RRP
agriculture news
Health Care
Open
diamond egg
renata-ltd.com
fishtech
Ad3
Spech for Promotion
avonah
বুধবার , ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি
 

সরল মনে দাঁগ

প্রতিবেদক
Md. Bayezid Moral
সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮ ২:৩৩ অপরাহ্ণ

সরল মনে দাঁগ
(খুলনার বি এল কলেজের আমার এক সিনিয়র ভাইয়ের জীবনী নিয়ে লেখা)

পিতা মাতার আট পুত্র কন্যার ভিতর ফিরোজ বড়। অনেক আশা ফিরোজকে ঘিরে। সংসারের বড় ছেলে হয়ে জন্ম নিলে অনেক দায়িত্ব কর্তব্য অধিকার থাকে তার। ফিরোজ মায়ের চোখের পানি কারন তার বিবাহের সাত বৎসর পর ফিরোজ জন্ম গ্রহন করে। অনেকে ফিরোজের আম্মাকে বন্ধা বলতেও দ্বিধা করেনি। যেমনঃ ফিরোজের দাদী ফুফু পাড়া প্রতিবেশী। এমনকি ফিরোজের পিতাও অবজ্ঞা-অবহেলা করেছে। তার পর ফিরোজ জন্ম নেওয়ার পর একে একে ছয়টি সন্তান লাভ করে । এক সময় ঘরে হাহাকার ছিল। আজ ঘরে হাসি কান্নার জোয়ার বয়ে যায়। অধিক সন্তানের জন্য সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকে।

ফিরোজ ছোট বেলা থেকে খুব মেধাবী। বই পত্র খুব মুখস্ত করতে পারত। তবে উপস্থিত বুদ্ধি একটু কম ছিল। কখন কি, কিভাবে বলতে হবে সেটা বুঝে গুছিয়ে বলতে পারতনা। ও আবার তোতলা ছিল কথা বার্তা বলতে গেলে বেধে যেত, তাই রাগটা চড়া। হঠাৎ যে কোন জিনিস নিয়ে রাগ হয়ে যেত আর রাগ হয়ে গেলে কি বলত তা নিজে বুঝে উঠতে পারত না। পরে ইংরেজি বই পড়তে গেলে এবং এ ই এর পরে বলতে পারে না। পরীক্ষার সময় এলে ঘাড় ও কপালের শিরাগুলো ফুলে উঠত।

ফিরোজ আবার ছোট বেলা থেকে একটু ভাবুক প্রকৃতির যা ওর চোখে ভাল লাগত তা নিয়ে অনেক কিছু ভাবা শুরু করে দিত। অনেক সময় ভাবতে ভাবতে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় এক কল্প জগতে। যে জগতের নায়ক ও নিজেই। আর বাকী সবাই ভিলেন আর অনুসারী। এমনি করে ও ছোট থেকে বড় হতে থাকে চোখে থাকে নানা স্বপ্ন, মনে কল্পনা। ও ভাবে এসব কল্পনা একদিন বাস্তবে পরিনত হবে। ওর বেশী ভাবনা চলে সুন্দরী প্রেমিকা আলিশান বাড়ী, নিউ মডেল গাড়ী, পিচ ঢালা সান-সৈকত পথ, খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। সব খারাপ লোকদের মেরে শাস্তি দিবে, নিজের হাতে। মুখে যাহা বলবে প্রকৃতিতে তাহা হয়ে যাবে। এভাবে কল্পনা করতে করতে একদিন কল্পনা বাস্তবায়নের পথে মাথা খাটাল। সে হলো কোন সুন্দরীর সাথে প্রেম করা। এ প্রসঙ্গে ও একটি বানী তৈরী করল।“পরাধীনতা থেকে ভালবাসলে হারাতে হবে। যখন স্বাধীন হবে তখন ভালিবাসবে, তবেই ভালবাসা কিনারা পাবে।”

এখানে পরাধীন বলতে (এসএসসি) প্রবেশিকা পাশের পূর্বের ছাত্র জীবন বুঝাচ্ছে। আর স্বাধীন বলতে প্রবেশিকা পাশ করার পর কলেজ জীবনের কথা বুঝাচ্ছে। তার কারন স্কুল জীবনে লেখা পড়া চলাফেরার যাবতীয় খোজ খবর পিতা মাতাই নিয়ে থাকে। ঘোরাফেরার জন্য পিতা মাতা গাইড দিয়ে থাকে। কিন্তু প্রবেশিকা পাস করার পর কলেজে গেলে পিতা মাতা আর গাইড দেয় না। লেখাপড়া করার কথা বলে না। চলাফেরা কথা বার্তায় আড্ডা মারতে বধা দেয় কম। তখন তারা ভাবে ছেলে/মেয় এখন কলেজে যায়, বড় হয়েছে নিজের ভাল মন্দ বুঝতে শিখেছে। এখন তাকে ভালমন্দ বুঝানো লাগবে না। এখন সে স্বাধীন মোটামুটি দশ জনের সাথে মিশে চোখ কান ফুটিয়ে ফেলেছে।

