নিরাপদ খাদ্যের আলোচনা থেকে বাস্তব কাজ: বিএসএসএফের সেমিনার কী বার্তা দিল?
কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যকে একই আলোচনায় এনে সহযোগিতার প্রত্যাশা; প্রশ্ন ও পরামর্শের পরবর্তী পর্যালোচনায় নজর।।
ড. বায়েজিদ মোড়ল | সম্পাদক, AgricultureNews24.com
ঢাকা, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

নিরাপদ খাদ্য নিয়ে একটি সেমিনারের সাফল্য শুধু মঞ্চের বক্তব্য কিংবা অতিথিদের উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেখানে উত্থাপিত প্রশ্ন, গবেষণার তথ্য ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী কাজে কতটা যুক্ত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সোসাইটি ফর সেফ ফুড—বিএসএসএফের ষষ্ঠ জাতীয় কারিগরি সেমিনারে উপস্থিত থেকে আয়োজনটির বিভিন্ন পর্ব পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এই প্রশ্নটিই সামনে এসেছে: আলোচনা থেকে বাস্তব কাজের সংযোগ কীভাবে আরও শক্তিশালী হবে?
রোববার (২৫ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ—আইইউবির মিলনায়তনে ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড হেলথ’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব ডিম দিবস ও বিশ্ব খাদ্য দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের স্বাগতিক ছিল আইইউবি। সহ-আয়োজক হিসেবে অংশ নেয় সিএবিআই।
মূল প্রবন্ধ, বিশেষজ্ঞ আলোচনা, কুইজ এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন ও মতামত সংগ্রহ—এসব কার্যক্রম আয়োজনটিকে নিরাপদ খাদ্য নিয়ে মতবিনিময়ের একটি পরিসর করে তোলে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলো একই আলোচনায় আনার উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা একই মঞ্চে

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম। সভাপতিত্ব করেন বিএসএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সেমিনার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ এনায়েত-ই-রাব্বি। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান।

স্বাগত বক্তব্য দেন বিএসএসএফের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব ড. জীবুন্নাহার খন্দকার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ সরোয়ার জাহান।
শিক্ষা, সরকারি প্রশাসন এবং উৎপাদন খাতের এই প্রতিনিধিত্ব আয়োজনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে গবেষণার প্রশ্ন, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও উৎপাদনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয় তাঁদের অংশগ্রহণে।
দুটি মূল প্রবন্ধে বিস্তৃত উৎপাদনব্যবস্থা
কৃষি ও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের পূর্ণকালীন সদস্য অধ্যাপক ড. মো. ওয়াকিলুর রহমান। প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যবিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এইচ এম নাজমুল হুসাইন নাজির।
প্রবন্ধগুলোর ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সিএবিআইয়ের বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেন। আলোচনায় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি, জনস্বাস্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিষয় গুরুত্ব পায়।
দুটি প্রবন্ধের বিষয়বিন্যাসেও আয়োজনটির বিস্তৃতি স্পষ্ট। কৃষির পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যকে পৃথকভাবে আলোচনায় রাখায় খাদ্য উৎপাদনের প্রধান খাতগুলো একই পরিসরে এসেছে। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করতে এসব খাতের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

