RRP
agriculture news
Health Care
Open
diamond egg
renata-ltd.com
fishtech
Ad3
Spech for Promotion
avonah
Wednesday , 29 July 2026 |
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি

১৬ বছরেও রপ্তানিমুখী হয়নি ডেইরি ও গো-সম্পদ খাত: সুযোগ ছিল, সমন্বিত উদ্যোগ ছিল না

প্রতিবেদক
Md. Bayezid Moral
July 28, 2026 9:15 pm

১৬ বছরেও রপ্তানিমুখী হয়নি ডেইরি ও গো-সম্পদ খাত: সুযোগ ছিল, সমন্বিত উদ্যোগ ছিল না।।

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণায় যা যা উঠে এসেছে…

ড. বায়েজিদ মোড়ল
AgricultureNews24.com-এর জন্য গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন
।।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। এই দীর্ঘ সময়ে সড়ক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও ডেইরি ও গো-সম্পদ খাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ, আধুনিক, রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তরের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি।

সরকারি পরিসংখ্যানে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কার্যক্রম, কৃত্রিম প্রজনন, টিকাদান, খামারি প্রশিক্ষণ, কিছু উন্নয়ন প্রকল্প এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ফলে দেশে গবাদিপশুর উৎপাদন অবশ্যই বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদনের মোট পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেই একটি খাতের কাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হয় না। প্রশ্ন হলো—প্রতি গাভীর উৎপাদনশীলতা কতটা বেড়েছে, উৎপাদন খরচ কতটা কমেছে, খামারি ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন কি না, দেশে মানসম্পন্ন বীজ ও জাত উন্নয়ন হয়েছে কি না, দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা কতটা বিস্তৃত হয়েছে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে দুধ, মাংস বা প্রক্রিয়াজাত প্রাণিজ পণ্য রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করেছে কি না।

জাতীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নীতি-২০০৭-এ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্য সংযোজন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং প্রাণিসম্পদজাত পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ১৬ বছরে নীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি অথবা বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে—দীর্ঘমেয়াদি জাত উন্নয়ন, সাশ্রয়ী গো-খাদ্য, রোগমুক্ত অঞ্চল, দুধের ন্যায্যমূল্য, আধুনিক হ্যাচারি ও বুল স্টেশন, খামার নিবন্ধন, পশু শনাক্তকরণ, গবেষণা, বীমা, শীতলীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি সনদব্যবস্থা একযোগে গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশ শুধু দুধ ও মাংসে টেকসই স্বয়ংসম্পূর্ণতাই অর্জন করত না, বরং আঞ্চলিক বাজারে রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও জায়গা করে নিতে পারত।

১. একটি সুস্পষ্ট জাতীয় ডেইরি ও বিফ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়নি

বাংলাদেশের ডেইরি ও গো-সম্পদ খাত দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পনির্ভরভাবে পরিচালিত হয়েছে। কোনো প্রকল্প পাঁচ বছর চলেছে, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও কৃত্রিম প্রজনন, কোথাও প্রশিক্ষণ, কোথাও প্রদর্শনী খামার এবং কোথাও বাজার সংযোগ নিয়ে কাজ হয়েছে। কিন্তু জাত উন্নয়ন থেকে শুরু করে খাদ্য, স্বাস্থ্য, উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে এক ছাতার নিচে আনার জন্য ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদি বাধ্যতামূলক জাতীয় মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর করা হয়নি।

একটি কার্যকর মাস্টারপ্ল্যানে জেলাভিত্তিক গবাদিপশুর জাত, জলবায়ু, খাদ্যের প্রাপ্যতা, দুধ ও মাংসের বাজার, রোগের প্রকোপ এবং খামারের ঘনত্ব বিবেচনায় আলাদা উৎপাদন অঞ্চল নির্ধারণ করা প্রয়োজন ছিল। যেমন—

  • সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরকে নিবিড় ডেইরি অঞ্চল;
  • উত্তরাঞ্চলকে গো-মোটাতাজাকরণ ও ফিড উৎপাদন অঞ্চল;
  • উপকূলীয় অঞ্চলকে মহিষ ও লবণাক্ততা-সহনশীল পশু উৎপাদন অঞ্চল;
  • পাহাড়ি অঞ্চলকে ছাগল, ভেড়া ও বিশেষায়িত গবাদিপশু অঞ্চল;
  • বড় শহরের কাছাকাছি এলাকায় দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কোল্ড-চেইন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা যেত।

এ ধরনের অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা না থাকায় একই জাতের সিমেন সব এলাকায় ব্যবহার, অপরিকল্পিত সংকরায়ণ, খাদ্যসংকট, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং অঞ্চলভেদে উৎপাদন বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।

২. দেশীয় গরুর জাত সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি

বাংলাদেশে রেড চিটাগাং ক্যাটল, পাবনা ক্যাটল, নর্থ বেঙ্গল গ্রে, মুন্সীগঞ্জের ধবল গরু এবং বিভিন্ন স্থানীয় অভিযোজিত গবাদিপশুর জিনগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব জাত দেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, রোগব্যাধি, নিম্নমানের খাদ্য এবং গ্রামীণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অভিযোজিত।

কিন্তু এসব জাতকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত, নিবন্ধন, সংরক্ষণ এবং নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে উন্নত করার জন্য জাতীয় পর্যায়ে বড় আকারের কার্যকর কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। কিছু গবেষণা ও সীমিত সংরক্ষণ কার্যক্রম থাকলেও তা মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারেনি।

দেশীয় জাতের মধ্যে যেসব গাভী তুলনামূলক বেশি দুধ দেয়, যেসব ষাঁড়ের বংশধর দ্রুত বাড়ে, যেসব পশু রোগসহনশীল এবং কম খাদ্যে ভালো উৎপাদন দেয়—সেগুলোকে জিনোমিক ও পারফরম্যান্স পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচন করা প্রয়োজন ছিল।