ঘুরতে ফিরতে যেথায় খুশী যাইতে পারে। যা খুশী করিতে পারে। কোন বাধা নেই। এমন কি একটি সময় ফিরোজের জীবনে প্রবেশিকা পরীক্ষা শেষ করে দু-তিনটি টিউশনী নিয়ে সময় কাটাচ্ছে। হঠাৎ গ্রামের একটি মেয়েকে ভাললেগে গেল। মেয়েটি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। ১১ বছরের নাবালক মেয়ে, প্রেমের কোন কিছু বুঝার বয়স এখনও হয়নি। তবুও আকর্ষন বিকর্ষন কিছু বোঝে। কারন গ্রামের মেয়ে সাধারনত ছয় সাত বৎসর না হলে স্কুলে পাঠায় না। ভয় থাকে রাস্তা ঘাটে হোচট খেয়ে পড়ে যায় কিনা? তারপর রাস্তার পাশে গরু চাগল মহিষ বাঁধা থাকে। তারা শিং নেড়ে গুতা দেয় কিনা এসব ভেবে। যাহোক মেয়েটির বয়স এগার বারো বৎসর হবে। সবে মাত্র আমেরমুকুল ধরার মত মনে প্রেম উদয় হচ্ছে। দুজন দুজনকে চিনতে জানতে শুরু করে দিল। ফিরোজ প্রবেশিকা পাস করে কলেজে ভর্তি হয়। সরকারী বি.এল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। সেবার গ্রাম থেকে শুধু মাত্র ঐ একটি ছেলেই সরকারী বি.এল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ভর্তি হল। সে জন্য গ্রামের সবাই ওকে খুব ভালবাসে, বড় মনে করে। অনেকে ভালবাসে কিন্তু ঐ মেয়েটির পিছনে ঘুরে বলে সহ্য করিতে পারে না। তারপর ওর মাথা একটু বড় কারণ ও বি.এল কলেজে পড়ে এ জন্য অনেক কিছু ভাবে আর কল্পনা করে পারমিতাকে নিয়ে। ও কিভাবে পারমিতার কাছে প্রেমের অফার করবে? ওতো ছোট যদি না বুঝে ফিরিয়ে দেয়? কিংবা সবাইকে বলে দেয়? তাহলে তো জাত মান ইজ্জ্বত সব যাবে। লোকের সামনে আর মুখ দেখাতে পারবে না। পারমিতা দেখতে শুনতে খুব সুন্দরী। কবি জীবনান্দ দাসের নাটরের বনলতা সেনের যে রকম বর্ণনা দিয়েছে তারপর শ্রাবস্তীর যে কারুকার্যের কথা বলেছে তার চেয়ে বেশি কোন অংশে কম নেই এই পারমিতার সৌন্দর্যে। ঠিক সেই পাখির নীড়ের মত চোখ। চুল গুলো অন্ধকার বিধিসার নেশা। চোখের ভ্র“দুটি সাপের মত। চোখ মুখ নেশা নেশা ঘুম ঘুম। কন্ঠ তার কাশির মত। এক অপরুপ সৌন্দর্য তার। মাটী দিয়ে তৈরী দুর্গা, লক্ষী, স্বরস্বতী হার মানবে পারমিতার কাছে। দৌলতপুরের সরকারী ব্রজলাল (বিএল) বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হাজারো সুন্দরীর ভিতর পারমিতা অন্যতম। সকাল সন্ধা কাটায় ফিরোজ পারমিতাদের বাড়ীর পাশে ঘেষে। কখনো সাহস করে বলতে পারে নি মনের কথা পারমিতাকে। তবে পারমিতা ও পারমিতার পরিবারের সবাই জেনে গেছে ফিরোজের এ ব্যাপারটা। কারন গ্রামের লোকের মুখে মুখে রটে গেছে এ ঘটনা। ফিরোজ লোক পাঠাল পারমিতার আম্মার কাছে, সে পারমিতাকে পছন্দ করে ভালবাসে। ফিরোজ ভবিষ্যতে আত্মীয়তা করিতে চায়। পারমিতার আম্মা প্রথমে অনেক কিছু বলল না না হবে না ছোট মেয়ে। পড়াশুনা করাবে কমপক্ষে প্রবেশিকা পাস করাবে। প্রবেশিকা পাস না করা পর্যন্ত বিয়ে দিতে পারবে না। মায়ের বড় মেয়ে তাছাড়া ও খুব মেধাবী। অবশেষে দুজনই পড়াশুনা করবে, পড়াশুনা শেষ হলে ওদের দু’হাত এক করে দিবে, এই বলে প্রতিশ্র“তি প্রদান করিল পারমিতার
আম্মা। আবার এও বলিল ফিরোজ যেন এদিকে কম আসে। এজন্য পাঁচ-সাত বৎসর সময় দিতে হবে। ফিরোজ সব কথায় রাজী হয়ে যায় এবং শর্ত মোতাবেক কাজ করিতে থাকে। ফিরোজের পরিবার থেকে সবাই জেনে যায়। পিতা মাতা দাদা রাজী হয় না। একই গ্রাম তারপর পারমিতা ছোট বংশের মেয়ে বলে। দাতা ও পিতা পারমিতাকে দেখে রাজী হল কিন্তু মা আর রাজী হল না। পারমিতা এখন ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ে বারো তেরো বৎসর বয়স, দৈহিক দিক না বুঝলেও মনের দিক থেকে বুঝে গেছে। হঠাৎ গ্রামের একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়। যার প্রতিচ্ছায়া পারমিতার উপর পড়তে আসে। ফিরোজ নায়কের মত ভুমিকা নিয়ে মোকাবেলা করে। তারপর পারমিতাকে আর ঘরে রাখবে না। যেভাবে হোক পাত্রস্থ করবে। না হলে বদনাম হয়ে যেতে পারে বা সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। ফিরোজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা আগত। সে সময় পারমিতাদের পরিবার থেকে বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। পারমিতাকে ঘরের বউ করে নাও। তা না হলে তারা মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দিতে বাধ্য হব। কি করবে ফিরোজ এখন? পিতা ফিরোজের ভবিষৎ অন্ধকার দেখেও, রাজী হল ছেলের জন্য। কিন্তু মা আর রাজী হল না। একদিকে পুত্রের ভবিষৎ অন্ধকার আর একদিকে পারমিতার নানা বাড়ী আর ফিরোজের নানা বাড়ী পাশাপাশি। অতএব দুই মা-ই একে অপরকে অনেক দিন থেকে চেনে ও জানে। ফিরোজের মা ফিরোজরে ডেকে বলল-তুমি কি সালেহার মেয়ে পারমিতাকে বিয়ে করবে? ফিরোজ মাথা নিচু করে বসে রইল মায়ের সামনে। তারপর মা আবার বলল- দেখ ফিরোজ তুমি যদি ঐ মেয়েকে বিয়ে করে আন তাহলে আমাকে হারাবে। তারপর ঐ মেয়ে এ বাড়ীতে বউ সেজে আসবে আর তোমার মা লাশ হয়ে নেমে যাবে। মায়ের মুখে একথা শোনা মাত্রই সকল আশা খান খান হয়ে গেল। সকল কল্পনা, স্বপ্ন স্তমিত হয়ে গেল। বুকের ভিতর বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। আকাশ ভেঙ্গে মাথার উপর পড়ল। সারা শরীরে ওর তিন থেকে চার মন ওজন বেড়ে গেল। তারপরও ভাবতে লাগল হয়ত: স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।

