
ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল: নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা, জলাশয় হাঁস পালনে বিশেষ উপযোগী। দারিদ্র বিমোচনে হাঁস খামারের গুরুত্বঅপরিসীম। স্বল্প পুঁজি এবং সাধারণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খুব সহজেই গ্রামীণ পর্যায়ে হাঁস লালন পালন করা সম্ভব।
হাঁস ব্যবস্থাপনায় প্রধান খরচ হলো হাঁসের খাদ্য। সারা দেশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ডোবা,নালা, পুকুর দীঘি, খাল, বিল। এছাড়া গ্রামের অনেক বাড়িতেই রয়েছে পতিত জলাশয়। যা প্রাকৃতিক খাদ্যে প্রাচুর্য্যময়। হাঁস নালা ও নীচু জলাশয়ের পোকা, মাকড়, শামুক, ঝিনুক, ছোট মাছ ইত্যাদি থেকে তার খাদ্য চাহিদার অধিকাংশ মিটিয়ে থাকে। তাই হাঁসের জন্য তৈরী খাদ্যের প্রয়োজন বেশ কম। তাছাড়াও মুরগির চেয়ে হাঁসের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশী, এদের মৃত্যুহারও কম। মুরগির চেয়ে হাঁস বড় আকারের হয়ে থাকে এবং অধিক সংখ্যকডিম দিয়ে থাকে। হাঁস মাছের সাথেও সমন্বিতভাবে চাষ করা যায়। এ পদ্ধতিঅনুসরণে পুকুরে হাঁস পালন করলে কোন প্রকার সার ও মাছের খাদ্য সরবরাহ ছাড়াই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এভাবে একই জমিতে একই ব্যবস্থাপনায় লাবজনক হারে অধিক মাছ, ডিম ও মাংস উৎপাদন করা সম্ভব। আর এই উজ্জ্বল সম্ভাবনাই ধীরে ধীরে পূরণ করতে পারে দেশের ক্রমবর্ধমান জনগণের আমিষের চাহিদা, এগিয়ে নিতে পারে দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন।
বিভিন্ন জাতের হাঁসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য সমূহ
পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতের হাঁস পাওয়া যায়। বিভিন্ন দেশে এ সমস্ত হাঁসের জাত থেকে প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাতের হাঁস উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। যার বৈশিষ্ট্য সমূহ ছক আকারে প্রদান করো হলো। এর মাধ্যমে আমাদের দেশে হাঁস খামারীরা হাঁসের বিভিন্ন জাত সম্পর্কে সম্যক ধারনা লাভ করবেন।
জাতের নাম উৎপত্তি স্থল পালকের রং দেহের আকার পা এবং পায়ের পাতার রং ঠোটের রং ওজন ডিম উৎপাদন (বাৎসরিক) উদ্দেশ্য
জিনডিং চীন হাঁসঃ মাথা সবুজ, দেহ সাদা এবং কালোর মিশ্রণ, হাঁসীঃ বাদামী এবং কালোর মিশ্রণ, হালকা, দ্রুত চলাচল করতে পারে, ঘাড় লম্বা, চিকন, হাঁসাঃ কমলা হাঁসীঃ হালকা হলুদ, হাঁসাঃ নীলাভ, হাঁসীঃ হালকা হলুদ, হাঁসাঃ ১.৮-২ কেজি, হাঁসীঃ ১.৫কেজি, ২৫০-২৭০ ডিম উৎপাদন
খাকী ক্যাম্পবেল ইংল্যান্ড পালকের রং খাকী, মাথা এবং ঘাড় ব্রোঞ্জ রংয়ের, মাঝারী আকৃতির অপেক্ষাকৃত গোলাকার, চলাফেরায় ধীরস্থির হাঁসাঃ হলুদ, হাঁসীঃ কালো, হাঁসাঃ নীলাভ হাঁসীঃ কালো, হাঁসাঃ ১.৮ কেজি, হাঁসীঃ১.৫কেজি, ২৫০-২৭০ ডিম উৎপাদন
ক্রস/সংকর জাত (জিনডিং হাঁসা নারায়ণগঞ্জ হাঁসাঃ মাথা সরু, দেহ সাদা কালোর মিশ্রণ
হাঁসী কালচে বাদামী এবং কালোর মিশ্রণ হালকা, ঘাড় লম্বা এবং চিকন হাঁসাঃ হালকা হলুদ, হাঁসীঃ হালকা হলুদ, হাঁসাঃ নীলাভ, হাঁসীঃ হালকা হলুদ, হাঁসাঃ ১.৮ কেজি, হাঁসীঃ ১.৬কেজি ২৬০-২৭৫ ডিম উৎপাদন
দেশী সাদা বাংলাদেশ হাঁসা এবং হাঁসী সাদা মাঝারী, প্রায় গোলাকৃতির, হাঁসাঃ কমলা, হাঁসীঃ হলদে, হাঁসাঃ ফ্যাকাশে কমলা, হাঁসীঃ হলুদ, হাঁসাঃ ১.৮ কেজি, হাঁসীঃ ১.৫কেজি, ১৫০-২০০, মাংস ও ডিম উৎপাদন
দেশী কালো বাংলাদেশ হাঁসা এবং হাঁসী সারা দেহ কালো তবে ঘারের নীচে এবং বুকের কাছে সাদা আকারে বড় এবং ভারী হাঁসাঃ কালচে নীল, হাঁসীঃ কালো, হাঁসাঃ কালচে নীল, হাঁসীঃ কালো, হাঁসাঃ ১.৫-২ কেজি, হাঁসীঃ ১.৫-১.৮কেজি, ১৫০-২০০ মাংস ও ডিম উৎপাদন
বেজিং চীন হাঁসা এবং হাঁসীর সাদা পালকে আবৃত আকারে বড় এবং ভারী হাঁসাঃ ফ্যাকাশে কমলা, হাঁসীঃ হলুদ, হাঁসাঃ ফ্যাকাশে কমলা, হাঁসীঃ হলুদ হাঁসাঃ ৩-৪কেজি, হাঁসীঃ ২.৩কেজি, ১৫০-১৬০, মাংস উৎপাদন
মাস্কোভী দক্ষিন আমেরিকা হাঁসা এবং হাঁসীর সাদা অথবা কালো মাথা লাল মাংসল চামড়া দ্বারা আবৃত হাঁসাঃ গোলাপী, হাঁসীঃ গোলাপী, হাঁসাঃ গোলাপী, হাঁসীঃ গোলাপী, হাঁসাঃ ৪-৫কেজি, হাঁসীঃ ২-৩কেজি, ১০০-১২৫, মাংস উৎপাদন
হাঁসের বাচ্চা পালন পদ্ধতি
হাঁসের বাচ্চা পালনের প্রথম পদক্ষেপ হলো বাচ্চার ব্রডিং করা অর্থাৎ বাচ্চাকে তাপ প্রদান করা। ডিম হতে বের হবার পর সুষ্ঠু জীবন বৃদ্ধির জন্য হাঁসের বাচ্চাকে তাপ দিতে হয়। এই তাপ দেয়ার প্রক্রিয়ার নামই ব্রডিং বা তাপায়ন। বাচ্চা অবস্থায় এদের শরীরে প্রাথমিক লোম পড়ে পুনবায় পালক না গজানো পযর্ন্ত নিজেদের দেহের তাপমাত্রা নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা বলে ব্রডিং করার প্রয়োজন হয়। ব্রডিং কাল অর্থ্যাৎ কতদিন ব্রডিং করা হবে তা বিভিন্ন ঋতুর উপর নির্ভর করে। শীতকালে বাচ্চা ফোটার পর থেকে আরম্ভ করে ৪-৬ সপ্তাহ পর্যন্ত ব্রডিং করা যেতে পারে। আবার গ্রীস্মকালে ২-৩ সপ্তাহ ব্রডিং করাই যথেষ্ট।
ব্রডিং দুই ভাবে করা যায়ঃ (ক) প্রাকৃতিক ব্রডিং এবং (খ) কৃত্রিম ব্রডিং
প্রাকৃতিক ব্রডিং
প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে হাঁসী ডিম ফোটানোর পর নিজেরাই ছোট বাচ্চাকে অনুকুল পরিবেশে রাখার ব্যবস্থা করে এবং তাপ প্রদান করে থাকে। অল্পসংখ্যক বাচ্চা পালনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ব্র“ডিং করা যেতে পারে। হাঁসের অধিকাংশ জাত তা দেয়ার অভ্যস্ত নয় বলে সাধারণঃ মুরগীই তা দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দেশী বা উন্নত জাতের একটি বড় মুরগির সাহায্যে ১০-১৫ টি হাঁসের বাচ্চায় তা দেয়া যায়। প্রথমে মুরগিকে বাচ্চাসহ কয়েকদিন ঘরে আবদ্ধ রেখে খাবার ও পানি প্রদান করতে হবে। পরবর্তীতে ৫-৭ দিন পর একটি সীমাবদ্ধ স্থানে বাচ্চাসহ মুরগিকে ছাড়াতে হবে। দুই-তিন সপ্তাহ পর বাচ্চাসহ মুরগিকে ছাড়তে হবে। দুই-তিন সপ্তাহ পর বাচ্চার সাথে আর মুরগি রাখার প্রয়োজন নেই।
কৃত্রিম ব্রডিং
কৃত্রিম পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চ কে তাপ প্রদান করা হয়। অধিক সংখ্যক বাচ্চা পালনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। হাঁসের বাচ্চাকে কৃত্রিম উপায়ে ব্র“ডিং করতে চাইলে তা নিুোক্ত উপায়ে করতে হবে।
ঘর তৈরীর কাজঃ ঘরের মাঝে, দেয়াল অথবা বেড়া, উপরের সিলিং প্রভৃতি ভালোভাবে পরিস্কার করে ফিনাইল, আয়োসান বা অন্য কোন জীবাণুনাশক ঔষধ পানির সাথে মিশিয়ে সেই পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। দেয়ালের উপর তারের জালের বেড়া থাকলে এবং জানালার কপাট না থাকলে বাচ্চাকে শীত অথবা ঝড় বৃষ্টির কবল হতে নিরাপদ রাখার জন্য জালের সাথে চট ঝুলিয়ে দিতে হবে। অন্য সময় এটি গুটিয়ে রাখতে হবে যেন,ঘরের ভেতর পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশ করতে পারে।
ব্রডার ঘরের ব্যবস্থাপনা
ডিম হতে বাচ্চা ফোটার পর ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত বাচ্চা দেহের তাপ নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। তাই বাচ্চাকে কৃত্রিম উপায়ে তাপ দেবার প্রয়োজন হয়। সে যন্ত্রের সাহায্যে তাপ প্রদান করা হয় তাকে ব্রডার বলে। ব্রডারে ব্যবহৃত ছাতার মত অংশকে হোভার বলে। আজকাল বিভিন্ন প্রকার ব্রডার বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। তাছাড়া কাঠ, টিন , হার্ডবোর্ড ইত্যাদির সাহায্যে ব্রডার বানানো যায়। এক ফুট উচু পায়ার সাথে শুধু কাঠ বা হার্ডবোর্ডের সাহায্যে অথবা কাঠ এবং হার্ডবোর্ডের সমন্বয়ে সহজেই ইলেকট্রিক ব্রডার তৈরী করা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় হাঁসের বাচ্চাগুলোকে খাবার, পানি ও তাপের উৎসের কাছাকছি রাখার জন্য হার্ডবোর্ড, বাঁশের চাটাই অথবা পাতলা আয়রণ শীট দ্বারা গোলাকার ব্রডার গার্ড তৈরী করতে হবে। ব্রডার গার্ডের উচ্চতা কমপক্ষে ১৮ ইঞ্চি (১.৫ ফুট) হওয়া ভালো। ৮-১০ ফুটের ব্যাসের একটি ব্রডার গার্ড ৩০০-৪০০টি বাচ্চাকে প্রাথমিক অবস্থায় ব্রডিং করা যায়। হোভার বা তাপের উৎসকে কেন্দ্র করে ২.৫ ফুট থেকে ৩ ফুট দূরত্বে ব্রডার গার্ড স্থাপন ব্রডার গার্ড উঠিয়ে বাচ্চা সমস্ত ঘরে ছেড়ে দিতে হবে।
ব্রডার ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন
ব্রডারের আকার ও অবস্থার প্রেক্ষিতে এবং বাচ্চার জাত ও উপযোগীতা অনুসারে তাপের বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় প্রথম সপ্তাহে ৯৫ ডিগ্রী ফাঃ তাপমাত্রা রাখতে হবে এবং বাচ্চার বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতি সপ্তাহে ৫ ডিগ্রী ফাঃ করে তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। ঘরে বাচ্চা প্রদানের সময ঘরের তাপমাত্রা থাকে ৭৫ ডিগ্রী ফাঃ এবং ব্রডিং শেষে ঘরের তাপমাত্রা হবে ৭০ ডিগ্রী ফাঃ।