এর পরিবর্তে অনেক এলাকায় বংশপরিচয়, মায়ের দুধ উৎপাদনের রেকর্ড অথবা ষাঁড়ের জেনেটিক মান যাচাই না করেই কৃত্রিম প্রজনন করা হয়েছে। এর ফলে জাত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়নি।

৩. বিদেশি উন্নত জাত আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি ছিল না

বাংলাদেশে হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান, জার্সি, সাহিওয়াল ও সিন্ধি জাতের রক্ত ব্যবহার করা হয়েছে। মাংস উৎপাদনের জন্য ব্রাহমা জাতের ব্যবহার নিয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; পরে বিভিন্ন কারণে তা সীমিত বা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় গবেষণাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি জাত উন্নয়ন পরিকল্পনার বদলে প্রশাসনিক নির্দেশ, বিতর্ক বা সাময়িক প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

বাংলাদেশে সরাসরি কোনো বিদেশি জাত নির্বিচারে ছড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তবে পরীক্ষামূলক নিউক্লিয়াস হার্ড, নিয়ন্ত্রিত খামার এবং অঞ্চলভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন জাতের উপযোগিতা যাচাই করা যেত। যেমন—

  • সিমেন্টাল বা ফ্লেকভিহ: দুধ ও মাংস—দুই উদ্দেশ্যে;
  • অ্যাঙ্গাস: উন্নত মানের মাংস উৎপাদনে;
  • চিয়ানিনা: দ্রুত বৃদ্ধি ও বড় দেহের জন্য;
  • বেলজিয়ান ব্লু: বিশেষায়িত মাংস উৎপাদনে, যদিও প্রসব জটিলতা ও ব্যবস্থাপনা ঝুঁকি বিবেচনা জরুরি;
  • নেলোর বা নেলোরি: গরম আবহাওয়া সহ্যক্ষমতা ও মাংস উৎপাদনে;
  • ব্রাউন সুইস: দুধের কঠিন পদার্থ ও সহনশীলতার জন্য;
  • গির, রেড সিন্ধি ও উন্নত সাহিওয়াল: উষ্ণ অঞ্চলের দুধ উৎপাদনে।

প্রতিটি জাতের জন্য কমপক্ষে কয়েক প্রজন্মের উৎপাদন, প্রজনন, রোগসহনশীলতা, খাদ্য রূপান্তর এবং অর্থনৈতিক ফলাফল পরীক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে একটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ “জাত মূল্যায়ন কাঠামো” তৈরি হয়নি।

ফলে খামারিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত প্রচারণা বা অনিয়ন্ত্রিত উৎস থেকে জাত সম্পর্কে ধারণা নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন। রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

৪. ষাঁড় নির্বাচন, প্রজেনি টেস্টিং ও জিনোমিক মূল্যায়ন দুর্বল ছিল

উন্নত ডেইরি শিল্পের মূল ভিত্তি হলো উন্নত মানের ষাঁড় নির্বাচন। একটি ষাঁড় হাজার হাজার বাছুরের জিনগত গুণমানকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শুধু বাহ্যিক গঠন দেখে ষাঁড় নির্বাচন যথেষ্ট নয়। তার মা, বোন ও কন্যাদের দুধ উৎপাদন, ফ্যাট, প্রোটিন, রোগ প্রতিরোধ, প্রজনন সক্ষমতা এবং আয়ুষ্কাল বিশ্লেষণ করতে হয়।

বাংলাদেশে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রজেনি টেস্টিং, জিনোমিক সিলেকশন, ব্রিডিং ভ্যালু প্রকাশ এবং প্রতিটি সিমেনের নির্ভরযোগ্য বংশপরিচয় খামারিদের সামনে উন্মুক্ত করার সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়নি।

প্রতিটি সিমেন স্ট্রতে কিউআর কোড দিয়ে ষাঁড়ের—

  • জন্মতারিখ;
  • জাত ও রক্তের অনুপাত;
  • মা ও দাদির দুধ উৎপাদন;
  • কন্যাদের গড় উৎপাদন;
  • জেনেটিক রোগের অবস্থা;
  • কনসেপশন রেট;
  • প্রত্যাশিত বাছুরের বৈশিষ্ট্য—

প্রকাশ করা যেত।

এতে খামারি নিজের গাভীর গঠন, উৎপাদন ও দুর্বলতার ভিত্তিতে উপযুক্ত ষাঁড় নির্বাচন করতে পারতেন। এ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় প্রজনন, দুর্বল পা, ছোট পেলভিস, কম উর্বরতা, ওলানের সমস্যা ও স্বল্প উৎপাদনশীল বাছুর জন্মেছে।

৫. জাতীয় পশু পরিচয় ও ডিজিটাল বংশতালিকা তৈরি করা হয়নি

দেশের প্রতিটি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার জন্য ইউনিক ডিজিটাল আইডি চালু করা প্রয়োজন ছিল। কানের ট্যাগ, ইলেকট্রনিক চিপ অথবা মুখ ও নাকের ছাপভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পশুর জন্ম, মালিকানা, টিকা, রোগ, চিকিৎসা, প্রজনন, দুধ উৎপাদন এবং বিক্রির তথ্য সংরক্ষণ করা যেত।

বাংলাদেশে গবাদিপশু শনাক্তকরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নাকের ছাপ ব্যবহারের গবেষণায় প্রায় ৯৬ শতাংশের বেশি শনাক্তকরণ নির্ভুলতা পাওয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের প্রযুক্তি পশুবীমা, রোগ নজরদারি ও খামার ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানো সম্ভব।