কিন্তু তা আর বাস্তবায়ন হল না। যথারীতি পারমিতার বিয়ে হয়ে গেল অশিক্ষিত বর্বর, গায়ের চাষা এক যুবকের সাথে। বিচ্ছেদ ব্যাথাও ফিরোজের সারা শরীরের দেখা দিল। চোখের কোনে একটা কালো দাগও দেখা গেল। তারপর পারমিতার
শ্বশুরালয় থেকে পারমিতার প্রতি কিছুটা নির্যাতন শুরু হল। তাই ফিরোজ পারমিতার মঙ্গলের জন্য স্বাভাবিকতায় ফিরে আসার চেষ্টা করল। কিন্তু ফিরে আসতে তো পারে না। সারাদিন ঘরে বই নিয়ে বসে থাকে একটি লাইন ও পড়তে পারে না। শুধু পারমিতার কথা ভেবে সময় কাটায়। তারপর সিগারেট ও ঘুমের বড়ির নেশা চেপে বসল। পরীক্ষাগুলো দিতে যেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হতে লাগল। তারপর এর মনে শুধু একটাই কথা আর কোন মেয়ের চোখে চোখ রাখবেনা। কাউকে নিয়ে কল্পনা করবে না। কিছু ভাববে না।

কৃতিত্বের সহিত উচ্চ মাধ্যমিক পাস দিয়ে অনার্সে ভর্তি হল। লেখা পড়ার পাশাপাশী রাজনীতি সিগারেট আর ট্যাবলেটের নেশা নিয়ে সময় কাটায়। সারাক্ষন ট্যাবলেটের নেশায় ও টাল থাকে। কিন্তুু কেউ ওর মনের কথা বুঝতে পারে না। ও এখন নিজ পায়ে দাড়িয়েছে। পিতার কাছ থেকে টাকা পয়সা আনে না পড়াশুনা করার জন্য। হোষ্টেলে সবাই ওকে ভালই জানে। সবাই ওকে একটু আধা-পাগল আধা-পাগল ভাবে। মারামারী কাটাকাটীর কথা শোনা মাত্রই সেখানে ছুটে যায়। কখনো কাউকে ভয় করে কথা বলে না। নিজ গায়ের ওজনের চেয়ে বেশী ওয়েট নিয়ে কথা বলে। কি নিজ দলের কি প্রতিপক্ষ দলে। ন্যায় নীতি ওর কাছে কিছুই না। হাই বললে ছুটে আসে।

এত কিছুর ভিতর দিয়েও ওর স্বপ্ন দেখা। দাড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়া, ওকে ছেড়ে যায়নি। রাস্তা দিয়ে হাটছে আকর্ষনীয় কোন কিছু দেখলো সাথে সাথে কল্পনায় ভেসে চলেছে। আবার মাঝে মাঝে যা কিছু ভাবে তাহা পাগলের মত লিখা লিখি শুরু করে দেয়। বন্ধুরা অনেক সময় ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে অনেক কিছু বলে। কখনো রেঘে ঝগড়া ঝাটি মারামারি বাঁধায়। আবার কখনো মুখ বুঝে সহ্য করে।

ফিরোজের এ ঘটনা কলেজের বন্ধু বান্ধবীরা জানে না। কারো সাথে বা কোন মেয়ের সাথে ও আড্ডা মারে না কখনো। খুলনার দৌলতপুরাস্থ বি.এল কলেজের পুকুর পাড়, গাছ তলা, অডিটরিয়ামের চার পাশ দিয়ে, ব্যামাগারের সামনে, কলা ও বিজ্ঞান ভবনের মাঝে, বাণিজ্য ভবনের পিছনে, হাজী মোহাম্মদ মহসিন হলে এবং কলেজের উত্তর পাশে প্রবাহিত খরস্রোতা ভৈরব তীরে, জোড়ায় জোড়ায় প্রেম জুটি বসে, প্রেম করে, আড্ডা মারে। ফিরোজ শুধু চোখ মেলে দেখে যায় আর নিজ কল্পনা করে বেড়ায়। তাতে একটা তীব্র আনন্দ উপলব্ধি করেও। অনেক বন্ধু, বান্ধবী ওকে প্রেমের জন্য অফার করে। পাশাপাশি বসতে চায়। কিন্তু কখনো কারো কথায় ও রাজী হয় না। শুধু এই দিকটাই বিদ্বেশী। অনেক বন্ধু বান্ধবী বাজী ধরে যেভাবে হোক ফিরোজের এ অভিমান ভঙ্গ করিবেই। কিন্তু সকল ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ও কখনো হোষ্টেলের রুমে মেয়েদের যেতে বলে না। আর কেউ গেলে নিষেধ করে, পরবর্তী না আসার জন্য। এ জন্য হোষ্টেলের ছাত্ররা ওকে একটু অন্য চোকে দেখে। কারন হোষ্টেলে যারা থাকে তারা মেয়ে এনে প্রেম করে গল্প করে। জীবনে রোমান্টিকতা করে।

ফিরোজ সারাক্ষন রাজনীতি আর টিউশনী নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু কখনো নেতৃত্ব দিতে যায় না বা নেতা হওয়া পছন্দ করে না। মনে করে নেতা হওয়া একটা ঝামেলা। চোখের ঘুম হারাম হবে। একেতো ঘুমতে পারে না ট্যাবলেট ছাড়া। কলেজের অনার্স ভর্তি পরীক্ষার সমাগম। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেলে মেয়ে আসছে অনার্সে ভর্তি হওয়ার জন্য। এবার ভর্তি পরীক্ষা হবে না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিদ্ধান্ত নিল মার্কসের ভিত্তিতে ভর্তি হবে। ভর্তি কার্যক্রমের দলীয় টেন্ট এ বসে কাছে। অনেক ছেলে মেয়ে ফরম নিচ্ছে ফিরোজ সহযোগীতা করে ফরম পুরণ করে, টেন্টেই জমা নিচ্ছে। তারপর ঐ ফরমগুলো দলীয় ভাবে কলেজ অফিসে জমা দেওয়া হবে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে পরে টোকেন নম্বর বিলি করবে। এভাবে ও একদিন কি যেন ভেবে দুইশত সাতাশি খানা ফরমের ভিতর থেকে একটি ফরমের একটি মেয়ের ছবি দেখে কিছুটা ভাল লাগল। সেই সাথে ফরমের মেয়েটার নাম ঠিকানা সংগ্রহ করল এবং এক খানা ছবি চুরি করে রাখল। তারপর অন্যভাবে একটু চেষ্টা করল স্যারদের কাছে গেল টোকেনটা দিয়ে কাকুতি মিনতি করে বিনয়ের সাথে সুপারিশ করল। স্যাররা ওর কথা মনে রাখল না। আর রাখবার মত কোন সুযোগও রইল না। কারন মার্কসের ভিত্তিতে ভর্তি, মেধাবীদের সুযোগ দিতে হবে। যে স্কোরে পড়বে তাকে দিতে হবে। এর মধ্যে ডুবলিকেট করতে গেলে ধরা পড়লে ডিপার্টমেন্টে ভাংচুর শুরু হয়ে যাবে। স্যাররা ছাত্র দ্বারা লাঞ্ছিত হবে। যারা সুযোগ পেল তারা দেখা যাচ্ছে একাধিক বিষয়ে সুযোগ পেয়েছে তাই এই কঠিন সাবজেক্ট বাংলায় ভর্তি হতে আসেনি। অনেক সিট খালি রইল। চুরি করা ছবির মেয়েটার নাম রিতু। নওসিনের পথ চেয়ে ফিরোজ বসে থাকে। এ সময় যদি নওসিন আসতো তাহলে ভর্তি করা যেত। স্যাররা ওকে আশ্বাস দিল ফিরোজ তোমার সেই ক্যান্ডিডেট নিয়ে এস। কিন্তু ফিরোজ নওসিনের খোজ পায়নি। নওসিন কোন সাবজেক্টে চান্স না পেয়ে স্যারদের সাথে অন্য ভাবে যোগাযোগ করছে।