পুষ্টির আলোচনায় নিরাপত্তার প্রশ্ন
বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে ডিমের পুষ্টিগুণ ও জনস্বাস্থ্যে এর ভূমিকা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বিশ্ব খাদ্য দিবসের আলোচনায় খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টি এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্ভাবনী উদ্যোগের গুরুত্ব স্থান পায়।
দুটি দিবসকে একই কারিগরি আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করায় পুষ্টি ও নিরাপত্তা নিয়ে একসঙ্গে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। খাদ্য উৎপাদনের অর্জন মানুষের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সুফলে রূপ দেওয়ার প্রশ্নটি এ ধরনের আলোচনাকে আরও প্রাসঙ্গিক করে।
এখানে পরবর্তী কাজের একটি ক্ষেত্র হতে পারে গবেষণার বিষয়গুলো সহজ ভাষায় সংশ্লিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছানো। কৃষক, খামারি ও উদ্যোক্তা যেন বুঝতে পারেন, কোন জ্ঞান তাঁদের দৈনন্দিন কাজে কীভাবে ব্যবহারযোগ্য। এটি প্রতিবেদকের মূল্যায়ন; সেমিনারে ঘোষিত কোনো পৃথক কর্মসূচি নয়।
হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন সংগ্রহের তাৎপর্য
আয়োজনের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন, মতামত ও পরামর্শ সংগ্রহ। অনুষ্ঠান, মূল প্রবন্ধ এবং নিরাপদ খাদ্যসম্পর্কিত বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট নম্বরে বক্তব্য পাঠানোর সুযোগ রাখা হয়।
আয়োজকদের উদ্দেশ্য ছিল, পরবর্তী সময়ে এসব প্রশ্ন ও পরামর্শ পর্যালোচনা করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। মঞ্চে তাৎক্ষণিক আলোচনার বাইরে অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞাসা সংরক্ষণের একটি পথ তৈরি করেছে এই ব্যবস্থা।
এ উদ্যোগের কার্যকারিতা বোঝা যাবে পরবর্তী অগ্রগতিতে। কোন প্রশ্নগুলো বেশি এসেছে, সেগুলোর উত্তর কীভাবে দেওয়া হবে এবং কোন বিষয়ে আরও গবেষণা বা আলোচনা প্রয়োজন—এগুলো চিহ্নিত করা গেলে সংগৃহীত মতামত ভবিষ্যৎ কাজের উপকরণ হতে পারে।
পর্যালোচনার ফল অংশগ্রহণকারীদের জানানোও উপকারী হবে। এতে তাঁরা বুঝতে পারবেন, তাঁদের প্রশ্ন ও পরামর্শ আয়োজনের পরও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ধরনের ধারাবাহিক যোগাযোগ সেমিনার ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে পারে।
কুইজ ও প্রকাশনায় অংশগ্রহণের সুযোগ
সেমিনারে নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় এবং বিজয়ী তিনজনকে পুরস্কৃত করা হয়। মূল প্রবন্ধ ও বিশেষজ্ঞ আলোচনার পাশাপাশি এ কার্যক্রম উপস্থিত ব্যক্তিদের সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়।
অনুষ্ঠানে বিএসএসএফের বার্ষিক প্রকাশনা ‘সেফ ফুড ডাইজেস্ট’-এর মোড়ক উন্মোচন ও বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান, দোয়া এবং মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন ছিল।
কুইজ, প্রকাশনা এবং মতামত সংগ্রহ—তিনটি উদ্যোগের মাধ্যমে আলোচনা শোনার পাশাপাশি অংশগ্রহণ ও তথ্য বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব মাধ্যমে উঠে আসা আগ্রহ ও প্রশ্নকে পরবর্তী আয়োজনের বিষয় নির্বাচনে কাজে লাগানো যেতে পারে।
সহযোগিতার প্রত্যাশা বাস্তবে নেওয়ার পথ
বিএসএসএফ আশা প্রকাশ করেছে, এ আয়োজন নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, খাদ্য উৎপাদনকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়াবে। আইইউবি ও সিএবিআইয়ের সহযোগিতা গবেষণা, জ্ঞান বিনিময় এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করবে বলেও সংগঠনটি প্রত্যাশা জানিয়েছে।
এই প্রত্যাশা এগিয়ে নিতে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংরক্ষণ, অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং পরবর্তী উদ্যোগের অগ্রগতি জানানো কার্যকর হতে পারে। গবেষক ও উৎপাদনকারীদের নিয়মিত মতবিনিময়ও মাঠের প্রশ্নকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দিতে পারে।
সেমিনারে বিভিন্ন পক্ষের উপস্থিতি সহযোগিতার একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে উপস্থিতির সুফল ধরে রাখতে যোগাযোগের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট বিষয়ে কারা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা কীভাবে বিনিময় হবে, তা নির্ধারণ করা হলে আলোচনা আরও ফলপ্রসূ হতে পারে।
বিএসএসএফের ষষ্ঠ জাতীয় কারিগরি সেমিনার নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে এমন একটি আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে উৎপাদন, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পাশাপাশি এসেছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই যোগাযোগ ধরে রাখা এবং প্রশ্ন ও পরামর্শের পর্যালোচনাকে পরবর্তী কাজে যুক্ত করা। মানুষের পাতে নিরাপদ খাবার পৌঁছানোর লক্ষ্যেই এ আলোচনার মূল্য ও প্রাসঙ্গিকতা।























