উন্নয়ন সমন্বয়ের বাজেট বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকদের অভিমতঃ
অন্তর্বর্তী সরকার আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের যে বাজেট তৈরি করেছে সেখানে একদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ এবং অন্যদিকে রাজনৈতিক-অর্থনীতির বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দের ক্ষেত্রে বাজেট প্রণেতারা আরও সাহসী ও সময়োপযোগি পদক্ষেপ নিতে পারতেন বলে মনে করেন অংশীজনেরা।

আজ (মঙ্গলবার, ২৪ জুন ২০২৫) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন সমন্বয়ের আয়োজনে “বাজেট পর্যালোচনা ২০২৫-২৬” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন আলোচকবৃন্দ।
ঢাকায় সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক এবং উন্নয়ন সমন্বয়ের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ড. এস. এম. জুলফিকার আলী।
বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য আলী আহমদ এবং গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার।
তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য আদৃতা রায়, একই সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি দিলীপ রায়, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সীমা আখতার, এবং একই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উন্নয়ন সমন্বয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগি ড. মাহবুব হাসান।
উন্নয়ন সমন্বয়ের পক্ষ থেকে প্রেক্ষাপট উপস্থাপনায় সংস্থার গবেষণা পরিচালক আব্দুল্লাহ নাদভী বলেন যে, সঙ্কোচনমুখী বাজেট দেয়া হয়েছে বলা হলেও বাজেট বাস্তবায়নে আগের ধারা বজায় রাখলে এই বাজেটেরও ৭ শতাংশের মতো অবাস্তবায়িত থেকে যাবে।
বাজেটের শিরোনামে বৈষম্য দূরীকরণের কথা বলা হলেও কর প্রস্তাবে তার প্রতিফলিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন আদৃতা রায়। তিনি বলেন যে, ভ্যাট-সহ পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরতার পাশাপাশি বিভিন্ন আয়শ্রেণীর করদাতাদের ওপর এমন হারে করারোপের প্রস্তাবনা এসেছে যার ফলে কম আয়শ্রেণীর মানুষের ওপর করের বোঝা বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মেঘমল্লার বসু বলেন যে, ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নাগরিকদের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থাকাদের অনুপাত বিগত চার-পাঁচ বছরে ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪০ শতাংশে ঠেকেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মতো কোন কার্যকর প্রস্তাবনা বাজেটে নেই।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরের এই বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে- এমন প্রত্যশা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি বলে মত দেন দিলীপ রায়।
গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলোর সাথে মতবিনিময়ের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করলে এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা যেতো বলে তিন মনে করেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণিত এই বাজেট আগের ধারাবাহিকতার বাইরে যেতে পারেনি বলে মনে করেন সীমা আখতার।
সৈকত আরিফ বলেন যে, এবারের বাজেটে প্রত্যাশা ছিলো সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দের ক্ষেত্রে সময়োপযোগি কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে যা পরবর্তি বাজেট-প্রণেতাদের জন্যও নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
তাসলিমা আখতার বলেন যে, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে আগেও নগরাঞ্চলের কম-আয়শ্রেণীর মানুষের চাহিদা, বিশেষ করে শ্রমিকদের চাহিদা উপেক্ষিত থেকেছে। এবারের বাজেটেও সে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। শ্রমিক হিসেবে সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের সুবিধা পাবেন মাত্র ৩০ হাজার নাগরিক।
এনবিআর-কে আসন্ন অর্থবছরে যে ৪ লক্ষ ৯৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে সেটি অর্জন করা সম্ভব হবেনা অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। এর ফলে বাজেট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করেন আলী আহমদ।
এবার বাজেটে কৃষিতে বরাদ্ধ বৃদ্ধি করা হলেও তা সঠিক জায়গায় বা সঠিক খাতে ব্যবহার হচ্ছেনা, কৃষকরা চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে, আলু চাষি তার খরচ তুলতে পারছেনা, পেয়াজ চাষীর নাভিশ্বাস, ডেইরি খামারে খরচের চেয়ে দুধ ও মাংশের দাম কম হচ্ছে, শেষ ২০ বছর ধরে মাছের দাম কাছাকাছি উঠানামা করছে কিন্তু মাছের খ্যাদের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪ টাকার জায়গায় ৭০ টাকা কৃষি সাংবাদিক ড. বায়েজিদ মোড়ল প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীন জনপেদর মানুষের কষ্টের কথাগুলো তুলের ধরে উপস্থিত সবাইকে গম্ভীর করে ফেলে। তিনি আরো বলেন বাজেটে কৃষকদের জন্য যা বরাদ্ধ থাক সেটার সঠিক ব্যবহার চান, মাটির স্বাস্থ্য বউন্নত না হলে একদিন মাটি আমাদের খাদ্য বন্ধ করে দিবে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ সামাজিক খাতগুলোতে নতুন ভবন, অবকাঠামো ইত্যাদির জন্য বছর বছর বরাদ্দ না বাড়িয়ে সেবার গুণগত মানোন্নয়নের দিকেই বাজেটের মনোযোগ দেয়া দরকার বলে মত দেন ড. জুলফিকার আলী। এবারের বাজেটে এ রকম কিছু চেষ্টা দেখা গেলেও নানামুখী চ্যালেঞ্জের কারণে এ খাতগুলোকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ছিলো তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
