একদিন ফিরোজ বাংলা সেমিনারে বসে পেপার পড়ছে এমন সময় বাংলার অধ্যাপক শহীদুল­াহ সাহেব একটি আবেদন পত্র নিয়ে টেবিলে গেল স্বাক্ষর করাতে। অন্য মনস্ক ছিল ফিরোজ হঠাৎ স্যারকে দেখে আচমকা উঠে দাড়াতে গেল তখন একটি মেয়ের গায়ের সাথে ধাক্কা লাগল। মেয়েটার নাম নুরুন নাহার নওসিন। ও হতবাক। ও স্তিমিত হয়ে নওসিনের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেক দিনের আশা আকাংখা কল্পনা করে ফেলল। এক সময় ওর এক বন্ধুর ধাক্কায় স্বপ্ন ভঙ্গ হল। দেখে নওসিন তখনো বিভাগের সামনে দাড়িয়ে রয়েছে। ও গিয়ে জিজ্ঞেসা করল। আপনি কি বাংলায় ভর্তি হচ্ছেন? হ্যা সুচক উত্তর আসাতে খুশী হল। সেই সাথে এক পরম আনন্দ একটা উৎফুল­ উল­াস, একটা রোমান্স ওকে স্পর্শ করে গেল।

তখন থেকে ফিরোজ আত্মহারা। কখন নওসিনের দেখা পাবে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে বের হয়, শুধু নওসিনের জন্যই। নওসিন ওর সকল চিন্তা চেতনাকে গ্রাস করে ফেলেছে। ওর গতিপথ রুদ্ধ করে ফেলেছে। ও সারাক্ষন দুপুরের চিন্তায় বিভোর। এ মুহুর্তে ও পকেটের টাকা উড়িয়ে চলছে। কখনো বসে নেই, আর থাকতে পারে না। ক্যাম্পাসে বসে নওসিনকেই শুধু খোজে তারপর ভালমন্দ কুশলাদী জিজ্ঞেস করে। নওসিনের এলাকার মেয়ে শারমিন পাশের ডিপার্টমেন্টে পড়ে। দু’জন খুব ভাল ও অন্তরঙ্গ বন্ধু। নওসিনের চেহারায় চাল-চলন আচার-আচারনে খুব গুনবতী মনে হয়। তাইতো ফিরোজ হারিয়ে গেছে ওর মাঝে। নওসিন একটা সাদা গ্লাসের গগস ব্যবহার করে। তারপর পোশাক পরিচ্ছেদ ব্যবহার করে শরীরের সাথে ম্যাচ করে।

ফিরোজ একদিন নওসিনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে যাহা করে তাহা রাতে এসে আবার ডায়রিতে লিখে রাখে। যে একদিন নওসিনকে এ ডায়রিটা দিবে পড়তে। নওসিনের অজান্তে ফিরোজ ওকে কত ভালবেসে ফেলেছে। ফিরোজ শারমিনের সহিত পরিচিত হয় তারপর শারমিনকে বলে-শারমিন তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। শারমিন বলল-বলুন ভাইয়া। তখন ফিরোজ বলল-আজনা থাক আর একদিন বলব। এভাবে শারমিনকে ফিরোজ কয়েকদিন ঘুরালো। কিভাবে কথা গুলো বলবে যে নওসিনকে ও ভালবাসে। কিভাবে জানবে যে নওসিন অন্য কাউকে ভালবাসেনা বা অন্যকারো সাথে কোন সম্পর্ক আছে কিনা। এই সকল চিন্তায় ফিরোজ অস্থির। ক্যাম্পাসে ফিরোজের শুধু ঐ একটি মুখকেই খোঝে। তারপর ভবুক প্রকৃতির ফিরোজ কখনো হারিয়ে যায। আবার কখনো পৃথিবীতে ফিরে আসে। রাতে সিগারেট ও ট্যাবলেট ছাড়া ঘুম আসে না। সকাল যায় মাথায় দুপুরের চিন্তা সে ঘুম-পড়বে কি করে? তারপর নওসিন, ফিরোজের কথা বার্তা লক্ষণ দেখে বুঝতে পারল ফিরোজ নওসিনকে ভালবাসে, হয়ত কোন ভাবে অফার করবে। তাই এড়িয়ে চলে আবার একটু ভাব ভঙ্গিও দেখায় যাতে করে ফিরোজের আকর্ষন আরো বাড়ে।

সাত পাঁচ অনেক ভাবনার শেষ ফিরোজ ওর এক ঘনিষ্ট বন্ধুকে জানায় ও নওসিনকে পছন্দ করে ভালসাবে। সে কথাগুলো জানাবে। তারপর সম্পর্ক গভীর হবে। ওর বন্ধুটি খুব হ্যান্ডসাম, কথা বার্তায় একেবারে পাকা। আর এই মসজিদ নির্মানে ওস্তাদ ওর জুড়ি নেই। ফিরোজ ওকে বলল-দোস আমি নওসিনের সাথে সম্পর্ক করিতে চাই। তুমি চেষ্টা করো হয়ত আমাদের মাঝে সম্পর্ক গভীর হবে নয়তঃ বর্তমান সম্পর্ক টুকু নষ্ট যেন না হয় সেটা মাথায় রেখ। বর্তমান ওদের সম্পর্ক ভাল ছিল. ক্যাম্পাসে দেখা হত, কথা হত. কুশলাদী বিনিময় হত।

