পথকুকুর কেন সংরক্ষণ করা দরকার? জনস্বাস্থ্য, প্রাণিকল্যাণ, পরিবেশ ও নিরাপদ নগর ব্যবস্থাপনার আলোকে একটি বিশ্লেষণ।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

রাস্তার পাশে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো, দোকানের সামনে শুয়ে থাকা কিংবা গভীর রাতে মহল্লা পাহারা দেওয়া কুকুরগুলোকে আমরা সাধারণভাবে ‘পথকুকুর’ বলি। কারও চোখে তারা অবহেলিত ও ক্ষুধার্ত প্রাণী, আবার কারও কাছে কামড়, জলাতঙ্ক, রাতের ডাক কিংবা দুর্ঘটনার কারণ। এই দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—পথকুকুরকে কি হত্যা বা এলাকা থেকে সরিয়ে দিতে হবে, নাকি বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে?
গবেষণা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা বলছে, নির্বিচারে পথকুকুর হত্যা জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান নয়। বরং গণটিকাদান, নির্বীজন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীল পোষা প্রাণী পালন, কামড় প্রতিরোধ এবং অসুস্থ ও আক্রমণাত্মক কুকুরের পৃথক ব্যবস্থাপনাই বেশি কার্যকর।
তবে ‘পথকুকুর সংরক্ষণ’ মানে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কুকুরের সংখ্যা বাড়তে দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো—মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কুকুরের সংখ্যা মানবিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সুস্থ কুকুরগুলোকে অকারণে নির্যাতন বা হত্যা না করা।
পথকুকুর বলতে কী বোঝায়?
সব রাস্তায় থাকা কুকুরের অবস্থা এক নয়। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জন্য তাদের কয়েকটি শ্রেণিতে দেখা প্রয়োজন—
- সম্পূর্ণ মালিকহীন কিন্তু নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী কুকুর;
- কোনো দোকান, বাজার, প্রতিষ্ঠান বা মহল্লার মানুষের খাবারে নির্ভরশীল কুকুর;
- মালিক আছে, কিন্তু দিনের অধিকাংশ সময় রাস্তায় ছেড়ে রাখা হয়;
- হারিয়ে যাওয়া বা মালিকের পরিত্যক্ত পোষা কুকুর;
- মানুষের সঙ্গে খুব কম সম্পর্ক রাখা বন্যস্বভাবের কুকুর;
- অসুস্থ, আহত কিংবা আচরণগতভাবে বিপজ্জনক কুকুর।
একই ব্যবস্থা সব কুকুরের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না। শান্ত ও সুস্থ একটি স্থানীয় কুকুর, জলাতঙ্কের লক্ষণযুক্ত কুকুর এবং নিয়মিত মানুষকে কামড়ায় এমন কুকুরকে একইভাবে বিবেচনা করলে জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিকল্যাণ—দুই ক্ষেত্রেই ভুল হবে।
পথকুকুর সৃষ্টি হয় কেন?
পথকুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য শুধু কুকুরকে দায়ী করা যায় না। এর পেছনে মানুষের অব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বড় কারণ।
পোষা কুকুর পরিত্যাগ
অনেকে শখ করে কুকুর পালন শুরু করেন। পরে খরচ, বাসা পরিবর্তন, অসুস্থতা, আচরণগত সমস্যা অথবা সময়ের অভাবে কুকুরটিকে রাস্তায় ছেড়ে দেন। নির্বীজন না করা এসব কুকুর পরবর্তী সময়ে বংশবিস্তার করে।
অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন
একটি স্ত্রী কুকুর বছরে একাধিকবার বাচ্চা দিতে পারে। সব বাচ্চা বেঁচে না থাকলেও কয়েকটি প্রজননক্ষম হলে অল্প সময়ের মধ্যে স্থানীয় কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যায়।
উন্মুক্ত খাদ্যবর্জ্য
বাজার, হোটেল, কসাইখানা, মাছের বাজার ও বাসাবাড়ির খাবারের উচ্ছিষ্ট খোলা স্থানে ফেলে রাখলে সেখানে কুকুর জমা হয়। সহজলভ্য খাবার একটি এলাকার কুকুরের ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ শুধু নির্বীজন করলেই হবে না; বর্জ্যের উৎসও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
দায়িত্বহীন মালিকানা
মালিকানাধীন কুকুরকে শনাক্তকরণ চিহ্ন, টিকা বা নির্বীজন ছাড়াই রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা পথকুকুরের সঙ্গে মিশে রোগ ছড়াতে বা বংশবিস্তার করতে পারে।
কেন পথকুকুর সংরক্ষণ করা প্রয়োজন?