কিন্তু ১৬ বছরে একটি সর্বজনীন জাতীয় লাইভস্টক ডেটাবেজ গড়ে ওঠেনি। ফলে—

  • দেশে প্রকৃত গাভীর সংখ্যা জানা কঠিন;
  • কোন পশু কতবার টিকা পেয়েছে তা নিশ্চিত করা যায় না;
  • একই পশুর বিপরীতে একাধিক ঋণ বা বীমার ঝুঁকি থাকে;
  • রোগ ছড়ালে উৎস শনাক্ত করা যায় না;
  • ভালো উৎপাদনশীল পশুর বংশ সংরক্ষণ হয় না;
  • আমদানি, পরিবহন ও জবাইয়ের তথ্য অনুসরণ করা যায় না।

একটি ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা ছাড়া উন্নত দেশে মাংস, দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানি প্রায় অসম্ভব।

৬. গো-খাদ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কৌশল নেওয়া হয়নি

বাংলাদেশের ডেইরি ও গো-মাংস উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বাধা হলো খাদ্যের উচ্চমূল্য। অনেক খামারে মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়। ভুট্টা, গমের ভুসি, সয়াবিন মিল, খৈল, চালের কুঁড়া, মোলাসেস, খনিজ ও ভিটামিনের দাম বাড়লে দুধ ও মাংসের উৎপাদন খরচ সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায়।

দীর্ঘ ১৬ বছরে গো-খাদ্যকে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে পর্যাপ্ত সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। প্রয়োজন ছিল—

১. পতিত সরকারি জমিতে ঘাস উৎপাদন;
২. নদীর চর ও সড়ক-মহাসড়কের পাশে পরিকল্পিত পশুখাদ্য চাষ;
৩. ভুট্টা ও সয়াবিনের উৎপাদন অঞ্চল সম্প্রসারণ;
৪. কৃষিপণ্যের উপজাত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ;
৫. সাইলেজ, হে ও টোটাল মিক্সড রেশন উৎপাদন কেন্দ্র;
৬. জেলা পর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষাগার;
৭. ফিড উপাদানের আমদানিতে স্থিতিশীল শুল্কনীতি;
৮. খামারিদের জন্য ফিড ক্রয় সমবায়;
৯. ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।

দেশে বর্ষাকালে প্রচুর ঘাস উৎপাদিত হলেও শুষ্ক মৌসুমে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। প্রতিটি উপজেলায় সাইলেজ ব্যাংক ও পশুখাদ্য সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা গেলে মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।

৭. উন্নত ঘাস ও ফডার বীজের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি হয়নি

খামারিরা নেপিয়ার, পাকচং, জারা, জার্মান, প্যারা, ভুট্টা, আলফালফা এবং বিভিন্ন লেগুমজাতীয় ঘাস চাষ করেন। কিন্তু উন্নত ও রোগমুক্ত কাটিং বা বীজের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থা দুর্বল।

অনেক নার্সারি বা বিক্রেতা অতিরঞ্জিত উৎপাদনের দাবি করে কাটিং বিক্রি করেন। কোনো কোনো ঘাস দ্রুত বাড়লেও পুষ্টিমান কম, কোনোটি বেশি পানির প্রয়োজন করে, আবার কোনোটি নির্দিষ্ট মাটিতে ভালো হয় না।

সরকার প্রতিটি কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলের জন্য উপযোগী ঘাসের তালিকা, পুষ্টিমান, ফলন, পানি প্রয়োজন, কাটার বয়স এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি প্রকাশ করতে পারত। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে প্রত্যয়িত ফডার সিড কোম্পানি এবং ঘাসের মাতৃবাগান তৈরি করা প্রয়োজন ছিল।

৮. দুধের ন্যায্যমূল্য ও উৎপাদন খরচভিত্তিক মূল্যনীতি ছিল না

একজন খামারি প্রতিদিন গাভীকে খাদ্য, চিকিৎসা, শ্রম, বিদ্যুৎ ও পানি দেন। কিন্তু দুধ বিক্রির সময় তার দর নির্ধারণ করেন স্থানীয় দুধ ব্যবসায়ী, মিষ্টি প্রস্তুতকারক বা প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান। উৎপাদন খরচ বাড়লেও খামারি সবসময় দুধের দাম বাড়াতে পারেন না।

দুধের মূল্য সাধারণত লিটার হিসেবে নির্ধারিত হয়। অথচ উন্নত দেশে দুধের ফ্যাট, প্রোটিন, সলিড-নট-ফ্যাট, ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা ও অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্টাংশের ভিত্তিতে মূল্য দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে প্রতিটি দুধ সংগ্রহকেন্দ্রে ডিজিটাল মিল্ক অ্যানালাইজার স্থাপন করে গুণগত মানভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ করা যেত। এতে বেশি ফ্যাট ও প্রোটিনযুক্ত দুধ উৎপাদনকারী খামারি বাড়তি দাম পেতেন এবং পানিমিশ্রণ বা ভেজাল কমত।

একই সঙ্গে সরকার ধান, চাল বা জ্বালানির মতো দুধের জন্য সরাসরি প্রশাসনিক মূল্য নির্ধারণ না করেও একটি “রেফারেন্স ফার্মগেট প্রাইস” ঘোষণা করতে পারত। উৎপাদন ব্যয়, যুক্তিসঙ্গত মুনাফা এবং অঞ্চলভিত্তিক পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় এই মূল্য নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন ছিল।

৯. দেশব্যাপী দুধ সংগ্রহ ও কোল্ড-চেইন গড়ে তোলা হয়নি

দুধ দ্রুত নষ্ট হয়। দোহনের পর দ্রুত তাপমাত্রা কমানো না গেলে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পায় এবং দুধের মান নষ্ট হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র খামারি গ্রাম থেকে কাঁচা দুধ বিক্রি করেন। অনেক ক্ষেত্রে সংগ্রহকারী আসতে দেরি করলে অথবা বাজারে চাহিদা কম থাকলে দুধ কম দামে বিক্রি করতে হয়।

