আলতাবের ভাগ্য বদলে
তুষের গরমে হাঁসের বাচ্চা
ড. বায়েজিদ মোড়ল
পরাজয়ে ডরে না বীর। আতœপ্রত্যয়ী ও বার বার জীবন সংগ্রামে পোঢ় খাওয়া, দিন বদলের অগ্রনী নায়ক, সকল দুঃখ ব্যাথা বেদনাকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়েছেন যিনি, তিনি হচ্ছেন নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার নলঝুড়ি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা আলতাবুর রহমান। ডাক নাম আলতাব। হাওড় বাওড় বিধৌত অঞ্চলে জন্ম বিধায় ছোটবেলা থেকেই বেশ বাউন্ডুলে জীবন যাপন করতেন আলতাব। ৩ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে তিনি ৩ নম্বর। বোনেরা সবাই জীবিত থাকলেও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তাঁর বড় দুই ভাই কম বয়সেই ইন্তেকাল করেন। ২ ভাইয়ের ইন্তেকালের পর আলতাব দিশেহারা হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় পড়াশোনায় বেশী দূর এগুতে পারেনি। এর পর তিনি বিলে আর হাওড় বাওড়ে ঘুরে বেড়াতেন, আর ভাবতেন কি করবেন? একদিন মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওড়ে বসে তিনি ভাবছিলেন, ঠিক তখনই তার মাথায় আসল এই হাওড়, বাওড় ও বিলগুলো লিজ নিয়ে সেখানে মাছ চাষ করবেন এবং সে মাছ বিক্রি করবেন। ভাবনা অনুযায়ী কাজ শুরুও করেছিলেন তিনি। বেশ ভালই চলছিল তাঁর মাছ ধরা ও মাছ বিক্রয় কার্যক্রম। কিন্তু ১৯৮৫ সালে অসময়ে আকস্মিক বন্যায় তার হাওড় ও বিলের সব মাছ অন্যত্র চলে যায় এবং ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হন আলতাবুর রহমান। ৪ বোনসহ বাবা-মার এই পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান হওয়ায় দায়িত্ব পালনের বোধ থেকে অনেক দিশেহারা হয়ে পড়েন আবারও তিনি। পরে কোন উপায় না পেয়ে মোহনগঞ্জের পাশের উপজেলা মদন নামক স্থানে দেখতে পান এক হাঁস খামারী, এক অভিনব তুঁষ পদ্ধতিতে হাঁস ছাড়াই ডিম থেকে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করছেন। তখন তার সাথে কথা বলে তিনি জানতে পারলেন এই পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন খুবই সহজ এবং লাভজনক। ক্রেতারও অভাব নেই এই হাওড় অঞ্চল খ্যাত নেত্রকোনায়। চাহিদা অনুযায়ী সেই খামারী হাঁসের বাচ্চার সরবরাহ করতেও হিমশিম খাচ্ছিলেন।
সেখান থেকেই আলতাব সিদ্ধান্ত নেন, তুষ পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করবেন। তারপর সেখান থেকে হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করবেন। আর কিছু কিছু করে হাঁসের বাচ্চা নিজের জন্য রেখে একজন প্রতিষ্ঠিত হাঁস খামারী হিসেবে নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটাবেন। এরপর ভাবতে থাকেন শুরু করবেন, শুরু করবেন। কিন্তু সাহস করে শুরু করতে-করতে পার হয়ে যায়, আরো কয়েক বছর।
১৯৯৬ সালেই শুরু করেন অভিনব তুষ পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন কার্যক্রম। ১২০০ টি হাঁসের ডিম দিয়ে আলতাবুর রহমান সর্বপ্রথম তুঁষ পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেন। ১২০০ ডিম থেকে ৮০০ হাঁসের বাচ্চা পান তিনি। এরপর থেকে তার এ কার্যক্রম চলতে থাকে, বাণিজ্যিকভাবে অভাবনিয় সাফল্যও লাভ করেন আলতাব। এভাবে ডিম বসানোর ২৮ দিনের মধ্যেই সে সব ডিম ফুটে হাঁসের বাচ্চা বের হয়। অর্থাৎ প্রতি মাসেই নতুন নতুন হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করছেন আর বিক্রি করছেন আলতাব।
