একজন সফল পোল্ট্রি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া
ড. বায়েজিদ মোড়ল
ঢাকার তেজগাঁস্থ ফার্মগেট এলাকার মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে অফিসার হিসেবে যোগদানের সুযোগ পেয়েছিলেন। আরিফুজ্জামানের পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে সবাই সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। এ জন্য তিনি বিমান বাহিনীর এমন সুযোগ পেয়েও সেখানে যোগদান না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় প্রশাসনে সম্মান শ্রেনীতে ভর্তি হোন। পড়াশুনার পাশাপাশী তিনি ঢাকার সাভারস্থ বিশ মাইল এলাকায় ২ বিঘা জমি কিনে ফুলের চাষ শুরু করেন। প্রথমে ফুলে ভাল ব্যবসা হতে লাগল। ৮০’র দশকে নার্সারী ও ফলের ব্যবসা বেশ জমজমাট হয়ে উঠে। উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের হাতে গোলাপ ও রজনীগন্ধার স্টিক, তোড়া প্রায়শই দেখা যেত। জন্মদিন, বিবাহ, বিবাহবার্ষিকীসহ অফিসিয়াল সব ধরনের অনুষ্ঠানে ফুল দিয়ে মঞ্চ সাজানোর পাশাপাশী সবার হাতে ফুলের তোড়া, ডালা ইত্যাদি ব্যবহার হতো।
৯০’র দশকে এসে ফুলে ব্যবসায় মন্দা এলো। ফুলের দাম কম পাশাপাশী ফুল প্রসেসিংএ জটিলতা, বিপণনে সুনিদৃষ্ট নীতিমালার অভাব। তখন পোল্ট্রি শিল্পের দিকে মনোনিবেশ করলেন আরিফুজ্জামান ভুইয়া। প্রথমে একটি টিন সেডে ১০০০ বয়লার মুরগী তোলেন। একবারে টাকা খরচ করে মুরগীর বাচ্চা এনে সেডে তোলা তারপর দেড় দুমাস খাওয়ায় বড় করে একবারে বিক্রি করে দেওয়া। তিনি ভাবলেন প্রতিদিন খরচ হবে প্রতিদিন আসবে এভাবে শিল্প দাড় করানো যাবে। তারপর ঐ সেডে ৬০০ রেড লেয়ার মুরগী তোলেন। ছয় মাস পরে তার আশা পূরন হতে লাগলো। মুরগীর ডিম বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে মুরগীর খাবার খরচ চালিয়ে আরো কিছু লাভ আসতে লাগে। তখন তিনি সেডের পরিধি বাড়াতে লাগলেন এবং এক বছরের মধ্যেই আরো ১৬০০ যোগ করে ২৬০০ লেয়ার মুরগী পালন শুরু করলেন। তখন লেখাপড়ার পাশাপাশী মুরগীর ফার্মে সারাক্ষন কাজ করতে থাকেন। ভাবলেন কর্মচারি বৃদ্ধি করতে হবে। তখন এলাকার গরীর দুটি পরিবার স্বামী-স্ত্রীসহ চার জনের চাকরি দেন। কর্মচারিদের ফার্মে থাকার ব্যবস্থা করলেন। কর্মচারিরা সারাক্ষন মুরগীগুলো দেখে শুনে রাখে। তাতে মুরগীর রোগবালাই কম হয়, অপুষ্টিতে ভোগেনা। সময়মত খাবার পায়। সব কিছু মিলে মুরগীর ফার্ম সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ হয় আরিফুজ্জামান ভুঁইয়ার। এরপর সুযোগ আসে আমেরিকা যাবার উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের জন্য। তখন ঐ কর্মচারীদের হাতে ফার্মের দায় ভার ছেড়ে দিয়ে তিনি চলে যান আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি ভেবে ছিলেন বিদেশ চলে গেলে এই