প্রতিটি ডেইরি-সমৃদ্ধ ইউনিয়নে সৌরবিদ্যুৎ বা বিদ্যুৎচালিত বাল্ক মিল্ক কুলার স্থাপন করা গেলে দোহনের পরপরই দুধ ঠান্ডা করা সম্ভব হতো। এরপর রেফ্রিজারেটেড ট্যাংকারে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় নেওয়া যেত।

গবেষণায় বাংলাদেশের ডেইরি মূল্যশৃঙ্খলে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, পরিবহন ও মূলধনের অভাবকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও প্রাণিসম্পদ খাতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মান প্রয়োগ, শক্তি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং উৎপাদক ও ভোক্তার সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

কিন্তু দীর্ঘ সময়ে দেশে একটি সর্বজনীন দুধ কোল্ড-চেইন নেটওয়ার্ক তৈরি হয়নি। এর ফলে প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট কয়েকটি মিল্কশেডের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে এবং দেশের বিশাল অংশের খামারি সংগঠিত বাজারে প্রবেশ করতে পারেননি।

১০. গুঁড়া দুধ ও দীর্ঘস্থায়ী দুগ্ধপণ্য উৎপাদনে বড় বিনিয়োগ হয়নি

বাংলাদেশে বর্ষা ও শীতকালে কোনো কোনো অঞ্চলে দুধের সরবরাহ বেড়ে যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত পাউডার প্ল্যান্ট, চিজ কারখানা, আল্ট্রা-হাই টেম্পারেচার দুধ, কনডেন্সড মিল্ক, কেসিন, হুই প্রোটিন ও অন্যান্য মূল্যসংযোজিত পণ্যের উৎপাদন সীমিত।

ফলে অতিরিক্ত দুধের সময় খামারিরা কম দাম পান, আবার ঘাটতির সময় দেশকে গুঁড়া দুধ আমদানি করতে হয়। দুধের বাজারে এই মৌসুমি বৈপরীত্য দূর করার জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে আঞ্চলিক মিল্ক পাউডার প্ল্যান্ট তৈরি করা প্রয়োজন ছিল।

বাংলাদেশে দেশীয় দুধের সরবরাহ ও শিল্পের চাহিদার ভারসাম্যহীনতার কারণে বিদেশি গুঁড়া দুধের ওপর নির্ভরতা বজায় আছে।

সরকার স্থানীয় দুধ দিয়ে পাউডার ও শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদের ঋণ, করছাড় এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কসুবিধা দিতে পারত। একই সঙ্গে পাউডার প্ল্যান্টকে স্থানীয় খামারি থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ দুধ কেনার শর্ত দেওয়া যেত।

১১. স্কুল মিল্ক কর্মসূচিকে জাতীয় পর্যায়ে নেওয়া হয়নি

দেশে উৎপাদিত দুধের স্থায়ী বাজার তৈরির সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হতে পারত জাতীয় স্কুল মিল্ক কর্মসূচি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে পাঁচ দিন নিরাপদ পাস্তুরিত বা ইউএইচটি দুধ দেওয়া হলে—

  • শিশুদের পুষ্টি উন্নত হতো;
  • দুধের নিশ্চিত চাহিদা তৈরি হতো;
  • ক্ষুদ্র খামারির বাজার স্থিতিশীল থাকত;
  • স্থানীয় প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারিত হতো;
  • গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো।

কিছু সীমিত প্রকল্প বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম থাকলেও এটিকে সর্বজনীন জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া হয়নি। অথচ সরকারি বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সেনাবাহিনী, পুলিশ, কারাগার ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দেশীয় দুধ ও দুগ্ধপণ্য বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেত।

১২. পশুর রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হয়নি

রপ্তানির পূর্বশর্ত হলো রোগ নিয়ন্ত্রণ। ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ বা ক্ষুরারোগ, লাম্পি স্কিন ডিজিজ, অ্যানথ্রাক্স, ব্রুসেলোসিস, যক্ষ্মা, ব্ল্যাক কোয়ার্টার, পরজীবী রোগ এবং প্রজননজনিত রোগ বাংলাদেশের গবাদিপশু খাতে বড় ক্ষতির কারণ।

দেশে টিকা দেওয়া হলেও তা অনেক সময় সর্বজনীন নয়। সব পশুর ডিজিটাল তালিকা না থাকায় কত শতাংশ পশু টিকার আওতায় এসেছে তা নির্ভুলভাবে নিশ্চিত করা কঠিন। সময়মতো টিকা না পাওয়া, কোল্ড-চেইনের দুর্বলতা, পর্যাপ্ত জনবল না থাকা এবং খামারিদের সচেতনতার অভাবও বড় সমস্যা।

প্রয়োজন ছিল—

  • দেশব্যাপী বাধ্যতামূলক টিকাদান;
  • সীমান্ত এলাকায় পশুর চলাচল নিয়ন্ত্রণ;
  • উপজেলা পর্যায়ে রোগ পরীক্ষাগার;
  • ব্রুসেলোসিস ও যক্ষ্মার নিয়মিত পরীক্ষা;
  • আক্রান্ত পশুর জন্য ক্ষতিপূরণসহ নিধননীতি;
  • নির্দিষ্ট এলাকাকে ধাপে ধাপে রোগমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা;
  • বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী নজরদারি।

রোগমুক্ত অঞ্চল ছাড়া বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা বা প্রক্রিয়াজাত গরুর মাংসের বড় রপ্তানিকারক হতে পারবে না।

১৩. ভ্যাকসিন ও পশু ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতার উদ্যোগ অপর্যাপ্ত ছিল