এখানে নওসিনের পরিচয় টুকু একটু জানানো দরকার। নওসিনের বর্তমান বাসা খুলনার বয়রা আবাসিক এলাকায়। ওরা তিন ভাই বোন। ও সকলের বড়। পিতা কামালুদ্দিন নুরু সাহেব একজন তপসিলদার। বয়রায় অফিস। নওসিনকে পিতা মাতা খুব ভালবাসে। আর নুরু সাহেব ছেলে-মেয়েদের খুব ভালবাসে তার নজির তার নামের সাথে যুক্ত সবার নাম। যেমন নওসিন, নেভিয়া, রুনু। নুরুর ‘ন’ সব জায়গায় আছে। নওসিনদের স্থায়ী ঠিকানা কুষ্টিয়া হাউজিং এষ্টেটে। প্রথমে তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পাশে বাড়ী করেন। তারপর ঐ বাড়ী বিক্রি করে কুষ্টিয়া আসেন। বর্তমান কুষ্টিয়ায় কেউ থাকে না। পুরা বাড়ীটা ভাড়ায় চলছে।

ফিরোজের বন্ধু মিজান নওসিনকে খুব কৌশলে ফিরোজের কথাগুলো বলছে। যে নওসিন তোমাকে একটি ছেলে খুব পছন্দ করে। একথা শোনার পর নওসিনের খুব আগ্রহ হরো ছেলেটা কে? কিন্তু মিজান তাহা বলছে না। একে একে কয়েক দিন মিজান নওসিনকে ঘুরালো এবং আগ্রহ বুঝতে পারল। তারপর একদিন বলেই ফেলল নওসিন তোমার সাথে কথা বলবে আমার বন্ধু ফিরোজ। তখন নওসিন বলল বিকেভাই। ফিরোজ ভাইর সাথেতো প্রতিদিন কথা হয়। তবে উনি আমাকে আগে কেন বলেনি? ঠিক আছে আমি উনার সাথে সরাসরী কথা বলতে চাই। ফিরোজ মিজানের মুখে সব কথা শুনতে পেল। আর নওসিনের এ কথায় স্বপ্ন ছাড়া আর কি? নওসিনের চাল চলনে ও কথা বার্তায় একশ পার্সেন্ট আশ্বাস পাওয়া যায়।

ফিরোজ সারারাত জেগে ডায়রি লিখতে লাগল। এবার হয়ত মনের মানুষ পেয়েই গেল। পেয়ে গেল তার সুখ দুঃখের কথা জানাবার মত কাউকে। সারাক্ষণ আনন্দে উৎফুল­ মনে ছুটে গেল। সময় ওর কাছে অতিবাহিত হতে চাচ্ছেনা। কথা বলার দিন তার সামনে আসছে না। হয়ত এ সময় ঘড়ির কাটাগুলো ধীরে ধীরে চলছে। তখন রাত দিন চব্বিশ ঘন্টার জায়গায় বাহাত্তর ঘন্টা মনে হচ্ছে ওর। ও যেখানে যায় সেখানেই নওসিনকে দেখতে পায়। বড় বৃক্ষের দিকে তাকালে নওসিনকে দেখতে পায়। রেডিওতে নওসিনের কথা, টিভিতে নওসিন নামের চরিত্র, নওসিনের প্রতিচছবি। ক্লাসের সকল মেয়েকে মনে হয় নওসিন। দেয়ালের পোষ্টারে নওসিনের ছবি লাগানো। এক কথায় ফিরোজের হৃদয়ে হাতে, চোখে, মুখে সব জায়গা শুধু নওসিন, নওসিন নামের জপ করছে। ওর পৃথিবীতে নওসিন ছাড়া আর কেউ নেই এখন।

আগামি কাল বুধবার। রাতে ঘুমাতে পারলই না। সারারাত জেগে রইল। সিগারেট ও ট্যাবলেটে কাজ হল না। রাত মোটে শেষ হয় না। হয়ত বিধাতা এ রাতটা ইচ্ছে করেই বড় করেছে। ভোর রাতে ফজরের নামাজের আজানের ধ্বনী শোনা মাত্রই বিছানা ছেড়ে দিয়ে ওজু করে নামাজ পড়তে মসজিদে গেল। নামাজান্ত কোরান তেলাওয়াত করল। ক্যাম্পাসে যাবে পোশাক পরছে। কিন্তু আজ ওর কোন পোশাকে মন ভোরছেনা। একে একে সবগুলো পরল আয়নার সামনে দাড়াল আর খুলে ফেলে দিল। রুমমেট বন্ধুরা ফিরোজের কান্ড দেখে বললো প্যান্টের সহিত সাদা শার্ট পরতে। পায়ে কালো জুতা পরে নাস্তা না খেয়ে চলে গেল বাংলা সেমিনারে। আজ ওর পেটে খিদে নেই। তাই নাস্তা খাওয়া প্রশ্নই আসে না। কি সেমিনারে অধির আগ্রহে বসে থাকে। কখন নওসিন আসবে, কখন আসবে, কখন আসবে!