ব্রডার ঘরের তাপমাত্রা
বাচ্চার বয়স শীতকাল গ্রীস্মকাল
০ফা ০সে ০ফা ০সে
১ম সপ্তাহ ৯৫ ৩৫ ৯১ ৩২
২য় সপ্তাহ ৯০ ৩২.২ ৮৬ ৩০
৩য় সপ্তাহ ৮৫ ২৯.৪ ৮১ ২৭.২
৪র্থ সপ্তাহ ৮০ ২৬.৬ ৭৫ ২৩.৮
৫ম সপ্তাহ ৭৫ ২৩.৮ – –
ব্রডার ঘরে উপরোক্ত নিয়ম অনুসারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার সুবিধা থাকলে সে অনুযায়ী করতে হবে অথবা শীতকালে প্রতি ১০০ বাচ্চার জন্য ৪টি ১০০ ওয়াট বাল্ব এবং গ্রীষ্মকালে ২টি ১০০ ওয়াট বাল্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রার প্রয়োজন মেটানো যেতে পারে। আমাদের দেশে শীতকালে হাঁসের বাচ্চার মৃত্যুহার বেশী। গ্রামগঞ্জে অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্রডারে প্রয়োজনীয় তাপ প্রদান করা যায় না। যে সমস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ নেই সেখানকার খামারীগণ নিজেদের বুদ্ধিমত হারিকেন, হ্যাজক লাইট অথবা মাটির চুলা তৈরী করে তাপ প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারেন। একটি হ্যাজাক লাইটে প্রায় ১০০টি বাচ্চা এবং হারিকেনের সাহায্যে ২৫টি বাচ্চাকে তাপ প্রদান করা যেতে পারে। ব্রডার ঘরে সঠিক তাপ নির্ণযকারী থার্মোমিটার রাখা উচিত। থার্মোমিটারের সাহায্যে তাপমাত্রা সঠিক আছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। এ ছাড়াও নিুলিখিত লক্ষণগুলো সঠিকভাবে পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে সহজেই বাচ্চার ঘরে বিদ্যমান তাপমাত্রা সম্পর্কে বুঝা যাবে।
(ক) অতি ঠাণ্ডা
(১) ব্রডারের নীচে সবচেয়ে গরম স্থানে সমস্ত বাচ্চা জড়ো হয়ে থাকে (২) একটি বাচ্চার উপর আরেকটি বাচ্চার উঠার প্রবনতা বৃদ্ধি পায়। (৩) বাচ্চাগুলো খাদ্য ও পানি না খেয়ে ব্রডারের নীচে থাকতে চায় বলে বাচ্চা খুব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুহার বেড়ে যায়।
প্রতিকার
(১) ঝুলন্ত ব্রডার বা তাপের উৎস নীচে নামিয়ে দেযা। সাধারণত রুডার মেঝে হতে ১ ফুট উচ্চতায় ঝুলাতে হবে। নীচে নামালে ৬ ইঞ্চির বেশী নীচে নামানো যাবে না। (২) অতিরিক্ত ব্রডারের ব্যবস্থা করতে হবে (৩) ঘরের দরজা জানালা পর্দা দিয়ে ঢাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
(খ) অতি গরম
(১) বাচ্চা তাপের উৎস হতে দূরে এবং ব্রডার গার্ডের কাছাকাছি অবস্থান করে (২) খাদ্য গ্রহনের পরিমান কমে যায় (৩) অনেক সময় ঠোঁট খুলে হাঁপাতে থাকে।
প্রতিকার
(১) তাপের উৎস উপরে উঠিয়ে নিতে হবে। (২) প্রয়োজন অনুসারে ব্রডারের কার্য্যকারিতা বন্ধ করে দিতে হবে। (৩) ঘর ঠান্ডা করার জন্য ঘরের পর্দা উঠিয়ে দিতে হবে।
(গ) স্বাভাবিক অবস্থা
(১) বাচ্চা ব্রডার গার্ডের সর্বত্র সমানভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে (২) স্বাভাবিক ভাবে খাদ্য ও পানি গ্রহণ করবে।
ব্রডার ঘরে আর্দ্রতা এবং বায়ু চলাচল
হাঁসের বাচ্চা মুরগীর বাচ্চার চেয়ে বেশী আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে কিন্তু তারপরও বায়ু যেন বেশী আর্দ্রতাযুক্ত বা বেশী শুষ্ক না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাচ্চার ঘরে আর্দ্রতা বেশী থাকলে লিটার সব সময় ভেজা থাকরে এবং কম হলে লিটার ধুলার মত হয়ে যাবে যা বাচ্চার অস্বস্তির সৃষ্টি করবে। বাচ্চার ঘরে ৪৫-৭৫ % আপেক্ষিক আর্দ্রতা রাখা উচিত। ব্রডার ঘরে বায়ু চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। তাই ব্রডার ঘর হতে দুষিত বায়ু নিষ্কাশন ও বিশুদ্ধ বায়ু সরবরাহ একান্ত প্রয়োজন। তাপের উৎস হতে উদ্ভুত কার্বন-মনোঅক্সাইড এবং বাচ্চা হতে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস ধীরে ধীরে জমা হয়ে বাচ্চার দেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই ব্রডার ঘরে পরিমিত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
রুডার ঘরে পানি ও খাদ্য সরবরাহ
ব্রডার ঘরে পানি এবং খাদ্য গুরুত্ব সহকারে সরবরাহ করতে হবে এবং পানি ও খাদ্য গ্রহণের দিকে নজর রাখতে হবে। হাঁসের বাচ্চাকে খাবার সরবরাহের পূর্বেই পানি সরবরাহ করতে হবে। বাচ্চা ব্রডার গার্ডের ভেতরে ছাড়ার পূর্বেই পানির সাথে কিছু ভিটামিন মিশিয়ে রাখলে ভালো। পানির সাথে এমবাভিট ডাব্লিউ এস অথবা গ্লুকোজ মিশিয়ে খাওয়ালে বাচ্চা যেকোন প্রকার ধকল বা পীড়ন থেকে মুক্ত থাকে। এগুলোর অভাবে পানির সাথে চিনি মিশিয়ে অথবা স্যালাইন পানিও খাওযানো যেতে পারে। এই পানি যেন ৮ ঘন্টার বেশী না থাকলে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাচ্চা পানি পানের ৩০ মিনিট হতে ১ ঘন্টা পরে সুষম খাবার দিতে হবে। কেননা বাচ্চা অবস্থায় শরীর বৃদ্ধির জন্য বাচ্চার জন্য সুষম খাদ্যের প্রয়োজন হয়। প্রাথমিক অবস্থায় বাচ্চার লিটারের উপর পত্রিকা বা অন্য কোন কাগজ বিছিয়ে দিলেও পরবর্তীত আলাদাভাবে খাদ্যের পাত্র দিতে হবে। ৭৫টি বাচ্চার জন্য ১টি পানির পাত্র এবং প্রতি ৪০টি বাচ্চার জন্য ১টি খাদ্যের পাত্র দিতে হবে।
বাচ্চার সুষম খাদ্য তৈরী নিয়ম
খাদ্যের উপাদান শতকরা ভাগ
গম ভাংগা/ চাউল ভাংগা ৫৫
চাউলের কুড়া ১৩
তিলের খৈল ১২
শুটকি মাছের গুড়া ১২
সয়াবিন মিল ৬.১৫
ঝিনুক চুর্ণ ১
লবন ০.৫০
ভিটামিন জি.এস ০.৩৫
মোট ১০০ ভাগ
হাঁসের বাচ্চার বয়স অনুসারে খাদ্যের পরিমান
বয়স মিশ্রিত খাদ্যের পরিমান (গ্রাম প্রতিটি/ দিন)
১ম সপ্তাহ ৫-১০
২য় সপ্তাহ ২০-৩০
৩ সপ্তাহ ৩০-৪০
৪র্থ সপ্তাহ ৪০-৫০
৫ম সপ্তাহ ৫০-৬০
৬ষ্ঠ সপ্তাহ ৬০-৭০
৭ম সপ্তাহ ৭০-৮০
৮ম সপ্তাহ ৮০-৯০
তবে, হাঁসের বাচ্চার ১০ দিন বয়স হতে চাহিদানুসারে ছোট ছোট শামুক সরবরাহ করতে পারলে উপরোক্ত খাদ্যের চাহিদা কমে যাবে।
বাচ্চার জন্য জায়গার পরিমান
বাচ্চাকে ব্রডিং এর সময় প্রয়োজনীয় বিছানা দিতে হবে। বিছানার দ্রব্যাদি বা লিটার হিসেবে তুষ, কাঠের গুড়া প্রভৃতি দেয় যেতে পারে। তবে তুষই অধিক উপযোগী। বাচ্চা ছাড়ার পর থেকে প্রথম ৫দিন তুষের উপর চট বা কাটা বস্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। ৫ দিন পর এই চট উঠিয়ে দিতে হবে। বিছানার দ্রব্যাদি তথা বাচ্চার ঘরে ব্যবহৃত লিটার যথাসম্ভব শুষ্ক রাখতে হবে। লিটার যেন চাকা না বাঁধে সেজন্য তা প্রতি সপ্তাহে উল্টে নেড়ে চেড়ে দিতে হবে। পানির পাত্রের আশে পাশে ভিজা লিটার এবং শক্ত চাকাবাধা লিটার ফেলে পুরাতন লিটারের সাথে আবার কিছু নতুন লিটার যোগ করে দিতে হবে।
বাচ্চার জন্য মেঝের পরিমাপ
বয়স প্রতি হাঁসের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান (বর্গফুট) ডিম পাড়া জাত মাংস উৎপাদনকারী জাত
১দিন বয়স থেকে ৪ সপ্তাহ ০.৫ ০.৭৫-১.০
৪ সপ্তাহ থেকে ৮ সপ্তাহ ১.০ ১.৫০-২.০
৮ সপ্তাহ থেকে ১২ ২.০-২.৫ ৩.০-৩.৫
১২ সপ্তাহ এবং ১২ সপ্তাহের পর ৩.০ ৪.০
বাচ্চার জন্য খাওয়ার পাত্র ও পানির পাত্রের স্থানের পরিমাপ
বয়স প্রতি হাঁসের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান (ইঞ্চি) খাবার পাত্রের স্থান পানির পাত্রের স্থান
১-৩ সপ্তাহ ২.০ ২.০
৪-৮ সপ্তাহ ৩.০ বড়পাত্র
৮-১৬ সপ্তাহ ৪.০ বড়পাত্র
পানিতে বাচ্চা ছাড়ার সময়
সাধারণতঃ বাচ্চার বয়স ১ মাস না হওয়া পর্যন্ত বাচ্চা পানিতে ছাড়া উচিত নয়। বাচ্চার দৈহিক গঠন একটু শক্ত হলে এবং ব্রডিং সম্পূর্ণ শেষ করার পর পানিতে ছাড়তে হবে। তবে গ্রীষ্মকালে ১৫ দিন পরই পানিতে ছাড়া যেতে পারে। প্রথমেই বাচ্চাকে বড় বা গভীর জলাশয়ে না ছেড়ে ছোট গর্তে পানি দিয়ে বাচ্চকে অভ্যস্ত করা যেতে পারে। সেই প্রথম দিন যেন সারাদিন পানিতে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
হাঁস পালন ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের ভৌগলিক পরিবেশ বিশেষ করে নদী, নালা, খাল, বিল, হাওড় প্রভৃতিজলাশয় হাঁস পালনে বিশেষ উপযোগী। সনাতন পদ্ধতিতে পারিবারিক ভাবে হাঁস পালন এদেশে প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত। কিন্তু বর্তমানে হাঁসের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু পারিবারিক ভাবেই নয়, ব্যাপক আকারে এখন হাঁসের চাষ করা হচ্ছে। হাঁস পালনে ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন উন্নত পদ্ধতি। হাঁস পালনের বিভিন্ন পদ্ধতি নিম্নে আলোচনা করা হলো-
(ক) সম্পূর্ণ আবদ্ধ পদ্ধতি
(খ) অর্ধ-আবদ্ধ পদ্ধতি
(গ) মুক্ত পদ্ধতি
সম্পূর্ণ আবদ্ধ পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে হাঁস সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় পালন করা হয়। কখনই হাঁস ঘরের বাইরে বের করা হয় না। এই পদ্ধতিতে সাধারণতঃ হাঁসের বাচ্চা পালন করা হয় এবং নিম্নের পদ্ধতিই বেশী প্রচলিত।
মেঝে পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা মেঝেতে পালন করা হয়। মেঝেতে লিটার বিছানো থাকে । সমস্ত মেঝের এক-চতুর্থাংশ জুড়ে খাদ্য পাত্র প্রদান করা হয়। এই পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চার ভালোভাবে যতœ নেয়া যায়।