দেশে কিছু প্রাণিসম্পদ ভ্যাকসিন উৎপাদিত হলেও চাহিদার তুলনায় উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈচিত্র্য পর্যাপ্ত নয়। অনেক ভ্যাকসিন, ওষুধ, হরমোন, ডায়াগনস্টিক কিট ও ল্যাব উপকরণ আমদানিনির্ভর।

সরকার প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির সমন্বয়ে একটি জাতীয় ভেটেরিনারি বায়োটেকনোলজি উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারত। এর আওতায়—

  • ক্ষুরারোগের স্থানীয় স্ট্রেনভিত্তিক ভ্যাকসিন;
  • লাম্পি স্কিন ডিজিজের নিরাপদ ভ্যাকসিন;
  • ব্রুসেলোসিস ও অন্যান্য রোগের ডায়াগনস্টিক কিট;
  • দ্রুত রোগ শনাক্তকারী প্রযুক্তি;
  • ভ্যাকসিনের মান ও কার্যকারিতা পরীক্ষা—

নিশ্চিত করা যেত।

১৪. উপজেলা পর্যায়ের প্রাণিচিকিৎসা সেবা আধুনিক করা হয়নি

অনেক উপজেলায় প্রাণিসম্পদ দপ্তর থাকলেও একটি বড় গরুর খামারের জরুরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, প্রসব জটিলতা, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, রক্ত পরীক্ষা বা আধুনিক রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল নেই।

একজন ভেটেরিনারি চিকিৎসককে অনেক বড় এলাকার দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে সময়মতো খামারে পৌঁছানো কঠিন। অনেক খামারি বাধ্য হয়ে অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তি বা ওষুধ বিক্রেতার পরামর্শ নেন। এতে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার, ভুল চিকিৎসা এবং দুধে ওষুধের অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রতিটি উপজেলায় ২৪ ঘণ্টার পশু অ্যাম্বুলেন্স, মোবাইল ভেটেরিনারি ইউনিট, ডিজিটাল কল সেন্টার, নমুনা সংগ্রহ এবং টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল।

১৫. অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোন ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি

দুধ ও মাংস রপ্তানির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক, ভারী ধাতু, আফলাটক্সিন ও হরমোনের অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে খামার পর্যায়ে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, নির্ধারিত প্রত্যাহারকাল না মানা এবং ওষুধের রেকর্ড না রাখার প্রবণতা রয়েছে।

সরকার প্রতিটি বাণিজ্যিক খামারে ওষুধ ব্যবহারের ডিজিটাল রেজিস্টার বাধ্যতামূলক করতে পারত। দুধ সংগ্রহকেন্দ্রে র‌্যাপিড অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ পরীক্ষা চালু করা প্রয়োজন ছিল। মানহীন দুধ কিনলে যেমন শাস্তি, তেমনি নিরাপদ দুধ উৎপাদনকারী খামারিকে প্রিমিয়াম মূল্য দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল।

১৬. ক্ষুদ্র খামারিদের সমবায়ভিত্তিক শক্তিশালী করা হয়নি

বাংলাদেশের অধিকাংশ গবাদিপশু ক্ষুদ্র ও পারিবারিক খামারে রয়েছে। একজন খামারির কাছে দুই থেকে দশটি গরু থাকলে তিনি একা সস্তায় খাদ্য কিনতে, বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দরকষাকষি করতে, কুলিং ট্যাংক বসাতে বা ব্যাংক থেকে বড় ঋণ নিতে পারেন না।

ভারতের আমুল মডেলের মতো খামারিমালিকানাধীন দুগ্ধ সমবায় দেশব্যাপী গড়ে তোলা যেত। ইউনিয়ন পর্যায়ে খামারিরা দুধ জমা দিতেন, সমবায় দুধ পরীক্ষা ও শীতল করত এবং জেলা বা কেন্দ্রীয় সমবায় প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করত।

বাংলাদেশে মিল্ক ভিটা ঐতিহাসিকভাবে সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হলেও এর মডেলকে আধুনিক করে দেশব্যাপী বিস্তৃত করা হয়নি। বরং বহু এলাকায় মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর খামারিদের নির্ভরতা থেকে গেছে।

১৭. পশুবীমাকে সহজলভ্য ও বাধ্যতামূলক করা হয়নি

একটি উন্নত জাতের গাভী কিনতে কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। রোগ, দুর্ঘটনা, বজ্রপাত, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা প্রসবজনিত জটিলতায় গরুটি মারা গেলে একজন ছোট খামারি সম্পূর্ণ পুঁজি হারাতে পারেন।

১৬ বছরে পশুবীমা জাতীয় পর্যায়ে সহজ, স্বচ্ছ ও জনপ্রিয় হয়নি। বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে শনাক্তকরণ, মৃত্যুর কারণ এবং পশুর মালিকানা যাচাই বড় সমস্যা ছিল।

জাতীয় ডিজিটাল পশু আইডি, মোবাইল অ্যাপ, ভেটেরিনারি প্রত্যয়ন ও ছবি-ভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে বীমা সহজ করা যেত। প্রান্তিক খামারিদের প্রিমিয়ামে সরকারি ভর্তুকি দিলে ব্যাংকও নিরাপদে ঋণ দিতে পারত।

১৮. খামারিদের জন্য স্বল্পসুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না

ডেইরি খামারে শেড, গরু, খাদ্য, দুধ দোহন যন্ত্র, জেনারেটর, কুলিং ট্যাংক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু অনেক খামারি বাণিজ্যিক সুদের ঋণ অথবা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে টাকা নিয়ে খামার করেন।

ডেইরি খামারে প্রথম দিন থেকেই লাভ আসে না। বকনা বড় হয়ে বাচ্চা দেওয়া এবং দুধ উৎপাদন শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগে। তাই তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি সাধারণ ঋণ যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন ছিল—