১. প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে
কুকুর অনুভূতিশীল প্রাণী। তারা ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ব্যথা, ভয়, আনন্দ, নিরাপত্তা ও সামাজিক সংযুক্তি অনুভব করে। পথকুকুর মানুষের তৈরি নগর ও গ্রামীণ পরিবেশে জন্মেছে; নিজের ইচ্ছায় সে রাস্তার অনিরাপদ জীবন বেছে নেয়নি।
মানুষের অব্যবস্থাপনার কারণে জন্ম নেওয়া প্রাণীকে বিষ প্রয়োগ, পিটিয়ে হত্যা, গাড়িচাপা দেওয়া কিংবা দূরবর্তী এলাকায় ফেলে আসা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু মানুষকে কীভাবে দেখে তা দিয়ে নয়—অসহায় প্রাণীর সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দিয়েও নির্ধারিত হয়।
২. বাংলাদেশের আইনে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা গ্রহণযোগ্য নয়
বাংলাদেশে প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ প্রাণীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে আইনি কাঠামো দিয়েছে। পথপ্রাণীও এই সুরক্ষার আওতার বাইরে নয়। আইনটির মূলনীতি হলো, প্রাণীকে মানবিক আচরণ ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯
অতএব পথকুকুর নিয়ে মানুষের সমস্যা থাকলেও সমাধানটি আইনসম্মত, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক হতে হবে। ব্যক্তি বা কোনো অননুমোদিত গোষ্ঠীর নিজের সিদ্ধান্তে কুকুর বিষ প্রয়োগ করে মারা কিংবা নির্মমভাবে তাড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
তবে আইনগত সুরক্ষা মানে বিপজ্জনক প্রাণীকে উপেক্ষা করা নয়। জলাতঙ্কে আক্রান্ত, গুরুতর অসুস্থ বা ধারাবাহিকভাবে মানুষকে আক্রমণকারী কুকুরের ক্ষেত্রে পশুচিকিৎসক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. নির্বিচারে হত্যা জলাতঙ্ক বন্ধ করে না
অনেকের ধারণা, পথকুকুর মেরে ফেললেই জলাতঙ্ক এবং কামড়ের ঘটনা কমে যাবে। কিন্তু বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নির্বিচারে কুকুর নিধন জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে অকার্যকর এবং কোনো কোনো পরিস্থিতিতে উল্টো ক্ষতিকর হতে পারে। WOAH—Stray dog population management
একটি এলাকা থেকে কুকুর সরিয়ে দিলে সেখানে খাদ্যবর্জ্য ও আশ্রয় আগের মতোই থাকে। ফলে আশপাশের এলাকা থেকে নতুন, অপরিচিত এবং সম্ভবত টিকাবিহীন কুকুর এসে খালি জায়গা দখল করে। একে অনেক সময় ‘ভ্যাকুয়াম ইফেক্ট’ বা শূন্যস্থান পূরণের প্রবণতা বলা হয়।
স্থানীয় টিকাপ্রাপ্ত ও নির্বীজিত কুকুরগুলো নিজ এলাকায় থাকলে তারা বাইরের কুকুরের অনুপ্রবেশ কিছুটা প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু তাদের হত্যা বা দূরে সরিয়ে দিলে নতুন কুকুর এসে আবার প্রজনন শুরু করে। ফলে সমস্যাটি কয়েক মাস বা বছরের মধ্যে ফিরে আসে।
৪. কুকুরকে টিকা দেওয়া মানুষকে সুরক্ষা দেয়
জলাতঙ্কের ভাইরাস মানুষের মধ্যে প্রধানত আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা লালার মাধ্যমে প্রবেশ করে। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর রোগটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী হলেও সময়মতো প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিলে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্ক নির্মূল করতে কুকুরের গণটিকাদান, কুকুরের সংখ্যা ব্যবস্থাপনা, কামড় প্রতিরোধ এবং কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা—সবগুলো একসঙ্গে চালাতে হবে। একটি এলাকার কুকুরের অন্তত প্রায় ৭০ শতাংশকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনা জলাতঙ্কের সংক্রমণচক্র ভাঙার স্বীকৃত কৌশল। WHO—Rabies: Zero deaths by 2030