(খ) অর্ধ-আবদ্ধ পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে হাঁসগুলো রাতে আবদ্ধ অবস্থায় থাকে এবং দিনে মুক্ত অবস্থায় থাকে। ঘরের ভেতর খাবার দেয় যেতে পারে অথবা বাইরেও দেয় যেতে পারে। বর্তমানে কিছু সরকারী খামার এবং বৃহৎ খামারীরা এই পদ্ধতিতে হাঁস পালন করে থাকেন। খুব সাধারণ ঘর তৈরী করে অথবা উন্নত মানের ঘর তৈরী করেও এই পদ্ধতিতে হাঁস পালন করা যায়। ঘরের চারপাশে হাঁস চলাফেরা করার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে প্রতি হাঁসের জন্য ২-২.৫ বর্গফুট স্থান রাখতে হবে। ঘরের বাইরে হাঁস চল-ফেরা করার জন্য ১০-১২ বর্গফুট স্থানের দরকার। হাঁসের ঘর বরাবর ৮-৯ ইঞ্চি গভীর এবং ২০ ইঞ্চি প্রস্থ বিশিষ্ট ড্রেন করে পানির জায়গা তৈরী করে নিলে হাঁস সহজেই সেই পানিতে চড়তে পারে। এই ড্রেনের পানি কৃত্রিম উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ড্রেন ময়লা হলে তা পরিস্কার করে পুনরায় পানি দ্বারা পুর্ন করতে হবে। সাধারণতঃ বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালন করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সুবিধাজনক তবে এই পদ্ধতিতে খরচ বেশী হয়।
(গ) মুক্ত পদ্ধতি
বাড়ন্ত এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হাঁসের জন্য এই পদ্ধতি উপযোগি। এই পদ্ধতিতে হাঁসগুলোকে শুধু মাত্র রাতে ঘরে আটকে রাখা হয় এবং সকাল ৯টায় ছেড়ে দেয় হয়। কারন হাঁস সকাল ৯টার মধ্যে ডিম পাড়া শেষ করে। প্রাপ্ত বয়স্ক হাঁসের জন্য ২.৫ বর্গফুট স্থানের প্রয়োজন হয়ে এবং এই পদ্ধতিতে তেমন কোন খরচ হয় না।
এছাড়াও কোন কোন স্থানে হাঁস সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় পালন করা হয়। বিশেষ করে যেসব স্থানে প্রচুর পরিমানে মুক্ত জলাশয় বিদ্যমান থাকে, সেসব স্থানে এই পদ্ধতিতে হাঁস পালন করা হয়। হাঁসের ঝাক সারাুদন চড়ে খাওয়ার পর রাতে একটা বেড়া দিয়ে একটি নিদিষ্ট স্থানে আটকে রেখে পুনরায় হাঁস গুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে হাঁস সারাদিন চড়ে খায় বলে আলাদা কোন খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। তবে হাঁসগুলোকে শিকারী প্রাণী বা চোরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একজন পরিচর্যাকারীর প্রয়োজন হয়।
হাঁসের বাসস্থান
গৃহপালিত পাখিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে রক্ষা, নিরাপত্তা প্রদান এবং সর্বাধিক আরাম নিশ্চিত করলেই তা থেকে ভালো উৎপাদন আশা করা যায়। তাই হাঁসেরও বাসস্থানের প্রয়োজন হয়। হাঁসের ঘরের জন্য সাধারণতঃ খোলা মেলা উঁচু ও রৌদ্র থাকে এমন জায়গা বাছাই করা উত্তম। বালু-মাটি, ড্রেন কাটার সুবিধা আছে এবং ঘাস জন্মাতে পারে এমন জায়গা হাঁস পালনের জন্য সুবিধাজনক। ঘর দক্ষিণ মুখী হওয়া প্রয়োজন। এতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারবে। গ্রামীন পরিবেশ, প্রাকৃতিক দূযোর্গ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে ঘরের চালা নির্বাচন করতে হবে। প্রতি হাঁসের জন্য ২-৩ বর্গফুট স্থানই যথেষ্ট। ২৪ বর্গফুট মাপের ১টি ঘর ৮টি হাঁসের জন্য যথেষ্ট। ঘরটি দৈর্ঘ্যে ৬ ফুট, প্রস্থে ৪ফুট এবং উচ্চতায় ৪ ফুট হতে হবে। তবে বাণিজ্যিক খামারের ক্ষেত্রে ঘরের প্রস্থ হতে পারে ১৮-২০ ফুট এবং দৈর্ঘ্য হাঁসের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করতে হবে। ঘর সাধারণ দেশী সামগ্রী যেমন- বাঁশ টিন, ছন, খড় প্রভৃতি দিয়ে তৈরী করা যায়। আবার পাকা মেঝে, ইটের গাথুনী এবং তার জালি দিয়েও ঘর তৈরী করা যায়। ঘরের মেঝেতে লিটার/ বিছানা হিসেবে ২-৩ ইঞ্চি পরিমান ধানের তুষ অথবা কাঠের গুড়া দিয়ে দিতে হবে। তবে ঘর যে উপাদানেই তৈরী হোক না কেন, ঘর যেন শুস্ক হয় এবং সহজে পরিস্কার করা যায় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। নিয়ন্ত্রিত ঘর তৈরীর ক্ষেত্রে ঘরে অভ্যন্তরীন তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ু চলাচল সবই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ঘরের তাপমাত্রা ৫৫০-৭৫০ ফাঃ হাঁসের জন্য অনুকূল। ঘরের আর্দ্রতা ৩০-৭০% এর মধ্যে হওয়া উচিত। হাঁসের ঘরে আলোক নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। ডিম পাড়া হাঁসের ক্ষেত্রে ১৪-১৬ ঘন্টা আলো প্রদান ভালো। ৩০০ বর্গফুট স্থানে ১টি ৬০ ওয়াটের বাল্ব ব্যবহার করে আলোর চাহিদা মেটানো সম্ভব।
হাঁসের প্রজনন
বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন খামারের সার্বিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো খামারের প্রজননক্ষম ঝাঁকের উন্নয়ন। উন্নত গুনাগুন বিশিষ্ট প্রজনন দল যেমন উন্নত মানের ডিম উৎপাদন করতে পারে তেমনি উন্নত মানের ডিম তৈরী করতে পারে উনন্ত মানের বাচ্চা। তাই খামারে সর্বদাই সঠিক প্রজনন পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। হাঁসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার প্রজনন পদ্ধতি বর্তমান। নিয়মিত বাছাই এবং ছাটাইয়ের মাধ্যমে ভালো গুণাবলীর পিতা-মাতা নির্দিষ্ট করে তাদের মধ্যে পর্যায়ক্রমিক ভাবে সঠিক প্রজনন পদ্ধতি প্রয়োগ করে ভালো জাত তৈরী করা সম্ভব। মুলতঃ কোন একটি প্রাণীর জীবদ্দশায় তা উৎপত্তিগত ভাবে যে কৌলিক বৈশিষ্ট্য (এবহবঃরপ ঈযধৎধপঃবৎ) নিয়ে জন্মায় তাকে পরবর্তীতে আর কোন ভাবেই পরিবর্তন করা যায় না। বিষয়টি দুইভাবে করা সম্ভব।
প্রথমতঃ পরবর্তী বংশধর তৈরীর জন্য উন্নত গুনাবলীর পিতা-মাতা বাছাইকরণ।
দ্বিতীয়তঃ বাছাইকৃত পিতা-মাতার মধ্যে সঠিক পন্থায় প্রজনন ঘটানো, যার মাধ্যমে পরবর্তী বংশধরে কিছুু উন্নত গুণাবলীর সমাবেশ ঘটে। তাই প্রথমে বাছাই এবং ছাটাই প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সঠিক হাঁসা নির্বাচন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারন, একটি হাঁসা একই সময়ে অধিক সন্তানের মাঝে তার কৌলিক বৈশিষ্ট্য স্থানান্তর করতে পারে। স্বাস্থ্যবান, চঞ্চল, সুবিন্যস্ত পালকের অধিকারী এবং সর্বোপরি উন্নত কৌলিক গুণাবলী সম্পন্ন হাঁসা বাছাই করা উচিত। পরবর্তীতে নির্বাচিত হাঁসা-হাঁসীর মধ্যে উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রজনন করাতে হবে। হাঁসের ক্ষেত্রে আন্তঃপ্রজনন (ওহনৎববফরহম), সংকর প্রজনন (ঈৎড়ংং নৎববফরহম), ক্রমোন্নয়ন (এৎধফরহম ঁঢ়) প্রভৃতি বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। একেবারে নিকট সম্বন্ধ যুক্ত হাঁসা-হাঁসীর মধ্যে প্রজনন ঘটালে তাকে আন্তঃপ্রজনন বলে। যেমন- পিতা-কন্যা, মাতা-পুত্র সন্তান প্রভৃতির মাঝে প্রজনন। এই পদ্ধতি পর্যাক্রমিক ভাবে ব্যবহার করার ফলে তৃতীয় বা চতুর্থ পুরুষ থেকে ডিম উৎপাদনের পরিমান বেড়ে যায়। পশু-পাখীর প্রজননের জন্য সংকর প্রজনন অধিক জনপ্রিয়। দুইটি বিশুদ্ধ জাতের হাঁসা-হাঁসীর মধ্যে প্রজনন ঘটানোকে সংকর প্রজনন বলে। যেমন- জিনডিং জাতের হাঁসার সঙ্গে খাকী ক্যাম্পবেল জাতের হাঁসীর প্রজনন। সংকর প্রজননের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সংকর শক্তি (ঐুনৎরফ ারমড়ৎড়ঁং যবঃবৎড়ংরং) অর্জন। সংকর শক্তি বলতে পিতা মাতার যে কোনটি তুলনায় তাদের সন্তানদের অধিকতর উৎপাদনশীলতাকে বুঝায়। প্রজনন পদ্ধতির অপর আরেকটি পদ্ধতি হলো ক্রমোন্নয়ন পদ্ধতি, যা আমাদের দেশী জাতের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কোন একটি বিশুদ্ধ জাতের পুরুষ দ্বারা বংশানুক্রমে একটি এলাকার অনুন্নত হাঁসী ও তাদের স্ত্রী সন্তানদেরকে উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশী জাতের হাঁস দেশের আবহাওয়ার সাথে ভালোভাবে খাপ-খাওয়াতে পারে। উপরন্ত এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিদেশী জাতের চেয়ে দেশী। তাই এই সমস্ত কৌলিক গুনাগুন সংরক্ষণ (এবহবঃরপ ঈযধৎধপঃবৎ ঈড়হংবৎাধঃরড়হ) করে বাছাইয়ের মাধ্যমে পর্যায় ক্রমিক প্রজনন ঘটিয়ে জাতের উন্নয়ন করা সম্ভব। তবে নতুন জাত সৃষ্টি কিংবা ক্রমোন্নয়ন দ্বারা অনুন্নত জাতের অধিক উৎপাদনশীল জাতে রূপান্তর একটি জটিল এবং সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়।
বেশী ও কম ডিম দেয়া হাঁসীর মধ্যে পার্থক্য
শারীরিক কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করে বেশী ও কম ডিম দেয়া হাঁসী আলাদা করা যায়। বেশী ডিম দেয়া হাঁসী দুই-আড়াই বৎসরের বেশী রাখা ঠিক নয়। কারণ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডিম উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। নিুে বেশী ডিম দেয়া ও না দেয়া হাঁসীর কিছু পার্থক্য আলোচনা করা হলোঃ
বৈশিষ্ট্য দেশী ডিম পাড়া হাঁসী কম ডিম পাড়া হাঁসী