তিনি জানান, চীনে উদ্ভাবিত এ পক্রিয়াটি বিদ্যুৎবিহীন গ্রামে ব্যবহার করে সহজেই বাচ্চা উৎপাদন করা সম্ভব। এতে স্থানীয় সহজলভ্য দ্রব্যাদি ব্যবহৃত হয়। প্রথমে খেয়াল রাখতে হবে: যেসব হাঁসের খামারে পুরুষ হাঁসের পরিমাণ নূনতম ১০ শতাংশ সেসব খামারের ডিম ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত বড় আকার প্রধান্য না দিয়ে মাঝারি আকারের আনুমানিক ৭০-৭৫ গ্রাম ওজনের ডিম হলে ভাল হয়। ডিমের ভিতর যদি রক্তের ছিটা, ঘোলাটে ভাব বা বায়ুর বুদ বুদ দেখা যায়, তবে সে ডিম ফোটার জন্য না ফোটানোই ভাল। ডিমের কুসুম মাঝখানে থাকলে সে ডিম ভাল ফোটে। ফোটানোর জন্য সাধারণত তিন দিনের বেশী বয়সের ডিম ব্যবহার করা উচিত নয়। ঠান্ডা বা সূর্যকিরণ লাগে না এ ধরণের স্থানে ডিম সংরক্ষণ করতে হবে। ৫০-৫৫ ডিগ্রী ফারেন হাইট তাপে এবং ৬০-৭০ ভাগ আদ্রতায় এ ডিম সংরক্ষণ করা উত্তম। ডিম বসানো বা সংরক্ষণের সময় ডিমের সরু দিকটা নিচের দিকে এবং মোটা দিকটা উপর দিকে দিয়ে বসানো ভাল। ফোটানোর ডিম সতর্কতার সাথে নাড়াচাড়া করা উচিত। কারণ, এর ভিতরের অংশ নড়ে গেলে ডিম কম ফোটে। কর্দমাক্ত বা অপরিচ্ছন্ন ডিম ফোটানোর জন্য বসানো উচিত নয়। পানি দিয়ে ডিম ধোয়া উচিত নয়, এতে ডিমের খোসার ছিদ্র দিয়ে পানি প্রবেশ করে ডিম নষ্ট হতে পারে। ব্রাশ বা মোটা কাপড় দিয়ে ঘসে পরিস্কার করা যেতে পারে।
আলতাব আরো বলেন, এমণ একটি কক্ষ নির্বাচন করতে হবে যেখানটায় মোটামোটি বায়ু প্রবাহে অসমর্থ বা ছিদ্রহীন। জানালা বা দরজা চট বা বোর্ড দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। ডিম যে জায়গায় বসানো হয় তাকে সিলিন্ডার বা ঝুড়ি বলে। ঝুড়ির উচ্চতা ৩.৫ ফুট এবং ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের হলে ভাল হয়। এ ধরণের একটি সিলিন্ডারে প্রায় ৫ শতাধিক ডিম বসানো যায়। ৫টি সিলিন্ডার বসানোর জন্য ৭ ফুট লম্বা এবং ৪২ ইঞ্চি প্রস্থ বিশিষ্ট বক্স যথেষ্ট। নূন্যতম দুটি সিলিন্ডার থাকতে হবে। এর তলদেশে তুষ বিছিয়ে দিয়ে মাদুর বা চাটাই দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সিলিন্ডার এসব চাটাইয়ের উপর দাঁড় করিয়ে বাক্সের ভিতর এবং সিলিন্ডারের চারপাশ শুষ্ক ও পরিষ্কার তুষ দিয়ে ভরিয়ে দিতে হবে। বক্সের উপরিভাগ চাটাই দিয়ে এমণভাবে ঢেকে দিতে হবে যেন সিলিন্ডারগুলোর মুখ খোলা থাকে। ডিম বসানোর আগে ডিমগুলোকে মৃদু স্যাভলন বা যে কোন মৃদু জীবানু নাশক দিয়ে কুশম গরম পানিতে ধোয়ে নেয়া উচিত। তুষে বসানোর আগে ১ম সিলিন্ডারে অন্ততঃ ৪ ঘন্টার জন্য একটি হারিকেন জ্বালীয়ে সিলিন্ডারের মুখ তুষের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। সিলিন্ডারে ডিম ঢুকানোর আগে মোটা কাপড়ের পোটলাতে বেঁধে নিতে হবে। একই উদ্দেশ্যে হারিকেনটি তুলে অন্য আরেক সিলিন্ডারে একইভাবে রেখে ঐ সিলিন্ডারটির মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। ডিমের একাধিক পোটলা গরম হওয়া সিলিন্ডারে রাখার পর একটি তুষ ভর্তি বস্তা দিয়ে এই সিলিন্ডারটিও ঢেকে দিতে হবে। এভাবে ১৮-২০ দিন ৪ ঘন্টা অন্তর অন্তর বারবার সিলিন্ডার পরিবর্তন করে ডিমগুলোকে গরম করতে হবে। এক্ষেত্রে সিলিন্ডার পরিবর্তনের সময় উপরের পুটলীগুলোকে নিচে এবং নিচেরগুলোকে উপরে রাখতে হবে। ২০ দিন পর ডিমগুলোকে একটি খোলা বেডে ডিমের নিচে তুলার ল্যাপ ও উপরে তুলার ল্যাপ দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এখানে ২৫-২৬ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে শুরু করে। ২৮ দিনে ডিম ফোটে বাচ্চা বের হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে। বাচ্চা ফুটার ১০ মিনিট পর ব্রæডারে রাখতে হবে। এর ২৪ ঘন্টার মধ্যে কোন খাবার সরবরাহের প্রয়োজন হয় না। তারপর বাচ্চাকে স্বাভাবিক নিয়মে পালন করতে হবে।
আলতাবুর রহমান জানান, ফাল্গুন মাসে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের হার সবচেয়ে বেশী। এ সময় তুষ পদ্ধতিতে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন করেলে ১০০টি ডিম থেকে ৮০টি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন হয়। নিজের খামারের হাঁসের খাদ্য সরবরাহের উৎস হিসেবে হাওড়ের ধান কাটার পর, সেই পতিত জমিতে ধানক্ষেত এর ধানগুলো পড়ে থাকে, হাঁস সেখানে চড়ে বেড়ায় এবং খাবার খায়।