কখন দেখা দিবে সেই পাখিটির রাঙা পা, কমল কালো আখি, তরমুজের ফালির মত লাল ঠোট। কিন্তু কই আসেনাতো। কথা ছিল জাষ্ট এগারটার সময় সেমিনারে আসবে। এগারটাতো বাজতে চলছে বারবার ঘড়ি দেখছে ফিরোজ। হঠাৎ ফিরোজের চোখ কপালে গেল। এসে গেল পাখিটি। স্যালোয়ার কামিজের বদলে আজ নীল শাড়ী, নীল রংয়ের ব্লাউজ, নীল শায়লা চুলের খোপায় রজনীগন্ধা ফুল, হাতে ব্যানেটি ব্যাগ। আজ কিনতু কোন খাতা নেই ক্লাস করবে না বলে আনে নি। সাথে ছোট বোন নেভিয়াসহ সেই বান্ধবী শারমিন। ঘড়ির সেকেন্ড ও মিনিটের কাটা ঘুরে ১২টার উপরে এল আর ঘন্টার কাটা ১১টা। অত্রএব সিনেমা-নাটকের ষ্টাইল। প্রতিদিন ফিরোজ নওসিনের কাছে প্রথমে আসত কথা বলত। আজ নওসিন সেমিনারে প্রবেশ করে প্রথমে ফিরোজের সাথে কথা বলল। তারপর ছোটবোনকে পরিচয় করে দিল। ফিরোজ চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসে রইল। ওরা সেমিনারে বসে কানাঘুষি কানাঘুষি করতে লাগল। বার বার বান্ধবীদের ও নিভেয়াকে আংগুলি ঈশারা করে দেখাতে লাগল। এতে করে ফিরোজের স্বপ্ন দেখা সার্থক হচ্ছে। কিছুক্ষন পর ফিরোজ নওসিনকে ডেকে কথা বলছে। ফিরোজ বলে চলল সব কথা-দেখ নওসিন, আমার ক্যাম্পাসে কোন কাজ নেই, আমি শুধু তোমার জন্য তোমাকে একবার দেখার জন্য প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আসি। যেদিন থেকে তোমার ছবি আমি ভর্তি ফরম এ দেখেছি, সেদিন থেকে তোমার মাঝে আমি হারিয়ে গিয়েছি। খুজেছি তোমাকে অনেক। তারপর খুজতে খুজতে আজ তোমার আমার সম্পর্ক এ পর্যন্ত। আমি মনের অজান্তে তোমাকো ভালবেসে ফেলেছি। তোমার কাছ থেকে আর ফিরতে পারব না। প্লিজ তুমি আমাকে গ্রহন কর। নওসিন শুধু কথাগুলো শুনেই গেল।

আজ নওসিনকে মনে হচ্ছিল হলিউডের সিনেমার নায়িকা। গায়ের রংয়ের সাথে ম্যাচ করে পরেছে। কানে নীল রংয়ের দুল। গলার তিন চারটে স্বর্নের চেইন। হাতে নীল ও লাল রংয়ের কাচের চুড়ী। হাটা চলার ভঙ্গিতে মডেলিং কন্যা মৌ হার মানছে আজ। আজ নওসিনের রুপের বর্ণনায় এ কথায় বলা যায়, অপরুপ সুন্দরী মনে হচ্ছে। যারে সুন্দরী সুন্দরী। যার পরে নেই সুন্দরী।

নওসিন ফিরোজের সব কথা শুনে শুধু একটি কথা বলে উঠে যাচ্ছে ফিরোজ ভাইয়া আপনাকে পরে জানাবো। আজ আমি আসি। নওসিন ওর এক বন্ধু এ্যানির সাথে বাইরে চলে গেল। ফিরোজ ভাবল হয়ত নওসিন লজ্জা পাচ্ছে তাই আজ রায় না দিয়ে চলে গেল, যাক। সব দিক বিবেচনা করে দেখুক। তারপর কথা দিক। ফিরোজ রুমে আসলে রুমমেট ও বন্ধুরা ওকে ধরল এই রিজাল্ট কি? কোন কথাই বলল না। ওর কিছু কিছু বন্ধু ভাবল রায় ফেভারে আর কিছু বন্ধুর মন্তব্য রায় ফেল। এ রকম সাত পাচ ভাবতে ভাবতে কত রাত কেটে গেল। নওসিন ফিরোজরে কয়েক দিন ধরে ঘুরাতে লাগল। আজ বলব কাল বলব। কিন্তু কিছুই বলে না। পরে ক্যাম্পাসে নওসিন এল। ফিরোজ নওসিনের কাছে দিয়ে জিজ্ঞেস করছে। নওসিন আজও রিজাল্টাতো দিলে না। নওসিন আজ একটি কথার উত্তর কলর ভাইয়া প্লিজ আমাকে ক্ষমা করুন। আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ফিরোজের কাছে কথাটা বর্জ্যরে সেলের মত মনে হল। তবু নওসিনকে শুধু এটুকু বলে এল নওসিন আমার আর কিছুই বলার নেই। তুমি সুখে থাক। এই কথাটি সেদিন কিংবা এর আগে বলা উচিৎ ছিল। ফিরোজকে চলে আসতে দেখে নওসিনের বন্ধু এ্যানি মনে মনে অনেক খারাপ চিন্তা করলো ভাবলো ফিরোজ কোন ঝামেলা করতে পারে। তাই ফিরোজের অনুসারী রাজনৈতিক দলীর কলেজ শাখার প্রেসিডেন্টসহ কয়েকজন নেতাদের কাছে নালিশ করে। এই বলে যে, ফিরোজ আমার বোনকে ডিষ্টার্ব করে। দলীয় নেতারা ফিরোজকে এ বিষয় নিয়ে অপমান করল সকলের সামনে। এতে করে তার সম্মান ক্ষুন্ন হল।

ফিরোজ রাগান্বিত হল। এই ভেবে যে সে তাকে প্রেম করার প্রস্তাব দিয়েছে, এতে কি অপরাধ হয়েছে? নওসিন এমন কাজটি করল সকলের সামনে তাকে এভাবে অপমান করল। পরদিন নওসিন ক্যাম্পাসে এলে ফিরোজ নওসিনের কাছে সব জানতে চাইল। নওসিন বলে সে কিছুই জানে না। ফিরোজ রাগান্বিত হয়ে আরো অনেক কিছু বলে ফেলল। নওসিন নিজেকে অসহায় মনে করে আরো কয়েকজন বড় ভাইয়ের সহায়তা নিয়ে বাড়ী চলে গেল। সিদ্ধান্ত নিল ও আর এ কলেজে পড়বে না। এ সংবাদ শুনে ফিরোজ নিজেকে বড় দোষী মনে করল। সে নওসিনকে ভালবাসে। হয়ত তার জন্য তার ভালবাসা তার প্রেম স্বপ্ন আজ এ কলেজে পড়বেনা তা হতে পারে না। যেভাবে হোক নওসিনকে আবার এ কলেজে আনতে হবে। প্রয়োজনে নওসিনের কাছে মাফ চাইবে। যদিও এ ব্যাপারে ফিরোজের কোন দোষ ছিল না। তবুও দোষী মনে করছে নিজেকে। নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না মোটেও।

বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হল ফিরোজ এ কলেজে পড়বে না মনস্থির করল। এ সংবাদ নওসিনের কাছে পাঠাল ফিরোজ আর কোন দিন নওসিনের পথের কাটা হতে আসবে না। নওসিনের ক্ষতি হবে এমন কোন কাজ ফিরোজ কখনো করবে না। এমনকি কাউকে করতেও দিবে না। হঠাৎ সংবাদ এল নওসিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে ফিরোজ এ সংবাদে মহাখুশী হল। আল­াহর কাছে দোয়া করল, নওসিন যেন সুখী হয়। ভাল করে পড়াশুনা করে, একদিন অনেক বড় হতে পারে। কিন্তু নওসিন সেখানে ভর্তি না হয়ে ফিরে এল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার ঘটনাও সম্পূর্ণ গুজব। ফিরোজ রাগন্বিত ও কষ্ট পাইল মনে।

কয়েকদিন পর এ্যানির সাথে নওসিনকে দেখল এক রিক্সায় যেতে। ফিরোজ ভাবল হয়ত এ্যানির সাথে নওসিনের সম্পর্ক হয়ে গেছে। দুজন দুজনাকে ভালবেসে ফেলেছে। এদের মাঝে আর কথা হওয়া উচিত নয়। হলে নওসিনের ক্ষতি হবে। ভাবতে ভাবতে সংবাদ এল নওসিন হাসপাতালে। সংবাদ শুনে রাতে ঘুমাতে পারল না, পরদিন সকালে ছুটে গেল হাসপাতালে। যেয়ে দেখে ও হাসপাতালে নেই অপারেশন শেষে নওসিনকে বাসায় নিয়ে গেছ। কর্তব্যরত ক্লিনিকের ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করল নওসিনের কি হয়েছে? উত্তরে সে বলল ব্রেষ্ট টিউমার। আজ কালকের মেয়ে বিয়ে সাদী এখনো হয়নি তাদের ব্রেষ্টে টিউমার হয় কি করে? পাশের একজন বলল বেশী হাতাহাতি ছেনাছেনি কচলাকচলি করলে ব্রেস্ট টিউমার হবে নাতো হবে কি?
ফিরোজ শুধু একটি কথাই বলল-আপনার হাসপাতালে চাকরী করা উচিৎ হয়নি। আপনার মত অপদার্থ যে প্রতিষ্ঠানে থাকে সে প্রতিষ্ঠানের কল্যান কখনো সম্ভব নয়। ফিরোজের সারা রক্তকনা ফিনকি দিয়ে উঠছে। মন চায় ছিল এখুনি লম্পটার জিব্বা ঠোট কেটে নি। যাতে আর কারো সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করতে না পারে। রাগে রাগে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। ক্যাম্পাসে কারো সামনে নওসিনের এ সংবাদটা দিল না। সবাই জানতে পারল নওসিনের এ্যাপেন্টিস হয়েছে। তারপর নওসিনকে ভুলতে চেষ্টা করল কিন্তু ক্রমে ভালবাসা আরো বাড়তে লাগল। হাসপাতালে কিনে নিয়ে যাওয়া ১৭০ টাকার হরলিক্স ওটা দেখলে বুঝা যায়। আপেলগুলো অবশ্য বন্ধুরা খেয়ে ফেলল। সাহস হল না বাসায় যাওয়ার। হয়ত বাসায় গেলে নওসিনের কোন প্রকার ক্ষতি হবে ভেবে। আল­াহর কাছে শুধু দোয়া ও কামনা করতে লাগল, যাতে নওসিন তাড়াতাড়ী ভাল হয়ে যায়। নওসিনের এ গোপনীয়তা যেন রক্ষা পায়। ফিরোজ যত ভুলে যেতে চেষ্টা করে ততই চিন্তা বাড়ে ভুলতে পারে না। নওসিনের নাম লিখে লিখে সারা রুম ভোরে ফেলল। নওসিনের ছবি দিয়ে রুম সাজালো।

কয়েক দিন পর নওসিন ক্যাম্পাসে এল এক তোড়া রজনী গন্ধা ফুল নিয়ে। ফিরোজ দুরে দাড়িয়ে দেখতে লাগল। নওসিন ছেলেদের হোস্টেল এ্যানির রুমে চলে গেলে। তারপর এ্যানিকে সাথে নিয়ে ফিরোজের হোষ্টেলের সামনে দাড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প ও হাসাহাসী করল। ফিরোজের বন্ধুরা আজ নওসিনকে ধরে নিয়ে আসবে হোষ্টেলে। তাদের কথা হচ্ছে নওসিন যদি ক্যাম্পাসে কোন ছেলের সাথে মিশে বা কথা বলে তাহলে ফিরোজের সাথে বলতে হবে। তানা হলে কাহারো সাথে কথা বলা ও ঘুরতে পারবে না। ফিরোজ এসে ওর বন্ধুর হাত পা ধরে সামলিয়ে নিল। আজ যদি নওসিনের সাথে ওরা কোন খারাপ ব্যবহার করে তাহলে ফিরোজের বদনাম হয়ে যাবে।

সেমিনারে নির্বাচন হলো সবার ভোটে ফিরোজ বাংলা সেমিনারের নির্বাচিত প্রতিনিধি হলো। ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষ্যে দায়িত্বশীল সেক্রেটারী। আরেকজন ছাত্র এ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারী হলো। আর সভাপতি হলেন বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর, সহ-সভাপতি হলেন আরেকজন সহযোগি অধ্যাপক। সেমিনারের ছাত্র-ছাত্রিদের মূখপাত্র এখন ফিরোজ। ছাত্র-ছাত্রীদের যে কোন সমস্যার জন্য ফিরোজেরই সমাধান দিতে হয়। এখন সেমিনারে বিরাট পজিশন, সকলে ওকে ভাই ছাড়া ডাকে না। কিন্তু নওসিন সেমিনারে এলে ওর ভিষন খারাপ লাগে। নিজেকে সামলিয়ে নিতে পারে না। যেভাবে হোক নওসিনের সাথে আবার কথা বলতে হবে। সেমিনারে নওসিনকে ডেকে যাবতীয় কুশলাদী জানতে চাইল। নওসিন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে সব বলল। ফিরোজ বলছে-দেখ নওসিন, আমার অন্তরে তুমি আছ, তুমি থাকবে চিরদিন। তোমার কাছে আমি ভালবাসা চাই না, তুমি শুধু আমাকে একটু ভাল দৃষ্টি দাও। একটু ভাল কথা শুনাও, তাতে আমি সুখী হব। তোমার এই সেমিনারে যা কিছু দরকার হয়, বই, নোট পত্র যাবতীয় আমাকে বললে পাবে। এতেও নওসিন কোন রায় দিল না। ভাল ব্যবহার করল না। তারপর ফিরোজ উপজাযক হয়ে বই ও সাজেশন পাঠাল পড়াশুনা করার জন্য। তা নিল। তবে ফিরোজ খুশীর চেয়ে কষ্ট পাইল বেশী। কারন নওসিন এমন এমন কথা বলল যা ফিরোজের হৃদয়ে স্টেনগানের গুলির মত বিধল। নওসিন এ্যানির হাত ধরে সারা ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায়, নদীর কুলে আড্ডা দেয়। আর বলে ওকে জ্বালিয়ে শেষ করে ফেলব। কেন একথা বলে ফিরোজ জানে না। ফিরোজ আর একদিন নওসিনকে ডেকে বলে- নওসিন আমি ভাল হতে চাই। তুমি আমাকে ভাল করে দাও। হয়ত আমাকে ভাল কর নয়ত আমাকে এই রিভাল বারের একটি গুলি দিয়ে আমাকে শেষ করে দাও। আমি যে তোমাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে আর কিছু ভাবতে পারছিনা। আজ তোমার হাতে জীবন। তোমার হাতে আমার মরন। তুমি বললে আমি সেমিনারের প্রতিনিধিত্ব করব। আর তুমি বললে ছেড়ে দিব। তোমার জন্য আমি সব কিছু করব যা তুমি মুখে বলবে। প্লিজ নওসিন আমি ভাল হতে চাই। আমাকে ভাল কর।