পালক সাধারণতঃ বিবর্ণ ও বিক্ষিপ্ত উজ্জ্বল ও আকর্ষনীয়
মলদ্বার বড়, ভেজা, নরম ছোট, গোলাকার, শুস্ক, শক্ত
দুটি পিউবিক হাড়ের মাঝের দুরত্ব (মলদ্বারের সন্নিকটে) দুই আঙ্গুলের চেয়ে বেশী প্রায় অর্ধেক আঙ্গুল।
পিউবিক হাড়ের ব্যবস্থা পাতলা ও নরম ভারী ও শক্ত
বক্ষাস্থি ও পিউবিক হাড়ের দুরত্ব সাধারণতঃ ৩-৪ আঙ্গুল বা তার চেয়ে বেশী সাধারণতঃ দু’আঙ্গুল
বক্ষদেশের অবস্থা বড়, নরম ও চর্বিমুক্ত ছোট, শক্ত ও ঘন চর্বি যুক্ত
হাঁসের লিঙ্গ নির্ধারণঃ বয়স্ক হাঁসা-হাঁসীর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখে সহজেই পৃথক করা যায়। তবে একদিনের বাচ্চার লিঙ্গ নির্ধারণ কিছুটা জটিল এবং অবিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে। এ নিয়মে বাচ্চার মলদ্বার পরীক্ষা করে লিঙ্গ নির্ধারণ করা হয়। লিঙ্গ নির্ধারণের এই পদ্ধতিটি জাপানী পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অনুসারে বাচ্চার মাথা দুই আঙ্গুরের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে বাম হাতে ধরতে হবে এবং ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল এবং তর্জনীর সাহায্যে মলদ্বার খুলে দেখতে হবে। যদি মলদ্বারে সুক্ষ সুতার মত কোন অংশ দেখতে পাওয়া যায় তবে বুঝতে হবে সেটি পুরুষ বাচ্চা। লম্বা সুতার মত অংশটি পুংলিঙ্গ যা দেখতে সরু ও লম্বা, কাল, সাদা বা ধুসর। আর যদি মলদ্বারে সমান ও মসৃণ মনে হয় তবে সেটি স্ত্রী বাচ্চা।
বয়স্ক হাঁস সনাক্তকরনঃ সাধারণতঃ গলার স্বর শুনে এবং পালকের রং দেখে খুব সহজেই বড় হাঁসা-হাঁসী সনাক্ত করা যায়। হাঁসীর স্বর মোটা এবং বড়। হাঁসী তীক্ষè স্বরে ডাকে। পক্ষান্তরে হাঁসার স্বর ছোট এবং ফ্যাসফ্যাসে। হাঁসা সাধাণতঃ ক্ষীন স্বরে ডাকে। তাছাড়াও বয়স্ক হাঁসের পালকের সজ্জা দেখে হাঁসা-হাঁসী সনাক্ত করা যায়। হাঁসার পালক উজ্জ্বল চকচকে বর্ণের হয়। লেজের পিছনের দিকে একটি পালক বাঁকা হয়ে রিং এর মত গঠন করে। কিন্তু হাঁসীর ক্ষেত্রে পালক অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল এবং লেজের পালকে কোন রিং থাকে না।
হাঁসের খাদ্য
হাঁসকে কি পরিমান খাদ্য দিতে হবে তা নির্ভর করে হাঁসের বয়স এবং ব্যবস্থাপনার উপর। খামারের উৎপাদনের সার্বিক বিষয় নির্ভর করে খাদ্যে উপযুক্ত পরিমান পুষ্টি আছে কিনা তার উপর। পুষ্টিহীন খাদ্য হাঁসের উৎপাদনের জন্য মোটেই অনুকূল নয়। হাঁসের খাদ্যে পুষ্টির অভাব থাকলে নিুলিখিত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে-
১। হাঁসের বাচ্চার মৃত্যু হার বাড়ে।
২। বাচ্চার পায়ে দূর্বলতা দেখা দেয়।
৩। বাচ্চার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে শরীরের লোম উঠে যায়।
৪। অনুর্বর ডিম উৎপাদন হয়।
৫। ইনকুবেটর থেকে কম সংক্যক বাচ্চা ফুটে বের হয়।
৬। তাপ দেয়ার প্রথম অবস্থায়ই ডিমের ভ্রুন মরে যায়।
৭। যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় সে গুলির অধিকাংশই তাড়াতাড়ি মারা যায়।
৮। ডিম পাড়া হাঁসের ডিম উৎপাদন কমে যায়।
৯। ডিমের ওজন কমে যায় এবং ডিমের আকার ছোট হয়ে যায়।
কাজেই এগুলি থেকে মুক্ত থাকতে হলে সব সময় সুষমখাদ্য তৈরী করে দিতে হয়। উন্নত মানের সুষম খাদ্য তৈরী করতে হলে হাঁসের জাত, বয়স, শরীরের ওজনের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হয়। খাদ্যের মধ্যে প্রধানতঃ আমিষ, শর্করা, ক্যালসিয়াম, চর্বি, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। খাদ্যের কোন উপদানা কি কাজ করে তা নিম্নে দেয়া হলোঃ
আমিষঃ আমিষ জাতীয় খাদ্যের প্রধান কাজ হচ্ছে দেহ ও পেশীর গঠন সহ শরীরের ক্ষয় পূরণ করা। ডিম ও তার উপাদান তৈরী করতে আমিষ সাহায্য করে। হাঁসের খাদ্যে ব্যবহৃত আমিষ জাতীয় উপাদান গুলো হলো তিলের খৈল, শুটকীরগুড়া, সয়াবিন খৈল, শাকুকের মাংশ, ঝিনুকের মাংশ ইত্যাদি।
শর্করাঃ শর্করা জাতীয় খাদ্যোর প্রধান কাজ হচ্ছে দেহের শক্তি বৃদ্ধি করে তাপ সংরক্ষণ করা। কাজের জন্য হাঁসের যে শক্তির প্রয়োজন হয়, সেই শক্তি শর্করা যোগান দিয়ে থাকে। হাঁসের খাদ্যে ব্যবহৃত শর্করা জাতীয় খাদ্য উপাদান গুলো গম ভাংগা, চাল ভাংগা, চালের কুড়া, ভূট্টার গুড়া ইত্যাদি।
চর্বি/তৈলঃ চর্বি জাতীয় খাদ্যের প্রধান কাজ হচ্ছে দেহের তাপ ও কর্মশক্তি উৎপাদন করে সেটি সংরক্ষণ ও প্রয়োজনে খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা। এছাড়াও ডিমের কুসুম গঠনের কাজে চর্বির প্রয়োজন। হাঁসের খাদ্যে ব্যবহৃত চর্বি-জাতীয় খাদ্য উপাদান গুলো হলো সয়াবিন তৈল, তিলের খৈল।
ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজঃ ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ জাতীয় খাদ্যের প্রধান কাজ হচ্ছে দেহের অস্থি ঠিকমত গঠন করা ও শক্ত রাখা। তাছাড়া ডিম ও তার খোসা গঠনসহ খোসা শক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্যালসিয়াম ও খনিজ খাদ্য উপাদান গুলো হলো শামুক-ঝিনুকের গুড়া, ক্যালসিয়াম ডাই-ফসফেট ইত্যাদি।
ভিটামিন সমূহঃ ভিটামিন বা খাদ্য প্রাণ- এ,বি,সি, ডি, ই এবং কে ইত্যাদি খাদ্যের জরুরী পুষ্টি উপাদান। এগুলোর প্রধান কাজ হচ্ছে দেহের গঠন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, দেহের সঠিক পরিচালনা ক্ষমতা যোগানো, দেহের বিভিন্ন হাড়-পাঁজর ও অস্থি বিণ্যাস ঠিকমত তৈরী করা øায়ুকে সচল রাখা, পুষ্টিহীনতা রোধ করা,মাংস ও উর্বর ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিমের প্রস্ফুটন ক্ষমতা বৃদ্ধি, দেহে পালক গজাতে সাহয্য করা, প্রজনন শক্তি বৃদ্ধি। এছাড়া ভিটামিন আরও অনেক কাজ করে থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানীগুলো প্যাকেট আকারে প্রিমিক্স ভিটামিন বিক্রি করছে। তাছাড়া হাঁসের জন্য সবুজ শাক সব্জি সরবরাহ করতে পারলে ভিটামিন জাতীয় খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা যায়।
পানিঃ সহজ কথায় পানি ছাড়া হাঁসের খামার করা যায় না। পানির প্রধান কাজ হচ্ছে খাদ্যকে হজম করতে সাহায্যে করা, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং দেহ থেকে দূষিত পদার্থ বের করতে পানির প্রয়োজন। তাই হাঁসকে সব সময় পরিস্কার পানি দেয়া উচিত। এদেরকে শুকনা খাবার দেয় ঠিক নয়।
হাঁসের সুষম খাদ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন খাদ্য উপকরণে পুষ্টিমানের পরিমান
উপাদান আমিষ/ কেজি শক্তি কি.ক্যাল/কেজি ক্যালসিয়াম গ্রাম/ কেজি মি. ফসফরাস গ্রাম/ কেজি
গম ১২% ২৯০০ ০.০৫ ০.৩৫
ভূট্টা ৯% ৩৪০০ ০.২০ ০.১০
চাল ৯% ২৮০০ ০.০৫ ১.২৪
চালের কুড়া ১৩% ২৮০০ ০.৮০ ০.৩৭
গমের ভূষি ১৩% ২৬০০ ০.৫০ ০.৩০
তিলের খৈল ৩৪% ২৬০০ ০.৯৫ ০.৩২
সয়াবিন খৈল ৪৪% ২২০০ ০.২৬ ০.২২
শুটকীগুড়া ৫০% ২৬০০ ৫.৪ ২.৭
হাঁসের সুষম খাদ্যঃ বয়স ভিত্তিক খাদ্য উপকরণের পরিমাণ
খাদ্য উপকরণ শতকরা হার বাচ্চা হাঁস বাড়ন্ত হাঁস ডিম পাড়া হাঁসী
গম ভাংগা/ চাউল ভাংগা ৫৫ ভাগ ৫৫ ভাগ ৫০ ভাগ
চাউলের কুড়া ১৩ ভাগ ২৫ ভাগ ২০ ভাগ
তিলের খৈল ১২ ভাগ ৮ ভাগ ১০ ভাগ
ফিসমিল ১২ ভাগ ৬ ভাগ ৭ ভাগ
সয়াবিন মিল ৬.১৫ ভাগ ৩ ভাগ ৫ ভাগ
ঝিনুক চূর্ণ ১ ভাগ ২.২০ ভাগ ৭.২০ ভাগ
লবন ০.৫০ ভাগ ০.৫০ ভাগ ০.৫০ ভাগ
ভিটামিন- মিনারালস ০.৩৫ ভাগ ০.৩০ ভাগ ০.৩০ ভাগ
১০০ ভাগ ১০০ ভাগ ১০০ ভাগ
আবদ্ধ অবস্থায় হাঁস পালনের জন্য সুষম খাবার সরবরাহ করতে হলে উপরোল্লেখিত ফর্মূলায় খাবার তৈরী করতে হবে। মুক্ত অবস্থায় হাঁস পালন করলে হাঁস যদি শামুক এবং অন্যান্য খাবার কুড়িয়ে খেতে পারে তবে উক্ত ফর্মূলায় খাবার তৈরী করার দরকার নেই। এ অবস্থায় পরিমানমত গম, সিদ্ধ ধান, গমের ভূষি ও চাউলের কুড়া সরবরাহ করলেই চলবে।
হাঁসের খাদ্যে আমিষের শতকরা পরিমান
১) বাচ্চার খাদ্য (১ দিন বয়স হতে ২ মাস পর্যন্ত) ২০%
২) বাড়ন্ত হাঁসের খাদ্য (২ মাস হতে ৫ মাস পর্যন্ত) ১৮%
৩) ডিম পাড়া হাঁসের খাদ্য (৫ মাসের উর্দ্ধে) ১৬%
বয়স অনুযায়ী একটি জিনডিং হাঁসের দৈনিক খাদ্যের পরিমান
বয়স খাদ্যের পরিমান বয়স খাদ্যের পরিমান
১ম সপ্তাহ ১০-১৫ গ্রাম ১১তম সপ্তাহ ১২০ গ্রাম
২য় সপ্তাহ ১৫-২০ গ্রাম ১২ তম সপ্তাহ ১৩০ গ্রাম
৩য় সপ্তাহ ৩০-৪০ গ্রাম ১৩তম সপ্তাহ ১৩৫ গ্রাম
৪র্থ সপ্তাহ ৪০-৫০ গ্রাম ১৪তম সপ্তাহ ১৪৫ গ্রাম
৫ম সপ্তাহ ৫০-৬০ গ্রাম ১৫তম সপ্তাহ ১৪৫ গ্রাম
৬ষ্ট সপ্তাহ ৬০-৭০ গ্রাম ১৬তম সপ্তাহ ১৪৫ গ্রাম
৭ম সপ্তাহ ৭০-৮০ গ্রাম ১৭তম সপ্তাহ ১৪৫ গ্রাম
৮ম সপ্তাহ ৮০-৯০ গ্রাম ১৮তম সপ্তাহ ১৪৫ গ্রাম
৯ম সপ্তাহ ১০০ গ্রাম ১৯তম সপ্তাহ ১৪৫ গ্রাম
১০ম সপ্তাহ ১০০ গ্রাম ২০তম সপ্তাহ ১৫০ গ্রাম
২১তম সপ্তাহ থেকে উর্ধে ১৬০ গ্রাম
ডিম ফুটানো পদ্ধতি
