নক্ষত্রের বিদায়: মুস্তাফিজুর রহমানকে স্মরণে
যিনি আলো দিয়ে গড়েছেন মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশের টেলিভিশনের ইতিহাস।।

ড. বায়েজিদ মোড়ল।
কিছু মানুষ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হন না; তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি প্রজন্মের শিক্ষক, একটি জাতির সাংস্কৃতিক আলোকবর্তিকা। বাংলাদেশের টেলিভিশন অঙ্গনে মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মহাপরিচালক, প্রযোজক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং অসংখ্য শিল্পী-প্রযোজকের অভিভাবক মুস্তাফিজুর রহমানের মৃত্যুতে আমি শুধু একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হারাইনি; হারিয়েছি আমার জীবনের একজন পথপ্রদর্শক, একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক এবং পিতৃতুল্য মানুষকে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসের যে স্বর্ণালী অধ্যায়ের কথা আমরা আজও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি, সেই অধ্যায়ের অন্যতম নির্মাতা ছিলেন তিনি। তাঁর আত্মজীবনী “আমি ও আমার কথা” পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি কখনো টেলিভিশনকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, টেলিভিশন একটি জাতিকে গড়ে তুলতে পারে, সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে, কৃষককে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, নতুন শিল্পী সৃষ্টি করতে পারে এবং একটি দেশের চিন্তাকে বদলে দিতে পারে।
তাঁর হাত ধরেই অসংখ্য নাট্যকার, প্রযোজক, সংগীতশিল্পী, উপস্থাপক ও নির্মাতা নিজেদের মেধা বিকাশের সুযোগ পেয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ, সেলিম আল দীনসহ বহু কিংবদন্তি সৃষ্টিশীল মানুষের কাজকে তিনি সঠিকভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। নতুন শিল্পী খুঁজে বের করা, নতুন ভাবনা বাস্তবায়ন করা এবং আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠান নির্মাণ—এসব ছিল তাঁর স্বপ্ন ও সাধনা।
কিন্তু আমার কাছে মুস্তাফিজুর রহমানের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—তিনি মানুষ গড়তেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে অবসরের পরও তিনি থেমে থাকেননি। তিনি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের নতুন যুগে বাংলাভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে যোগ দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই চ্যানেলটিকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় টেলিভিশনে পরিণত করেন। সেই সময় তাঁর সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। প্রতিদিন তাঁর কাছ থেকে শিখেছি—একটি অনুষ্ঠান কীভাবে শুধু ভালো হলেই হয় না, দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়; একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য আসে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা এবং মানুষের প্রতি সম্মান থেকে।

পরবর্তীতে তিনি গাজী স্যাটেলাইট টেলিভিশন (জিটিভি)-এর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনা, অনুষ্ঠান নির্মাণের আধুনিক দর্শন এবং দল গঠনের অসাধারণ দক্ষতায় জিটিভিও অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্যাটেলাইট টেলিভিশনে পরিণত হয়। সৌভাগ্যক্রমে সেখানেও আমি তাঁর সান্নিধ্যে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।
আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটি বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন এই মানুষটি।
একদিন তিনি আমাকে ডেকে বলেছিলেন, “বায়েজিদ, শুধু অনুষ্ঠান নির্মাণ করলেই হবে না। তোমাকে আরও পড়তে হবে। পিএইচডি করো। জ্ঞানই মানুষকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখে।”
তাঁর সেই কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে। তাঁর অনুপ্রেরণা, উৎসাহ এবং আশীর্বাদই আমাকে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছিল। আজ আমি ড. বায়েজিদ মোড়ল—এই পরিচয়ের পেছনেও তাঁর দেওয়া প্রেরণার একটি বড় অবদান রয়েছে। এজন্য তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা আজীবনের।
তিনি কখনো কাউকে ছোট করে দেখতেন না। একজন নতুন সহকারী প্রযোজকের আইডিয়াও তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ভুল হলে ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিতেন, ভালো কাজ করলে অকুণ্ঠ প্রশংসা করতেন। তাঁর অফিসে ভয় নয়, শেখার পরিবেশ ছিল।
আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, তিনি ছিলেন আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
যতদিন তিনি আমাদের আলো দিয়েছেন, ততদিন আমরাও সেই আলোয় আলোকিত হয়ে দেশকে আলোকিত করার চেষ্টা করেছি। আজ সেই নক্ষত্রের আলো নিভে যাওয়ায়, আমাদের আকাশও যেন কিছুটা অন্ধকার হয়ে গেল। তাঁর অনুপস্থিতিতে আমাদের আলোও যেন কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে।
তাঁর মতো মানুষের মৃত্যু হয় না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের গড়ে তোলা মানুষদের মধ্যে, তাঁদের সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে, তাঁদের রেখে যাওয়া দর্শনের মধ্যে।
আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে যে অসংখ্য সফল প্রযোজক, পরিচালক, উপস্থাপক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব কাজ করছেন, তাঁদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুস্তাফিজুর রহমানের স্নেহ, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার ঋণে ঋণী। আমিও তাঁদের একজন।
মহান আল্লাহ তাঁর সকল ভালো কাজকে কবুল করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
— ড. বায়েজিদ মোড়ল
সাবেক নির্বাহী প্রযোজক, গাজী টেলিভিশন (জিটিভি) ও বাংলাভিশন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক, AgricultureNews24.com