  • ৮ থেকে ১২ বছর মেয়াদি ঋণ;
  • অন্তত এক থেকে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড;
  • উৎপাদনচক্রভিত্তিক কিস্তি;
  • পশুবীমার সঙ্গে যুক্ত ঋণ;
  • নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষ তহবিল;
  • কোল্ড-চেইন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আলাদা ঋণসুবিধা।

১৯. খামারের শ্রেণিবিন্যাস, নিবন্ধন ও মানসনদ চালু করা হয়নি

দেশে কতটি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ডেইরি খামার আছে—এ নিয়ে নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। খামার নিবন্ধনের সঙ্গে পরিবেশ, প্রাণিকল্যাণ, বায়োসিকিউরিটি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুধের মান এবং শ্রমিক নিরাপত্তা যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল।

সরকার খামারগুলোকে ব্রোঞ্জ, সিলভার ও গোল্ড শ্রেণিতে ভাগ করতে পারত। ভালো ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ দুধ এবং রেকর্ড সংরক্ষণে উন্নতি করলে খামার উচ্চতর সনদ পেত। সনদের ভিত্তিতে ঋণ, বীমা, বাজার ও সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া যেত।

২০. আধুনিক জবাইখানা ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে ওঠেনি

দেশে গরুর মাংসের বড় বাজার থাকলেও অধিকাংশ জবাই প্রচলিত ব্যবস্থায় হয়। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানবিক জবাই, রক্ত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মাংসের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রেসেবিলিটি সর্বত্র নিশ্চিত নয়।

রপ্তানির জন্য প্রয়োজন—

  • আন্তর্জাতিক মানের অ্যাবাটয়ার;
  • জবাইয়ের আগে ও পরে পশুচিকিৎসকের পরীক্ষা;
  • হালাল সনদ;
  • রোগ ও ওষুধ অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা;
  • কাটিং, ডিবোনিং ও প্যাকেজিং;
  • ব্লাস্ট ফ্রিজিং;
  • রেফ্রিজারেটেড পরিবহন;
  • উৎপত্তিস্থল শনাক্তকরণ।

প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি রপ্তানিযোগ্য আধুনিক অ্যাবাটয়ার স্থাপন করা গেলে গরুর মাংসের পাশাপাশি চামড়া, হাড়, রক্ত, অন্ত্র, চর্বি ও অন্যান্য উপজাত থেকেও বড় শিল্প গড়ে উঠত।

২১. চামড়া ও পশুর উপজাতকে সমন্বিত শিল্প হিসেবে দেখা হয়নি

একটি গরু থেকে শুধু দুধ বা মাংস নয়—চামড়া, হাড়, শিং, ক্ষুর, রক্ত, চর্বি, জেলাটিন, কোলাজেন, পোষা প্রাণীর খাদ্য এবং জৈবসার উৎপাদন সম্ভব।

বাংলাদেশে কোরবানির সময় বিপুল চামড়া উৎপাদিত হলেও দাম, সংরক্ষণ, লবণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সংকট দেখা গেছে। গো-সম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে চামড়া শিল্পের পরিকল্পনা সমন্বিত না হওয়ায় খামারি বা পশুপালক পশুর পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য পাননি।

২২. মহিষ উন্নয়নকে প্রায় উপেক্ষা করা হয়েছে

বাংলাদেশের উপকূল, চর ও হাওরাঞ্চলে মহিষ পালনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। মহিষের দুধে সাধারণত গরুর দুধের তুলনায় বেশি ফ্যাট থাকে এবং তা থেকে মোজারেলা চিজ, ঘি, দই ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করা যায়।

কিন্তু মহিষের জাত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজনন, রোগ নিয়ন্ত্রণ, দুধ সংগ্রহ এবং বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনে বড় জাতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক তথ্যেও বাংলাদেশের মোট দুধ উৎপাদনের তুলনায় মহিষের দুধের অবদান অত্যন্ত কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপকূলীয় এলাকায় উন্নত মুররাহ বা উপযোগী মহিষের জাত নিয়ে নিয়ন্ত্রিত গবেষণা এবং মহিষের দুধভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের চিজ রপ্তানির সুযোগ পেত।

২৩. গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও খামারির মধ্যে কার্যকর সংযোগ ছিল না

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বহু গবেষণা হয়েছে। কিন্তু গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো, বাণিজ্যিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর এবং খামারিদের সমস্যার ভিত্তিতে গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ দুর্বল ছিল।

খামারির প্রয়োজন একদিকে, গবেষণার বিষয় অন্যদিকে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাণিজ্যিক খামার যুক্ত করা এবং ফলাফল প্রকাশ্য ডেটাবেজে রাখা প্রয়োজন ছিল।

২৪. নির্ভরযোগ্য উৎপাদন পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন দূর করা হয়নি

বাংলাদেশের দুধ উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎসে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। কোনো কোনো সরকারি হিসাবে উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান খুব কম দেখানো হয়, আবার অন্যান্য গবেষণা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাবে বাজারযোগ্য দুধ, প্রক্রিয়াজাত দুধ এবং প্রকৃত ভোগের চিত্র ভিন্ন।

এই পার্থক্যের কারণ হতে পারে মোট সম্ভাব্য উৎপাদন, খামার পর্যায়ের ব্যবহার, বাছুরের পান করা দুধ, নষ্ট হওয়া দুধ এবং বাজারে বিক্রি হওয়া দুধকে ভিন্নভাবে গণনা করা।

সঠিক নীতি তৈরির জন্য প্রতি দুই বা তিন বছর পর জাতীয় লাইভস্টক সেনসাস, খামারভিত্তিক দুধ পরিমাপ এবং স্বাধীন অডিট প্রয়োজন ছিল। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কখনো উদ্বৃত্ত দেখানো হবে, আবার একই সময়ে গুঁড়া দুধ আমদানি অব্যাহত থাকবে—এ ধরনের বৈপরীত্য দূর করা সম্ভব নয়।