সকল জাতের হাঁসের ডিম সাধারণত ২৮ দিনে ফোটে। মাস্কোভী হাঁস এর ব্যতিক্রম। মাস্কোভী হাঁসের ডিম ৩৩-৩৫ দিনে ফোটে। হাঁসের ডিম ফোটানোর পদ্ধতি মুরগীর ডিম ফোটানোর মতই। তবে এ ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশী আর্দ্রতার দরকার পড়ে। আমাদের দেশের আবহাওয়ার ব্যাপক তারতম্য হেতু সারা বছর ডিম একইভাবে ফোটে না। বর্ষাকালে প্রয়োজনাতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকায় এবং গ্রীস্মকালে অধিক তাপমাত্রা থাকায় ডিম ভালো ফোটেনা । আমাদের দেশের আবহাওয়ায় পৌষ থেকে চৈত্র মাস ডিম ফোটানোর জন্য অধিক উপযোগী সময়। নিষিক্ত (ঋবৎঃরষব) ডিম দুটি পদ্ধতিতে ফোটানো যায়ঃ
প্রাকৃতিক পদ্ধতি
হাঁস একাধারে ডিম পাড়ার পর একটা নির্দিষ্ট সময় ডিম পাড়া বন্ধ থাকে। এ সময় এদের মধ্যে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানোর প্রবনতা দেখা যায়। তবে হাঁসের সকল জাত এই ভাবে কুঁচে হয় না। কিছু দেশী (যেমন- দেশী সাদা, দেশী কালো) ও মাস্কোভী জাতের হাঁস অধিক হারে কুঁচে হয়। কিন্তু অধিক উৎপাদনশীল জাতের হাঁসে এই প্রবতান দেখা যায় না। তাই অধিকাংশ সময় হাঁসের ডিম মুরগির দ্বারাই ফোটানো হয়।
ডিম বসানো জন্য হাঁস/ মুরগী বাছাই
প্রাকৃতিক নিয়মে ডিম ফোটাতে হলে ওমওয়ালা হাঁস বা মুরগী প্রয়োজন। উন্নত জাতের হাঁস অথবা মুরগী প্রায় সারা বছর ডিম দেয় বলে এরা ওমে বসেনা বললেই চলে। এদিক থেকে আমাদের দেশী হাঁস অথবা মুরগী ডিমে তা দেয়ার জন্য সবদিক থেকে উপযোগী। ওমে বসা হাঁস/মুরগীর স্বাস্থ্য ভালো এবং পালক ভালো করতে হবে। পালক বদলাচ্ছে এমন হাঁস-মুরগী ওমে বসানো ঠিক নয়।
মাটির, কাঠের, বাঁশের অথবা টিনের পাত্রে রেখে তাতে মুরগী বসানো যায়। এক্ষেত্রে বালি কিম্বা ছাই দিয়ে পাত্রটি ভরে দিতে হবে যেন মুরগী আরাম করে বসতে পারে। ডিম বসানোর স্থানটি নিরিবিলি হওয়া উচিত। স্যাতস্যাতে, নোংরা, স্থানে ডিম বসানো ঠিক না। একটি হাঁস/মুরগীর নিচে কতটা ডিম বসাতে হবে তাঁ হাঁস/ মুরগীর স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। তবে ১০-১২টির অধিক ডিম বসানো উচিত নয়। ডিমে তা দিতে বসানোর আগে অবশ্যই হাঁস/মুরগীকে ভালো ভাবে খাওয়াতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে হাঁস/মুরগীর দেহ যেন উঁকুন বা আঠালীর আক্রমণ না হয়। হাঁসের ডিম ফোটানোর ক্ষেত্রে অধিক আদ্রর্তার প্রয়োজন হয়। তাই ডিম বসানোর ১৫-২৪ দিনের মধ্যে কুসুম গরম পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। সেই সাথে হাঁসের বাচ্চা খোসা ভেঙে উঁকি দেয়ার পূর্বেও কুসুম গরম পানি ছিটিয়ে দেয়া উচিত।
তবে হাঁসের ডিম মুরগী দ্বারা ফোটাতে হলে অনেক সময় একটি মুরগী ২২-২৩ দিনের মধ্যে সরিয়ে নিয়ে আরেকটি কুঁচে মুরগী বসাতে হয়। কেননা কুঁচে মুরগি ২২-২৩ দিন হয়ে গেলেই ডিমের উপর বসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
কৃত্রিম পদ্ধতি
ওমে বসা হাঁস বা মুরগী ছাড়াও কৃত্রিম ভাবে ডিম ফোটানো যায়। হাঁস মুরগী যেভাবে স্বাভাবিক নিয়মে তাপ ও আর্দ্রতা দিয়ে ডিম ফোটায় ঠিক সেই পরিমান উত্তাপ ও আর্দ্রতা, যন্ত্রের সাহায্যে সৃষ্টি করে ডিম ফোটানো হয়। যে যন্ত্রের সাহায্যে ডিম ফোটানো হয় তাকে ইনকিউবেটর বলে। কৃত্রিম পদ্ধতি গুলোর মধ্যে ইনকিউবেটর নামক আধুনিক যন্ত্রটি বর্তমানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কৃত্রিম এবং প্রাকৃতিক নিয়মে বাচ্চা ফোটাতে সময় একই লাগে কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে এক সাথেবহু সংখ্যক ডিম ফোটানো যায়। কৃত্রিম উপায়ে সাফল্যজনকভাবে ডিম ফোটানোর ক্ষেত্রে নিুোক্ত ব্যবস্থাদি গ্রহন করা অত্যাবশ্যক।
ক) ডিম পাড়ার বাক্স প্রদান
ডিম ফোটানোর ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফলাফল পাবার জন্য যতদূর সম্ভব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ডিম সংগ্রহ করা প্রয়োজন। ডিম পাড়ার পর পরই বিভিন্ন অনুজীব দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার মাধ্যমে ডিম ফুটার হার হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু ডিম পাড়ার বাক্স বা লিটার পরিষ্কার থাকলে এই সম্ভাবনা অনেকাংশ কমে যায়। ডিম পাড়ার বাক্সে ব্যবহৃত তুষ বা কাঠের গুড়া সপ্তাহে অন্ততঃ ৩ বার পরিবর্তন করা উচিত। ডিম পাড়ার পূর্বেই হাঁসের ঘরে ডিম পাড়ার বাক্স দিতে হবে। এতে করে হাঁস নির্দিষ্ট ডিম পাড়ায় অভ্যস্ত হবে।
খ) ফিউমিগেশ
পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এবং ফরমালিন দ্বারা ধোয়া সৃষ্টি করে জীবাণু ধ্বংস করার নামই ফিউমিগেশন। ডিম সংগ্রহ করার পর শীঘ্রই ডিম জীবাণুমুক্ত করা উচিত। যে কোন ধরনের জীবাণুনাশক যেমন- আয়োসান, সেভলন কুসুম গরম পানিতে মিশেয়ে ডিম পরিষ্কার করতে হবে। মেশিনে ফিউমিগেশন করার ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ ঘনফুট স্থানের জন্য ৪০ গ্রাম পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (দানা) এবং ৮০ সি. সি. ফরমালিন প্রয়োজন হয়। প্রায় ৪ ইঞ্চি উঁচু একটি প্রশস্ত মাটির পাত্র মেশিনে রেখে তাতে প্রথমে ৪০ গ্রাম পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেটর দানা রাখতে হবে এবং এর উপর ৮০ সি. সি. ফরমালিন যোগ করে ১৫ মিনিট মেশিনের দরজা বন্ধ রাখতে হবে। এসময় বায়ু চলাচলও বন্ধ রাখতে হবে। ডিমের খোসার সূক্ষ ছিদ্রপথে ব্যাকেটরিয়া ঢুকে ডিমের বাড়ন্ত ভ্রুণকে নষ্ট করে দেয়। ডিম বসানোর ১২ ঘন্টার মধ্যে ফিউমিগেশন করে এ সমস্যা দূর করা যায়।
গ) ডিম সংরক্ষণ
ডিম প্রস্ফুটনের পূর্বে ডিম সংরক্ষণ করতে হলে সর্তকতার সাথে তা সংরক্ষণ করতে হবে। নাহলে ডিমের গুনাগুন হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে ডিম ফোটার হারও কমে যাবে। ফোটানোর জন্য বাছাইকৃত ডিম ৭ দিনের বেশী সময় সংরক্ষণ না করাই ভালো।
ডিম সংরক্ষণের মেয়াদ ও পদ্ধতি
সংরক্ষণ মেয়াদ পদ্ধতি তাপমাত্র আর্দ্রতা
১-৩ দিন ২০০ ৭৫%
৪-৭ দিন ১৩-১৬০ ৭৫%
৮-১৪ দিন ১১-১২০ ৮০%
যেখানে বিদ্যুৎ নেই সেখানে চুনের পানির সাহায্যে ডিম সংরক্ষন করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রথম সপ্তাহে ডিম ফোটার হার ঠিকই থাকে, দ্বিতীয় সপ্তাহে কিছু কম হয় এবং তৃতীয় সপ্তাহে ডিম ফোটার হার হ্রাস পায়।
চুনের পানির সাহায্যে ডিম সংরক্ষণ পদ্ধতি
এক কিলোগ্রাম চুন ২০ সের পানিতে মিশিয়ে ১০ মিনিট থিতাতে হবে। এরপর উপরের স্বচ্ছ চুনের পানি ডিম সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করতে হবে। চুনের পানি অন্য পাত্রে ঢেলে তাতে ডিম ডুবিয়ে রাখতে হবে। এ পদ্ধতিতে ২ মাস পর্যন্ত ডিম সংরক্ষন করা যায়।
ফোটানোর জন্য ডিম বাছাই
সাফলতার সাথে ডিম ফোটানোর জন্য সঠিক ডিম বাছাই এবং বাছাইকৃত ডিমের সঠিক যতেœর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত। সতর্কতার সাথে ডিম বাছাই বাচ্চা ফোটার হারকে শতকরা ৫ ভাগ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। ফোটানোর ডিম নির্বাচন করা যেতে পারে।
ডিমের আকার
খুব বড় বা খুব ছোট আকারের ডিম ভালো ফোটেনা। তাই মাঝারী আকারের ডিম বাছাই করতে হবে। ডিমের ওজন ৬৫-৭৫ গ্রাম পর্যন্ত হওয়া ভালো। একেবারে গোলাকার অথবা সরু প্রান্ত, অথবা লম্বাকৃতির ডিম ফোটানোর জন্য বাছাই করা উচিত নয়। বাছাইকৃত ডিম স্বাভাবিক আকার ও আকৃতির হতে হবে।
খোসার গুনাগুন
ডিম থেকে প্রয়োজনীয় পানি বাষ্পীভূত হওয়া এবং ডিমের বায়ু থলি (অরৎ ংধপ) তৈরীতে ডিমের খোসার গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা আছে। তাই খুব পাতলা অথবা অমসৃণ খোসার ডিম বাছ্ইা করা ঠিক নয়। বাছাইকৃত ডিম অবশ্যই মসৃণ এবং দৃঢ় খোসার হওয়া উচিত। সেই সাথে খোসার রংয়ের প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে। যে জাতের হাঁস যে রং এর ডিম পাড়ে সেই রং ব্যতীত ভিন্ন রংয়ের খোসার ডিম নির্বাচন করা ঠিক নয়।
খোসার পরিচ্ছন্নতা
বাছাইকৃত ডিম যথাসম্ভব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া উচিত। মাটি অথবা ময়লাযুক্ত ডিম. অথবা রক্তের ডিম বাছাই করা উচিত নয়। ডিম সংগ্রহ করার পর ঈষৎ গরম পানিতে সেভলন, ডেটল জাতীয় জীবাণুনাশক মিশিয়ে ডিম পরিস্কার করে নিতে হবে।
বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে ডিম ফোটানোর জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবেঃ
১) তাপমাত্রাঃ
হাঁস এবং মুরগীর ডিম ফোটানোর জন্য সাধারনতঃ ৩৭.৫০ সেঃ (৯৯.৫০ ফাঃ) তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। এই তাপমাত্রার হের-ফের হলে ডিম ফোটার হার কমে যাবে এবং ডিম ফোটার সময়ও সঠিক থাকবে না। হাঁসের ডিম বসানোর পে ২৫/২৬ দিনে হ্যাচারে স্থানান্তর করতে হয়। তখন মেশিনে জাত অনুসারে হ্যাচার ট্রের তাপমাত্রা ৩৬.৪০ সেঃ-৩৭.৪০ সেঃ (৯৭.৫০ ফাঃ৯৯.৫০ফাঃ) এর মধ্যে উঠানামা করে। সর্তকতার সাথে এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। ডিম বসানোর প্রথম দিকে তাপমাত্রা বেশী থাকলে ভ্রুণের বৃদ্ধির হার বেড়ে যায় এবং বাচ্চা মারা যায়। তাপমাত্রা কম হলে ভ্রুনের বৃদ্ধির হার কম হয়, বাচ্চা পুর্নাঙ্গ এবং সম আকৃতির হয়না, ফলে বাচ্চা ফোটার হার হ্রাস পায়।
