একই সরবরাহপথ ধরে হিসাব নেওয়া প্রয়োজন।
সব মধ্যস্বত্বভোগী কি অপ্রয়োজনীয়?
ছোট কৃষকের পক্ষে অল্প ধান নিয়ে দূরের মিলে যাওয়া সব সময় লাভজনক হবে না। স্থানীয় সংগ্রহকারী সেই ধান একত্র করে পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারেন। পাইকার বিভিন্ন এলাকায় চাল সরবরাহ করেন, খুচরা দোকান ভোক্তার প্রয়োজনমতো অল্প পরিমাণ চাল বিক্রি করে।
তাই শুধু মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানোই লক্ষ্য হতে পারে না। দেখতে হবে, প্রতিটি পর্যায় কী সেবা দিচ্ছে এবং সেই সেবার তুলনায় কত টাকা নিচ্ছে।
একই কাজ বারবার হচ্ছে কি না, ওজনে অনিয়ম আছে কি না, অস্বচ্ছ কমিশন নেওয়া হচ্ছে কি না এবং কৃষক বিকল্প ক্রেতার কাছে যেতে পারছেন কি না—এসব প্রশ্ন বেশি কার্যকর।
বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলে কৃষক একাধিক ক্রেতার মধ্যে ভালো দাম বেছে নিতে পারবেন। সেই সুযোগ সীমিত হলে তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ যাচাই করতে কী প্রয়োজন?
চালের দাম বেশি হলেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যথেষ্ট নয়। আবার অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা উপেক্ষা করাও ঠিক নয়।
যাচাইয়ের জন্য একই সময়ে ধানের ক্রয়মূল্য, মিলের উৎপাদন ব্যয়, চালের বিক্রয়মূল্য, উপজাতের আয় এবং মজুতের তথ্য দেখতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারে কতটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, সরবরাহ ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখছে কি না এবং প্রতিযোগীদের সঙ্গে মূল্য নির্ধারণে সমঝোতা করছে কি না—এসবও অনুসন্ধানের বিষয়।
প্রমাণভিত্তিক তদন্তেই বোঝা যাবে কোন মূল্যবৃদ্ধি বাস্তব খরচের কারণে, আর কোনটি অযৌক্তিক মুনাফা বা বাজারের অনিয়মের ফল।
কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষের স্বার্থে কী করা দরকার?
প্রথম প্রয়োজন, ধান-চালের নিয়মিত ও তুলনাযোগ্য মূল্যতথ্য। জাত, মান, আর্দ্রতা এবং বাজারের নামসহ কৃষক, মিল, পাইকার ও খুচরা পর্যায়ের দাম প্রকাশ করলে ব্যবধান কোথায় তৈরি হচ্ছে বোঝা সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, কৃষকের দ্রুত বিক্রি করার চাপ কমাতে স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন, যৌথ শুকানোর ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত গুদামসুবিধার উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে ধান ধরে রাখার পরামর্শ দেওয়ার আগে সংরক্ষণের খরচ ও ক্ষতির ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হবে।
তৃতীয়ত, কৃষক সমবায় বা উৎপাদক দল একসঙ্গে ধান বিক্রি করলে বড় ক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে স্বচ্ছ ওজন, মান যাচাই এবং সময়মতো মূল্য পরিশোধ নিশ্চিত করা জরুরি।
চতুর্থত, সরকারি ধান সংগ্রহের কার্যকারিতা মূল্যায়নে শুধু ঘোষিত দাম নয়, কতজন প্রকৃত কৃষক বিক্রি করতে পেরেছেন এবং কত দ্রুত টাকা পেয়েছেন—সেই তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, বাজার তদারকিতে মিলের উৎপাদন ও উপজাতের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অদক্ষতা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে কৃষকের দাম কমিয়ে ভোক্তার দাম কমানোর চেষ্টা করতে না হয়।
এক কেজি চালের হিসাবেই কৃষকের ভবিষ্যৎ
এক কেজি চালের দাম শুধু দোকানের একটি সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে কৃষকের কয়েক মাসের শ্রম, জমির ব্যবহার, উৎপাদনের ঝুঁকি এবং বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে।
এই প্রতিবেদনের মূল প্রশ্নের উত্তর তাই একটিমাত্র অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকের প্রাপ্তি নির্ভর করে তিনি কত দামে ধান বিক্রি করেছেন এবং সেই ধান থেকে কত চাল পাওয়া গেছে। তাঁর লাভ জানতে উৎপাদনের পূর্ণ খরচ বাদ দিতে হবে। অন্য পর্যায়ের লাভ জানতে চাল ও উপজাতের আয় থেকে ধান কেনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপণনের ব্যয় বাদ দিতে হবে।
ভোক্তা বেশি টাকা দিচ্ছেন, অথচ কৃষকের হাতে যথেষ্ট লাভ থাকছে না—এমন পরিস্থিতির সমাধান খুঁজতে ধান থেকে চাল পর্যন্ত পুরো হিসাব প্রকাশ করতে হবে। সেই হিসাবেই ধরা পড়বে, কোথায় প্রয়োজনীয় খরচ হচ্ছে, কোথায় দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব এবং কোথায় অযৌক্তিক মুনাফা তৈরি হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক—কৃষিপণ্যের মূল্যশৃঙ্খল গবেষণা, প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় (২০২৫); এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—বাংলাদেশ ও ভারতের চালের মূল্যশৃঙ্খল গবেষণা (২০১৩)।






