নওসিন এত কথা শুনে শুধু এটুকুই বলে গেল আপনার সাথে আমার কোন কথা আছে জানা নেই। আপনার সাথে কোন কথা বলব না। কোন কথা থাকতে পারে না। ফিরোজ বিরাট আশা নিয়ে নওসিনের কাছে গিয়েছিল, ভাল হতে চেয়েছিল। কিন্তু নওসিন খালি হাতে ফিরিয়ে দিল। আবারও ওকে অপমান করল। ফিরোজ আর সেমিনারে যায় না। ওর কিছু ভাল লাগেনা কিভাবে যাবে সেমিনারে? কিভাবে সবার সামনে মুখ দেখাবে? সেমিনারের সতেরোশো ছাত্র/ছাত্রী সাবই জেনে গেছে ফিরোজ নওসিনের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত ও অপমানিত হয়েছে।

ফিরোজ নিজে থেকে সেমিনারের প্রতিনিধিত্ব ছেড়ে দিল। সারাক্ষন রুমে বসে থাকে সিগারেটর পর সিগারেট ধুয়া টেনে টেনে সময় কাটায়। নওসিনের বন্ধু এ্যানি পিতামাতহীন, একটা জটিল অসুখে ভোগা রুগী । এ্যানি খালার সাহায্যে এ পর্যন্ত এসেছে। ফিরোজ এ সংবাদ পাইল যে এ্যানি বড় অসহায়। তার একটা টিউশানী বড় দরকার। অনেককে বলেছে পাচ্ছেনা। হোষ্টেলের ডাইনিং এ অনেক টাকা বাকি পড়েছে। বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে যে টাকা ধার নেয় তা পরিশোধ করতে পারেনা বলে বন্ধুরা এখন আর টাকা পয়সা ধার দেয় না। ফিরোজ এসব কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিল ওর মোটা অংকের টাকার টিউশানীটা এ্যানিকে দিয়ে দিবে। এ্যানি ভাল ভাবে চললে নওসিন খুশী হবে। আর নওসিনের মুখে হাসি দেখলে বড় শান্তী লাগবে ফিরোজের। সামনে গিয়ে হাসিটা না দেখতে পারলেও দুর থেকে সুখ অনুভব করিতে পারবে। যে ভাবনা সেই কাজ এ্যানিকে টিউশান বাড়ীতে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিল। ফিরোজের অপর যে টিউশানীটা ছিল পরের মাসে সেটিও চলে গেল। চলতে বেশ সমস্যা হতে লাগলো। ওদিকে সেমিনারের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় রাজনৈতিক দল থেকে তার উপর চাপ আসতে লাগলো। তাদের দলীয় প্রভাবটা সেমিনার থেকে হাত ছাড়া হলো। দলীয় ভাবে হুমকি দেওয়া হলো। ফিরোজের তখন হোস্টেলের সিট ও ক্যাম্পাস ছেড়ে দিতে হলো। কারণ হোস্টেলের সীট হয় দলীয় ভাবে। ও চলে গেল বাড়ীতে ভাবলো বাড়ী থেকেই একটু কষ্ট করে হলেও এসে পরীক্ষা দেবে। বাড়ী গিয়ে দরিদ্র পিতার সংসারে চলতে আরো কষ্ট হতে লাগলো। সময় মতো খাওয়া হচ্ছিল না। তারপর রাতে ঘুমাতে পারেনা একের পর এক বিড়ি খেতে লাগলো। দেখা গেছে এক রাতে দু প্যাকেট বিড়িও খেয়ে ফেলেছে। সারা রাত জেগে থেকে ফিরোজ এমন কাজ করছে মা বাবা সেটা বুজতে পারেনি। তারা ভাবে ফিরোজ লেখা পড়া করছে। এভাবে রাতের পর রাত চলতে চলতে শরীর ভেঙ্গে পড়লো। সাথে কাঁশি জ্বর উঠলো গায়ে। সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকে সহজ সরল গ্রামের মানুষ বাবা-মা ওর অবস্থা এতো খারাপ বুঝতে পারেনা। ভাবে অনার্সের পড়া সামনে পরীক্ষা একটু বেশিই পড়তে হবে। কিন্তু না, সকল ভাবনার অবসান দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো ফিরোজ। কাঁশির সাথে গলা দিয়ে রক্ত পড়তে লাগলো। গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে নিতে একেবারে কঙ্কালসার হয়ে যায়। এক পর্যায়ে খুলনা সদর হাসপাতালে যায় চিকিৎসা নিতে তখন আর সময় শেষ। হাসপাতালে সীট না পেয়ে ফ্লোরে থাকতে হয় দুদিন। শরীরের খারাপ অবস্থা দেখে সীট মিললেও প্রাণপাখি আর ঘরে রইলো না, উড়ে গেল আকাশে। অনেক আশা প্রত্যাশা ছিল ফিরোজকে ঘিরে। ফিরোজের মাথা বুকে নিয়ে দুখীনি মা অঝোর ঝরে চোখের পানি ঝরিয়ে চলছে।

**********

সর্বশেষ - গরু পালন

আপনার জন্য নির্বাচিত