২) আপেক্ষিক আর্দ্রতা
তাপের ফলে ভ্রুন বাড়তে থাকলে ডিমের জলীয় অংশ কমতে থাকে এবং ওজন কমে যায়। ডিমের ওজনের উপর ভিত্তি করে ইনকিউবেটরের আর্দ্রতার পরিমাণ নিযন্ত্রণ করতে হবে। প্রথম ২৫ দিন ওয়েট বাল্ব রিডিং ৮৬০-৮৮০ ফাঃ রাখা উচিত। তবে ডিম ফোটা শুরু হলে আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়িয়ে ওয়েট বাল্ব রিডিং ৯০-৯২০ ফাঃ (আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭৩-৭৯%) রাখতে হবে। আর্দ্রতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশী থাকলে বাচ্চা সঠিক সময়ের কিছু আগেই ফুটে যেতে পারে। এর ফলে শরীর পরিপূর্ণ ভাবে গঠিত হয়না এবং বাচ্চা মারা যায়। আর আর্দ্রতা কম হলে ডিমের খোসা থেকে ক্যালসিয়াম সঠিক ভাবে শোষিত হয় না। এতে বাচ্চা খোসা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে ছোট আকারের রুগ্ন বাচ্চা হয় বা খোসার ভিতর বাচ্চা মারা যায়।
৩) বায়ু চলাচল
ডিম্বস্থ ভ্রুণকে বাঁটিয়ে রাখার জন্য ইনকিউবেটরের ভিতর যথেষ্ট বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। মেশিনের অভ্যন্তরের বাতাসে ২১% অক্সিজেন এবং ০.৫% কার্বন-ডাই-অক্সাইড থাকতে হবে যা মেশিনের বাইরের বিশুদ্ধ বাতাসে বিদ্যমান। ডিমের ভিতর ভ্রুনের বৃদ্ধির সাথে সাথে ভ্রুণ অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন-ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে। অক্সিজেন প্রদান এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড দূর করার জন্য তাই মেশিনের ভিতর পরিস্কার বায়ু চলাচল ব্যবস্থার প্রয়োজন। ডিম বসানোর ক্ষেত্রে ঘন্টায় ৮ বার এবং ডিম ফুটানোর ক্ষেত্রে হ্যাচারে ঘন্টায় ১২ বার বায়ু পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবার সময় কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান ১% এর বেশী থাকা উচিত নয়।
৪) ডিমের সঠিক অবস্থান এবং ডিম উল্টে দেয়া
মি বসানোর সময় ডিমের সরু অংশ নীচের দিকে এবং মোট অংশ উপরের দিকে দিয়ে ৪৫ কোণ করে বসাতে হয়। কারণ ডিমের মোটা অংশ উপরের দিকে থাকলে সেই অংশে ভ্রুনের মাথা সঠিক ভাবে গঠিত হতে পারে। তাছাড়া ডিমের বায়ুথলি(অরৎংধপ) উপরের দিকে থাকলে ডিম ভালো ফোটে। প্রতি ১ ঘন্টা পর পর ডিম উল্টে দিতে হবে। প্রথম দিন থেকে ২৪ দিন পর্যন্ত ডিমের টার্নিং (ঘুরানো/ উল্টানো) করা প্রয়োজন। কিন্তু এর পর থেকে আর ডিমের টর্নিং দরকার না। ডিম সঠিক ভাবে টার্নিং না করলে ভ্রুন প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না ফলে বাচ্চা অপুর্নাঙ্গ হয়ে ফোটে এবং মারা যায়।
৫) ডিম পরীক্ষাকরণ
ডিম পরীক্ষা করে অনিষিক্ত ডিম বাদ দিতে হবে। ২৫তম দিনে, ডিম যখন হ্যাচারে নেয়া হয় তখন পুনরায় পরীক্ষা করে মৃত ভ্রুন বিশিষ্ট এবং গ্যাস ধারণকৃত ডিমগুলো বাদ দিয়ে দিতে হবে। অনিষিক্ত ডিম স্বচ্ছ, পরিস্কার দেখায়। নিষিক্ত ডিমগুলোর মধ্যে ভ্রুণ অবস্থান করায় তা অন্ধকার দেখায়।
অধিক সংখ্যক ডিম ফুটানোর ক্ষেত্রে খামারীরা বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। নিম্নে সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
ডিম পরীক্ষা করার পর যদি অধিক সংখ্যক ডিম অনুর্বর হয় তবে হাঁসেরর ঝাঁকে হাঁসা-হাঁসীর অনুপাত ঠিক করতে হবে। অধিক ডিম উৎপাদনশীল ৭-১০ টি হাঁসীর জন্য ১টি স্বাস্থ্যবান হাঁসা রাখতে হবে। আর অধিক মাংস উৎপাদনশীল জাতের ক্ষেত্রে ৩-৫ টি হাঁসীর জন্য ১টি স্বাস্থ্যবান, সুস্থ হাঁসা রাখতে হবে। তাছাড়া ঝাঁকে অতিরিক্ত হাঁসা রাখা উচিত হবেনা। কেননা মিলনের সময় একে অপরের সাথে ঝগড়া করলে হাঁসীর অনুর্বর ডিম উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকে। ঝাঁকে সর্বদা সুস্থ, সবল এবং মিলনে আগ্রহী অল্প বয়স্ক হাঁসা রাখতে হবে। সাধারণতঃ হাঁসা গুলোকে ২-২.৫ বছরের অধিক সময় যৌন মিলনের জন্য রাখা উচিত নয়। আবার অনেক সময় ডিম ভুল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলেও ডিম অনুর্বর হতে পারে। তাই ৭ দিনের বেশী কোন ক্রমেই ডিমগুলোকে সংরক্ষণ করা উচিত নয়। ঝাঁকের ব্যবস্থাপনার সময় হাঁসগুলোকে পর্যাপ্ত পরিমানে পুষ্টিকর খাবার প্রদান করতে হবে। সদ্য বয়ঃপ্রাপ্ত হাঁসীগুলো অনুর্বর ডিম বেশী দিয়ে থাকে। তাই প্রথম দিকের ডিমগুলো বাছাই না করে কিছুদিন পর থেকে ফোটানোর জন্য ডিম বাছাই করা উচিত। ডিম পরীক্ষা করার পর যদি ডিমের ভেতর অধিক সংখ্যক ভ্রুণ মৃত দেখা যায় তবে ইনকুবেটরের তাপমাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাছাড়া ডিম অন্ততঃপক্ষে দিনে জ্জ বার নাড়াচাড়া করা উচিত। সর্বদা একই নিয়মে নাড়াচাড়া না করে উল্টাপাল্টা করে মৃদুভাবে ডিম নাড়াচাড়া করা উচিত। হাঁচারে এবং ইনকুবেটরে সঠিকভাবে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। অসুস্থ ঝাঁকের (সেডের) হাঁসের ডিম ফোটানোর জন্য নির্বাচন করা ঠিক না।
ইনকুবেটরে গড়-পড়তা আর্দ্রতা কম হলে এবং ডিমগুলো স্থানান্তরের সময় খুব বেশি বা খুব কম আর্দ্রতা থাকলে বাচ্চাগুলোর যথাযথ বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও ডিম যথাসময়ে ফোটানা, ফলে বাচ্চা ভেতরে মারা যায়। তাই ডিম ফুটার সম্পূর্ন সময়ে সঠিকভাবে আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে হাঁসের ডিমের জন্য গড়পড়তা শতকরা ৬৫-৮০ ভাগ আর্দ্রতা রাখতে হবে। আবার বাচ্চাগুলো যথাসময়ে ফুটলেও যদি মারা যায় তবে সাবধানতা হিসেবে যথাযথ আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে। কেননা প্রথম দিকে অতিরিক্ত আর্দ্রতা রাখলে এবং গড়পড়তা আর্দ্রতা কম থাকলে এরূপ সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া হাঁসের ঝাঁকে সঠিক পুষ্টি সরবরাহ করা হচ্ছে কিনা সেদিকেও নজর দিতে হবে। ইনকুবেটরে সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ না করলে নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বা পরে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা হাঁসের ডিমের বাচ্চা দুর্বল হবে।
বাচ্চা প্রস্ফুটনের সময় ইনকুবেটরের ভেতর বায়ু চলাচল ও আর্দ্রতা সঠিকভাবে বজায় না থাকলে ডিমগুলো অধিক মাত্রায় শুকিয়ে যায়। ফলে আঠাল পদার্থ শুকিয়ে বাচ্চা লেগে থাকে। তাছাড়া ইনকুবেটরে অতিরিক্ত তাপমাত্রা থাকলে বাচ্চাগুলো দূর্বল হয়। সঠিক তাপমাত্রা বজায় না থাকলে বাচ্চার দেহের গঠন ত্র“টিপূর্ন হতে পারে। তাপমাত্রা বারবার উঠানামা করলে বাচ্চগুলোর ওস্ফ্যালাইটিস রোগ হতে পারে।
ডিম প্রস্ফুটনের সময় হ্যাচার এবং ইনকুবেটরে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ু চলাচল, ডিম বসানো ও নাড়াচাড়া প্রভৃতি যাবতীয় প্রক্রিয়াগুলো মেনে চললে সাফল্যজনকভাবে ডিম প্রস্ফুটন কাজ সমাধা করা সম্ভব।
হাঁস-মুরগী ও পাখীর ডিম প্রস্ফুটনের মেয়াদ
নাম মেয়াদ নাম মেয়াদ
মুরগী ২১দিন হাঁস ২৮ দিন
মাস্কোভী হাঁস ৩৩-৩৫ দিন রাজহাঁস ২৮-৩২ দিন
কোয়েল ১৬-১৮ দিন তিতির ২৬-২৮ দিন
কবুতর ১৮-২০ দিন ফিজেন্ট ২১-২৮ দিন
উটপাখী প্রায় ৪২ দিন টার্কী ২৮-৩০ দিন
ময়ুর ২৮-৩০ দিন
হাঁসের রোগ ও তার প্রতিকার
হাঁসের রোগ বালাই কম। স্বাস্থ্যসম্মত জায়গা, পরিস্কার গর, পর্যাপ্ত পানি এবং সুষম খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে রোগ বালাই কম হয়। অনেক সময় হাঁস আবদ্ধ অবস্থায় পালন করা হয়। সেক্ষেত্রে রোগ দেখা দিলে মৃত্যুহার বেশী হয়। আমাদের দেশে যে সমস্ত রোগ দেখা দেয় সেগুলো হলো- হাঁসের প্লেগ, কলেরা, ভাইরাল হেপাটাইটিজ, সালমোনেলোসিস, বটুলিজম, এসপারজিলোসিস, কৃমি ও ভিটামিন অভাবজনিত রোগ।
হাঁসের প্লেগ রোগ
হাঁসের প্লেগ ভাইরাসজনিত একটি সংক্রামক ব্যাধি। যে কোন বয়সের হাঁস এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
রোগের সংক্রমন ও বিস্তার: (১) অসুস্থ বা বাহক পাখির সংস্পর্শে আসলে (২) অসুস্থ বা বাহক পাখির পায়খানা, লালা, শ্লেষ্মা, চোখ থেকে নির্গত পানি বা পিঁচুটির মাধ্যমে (৩) দুষিত খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে।
রোগের লক্ষণ
(ক) হাঁস দুর্বল হয়ে পড়ে। আক্রান্ত হাঁস দাড়াতে পারে না অথবা খুড়িয়ে হাটে এবং সাঁতার কাটতে চায় না (খ) বয়স্ক হাঁস বেশী মরা যায় এবং হাঁস মারা যাবার পর অথবা কোন কোন সময় মরার পূর্বে পুরুষাঙ্গ বাইরে ঝুলতে দেখা যায়। (গ) নাক দিয়ে পানি ঝরে, সবুজ/হলুদ রংয়ের পাতলা পায়খানা করে এবং কোন কোন সময় পায়খানার সাথে রক্ত দেখা যায়। (ঘ) রোগের লক্ষন বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্য গ্রহন কমতে থাকে কিন্তু তৃষ্ণা বৃদ্ধি পায় (ঙ) ডিম দেওয়া হাঁসের ডিম উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। (চ) চলা ফেরায় অসামঞ্জস্যতা দেখা যায় (ছ) মৃত্যুর হার ৫-১০০%।