কর্মচারীগুলির কি হবে? তারা বুঝি ক্ষতিপূরন চাইবে! আমেরিকা গিয়ে ভাবেন তার পোল্ট্রি ফার্ম নেই! কর্মচারীরা হয়তো বেতন না পেয়ে ফার্ম বিক্রি করে দিয়ে পালিয়ে গেছে! পড়াশুনা চলাকালিনই আমেরিকায় তিনি পেলেন বড় চাকরি। সামনে এলো তার ধনী হওয়ার সুযোগ। দেশে এলেন বেড়াতে আর পরিবারের সবার দোয়া নিতে আমেরিকা গিয়ে চাকরি করবেন। এদিকে ফার্মের কর্মচারীরা তাদের বেতন ভাতা ও ফার্মের যাবতীয় খরচ চালিয়ে ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা নগদ লাভ দিলেন এবং দেখলেন ফার্মও একটু বৃদ্ধি পেয়েছে। ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা পেয়ে এবং ফার্মের অবস্থা দেখে তিনি ঘুরে দাড়ালেন। আমেরিকায় যাবার পরিকল্পনা পরিবর্তন করলেন। আমেরিকা সুন্দর দেশ কিন্তু সেখানে ঢাকা শহরের রিক্সার ধাক্কা নেই, কাওরান বাজারের মাছের গন্ধ নেই, হাজারীবাগের ট্যানারীর গন্ধ নেই। তার চির পরিচিত নগরীর কোন চিহ্নই আমেরিকায় নেই। স্বদেশে থেকে পরিকল্পিত ভাবে ব্যবসা করলে আমেরিকা থেকে ভাল করা সম্ভব হবে।
পরিবারের সবার বিরোধিতা সত্তে¡ও আরিফুজ্জামান ভুইয়া পোল্ট্রি সমন্ধ্যে পড়াশুনা শুরু করলেন। সাভারের যুব উন্নয়ন থেকে পোল্ট্রি ফার্মের উপর কোর্স করলেন এবং ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করতে লাগলেন ফার্মের অবয়ব। বিশ মাইল এলাকায় ১২বিঘা জমি নিয়ে “এ্যাকোয়া ল্যান্ড এগ্রো কমপ্লেক্স” নামে তিন তলা বিশিষ্ট ফার্ম গড়ে তোলেন। তার ফার্মে এখন মুরগীর ধারন ক্ষমতা ৩০ হাজার। কিন্তু অনেক হিসেবি এই আরিফুজ্জামান। ১৫ হাজারের বেশি মুরগী কখনোই ফার্মে তোলেন নাই। কারণ বাংলাদেশে মানুষ আছে যারা অনেক হুজোগে ব্যবসা করেন। তিনি ১০০% বাস্তবমুকী একজন খামারী। ২০০৬ সালে যখন বার্ড ফ্লু হয়ে একের পর এক খামার ধ্বংশ হতে থাকে। তখন তিনি সাভার ও ধামরাইয়ের সকল খামারীদের একত্রিত করে সাভার পোল্ট্রি ফারমার এসোসিয়েশন নামে সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি ঐ সংগঠনের সাধারন সম্পাদক। পোল্ট্রি খামারীদের সচেতন করার চেষ্টা করেন। শীত এলে বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আরিফ শীত আসার আগেই ফার্মের বয়স্ক মুরগীগুলো বিক্রি করে দেন। এই নভেম্বর মাসেই তিনি চার হাজার বয়স্ক মুরগী বিক্রি করলেন, শীত কমে গেলে আবার মুরগী তুলবেন খামারে। প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার ডিম আসছে তার ফার্ম থেকে। প্রতিদিন সকালে নিজে ড্রাইভ করে গাড়ী নিয়ে যান ফার্মে। সারাদিন থেকে সন্ধ্যা বেলা আবার ফিরে আসেন ফার্মগেট তেজগাঁয়ের বাসায়। তিনি এখন দুই সন্তানের জনক। তার স্ত্রী একজন চিকিৎসক। তার স্ত্রী প্রথম প্রথম পোল্ট্রি ব্যবসাটাকে অন্য চোখে দেখতো। কিন্তু আরিফের ফার্মে আজ পর্যন্ত কোন মাস লোকসান দেই নি। আরিফের ধ্যান জ্ঞান সবকিছু মিলে আছে তার পোল্ট্রি খামার। পোল্ট্রি খামারের মুরগীগুলো তার সন্তানের মতো। তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে মাঝে মাঝে আরিফের সাথে পোল্ট্রি খামারে যান। একটি