এসব হাঁসের বাচ্চা নেত্রকোণা জেলায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে বিক্রি করলেও তাঁর মূল ব্যবসাটা হয় তাঁর নিজের জেলা নেত্রকোণার বাইরে। ভোলা, পটুয়াখালাীর ব্যাপারীরা মূলত তারঁ বড় ক্লাইন্ট।
৪ মেয়ে ও ৩ছেলে সন্তান এর সংসার চালাচ্ছেন এই হাঁস ও তুঁষ পদ্ধতিতে উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চা বিক্রি বাবদ অর্জিত অর্থ দিয়ে। এই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ও সংসার চালানোর সব খরচ তিনি বহন করছেন, এই হাঁসের ব্যবসা থেকে। হাঁসের বাচ্চা বিক্রির টাকা দিয়ে আলতাবুর ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজের পরিবারের জন্য একটি পাকা ঘরও নির্মাণ করেছেন। ছেলে মেয়েদের তিনি লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। তার বড় ছেলে তাকে এই কাজে সহযোগিতা করে। বড় ছেলে ময়মনসিংহে এসে ট্রেনিং করে গেছে। সেই মুলত এখন খামারটি বেশি দেখাশুনা করেন এছাড়া কর্মচারী আছে ৫জন। এই মৌসুমে ৩,১০০ হাঁস আছে তার খামারে। এই হাস হাওড়ে চড়ে বেড়ায় সারা দিন আর রাতের বেলা হাওড়ের পাড়েই ভ্রাম্যমান ঘরে থাকে হাঁসগুলি। হাওড়ের পানি নামা উঠার উপর নির্ভও কওে তার খামার। হাওড়ে যখন যেখানে পানি থাকে তার হাস সেখানে নিয়ে পালন কওে সারা বছর। আর বাড়েিত হলে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন। প্রতিদিন তার খামারে ২০০০ উপরে ডিম আসছে। প্রতিটা ডিম পাইকারী ৮ টাকা করে বিক্রি করেন। এই হিসেবে প্রতিদিন তার ১৫-১৬ হাজার টাকা আয় করেন। মাসে সাড়ে ৪ লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা তবে এর মধ্যে তার কর্মচারির বেতন ও হাঁসের খাবার বাবদ দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হয় সারা বছর। তবে হাঁস সারা বছর ডিম পাড়েনা বলে, বছর শেষে আলতাবের ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার মতো নিট আয় থাকে সব কিছু বাদ দিয়ে। যে টাকা দিয়ে তিনি বেশ কয়েক বিঘা জমিও কিনেছেন। আলতাব এখন মোহনগঞ্জের বেকার মানুষদের সামনে আদর্শ
৬২ বছর বয়সী আলতাবুরের এই সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে জেলার ও জেলার বাইরের অনেক খামারী এই তুষ পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করতে শিখেছে এবং এলাকার অনেক বেকার যুবক এই পদ্ধতিতে হাঁসের খামার করে তাদের আত্মকর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে।
ডিঙ্গাপোতা হাওড়ের মাঝে যে পাকা রাস্তা নেমে গেছে সেই পয়েন্টের নাম তেথুলিয়া। তেথুলিয়ার মির্জা সাজু, সন্ড,ু শোভা আক্তার সহ অনেকে আছেন যারা আলতাবের ‘নুরনাহার হাঁসের হ্যাচারি’ থেকে বাচ্চা এনে হাঁস পালন করছেন। এরা সবাই সকালে হাওড়ে হাঁস ছেড়ে দেন সন্ধ্যার সময় হাঁস চরাই করে ফিরে এলে তাদের আবার কিছু খাবারও দিয়ে থাকেন, সেই খাবার খেয়ে হাঁস ঘরে যায়। কিছু কিছু ঘর আছে বাড়ীর মধ্যে আর বাকী সবার ঘর হওড়ের মাঝেই।
আর আপনারা যারা ভাল জাতের হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করতে চান, তারা নারায়নগঞ্জ জেলার হাজীগঞ্জে অবস্থিত কেন্দ্রীয় হাঁস প্রজনন খামার এবং খুলনার দৌলতপুরের আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারে যোগাযোগ করতে পারেন। সেখানে প্রতি মাসের ৫, ১০, ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ তারিখে হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করা হয়।
হাঁস পালনের এই উজ্জ্বল সম্ভাবনাই ধীরে ধীরে পূরণ করতে পারে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসাধারণের আমিষের চাহিদা, এগিয়ে নিতে পারে দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের ধারাকে। এই হাঁস পালনই হতে পারে একজন শিক্ষিত বেকার যুবক/যুবতির দারিদ্র বিমোচনের অন্যতম এক হাতিয়ার।
