২৫. রপ্তানি বাজার তৈরিতে অর্থনৈতিক কূটনীতি দুর্বল ছিল

মধ্যপ্রাচ্য, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে হালাল মাংস, ঘি, চিজ, দই, ইউএইচটি দুধ ও অন্যান্য প্রাণিজ পণ্যের বাজার রয়েছে।

কিন্তু রপ্তানির জন্য শুধু উৎপাদন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন—

  • দ্বিপক্ষীয় স্যানিটারি চুক্তি;
  • আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার;
  • হালাল ও স্বাস্থ্য সনদ;
  • ট্রেসেবিলিটি;
  • রোগমুক্ত অঞ্চল;
  • রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন;
  • বাজার গবেষণা;
  • ব্র্যান্ডিং ও বাণিজ্য মিশন।

শেখ হাসিনা সরকারের ১৬ বছরে তৈরি পোশাক, ওষুধ ও অন্যান্য পণ্যের রপ্তানিতে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেলেও প্রাণিসম্পদজাত পণ্যের জন্য একই মাত্রার বিশেষায়িত রপ্তানি কূটনীতি গড়ে ওঠেনি।

২৬. আমদানি নীতিতে খামারি ও ভোক্তার স্বার্থের ভারসাম্য তৈরি হয়নি

দেশে দুধের ঘাটতি হলে গুঁড়া দুধ আমদানি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আমদানি শুল্ক খুব কম হলে স্থানীয় খামারি প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হন; আবার শুল্ক অতিরিক্ত হলে শিশু ও নিম্নআয়ের ভোক্তার ওপর চাপ পড়ে।

প্রয়োজন ছিল এমন একটি পরিবর্তনশীল শুল্কব্যবস্থা, যেখানে—

  • স্থানীয় দুধের উৎপাদন ও মূল্য;
  • আন্তর্জাতিক গুঁড়া দুধের দাম;
  • ডলারের বিনিময় হার;
  • শিল্পের কাঁচামালের প্রয়োজন;
  • ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা—

বিবেচনা করে শুল্ক নির্ধারণ করা হতো।

একই সঙ্গে আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে স্থানীয় খামারি থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ দুধ সংগ্রহের শর্ত দেওয়া যেত। শুধু শুল্ক বাড়ানো বা কমানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

২৭. জলবায়ু পরিবর্তনসহনশীল ডেইরি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি

বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও অতিবৃষ্টি বাড়ছে। উচ্চ উৎপাদনশীল বিদেশি সংকর গাভী তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার চাপে দ্রুত দুধ কমিয়ে দেয় এবং রোগে আক্রান্ত হয়।

সরকারের প্রয়োজন ছিল—

  • তাপসহনশীল জাত উন্নয়ন;
  • খামারে ছায়া, ফ্যান, কুলিং ও স্প্রিংকলার;
  • বন্যাপ্রবণ এলাকায় উঁচু পশু আশ্রয়কেন্দ্র;
  • জরুরি খাদ্য ব্যাংক;
  • সৌরবিদ্যুৎচালিত কুলিং;
  • জলবায়ু বীমা;
  • গোবর থেকে বায়োগ্যাস;
  • মিথেন নির্গমন কমাতে খাদ্য গবেষণা।

এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও বাস্তবায়িত হলেও জাতীয় মানদণ্ড ও বড় পরিসরের কর্মসূচি হয়নি।

২৮. গোবর, বায়োগ্যাস ও জৈবসারের অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়নি

বড় খামারের গোবর পরিবেশদূষণের কারণ হতে পারে, আবার সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি জ্বালানি ও সারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। প্রতিটি মাঝারি ও বড় খামারে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনে ভর্তুকি, প্রযুক্তি এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে বায়োগ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ দেওয়া যেত।

গোবর থেকে কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট ও তরল জৈবসার উৎপাদন করে রাসায়নিক সারের আমদানি কমানো সম্ভব হতো। কিন্তু ডেইরি, জ্বালানি ও জৈবসার নীতিকে সমন্বিত করা হয়নি।

২৯. দক্ষ খামার ব্যবস্থাপক ও শ্রমিক তৈরিতে কারিগরি শিক্ষা বিস্তৃত হয়নি

আধুনিক খামার পরিচালনায় শুধু পশু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পুষ্টি, প্রজনন, দোহন, বাছুর পালন, রেকর্ড, বায়োসিকিউরিটি, অর্থনীতি ও শ্রম ব্যবস্থাপনার জ্ঞান।

প্রতিটি জেলায় ছয় মাস বা এক বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্স, বাণিজ্যিক খামারে শিক্ষানবিশ ব্যবস্থা এবং পেশাদার “ডেইরি হার্ড ম্যানেজার” তৈরির উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল।

অনেক উদ্যোক্তা বড় বিনিয়োগ করে খামার শুরু করেছেন, কিন্তু দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে লোকসান করে খামার বন্ধ করেছেন। উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি পেশাদার জনবল তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কম ছিল।

৩০. খামারিকে শুধু উৎপাদক হিসেবে দেখা হয়েছে, উদ্যোক্তা হিসেবে নয়

ডেইরি খামারি শুধু গরু পালন করেন না। তিনি খাদ্য ক্রেতা, শ্রমদাতা, দুধ উৎপাদক, বর্জ্য ব্যবস্থাপক, রোগ নিয়ন্ত্রক এবং বাজারের ঝুঁকি বহনকারী উদ্যোক্তা।

কিন্তু নীতি প্রণয়নে অনেক সময় খামারিকে অনুদান বা প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী হিসেবে দেখা হয়েছে। মূল্য নির্ধারণ, আমদানি, শুল্ক, প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাত উন্নয়ন ও রপ্তানি নীতিতে খামারিদের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি।

একটি স্থায়ী জাতীয় ডেইরি ও গো-সম্পদ কাউন্সিল গঠন করা যেত, যেখানে খামারি, বিজ্ঞানী, ভেটেরিনারিয়ান, ফিড প্রস্তুতকারী, দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী, ভোক্তা, ব্যাংক, বীমা ও রপ্তানিকারকের প্রতিনিধিত্ব থাকত।

সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারত?

