গাভীকে কৃত্রিম প্রজননের বীজ দেওয়ার পর গর্ভ না ধরার প্রধান কারণগুলো হলো—ভুল সময়ে বীজ দেওয়া, হিট ঠিকমতো শনাক্ত না করা, জরায়ুর সংক্রমণ, অপুষ্টি, ডিম্বাশয়ের সমস্যা, নিম্নমানের বীজ এবং বীজদাতার কারিগরি ত্রুটি।
মরহুম ডাঃ নুরুল আমীন ও ডাঃ মেহেদী হাসান ভুইয়ার সাথে মিশে যে তথ্য পেয়েছি তা নিচে তুলে ধরছি
প্রধান কারণ
১. হিট সঠিকভাবে শনাক্ত না করা
শুধু ডাকাডাকি, অস্থিরতা বা যোনিপথ দিয়ে সাদা শ্লেষ্মা বের হওয়া দেখেই বীজ দেওয়া ঠিক নয়। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য লক্ষণ হলো—অন্য গরু পিঠে উঠলে গাভীটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সাধারণত গাভীর হিট প্রথম দেখা দেওয়ার প্রায় ৪–১৬ ঘণ্টার মধ্যে বীজ দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। ব্যবহারিক নিয়ম:
- সকালে পরিষ্কার হিট দেখা গেলে বিকেলে বীজ দিন।
- বিকেল বা রাতে হিট দেখা গেলে পরদিন সকালে বীজ দিন।
খুব আগে বা অনেক দেরিতে বীজ দিলে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন নাও হতে পারে। FAO—কৃত্রিম প্রজনন নির্দেশিকা
২. জরায়ুতে সংক্রমণ
বাচ্চা হওয়ার পর ফুল আটকে যাওয়া, কঠিন প্রসব, অপরিষ্কার হাতে প্রসব করানো বা জরায়ুতে ময়লা ঢোকার কারণে মেট্রাইটিস বা এন্ডোমেট্রাইটিস হতে পারে।

লক্ষণগুলো হলো—
- দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব;
- পুঁজ বা ঘোলাটে শ্লেষ্মা;
- বারবার হিটে আসা;
- বীজ দিলেও না টেকা;
- দুধ ও খাবার গ্রহণ কমে যাওয়া।
এ অবস্থায় শুধু বারবার বীজ দিলে লাভ হবে না। আগে পশুচিকিৎসকের মাধ্যমে জরায়ু পরীক্ষা ও চিকিৎসা করাতে হবে।
৩. বাচ্চা হওয়ার পর খুব তাড়াতাড়ি বীজ দেওয়া
প্রসবের পর জরায়ু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। সাধারণভাবে সুস্থ গাভীকে প্রসবের কমপক্ষে ৪৫–৬০ দিন পর, জরায়ু পরিষ্কার ও স্বাভাবিক হিট নিশ্চিত করে বীজ দেওয়া ভালো। কঠিন প্রসব বা জরায়ুর সংক্রমণ থাকলে আরও সময় লাগতে পারে।
৪. পুষ্টির ঘাটতি
শুধু খড় খাইয়ে ভালো প্রজনন ফল আশা করা যায় না। শক্তি, আমিষ, খনিজ ও ভিটামিনের ঘাটতিতে ডিম্বাণু তৈরি ও ভ্রূণ টিকে থাকা ব্যাহত হয়।
বিশেষ করে প্রয়োজন—
- পর্যাপ্ত শক্তি ও আমিষ;
- ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের সঠিক ভারসাম্য;
- কপার, জিংক, সেলেনিয়ামসহ প্রয়োজনীয় খনিজ;
- ভিটামিন এ ও ই;
- পর্যাপ্ত সবুজ ঘাস ও বিশুদ্ধ পানি।
তবে পরীক্ষা ছাড়া অতিরিক্ত মিনারেল বা হরমোন ব্যবহার করাও ঠিক নয়।
৫. গাভী অতিরিক্ত রোগা বা মোটা
অতিরিক্ত রোগা গাভীর শরীরে গর্ভধারণ ও ভ্রূণ রক্ষার মতো পর্যাপ্ত শক্তি থাকে না। আবার অতিরিক্ত মোটা গাভীরও হরমোন ও ডিম্বাশয়ের কার্যক্রমে সমস্যা হতে পারে। বীজ দেওয়ার সময় গাভীর শরীরের অবস্থা মাঝারি রাখা প্রয়োজন।
৬. ডিম্বাশয় ও হরমোনের সমস্যা
ডিম্বাশয়ে সিস্ট, ডিম্বাণু বের না হওয়া, দীর্ঘদিন হিটে না আসা, নীরব হিট বা কর্পাস লুটিয়াম ঠিকমতো কাজ না করলে গর্ভ নাও ধরতে পারে। এসব সমস্যা হাত দিয়ে বা আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে পশুচিকিৎসক পরীক্ষা করতে পারেন।
নিজে থেকে হরমোন ইনজেকশন দিলে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।