প্রতিকার
(ক) ১. ভাইরাস দ্বারা হাঁসের প্লেগ হয় বলে এই রোগের সফল কোন চিকিৎসা নেই। তাই এই রোগ যেন না হয় সেজন্য স্বাস্থ্য সম্মত বিধি ব্যবস্থা পূর্বেই গ্রহণ করা উচিত ২. আক্রান্ত হাঁসকে সুস্থ হাঁসের ঝাঁক হতে পৃথক রাখতে হবে ৩. ঘর, খাবার পাত্র, পানির পাত্র উপযুক্ত জীবাণুনাশক পদার্থ দ্বারা পরিষ্কার করতে হবে।
(খ) টিকা প্রদান
বাচ্চার ১ মাস বয়সের মধ্যে বুকের মাংসে ১ সি.সি. পরিমান টিকা প্রদান করতে হবে। ১৫ দিন পর পুনরায় বুষ্টার ডোজ প্রয়োগ করতে হবে। পরবর্তীতে প্রতি ৬ মাস অন্তর এ টিকা দিতে হবে। ডাক প্লেগ টিকার একটি ভায়েল বড়ি আকারে থাকে যা ১০০ সি.সি ডিষ্টিল ওয়াটারে মিশ্রিত করে প্রয়োগ করতে হয়। এই রোগ থেকে আরোগ্য লাভের পর হাঁসের প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠে, এছাড়াও দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমন রোধের জন্য এন্টিবায়োটিক/ সালফার জাতীয় ঔষধ খাওয়ানো যায়।
হাঁসের কলেরা রোগ
হাঁসের কলেরা একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। যে কোন বয়সের হাঁসেই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
রোগ সংক্রমন ও বিস্তার
(১) রোগাক্রান্ত হাঁস-মুরগির মাধ্যমে (২) দুষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে (৩) আক্রান্ত পাখির লালার মাধ্যমে (৪) দুষিত খাবার পাত্র, পানির পাত্র, লিটার, বাসস্থান ও পরিচর্যাকারী মাধ্যমে।
লক্ষণ
(ক) অনেক সময় মারা যাওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টা পূর্বে এ রোগের লক্ষন প্রকাশ পায় (খ) হাঁসের ক্ষুধা কমে যায়, কিন্তু পিপাসা হয়। হাঁস সবুজ বা হলদে সবুজ পাতলা পায়খানা করে (গ) আক্রান্ত হাঁসের মুখ দিয়ে পিচ্ছিল তরল পদার্থ বের হয় (ঘ) অনেক সময় পায়ের গিট ফুলে যায় (ঙ) মৃত্যুর হার ২০-৫০% পর্যন্ত হতে পারে।
প্রতিরোধ
কলেরা রোগের টিকা ঃ হাঁসের বাচ্চার দেড় মাস বয়স হবার পর কলেরা টিকা দিতে হবে। এই টিকা ১ সি. সি. পরিমানে বুকের মাংসে প্রয়োগ করতে হয় এবং তার ১৫ দিন পর বুষ্টার মাত্রা প্রয়োগ করতে হয়। পরবর্তীতে ৬মাস অন্তর অন্তর এই টিকা প্রদান করতে হয়। টেট্রাসাইক্লিন জাতীয় ঔষধ খাওয়ালে এ রোগ ভাল হয়।
চিকিৎসা
এছাড়া যে কোন সালফার জাতীয় ঔষুধ যেমন- এলুড্রন, কসুমিক্স প্লাস প্রভৃতি নিয়মিত খাওয়ালে উপকার হবে। ফ্লুমিকুইন ১০% পাউডার ১ গ্রাম হিসেবে ২ লিটার পানিতে মিশিয়েও ৩-৫ দিন খাওয়ানো যেতে পারে।
হাঁসের বটুলিজম
মুরগির ন্যায় হাঁসও বটুলিজম রোগে আক্রান্ত হয়। তবে মুরগি অপেক্ষা হাঁসে এ রোগ অধিক পরিমানে হতে দেখা যায়। ঈষড়ংঃৎরফরঁস নড়ঃঁষরহঁস নামক ব্যাকটেরিয়া কর্তৃক তৈরী বিষাক্ত পদার্থের জন্য খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটে। যে কোন পঁচা, বাসি খাবার খাওয়ানোর ফলে এই রোগ হয়।
বিষের উৎস ও রোগ সংক্রমণ
(১) পঁচা বাসি খাবারে এ রোগের জীবাণু বিষ তৈরী করলে এবং সেই বিষাক্ত খাবার খেলে (২) পচনশীল খাদ্যের বিষ মিশ্রিত লার্ভা খেলেও এ রোগ হয়।
লক্ষণ
(ক) অতি তীব্র প্রকৃতির রোগে হঠাৎ করে হাঁস মারা যায় (খ) অপেক্ষাকৃত কমতীব্র প্রকৃতির রোগে প্রথমে দুর্বলতা দেখা দেয়। হাঁস নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং খোঁড়ায় (গ) ডানা, পা এবং ঘাড় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হবার কারণে ডানা ঝুলে পড়ে। হাঁস হাটতে পারে না এবং মাথা ঘাড় মাটিতে হেলে পড়ে (ঘ) অবশেষে শ্বাস প্রশ্বাস সম্পর্কিত পেশী পক্ষাঘাতের ফলে শ্বাস কষ্টে হাঁস মারা যায়।
প্রতিরোধ
(ক) পঁচা অথবা বাসি খাবার হাঁসকে দেয়া যাবে না। (খ) মৃদু প্রকৃতির রোগে আক্রান্ত হাঁসকে বিষাক্ত জলাশয় থেকে তুলে এনে পরিস্কার স্বচ্ছ জলাশয়ে রাখতে হবে।
চিকিৎসা
প্রচুর পানি পান করতে হবে এবং পাখির অন্ত্র পরিস্কারের জন্য হজমী ঔষধ খাওয়ানো প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে প্রতিটি হাঁসকে ১ গ্রাম করে ম্যাগনেসিয়াম সালফেট অথবা পরিমানমত ইপসাম লবন (টেষ্টিং সল্ট) পরিস্কার খাবার পানিতে মিশিয়ে প্রত্যহ ২/৩ বার করে ২/৩ দিন খাওয়াতে হবে।
হাঁসের টিকা ব্যবস্থাপনা
শরীরের প্রত্যক্ষ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কৃত্রিম উপায়ে আরো সক্রিয় করে তোলাকেই ভ্যাকসিয়েশন/ টিকা দেয়া বলে। যা দ্বারা কৃত্রিম ভাবে এই কাজটি করা হয় তাকে বলে ভ্যাকসিন বা টিকা। ভ্যাকসিন প্রদানের মূল উদ্দেশ্য হলো যে বস্তুটি শরীরে ঢুকানো হয়, সেই বস্তু বা টিকার বিরুদ্ধে শরীরের মধ্যে রোগ প্রতিরোধকারী এন্টিবডি তৈরী করা। সাধারণতঃ যে রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকাটি প্রদান করা হয়, সেই রোগের জীবাণূ বা একই রকম ক্রিয়াশীল জীবাণু দ্বারা টিকাটি তৈরী করা হয়।
টিকা/ ভ্যাকসিন ব্যবহারের কয়েকটি সাধারণ শর্ত
ভ্যাকসিন কোন উৎস হতে সংগৃহীত হল তা লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। যদি ঐ উৎসে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করার মত পর্যাপ্ত কোল্ড রুম বা রেফ্রিজারেটর বা অন্য কোন বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা না থাকে তবে সেখানকার ভ্যাকসিন ব্যবহার মোটেই ঠিক হবে না।
প্রস্তুতকারী কোম্পানীর ব্যবহার বিধি মেনে চলতে হবে।
যে সব ভ্যাকসিন ব্যবহার করলে অধিক মাত্রার এন্টিবডি উৎপন্ন হয় এবং অনেকদিন পর্যন্ত তা রক্তে থেকে শরীরকে নিরাপদে রাখতে পারে, সে সমস্ত প্রস্তুতকারকের ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে ব্যবহার করা উচিত।
টিকা ব্যবহারের সাধারণ নিয়মাবলী
১। প্রতিষেধক টিকা সব সময়ই সুস্থ পশুপাখিতে প্রয়োগ করতে হয়।
২। সংক্রামক রোগ বা কৃমিতে আক্রান্ত পশু পাখিকে টিকা প্রয়োগ করা উচিত নয়, তাতে কাঙ্খিত মাত্রায় প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয় না।
৩। টিকাবীজ কোন অবস্থাতেই সূর্য্যালোকের সংস্পর্শে আনা ঠিক নয়।
৪। ব্যবহারের সময় মিশ্রন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে পাত্র, সিরিঞ্জ, নিড্ল, ডাইলিউশনের জন্য ব্যবহৃত তরল পদার্থ, টিকা ব্যবহারকারীর হাত ইত্যাদি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবণুমুক্ত হতে হবে।
৫। জীবাণুমুক্ত করার জন্য রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা যাবে না।
৬। প্রতিষেধক টিকা সকালে বা সন্ধ্যায় প্রয়োগ করা উত্তম।
৭। ব্যবহারের জন্য গোলানোর পর যত দ্রুত সম্ভব টিকা ব্যবহার করে ফেলা উচিত ও গোলানোর ১ ঘন্টা পর অথবা পরবর্তিতে অব্যবহৃত টিকা আর ব্যবহার করা যাবে না।
৮। মেয়াদ উত্তীর্ণ বা টিকার সাধারণ রং পরিবর্তিত হয়ে গেলে সে টিকা আর ব্যবহার করা যাবে না।
৯। টিকা পরিবহনের ক্ষেত্রে কুল চেইন বা ঠান্ডা অবস্থায় পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।
১০। তাপ প্রতিরোধক কুল ভ্যান/ কুল বক্স/ ফ্লাক্সের মধ্যে বরফ দিয়ে টিকা বীজ পরিবহন করতে হয়। বরফ গলে গেলে পুনরায় বরফ দিতে হবে।
১১। ব্যবহারের সময় টিকা মিশ্রণের পাত্র ছায়াযুক্ত স্থানে বরফ দেওয়া পাত্রের মধ্যে রাখতে হবে।
১২। ভাইরাস জনিত রোগ প্রতিরোধক টিকা প্রয়োগকালে, টিকা প্রয়োগস্থান পরিশ্র“ত পানি দ্বারা পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং এই জন্য রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না।
ভ্যাকসিন/ টিকা কার্যকরী না হওয়ার কারণ সমুহ
(ক) টিকা এমন ভাইরাস/ ব্যাকটেরিয়ার বীজ দ্বারা তৈরী যা ক্ষেত্রে বিশেষে ঐ রোগটিকে প্রতিরোধ করতে পারেনা।
(খ) অপর্যাপ্ত পরিমান ভ্যাকসিন প্রদান। যেমন- ১ সি. সি করে দেয়ার প্রয়োজন, কিন্তু কোন কারণে ১ সি. সি এর কম দেয়া হলো।
টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহন সংক্রান্ত ত্রুটি
ক) টিকা তৈরীর পর তা টিকা প্রস্তুতকারী সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী সংরক্ষণ না করে তা থেকে নিম্ন বা উচ্চ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হলে টিকার গুনগতমান হ্রাস পায়।
খ) সঠিকভাবে পরিবহন না করা হল।
গ) টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ পানিতে গুলানো না হলে টিকার গুনগত মান হ্রাস পায়।
ঘ) টিকা গুলে ফেললে তা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শরীরে প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণতঃ ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রয়োগ সর্বাধিক নিরাপদ ও কার্যকরী।
প্রয়োগ সংক্রান্ত ত্রুটি
ক) অসময়ে ভ্যাকসিন প্রদান। যেমন- ভ্যাকসিন এমন সময় দেওয়া হলো যখন খামারে রোগ প্রবেশ করেছে।
