ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন,
পৃথিবীতে কোথায় প্রথম লেয়ার মুরগি পালন শুরু হয়?
লেয়ার মুরগির ইতিহাস, বিবর্তন ও আধুনিক ডিম শিল্পের বিকাশ
– ড. বায়েজিদ মোড়ল | AgricultureNews24.com

বর্তমান বিশ্বের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস হলো ডিম। প্রতিদিন বিশ্বের শত কোটি মানুষ ডিম খেয়ে তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। কিন্তু আজকের উচ্চ উৎপাদনশীল লেয়ার মুরগি একদিনে তৈরি হয়নি। হাজার বছরের গৃহপালন, শতাধিক বছরের বৈজ্ঞানিক নির্বাচন (Selective Breeding), জেনেটিক উন্নয়ন, পুষ্টি গবেষণা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আজকের বাণিজ্যিক লেয়ার শিল্প গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এখন যে লেয়ার মুরগি পালন করা হয়, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, যেখানে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড এবং পরবর্তীতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মুরগির উৎপত্তি কোথায়?
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সব গৃহপালিত মুরগির পূর্বপুরুষ হলো লাল জঙ্গলি মুরগি (Red Junglefowl – Gallus gallus)।
এর উৎপত্তি হয়েছিল—
- ভারত
- বাংলাদেশ
- মিয়ানমার
- থাইল্যান্ড
- ভিয়েতনাম
- দক্ষিণ চীন
- মালয়েশিয়া
এই অঞ্চল থেকেই প্রায় ৫,০০০–৮,০০০ বছর আগে মানুষ প্রথম মুরগিকে গৃহপালিত প্রাণীতে রূপান্তরিত করে। প্রথমদিকে মুরগি পালন করা হতো ধর্মীয় আচার, সৌখিনতা এবং মাংসের জন্য; ডিম উৎপাদন তখনও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না।
পৃথিবীতে প্রথম কোথায় লেয়ার মুরগি পালন শুরু হয়?

“লেয়ার” শব্দটি আধুনিক যুগের। প্রাচীনকালে আলাদা করে লেয়ার মুরগি ছিল না।
বাণিজ্যিকভাবে শুধুমাত্র ডিম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বিশেষ জাত নির্বাচন শুরু হয় ইতালিতে।
বিশেষ করে ইতালির লিভোর্নো (Livorno বা Leghorn) অঞ্চল থেকেই বিখ্যাত Leghorn জাতের উৎপত্তি।
এই জাত পরবর্তীতে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিম উৎপাদনকারী মুরগিতে পরিণত হয়।
লেগহর্ন (Leghorn) কেন এত বিখ্যাত?
১৮০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইতালি থেকে Leghorn জাতের মুরগি যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়।
সেখানে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে নির্বাচনমূলক প্রজননের মাধ্যমে এমন মুরগি তৈরি করেন, যেগুলো—
- দ্রুত বড় হয়
- কম খাদ্য খায়
- আগে ডিম দেওয়া শুরু করে
- বছরে অনেক বেশি ডিম দেয়
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক ভালো
এভাবেই আধুনিক White Leghorn বিশ্বের প্রথম সফল বাণিজ্যিক লেয়ার জাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
আধুনিক লেয়ার শিল্পের সূচনা
উনিশ শতকের শেষ ভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ডিমের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে।
তখন কৃষকরা বুঝতে পারেন—
মাংস উৎপাদনের জন্য এক ধরনের মুরগি এবং ডিম উৎপাদনের জন্য আরেক ধরনের মুরগি বেশি লাভজনক।
এরপর শুরু হয়—
- বিশেষায়িত লেয়ার লাইন
- রেকর্ডভিত্তিক ডিম নির্বাচন
- পারিবারিক খামার থেকে বাণিজ্যিক খামারে রূপান্তর
- ইনকিউবেটরের ব্যবহার
- উন্নত খাদ্য
ফলে বিশ শতকের শুরুতেই বাণিজ্যিক লেয়ার শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
১৯০০–১৯৫০: বৈজ্ঞানিক যুগের সূচনা
এই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে—
- Egg Laying Test
- Performance Recording
- Pedigree Selection
- Cross Breeding
শুরু হয়।
ডিম উৎপাদনের পাশাপাশি গুরুত্ব দেওয়া হয়—
- ডিমের ওজন
- খোসার মান
- খাদ্য দক্ষতা
- উৎপাদনকাল
- মৃত্যুহার
এর ফলেই লেয়ার শিল্পে বিপ্লব ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন যুগ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ও আমেরিকায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
তখন সরকারগুলো প্রাণিজ প্রোটিন উৎপাদনে জোর দেয়।
এর ফলে—
- বড় বড় লেয়ার ফার্ম
- স্বয়ংক্রিয় ফিডার
- পানির লাইন
- কেজ সিস্টেম
- ভ্যাকসিন
- কৃত্রিম আলো
ব্যবহার শুরু হয়।
লেয়ার শিল্প দ্রুত শিল্পভিত্তিক উৎপাদনে রূপ নেয়।
জেনেটিক কোম্পানির আবির্ভাব
১৯৬০ সালের পর পৃথিবীতে কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি আধুনিক লেয়ার জেনেটিক্স উন্নয়নে নেতৃত্ব দেয়।
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- Hy-Line
- Lohmann
- ISA
- Shaver
- Dekalb
- Bovans
- H&N
- Hisex
- Novogen
এরা হাজার হাজার লাইন পরীক্ষা করে সর্বোচ্চ ডিম উৎপাদনকারী হাইব্রিড তৈরি করে।
আজকের লেয়ার মুরগি কত ডিম দেয়?