৭. বীজের মান ও সংরক্ষণে সমস্যা
হিমায়িত বীজ অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় তরল নাইট্রোজেনে রাখতে হয়। নাইট্রোজেন কমে যাওয়া, স্ট্র বারবার ওপরে তোলা, ভুল তাপমাত্রায় গলানো বা গলানোর পর দেরি করলে শুক্রাণু মারা যেতে পারে।
একই বীজদাতার কাছে একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনেক গাভীর গর্ভ না ধরলে বীজের ব্যাচ, নাইট্রোজেন কনটেইনার ও ব্যবস্থাপনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
৮. বীজ দেওয়ার কৌশলে ভুল
বীজটি জরায়ুমুখ পার করে জরায়ুর বডিতে সঠিকভাবে জমা দিতে হয়। জরায়ুমুখে আটকে যাওয়া, এক পাশের হর্নে বেশি ঢুকিয়ে দেওয়া, অপরিষ্কার যন্ত্র ব্যবহার বা প্রজননতন্ত্রে আঘাত করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়।
অভিজ্ঞ ও অনুমোদিত কৃত্রিম প্রজননকর্মীর মাধ্যমে বীজ দেওয়া উচিত।
৯. গরমের চাপ
অতিরিক্ত গরমে গাভীর খাবার গ্রহণ কমে, হিটের লক্ষণ দুর্বল হয় এবং ডিম্বাণু ও প্রাথমিক ভ্রূণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গরমের সময় প্রয়োজন—
- ছায়া ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা;
- পর্যাপ্ত ঠান্ডা পানি;
- ফ্যান বা পানি ছিটানোর ব্যবস্থা;
- সকালে বা সন্ধ্যায় খাবার দেওয়া;
- অতিরিক্ত ভিড় কমানো।
১০. প্রাথমিক ভ্রূণ মারা যাওয়া
কখনো নিষিক্তকরণ হলেও ১৫–৪৫ দিনের মধ্যে ভ্রূণ মারা যায়। তখন গাভী আবার হিটে আসে—কখনো স্বাভাবিক ১৮–২৪ দিনে, আবার কখনো আরও দেরিতে।
কারণ হতে পারে জ্বর, অপুষ্টি, জরায়ুর সংক্রমণ, অতিরিক্ত গরম, বিষাক্ত বা ছত্রাকযুক্ত খাবার, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা ভ্রূণের জেনেটিক ত্রুটি।
কখন ‘রিপিট ব্রিডার’ বলা হয়?
গাভীর হিট নিয়মিত, দৃশ্যত সুস্থ এবং প্রজনন অঙ্গ স্বাভাবিক থাকার পরও ভালো মানের বীজ তিনবার বা তার বেশি দেওয়ার পর গর্ভ না ধরলে তাকে সাধারণভাবে ‘রিপিট ব্রিডার’ বলা হয়। এ অবস্থায় বারবার বীজ না দিয়ে পূর্ণ প্রজনন পরীক্ষা করানো জরুরি।
এখন কী করবেন?
১. আগের বীজ দেওয়ার তারিখ লিখে রাখুন।
২. বীজ দেওয়ার প্রায় ১৮–২৪ দিন পর আবার হিট আসে কি না দেখুন।
৩. সাদা স্বচ্ছ শ্লেষ্মার পরিবর্তে পুঁজ, রক্ত বা দুর্গন্ধ থাকলে বীজ দেবেন না।
৪. পশুচিকিৎসক দিয়ে জরায়ু ও ডিম্বাশয় পরীক্ষা করান।
৫. প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম করুন।
৬. খাবার, শরীরের অবস্থা ও মিনারেল সরবরাহ পর্যালোচনা করুন।
৭. বীজের উৎস ও প্রজননকর্মীর দক্ষতা যাচাই করুন।
৮. বীজ দেওয়ার প্রায় ২৮–৩৫ দিন পর আল্ট্রাসনোগ্রাম অথবা উপযুক্ত সময়ে পশুচিকিৎসকের মাধ্যমে গর্ভ পরীক্ষা করান।
৯. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক বা জরায়ু পরিষ্কারের ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—একই গাভীকে বারবার অন্ধভাবে বীজ না দিয়ে তৃতীয়বারের আগেই কারণ নির্ণয় করুন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক হিট শনাক্তকরণ, সঠিক সময়ে বীজ দেওয়া, জরায়ুর চিকিৎসা এবং পুষ্টি ঠিক করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ে।
ড. বায়েজিদ মোড়ল-01712 626 198





