খ) রোগাক্রান্ত পাখীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় বলে সেই অবস্থায় ভ্যাকসিন প্রদান করা যাবে না।
গ) এক প্রজাতির প্রাণীর ভ্যাকসিন অন্য প্রজাতিতে ব্যবহার করা যাবে না।
ঘ) অনির্ধারিত স্থানে টিকা প্রয়োগ। প্রস্তুতকারী কোম্পানী কর্তৃক নির্দেশিত স্থানে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হবে।
হাঁসের খামারে রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা
সাফল্যজনক হাঁস পালনের পূর্বশর্ত হলো খামার রোগমুক্ত রাখা। কেননা রোগমুক্ত ঝাঁকেই দিতে পারে সঠিক উৎপাদন, আর সঠিক উৎপাদনের মাধ্যমেই কৃষক হতে পারেন লাভবান। হাঁসের ক্ষেত্রে রোগ-ব্যাধীর চিকিৎসার চেয়ে রোগ যেন না হয় সেটি অধিক কাম্য কারণ পশু-পাখী রোগাক্রন্ত হবার পর পরবর্তীতে রোগ-মুক্ত হয়ে উঠলেও অনেক সময় উৎপাদন পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে নাও পারে। তাছাড়া, একজন আদর্শ খামারীর লক্ষ্য হতে হবে সর্বদাই-অল্প খরচে অধিক লাভবান হওয়া। তাই রোগাক্রন্ত পাখীর চিকিৎসা ব্যয় যেন সর্বনিু হয় অথবা একেবারেই না হয় সে;দিকে নজর দিতে হবে। সুষ্ঠু এবং স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা হাঁসের রোগাক্রন্ত হবার সম্ভাবনা বহুলাংশে কমিয়ে দেয়, অথচ তাতে তেমন কোন ব্যয় হয়না। নিুে প্রদত্ত নিয়মাবলী অনুসরণ করলে মহামারীর কবল থেকে এদেরকে সহজেই রক্ষা করা যায়।
* নিয়মিত হাঁসের বাসস্থান অর্থাৎ ঘরের মেঝে, দেয়াল বা বেড়া, ছাদ ইত্যাদি পরিস্কার করে মাঝে মাঝে জীবাণুনাশক ঔষধ যেমনঃ আইয়োসান, ফিনাইল ইত্যাদি ছিটিয়ে দেয়া।
* খামারে অবাধ প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
* প্রয়োজন/ চাহিদা অনুসারে স্বাস্থ্যসম্মত সুষম খাবার প্রদান করা।
* সব সময় পরিস্কার পানি প্রদান করা, পানি ও খাবার পাত্র পরিস্কার রাখা। হাঁসের ক্ষেত্রে আবদ্ধ অবস্থায় পানি রাখলে নিয়মিত সেই পানি ফেলে নতুন পানি প্রদান করা এবং পানির চ্যানেল মাঝে মাঝে পটাশ দিয়ে ধুয়ে দেয়া।
* পাখী, ইদুর, পোকা-মাকড় এবং কুকুর বা অন্য কোন বন্য জন্তু যেন খামারে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
* কোন পশু-পাখী অসুস্থ হলে আলাদা ঘরে রেখে তার চিকিৎসা করা।
* পূর্ববর্তী ঝাঁকের লিটার এবং শেডের অন্যান্য আবর্জনা শেড হতে কমপক্ষে ১০০ (এক হাজার) ফুট দূরে বাতাসের প্রবাহের বিপরীত দিকে নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখে।
* পূর্ববর্তী ঝাঁক শেষ হওয়ার পর ঘর এবং অন্যান্য আসবাবপত্র যেমন, ব্র“ডার, খাদ্যের পাত্র, পানির পাত্র, বালতি, ঝাড়– প্রভৃতি ব্লিচিং পাউডার বা অন্য কোন জীবাণুনাশক দ্বারা পরিস্কার করে নেয়া।
* একটি ঘরে কেবল মাত্র একই বয়সের হাঁস থাকবে।
* খামারের হাঁস অধিক হারে মারা যেতে থাকলে সঠিক রোগ-নির্ণয়ের জন্য দু-একটি আক্রান্ত বা মৃত হাঁস রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে পাঠিয়ে রোগ নির্ণয় করিয়ে এনে প্রতিকার ব্যবস্থা করা।
* হাট-বাজার থেকে ক্রয় করা হাঁসকে অন্তঃত এক সপ্তাহ আলাদা রেখে, তাদের কোন রোগ আছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। তারপর এদেরকে টিকা দিয়ে অন্যান্য হাঁসের সাথে রাখা।
* খামারে হাঁসের পুরাতন খাঁচাসহ কোন লোককে প্রবেশ করতে না দেয়া।
* পটাশিয়াম পাম্যাঙ্গানেট বা অন্য কোন জীবানুনাশক ঔষধ পানিতে মিশিয়ে খামারের প্রবেশ পথে এবং হাঁসের ঘরের দরজায় ফুটবাথ হিসেবে রাখতে হবে।
* নিয়মিত টিকা প্রদান করা।
* মাঝে মাঝে কৃমি নাশক ঔষধ যেমন: ইউভিলন, এভিপার ইত্যাদি সঠিক মাত্রায় খাওয়ানো।
হাঁস ও মাছের সমম্বিত চাষ পদ্ধতি
নদীমাতৃক বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় নদী, নালা, যোবা, হাওড়, বাওড় প্রতৃতি জলাশয়। লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব পতিত জলাশয় আমরা সহজেই কাজে লাগাতে পারি, যা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে হাঁসের সাথে মাছের চাষ অত্যন্ত সফল প্রযুক্তি, কেননা এই পদ্ধতিতে একই জমি ব্যবহারের মাধ্যমে একই সাথে মাংস, ডিম এবং মাছ উৎপাদন করা যায়, যা দেশের ক্রমবর্ধমান জনসাধারণের আমিষের চাহিদা বহুলাংশে মিটাতে পারে।
পুকুরে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ পদ্ধতির সুবিধা
একই জমিতে একই ব্যবস্থাপনায় সমম্বিত পদ্ধতিতে লাভজনক ভাবে মাংস, ডিম ও মাছ উৎপাদন করা যায়। হাঁসের বিষ্ঠা মাছ চাষের একটি উৎকৃষ্ট জৈবসার।
* পুকুরে হাঁস ও মাছ একত্রে চাষ করলে মাছের জন্য আলাদা কোন খাদ্য বা সারের প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া অব্যবহৃত ও পানিতে পড়ে যাওয়া হাঁসের খাদ্য মাছের সম্পূরক খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
* হাঁস পুকুরে সাঁতার কাটার সময় বাতাস থেকে কিছু অক্সিজেন পানিতে মিশে যায়। এই অক্সিজেন মাছের জন্য প্রয়োজন।
* পুকুরের পাড়ে বা পানির উপর হাঁসের ঘর তৈরী করা হয় বলে হাঁস পালনের জন্য আলাদা কোন জায়গার প্রয়োজন হয়না এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা কোন শ্রমিক নিয়োগেরও দরকার হয় না।
পুকুরে হাঁসের ঘর তৈরীর পদ্ধতি
পুকুরের পাড়ে অথবা পুকুরের উপর যে কোন পার্শ্বে স্থায়ী অথবা ভাসমান মাঁচায় ঘর তৈরী করা যেতে পারে। হাঁসের ঘর মজবুত হওয়া দরকার। ঘর তৈরীতে বাঁশ, টিন, ছন, কাঠ, তালপাতা প্রভৃতি দেশী সামগ্রী ব্যবহার করা যায়। ঘর যে সামগ্রী দিয়েই তৈরী করা হোকনা কেন, ঘরে যেন পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশ করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ঘরে প্রতি হাঁসের জন্য ২-৩ বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন। ঘরের উচ্চতা হবে ৪-৫ ফুট। মেঝেতে বাঁশের একটি চটা থেকে অপর চটার দুরত্ব হবে ৪/৩ সে.মি। এতে হাঁসের বিষ্ঠা এবং পানিতে পড়ে যাওয়া খাবার সরাসরি পানিতে মিশে যাবে। পুকুরের উপর ঘর থাকলে পুকুরের পাড় হতে হাঁসের ঘরে প্রবেশের জন্য বাঁশের সিড়ি ব্যবহার করা যেতে পারে।
হাঁসের জাত
অধিক লাভের জন্য এমন জাতের হাঁস নির্বাচন করা উচিত যা অধিক ডিম দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে খাকী ক্যাম্পবেল, ইন্ডিয়ান রানার এবং জিনডিং জাতের হাঁস নির্বাচন করা ভলো। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা প্রদান করলে এরা বাছরে ২৫০-৩০০ টি পর্যন্ত ডিম দেয়া। এরা ৫ মাস বয়স থেকে ২ বছর পর্যন্ত লাভজনক ভাবে ডিম দিয়ে থাকে। এদেশের আবহাওয়া এবং পরিবেশের সাথে এরা ভালোভাবে খাপ-খাওয়াতে পারে।
হাঁসের সংখ্যাঃ বিঘা প্রতি ৬০-৭০ টি হাঁস পুকুরে পালন করা যেতে পারে অর্থাৎ পুকুরে প্রতি শতকে ২টি হাঁস রাখা যাবে। পুকুরের গভীরতা ৫ ফুটের অধিক হলে হাঁসের সংখ্যা বিঘা প্রতি ১০০টি পর্যন্ত পালন করা যায়। বাচ্চা ফোটানোর জন্য ডিম উৎপাদন করতে হলে প্রতি ৬-৮টি হাঁসীর জন্য ১টি করে হাঁসা রাখতে হবে। দুই আড়াই বছর বয়স হবার পর ঐ সমস্ত হাঁস বিক্রি করে পুনরায় সমান সংখ্যক হাঁস সংগ্রহ করতে হবে।
হাঁসের খাদ্য ও পরিচর্যা
খাদ্যপাত্র
প্রতি ২০টি হাঁসের জন্য ৩ ইঞ্চি x ৬ ইঞ্চি x ৬ইঞ্চি মাপের পাত্রই যথেষ্ট। পানি এবং খাদ্য আলাদা পাত্রে দেয়া উত্তম।
হাঁসের খাদ্য
হাঁসের নবজাত ছানাকে দিনে ৪-৫ বার এবং ৪ সপ্তাহ বয়সের পর ২-৩ বার করে খাবার দিতে হবে। বয়স্ক হাঁসকে দিনে দু’বার খাবার প্রদান করাই যথেষ্ট। হাঁসর গুড়া খাবার খেতে পারেনা। তাই পিলেট/বড়ি আকারে ভেজা খাবার প্রদান করা উচিত। খাকী ক্যাম্পবেল, জিনডিং প্রভৃতি জাতের হাঁস দৈনিক ২৫-৩০ গ্রাম পরিমানে প্রাকৃতিক খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু দেহে প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য প্রাপ্ত বয়স্ক হাঁসের দৈনিক ১৫০-১৬০ গ্রাম খাবার প্রয়োজন হয়। তাই অতিরিক্ত ১০০-১১০ গ্রাম সুষম খাবার সরবরাহের প্রয়োজন হয়।
সুষম ১ কেজি খাদ্যের উপাদান সমূহ নিুরূপঃ
খাদ্যের উপাদান শতকরা উপস্থিতির পরিমান বাচ্চা অবস্থায় (গ্রাম) পরিনত অবস্থায় (গ্রাম)
আধা ভাঙ্গা গম ৪৫০ ৪৫০
চালের কুড়া ২৭০ ৩০০
তিলের খৈল ১৪০ ১২০
মাছের গুড়া ১২০ ১০০
ঝিনুক চূর্ন ১৫ ২৫
লবণ ৫ ৫
ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স ১.৫ গ্রাম/ কেজি ২ গ্রাম/ কেজি
হাঁস পুকুরে চড়ে খাবে বলে সেখানে পর্যাপ্ত খাবার থাকলে হাঁস পুকুর থেকে প্রায় ৫০ গ্রাম খাবার সংগ্রহ করতে পারবে। পুকুরে খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে এর পরিমান আরও বেশী হতে পারে।
উপাত্ত সংগ্রহ: পারিবারিক পর্যায়ে হাঁস পালন। হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার স্থাপন প্রকল্প, পশসম্পদ অধিদপ্তর, ফার্মগেট, ঢাকা