উল্লিখিত উদ্যোগগুলো ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে কয়েকটি বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে পারত।

প্রথমত, গাভীর সংখ্যা শুধু বাড়ানোর পরিবর্তে প্রতি গাভীর দুধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ত। দ্বিতীয়ত, খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ বাড়ায় প্রতি লিটার দুধ ও প্রতি কেজি মাংসের উৎপাদন খরচ কমত। তৃতীয়ত, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানির দরজা খুলত।

চতুর্থত, স্কুল মিল্ক, সরকারি ক্রয় এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কারণে দুধের স্থায়ী বাজার তৈরি হতো। পঞ্চমত, গুঁড়া দুধ, চিজ, ঘি, কেসিন ও হুই উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানির বিকল্প তৈরি হতো। ষষ্ঠত, চামড়া ও অন্যান্য উপজাত থেকে বাড়তি আয় হওয়ায় একটি গরুর পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য পাওয়া যেত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হাজার হাজার তরুণ শুধু গরু কিনে খামার শুরু করতেন না; বরং তথ্য, প্রশিক্ষণ, বীমা, বাজার ও প্রযুক্তিসম্পন্ন টেকসই উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতেন।

আগামী দিনের জন্য করণীয়

অতীতের ব্যর্থতা বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য শুধু সমালোচনা নয়; ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ। বাংলাদেশের ডেইরি ও গো-সম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ দিতে এখন জরুরি ভিত্তিতে—

১. ২০ বছর মেয়াদি জাতীয় ডেইরি ও বিফ মাস্টারপ্ল্যান;
২. প্রতিটি পশুর ডিজিটাল পরিচয় ও বংশতালিকা;
৩. বৈজ্ঞানিক প্রজেনি টেস্টিং ও জিনোমিক নির্বাচন;
৪. দেশীয় জাত সংরক্ষণ ও অঞ্চলভিত্তিক সংকরায়ণ নীতি;
৫. গো-খাদ্য উৎপাদন অঞ্চল ও জাতীয় সাইলেজ ব্যাংক;
৬. ইউনিয়ন পর্যায়ে দুধ শীতলীকরণ কেন্দ্র;
৭. গুণগত মানভিত্তিক দুধের মূল্য;
৮. জাতীয় স্কুল মিল্ক কর্মসূচি;
৯. সর্বজনীন টিকাদান ও রোগমুক্ত অঞ্চল;
১০. আধুনিক জবাইখানা ও রপ্তানি ট্রেসেবিলিটি;
১১. স্বল্পসুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও পশুবীমা;
১২. মহিষ ও বিশেষায়িত দুগ্ধপণ্য উন্নয়ন;
১৩. গুঁড়া দুধ ও চিজ উৎপাদনে বিনিয়োগ;
১৪. আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার;
১৫. খামারিমালিকানাধীন শক্তিশালী সমবায়—

বাস্তবায়ন করতে হবে।

সমাপনী মূল্যায়ন

শেখ হাসিনা সরকারের ১৬ বছরে বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতে কোনো উন্নয়ন হয়নি—এমন দাবি তথ্যসম্মত হবে না। গবাদিপশুর সংখ্যা, মোট দুধ ও মাংস উৎপাদন, কৃত্রিম প্রজনন, বেসরকারি খামার, ফিড শিল্প এবং ভোক্তা বাজারে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পবিপ্লবে রূপ নেয়নি।

মূল ব্যর্থতা ছিল বিচ্ছিন্ন প্রকল্পনির্ভরতা, দীর্ঘমেয়াদি জাত উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাব, উচ্চ গো-খাদ্য মূল্য, দুর্বল স্বাস্থ্য ও রোগ নজরদারি, দুধের ন্যায্যমূল্যের সংকট, কোল্ড-চেইনের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ, খামারিবান্ধব অর্থায়নের অভাব এবং রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় মান ও ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা তৈরি না করা।

১৬ বছর একটি খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কম সময় নয়। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ দুধের আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে কমাতে, মহিষের দুধ ও চিজে বিশেষ বাজার তৈরি করতে, হালাল মাংস রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করতে এবং দেশীয় জাতভিত্তিক টেকসই ডেইরি মডেল গড়ে তুলতে পারত।

কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো সমন্বিতভাবে নেওয়া হয়নি। ফলে উৎপাদন বাড়লেও খামারির ঝুঁকি কমেনি, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে আসেনি, দুধের বাজার স্থিতিশীল হয়নি এবং রপ্তানির সম্ভাবনা বাস্তব শিল্পে রূপ নেয়নি।

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো—বাংলাদেশের ডেইরি ও গো-সম্পদ খাতের সংকট গরু বা খামারির সক্ষমতার সংকট নয়; এটি মূলত সঠিক পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক জাত উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা, বাজার ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন, গবেষণা এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সংকট।

আগামী সরকার যদি খামারিকে কেন্দ্র করে উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত একটি সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ডেইরি ও গো-সম্পদ খাত তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় কর্মসংস্থান, পুষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং রপ্তানি আয়ের খাতে পরিণত হতে পারে।

ড. বায়েজিদ মোড়ল | AgricultureNews24.com। +8801712 626198

সর্বশেষ - ছাগল পালন