প্রাচীন দেশি মুরগি বছরে দিত—
৩০–৬০টি ডিম।
১৯০০ সালের শুরুতে Leghorn দিত—
১৫০–১৮০টি ডিম।
বর্তমান আধুনিক বাণিজ্যিক লেয়ার দেয়—
- ৩২০–৩৫০টি ডিম
- অনেক খামারে ৩৮০টিরও বেশি ডিম
- উন্নত ব্যবস্থাপনায় প্রায় প্রতিদিনই একটি করে ডিম
White Leghorn এবং এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি আধুনিক হাইব্রিডগুলো এই অগ্রগতির ভিত্তি।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেয়ার লাইন
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত লেয়ার জেনেটিক্সের মধ্যে রয়েছে—
- Hy-Line Brown
- Hy-Line W-36
- Lohmann Brown
- Lohmann LSL
- ISA Brown
- Bovans Brown
- Dekalb White
- Hisex Brown
- Novogen Brown
এসবই বহু প্রজন্মের জেনেটিক নির্বাচনের ফল।
বাংলাদেশে লেয়ার মুরগির আগমন
বাংলাদেশে প্রথমদিকে দেশি মুরগিই ছিল ডিমের প্রধান উৎস।
পরবর্তীতে—
- White Leghorn
- Rhode Island Red
- Australorp
জাত আনা হয়।
১৯৮০-এর দশক থেকে আধুনিক Parent Stock আমদানি শুরু হয়।
১৯৯০-এর দশক থেকে বাণিজ্যিক লেয়ার শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ ডিম উৎপাদনকারী খামারে আন্তর্জাতিক জেনেটিক লাইনের লেয়ার ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভবিষ্যতের লেয়ার শিল্প
আগামী দিনের লেয়ার খামারে আরও বেশি গুরুত্ব পাবে—
- AI-নির্ভর খামার ব্যবস্থাপনা
- IoT সেন্সর
- স্বয়ংক্রিয় ডিম সংগ্রহ
- রোবটিক ফিডিং
- জিনোমিক নির্বাচন
- রোগ পূর্বাভাস প্রযুক্তি
- পরিবেশবান্ধব উৎপাদন
- প্রাণিকল্যাণভিত্তিক (Animal Welfare) খামার
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২০ বছরে একটি লেয়ার মুরগির গড় উৎপাদন ৪০০ ডিমের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, যদি জেনেটিক উন্নয়ন, পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি একই গতিতে চলতে থাকে।
সমাপনী মূল্যায়ন
লেয়ার মুরগির ইতিহাস কেবল একটি জাতের বিবর্তনের গল্প নয়; এটি কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণিজ জেনেটিক্স, পুষ্টিবিজ্ঞান এবং শিল্পায়িত কৃষির এক অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গলি মুরগি থেকে ইতালির লেগহর্ন, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক নির্বাচন এবং পরে বিশ্বব্যাপী উচ্চ উৎপাদনশীল হাইব্রিড লেয়ারের বিকাশ—এই দীর্ঘ যাত্রাই আজকের বৈশ্বিক ডিম শিল্পের ভিত্তি।
বাংলাদেশের মতো দেশে এই ইতিহাস জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতের টেকসই ডিম উৎপাদন নির্ভর করবে উন্নত জেনেটিক্স, মানসম্পন্ন খাদ্য, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ খামার ব্যবস্থাপনার ওপর। ইতিহাসের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর লেয়ার শিল্প গড়ে তুলতে পারলে দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হবে।