অতএব পথকুকুরকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা নয়, তাদের শনাক্ত করে টিকা দেওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য বেশি কার্যকর। টিকাপ্রাপ্ত কুকুরকে রঙিন কলার, কানের নিরাপদ চিহ্ন, অস্থায়ী রং বা ডিজিটাল রেকর্ডের মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে।
৫. নির্বীজন কুকুরের সংখ্যা মানবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে
পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিগুলোর একটি হলো ধরা–নির্বীজন–টিকাদান–সুস্থ করে নিজ এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়া।
এর মাধ্যমে—
- অনিয়ন্ত্রিত বংশবিস্তার কমে;
- স্ত্রী কুকুরকে ঘিরে পুরুষ কুকুরের লড়াই কমতে পারে;
- প্রজনন মৌসুমে দলবদ্ধতা ও উত্তেজনা হ্রাস পায়;
- নতুন বাচ্চার জন্ম এবং তাদের অনাহার ও মৃত্যুর হার কমে;
- টিকাপ্রাপ্ত স্থিতিশীল কুকুরের জনগোষ্ঠী তৈরি হয়;
- স্থানীয় জনগণ কোন কুকুর টিকাপ্রাপ্ত তা শনাক্ত করতে পারে।
তবে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি কুকুর নির্বীজন করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা এলাকার অধিকাংশ প্রজননক্ষম কুকুরকে স্বল্প সময়ের মধ্যে কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নতুন কুকুরের আগমন, পরিত্যাগ এবং খোলা বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৬. স্থানীয় কুকুর মহল্লার পরিচিত প্রহরী হিসেবে কাজ করে
অনেক পথকুকুর একটি নির্দিষ্ট রাস্তা, বাজার বা মহল্লাকে নিজের এলাকা হিসেবে চিনে নেয়। অপরিচিত মানুষ, অস্বাভাবিক শব্দ বা অন্য প্রাণীর উপস্থিতিতে তারা ডাকতে শুরু করে। ফলে রাতের নিরাপত্তায় কখনো কখনো তারা প্রাথমিক সতর্কসংকেতের ভূমিকা পালন করে।
অনেক দোকানি, নিরাপত্তাকর্মী ও বাসিন্দা স্থানীয় কুকুরের উপস্থিতিকে নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখেন। পরিচিত মানুষের সঙ্গে তাদের আচরণও সাধারণত শান্ত থাকে।
তবে কুকুরকে আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তাব্যবস্থার বিকল্প ভাবা উচিত নয়। অতিরিক্ত এলাকা রক্ষার প্রবণতা থাকলে ডাকপিয়ন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সাইকেলচালক বা অপরিচিত পথচারীর প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা দিতে পারে। এজন্য স্থানীয় কুকুরের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং সমস্যা দেখা দিলে প্রশিক্ষিত দলের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
৭. বর্জ্য পরিষ্কারে সীমিত ভূমিকা থাকলেও এটিকে সমাধান ভাবা যাবে না
পথকুকুর বাজার ও রাস্তায় পড়ে থাকা কিছু খাদ্যবর্জ্য খেয়ে ফেলে। এর ফলে পচনশীল বর্জ্যের একটি অংশ সাময়িকভাবে কমতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় তারা ইঁদুর বা ক্ষুদ্র ক্ষতিকর প্রাণীকেও তাড়া করে।
কিন্তু এই সুবিধাকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। খোলা বর্জ্য খেয়ে বেঁচে থাকা কুকুর নিজেও অসুস্থ হয়, প্লাস্টিক খায় এবং বর্জ্যের স্তূপে দলবদ্ধ হয়। এতে কামড়, দুর্ঘটনা ও রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পথকুকুরকে ‘প্রাকৃতিক ময়লা পরিষ্কারক’ হিসেবে ব্যবহার করা কোনো আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা নয়। সঠিক সমাধান হলো ঢাকনাযুক্ত বর্জ্যপাত্র, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, বাজারের প্রাণিজ বর্জ্য আলাদাভাবে অপসারণ এবং নির্ধারিত স্থানের বাইরে খাবার না ফেলা।
৮. স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের অংশ—তবে নিয়ন্ত্রণ জরুরি
দীর্ঘদিন ধরে মানুষের বসতির সঙ্গে থাকা কুকুর নগর ও গ্রামীণ সামাজিক পরিবেশের একটি পরিচিত অংশ। তারা মানুষের কাছাকাছি বসবাসের উপযোগী আচরণ গড়ে তুলেছে।