সুন্দর রেষ্ট হাউজ আছে দুপুর বেলা এক সাথে ফার্মে বসে খাওয়া দাওয়া করেন।
ফার্মের পাশে মৎস্য চাষের জন্য রয়েছে পুকুর, অব্যবহৃত জমিতে চাষ করছেন সবজি, লাগিয়েছেন বিভিন্ন ফলমূলের গাছ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এ ফার্মের বিষ্টা দিয়ে তেরী করেছেন বায়োগ্যাস প্লান্ট। ১২ জন কর্মচারি আছে তার খামারে। কর্মচারীদের তিনটি পরিবারের রান্না চলে এ প্লান্টের গ্যাস দিয়ে।
তিনি বলেন-পোল্ট্রি ফার্ম করা অশিক্ষিত লোকের কাজ নয়। কিছু পড়াশুনা প্রয়োজন আছে। মুরগীর কোন সময় কি রোগ হচ্ছে কি লক্ষণ দেখা দিলে কি রোগ হয়। এসব বিষয়ে পড়া শুনা করা এবং সাধারণ লক্ষন দেখে মুরগীদের চিকিৎসা করার মতো জ্ঞান থাকতে হবে। অসুস্থ্য বা মৃত মুরগীর পোষ্টমর্টেম করতে হবে। পশু চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ফার্মের মুরগীর অবস্থা জানাতে হবে জানাতে ভুল করলে চিকিৎসা ভুল হবে। ফার্মে প্রবেশের সময় অবশ্যই স্যাভলোন স্প্রে করতে বা এন্টিসেপ্টীক স্প্রে করতে হবে। বাইরের কোন ফার্ম থেকে কেউ এলে তাকে ফার্মে প্রবেশের আগে ভাল করে ¯েপ্র করতে হবে। আর সর্ব সাধারনের জন্য ফার্মে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত হতে হবে। মুরগীকে নিয়ম মাফিক খাওয়াতে হবে। আজ এক সময় কাল আরেক সময়, পড়শু অন্য আরেক সময় মুরগীকে খাবার খাওয়ালে হবে না। প্রতিদিন একটি নিদৃষ্ট সময় ফার্মের মুরগীদের খাবার খাইতে দিতে হবে। প্রতিদিন একবার ফার্মের বিষ্টা পরিস্কার করতে হবে। সপ্তাহে এক বা দুদিন ফার্মের মেঝে স্যাভলোন বা ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মুরগীর খাবরের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে। অবশ্যই ভাল খাবার মুরগীদের খাওয়াতে হবে। ফার্মের কোন মুরগী হঠাৎ মারা গেলে পোষ্ট মর্টেম করে তার কলিজা, গিলা, ফুসফুস পিত্তথলি ইত্যাদি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে মুরগীর দেহবশেষ ফার্মের বাইরে মাটির নিচে পুতে রাখতে হবে। আর যেখানে বসে মৃত মুরগীর পোষ্ট মর্র্টেম করা হবে সেখানকার পুরো জায়গাটাকে স্যাভলোন বা ডেটল দিয়ে ভাল করে পরিস্কার করতে হবে। কোন অবস্থায় অবহেলা বা আগামীকাল করব এমন মনোভাব থাকা যাবে না।
নতুন কেউ পোল্ট্রি খামার করতে চাইলে তাকে অবশ্যই অন্য কোন ফার্মে ছয় মাস কাজ করতে হবে। মুরগীর বিষ্টা যদি খামারী তার নিজের গায়ে না মাখায়, নিজের হাত দিয়ে পরিষ্কার না করে, তাহলে সে মুরগী থেকে লাভের আশা করবে কি করে।
