কিন্তু পথকুকুরকে বন্যপ্রাণীর সমতুল্য ‘দেশীয় বন্যপ্রাণী’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। নিয়ন্ত্রণহীন কুকুর কখনো পাখি, হরিণ, শিয়াল বা অন্যান্য বন্যপ্রাণীকে তাড়া, হত্যা কিংবা রোগ সংক্রমণ করতে পারে। বিশেষ করে বন, চর, দ্বীপ, সংরক্ষিত এলাকা ও পরিযায়ী পাখির আবাসে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো কুকুর জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করতে পারে।
তাই শহর ও জনবসতিতে মানবিক ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ—দুটি আলাদা কৌশল প্রয়োজন।
৯. পথকুকুর মানুষের সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে
কুকুরকে খাবার দেওয়া, আহত কুকুরের চিকিৎসা করানো বা একটি বাচ্চাকে দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে মানুষ দায়িত্ব ও সহমর্মিতা শেখে। শিশু-কিশোরেরা প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ শিখলে তাদের মধ্যে সহিংসতার পরিবর্তে সহানুভূতি বাড়তে পারে।
তবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাস্তায় খাবার ছড়িয়ে দেওয়াই দায়িত্বশীল প্রাণীসেবা নয়। এতে কুকুর রাস্তার মাঝখানে জমা হতে পারে, এলাকা নিয়ে লড়াই করতে পারে এবং পথচারীর সমস্যা বাড়াতে পারে। খাবার দিলে নির্দিষ্ট নিরাপদ স্থানে দিতে হবে; অবশিষ্ট খাবার পরিষ্কার করতে হবে এবং কুকুরগুলোর টিকা ও নির্বীজন নিশ্চিত করার উদ্যোগেও অংশ নিতে হবে।
১০. অনেক পথকুকুরকে দত্তক নেওয়া সম্ভব
সব পথকুকুর সারাজীবন রাস্তায় থাকার জন্য জন্মায়নি। যথাযথ চিকিৎসা, টিকা, নির্বীজন, সামাজিকীকরণ ও প্রশিক্ষণ পেলে অনেক স্থানীয় কুকুর চমৎকার পারিবারিক সঙ্গী ও প্রহরী হতে পারে।
দেশি কুকুর সাধারণত স্থানীয় জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত। তাদের অনেকের রোগসহনশীলতা ভালো, পরিচর্যা তুলনামূলক সহজ এবং পাহারার দক্ষতা শক্তিশালী। বিদেশি জাতের কুকুর কেনার পাশাপাশি দেশি পথকুকুর দত্তক নেওয়ার সংস্কৃতি বাড়লে রাস্তায় কুকুরের সংখ্যা মানবিকভাবে কমবে।
দত্তক দেওয়ার আগে কুকুরের স্বাস্থ্য, স্বভাব, টিকা, নির্বীজন এবং নতুন পরিবারের সামর্থ্য যাচাই করা দরকার। শুধু আবেগের কারণে নিয়ে পরে রাস্তায় ছেড়ে দিলে সমস্যা আরও বাড়বে।
পথকুকুর থেকে মানুষের কী কী ঝুঁকি রয়েছে?
সংরক্ষণের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে ঝুঁকি অস্বীকার করা দায়িত্বশীলতা নয়। নিয়ন্ত্রণহীন পথকুকুরের কারণে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা হতে পারে।
জলাতঙ্ক
জলাতঙ্ক পথকুকুর নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ। আক্রান্ত কুকুরের আচরণ অস্বাভাবিক হতে পারে—অকারণে কামড়ানো, অতিরিক্ত লালা, পানি বা খাবার গিলতে অসুবিধা, দুর্বলতা, চলাফেরায় ভারসাম্যহীনতা কিংবা অস্বাভাবিক নিস্তেজতাতা দেখা দিতে পারে।
তবে সব আক্রমণাত্মক কুকুর জলাতঙ্কে আক্রান্ত নয় এবং সব আক্রান্ত কুকুর অতিরিক্ত আক্রমণাত্মকও হয় না। সন্দেহজনক কুকুর দেখলে কাছে না গিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা পশুচিকিৎসা বিভাগকে জানাতে হবে।
কামড় ও তাড়া করা
প্রজনন মৌসুম, বাচ্চা রক্ষা, খাবার নিয়ে প্রতিযোগিতা, অসুস্থতা, পূর্বের নির্যাতন কিংবা এলাকা রক্ষার কারণে কুকুর কামড়াতে পারে। মোটরসাইকেল ও সাইকেল তাড়া করার কারণে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
রাতের শব্দ
দলগত লড়াই, প্রজনন, অপরিচিত কুকুরের আগমন অথবা অস্বাভাবিক চলাচলের কারণে রাতে কুকুরের ডাক বেড়ে যেতে পারে। নির্বীজন ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই সমস্যা কমাতে সহায়ক।
মলমূত্র ও পরজীবী
কুকুরের মল পরিষ্কার না হলে পরিবেশ দূষিত হতে পারে। টিক, উকুন, কৃমি এবং কিছু চর্মরোগের ঝুঁকিও থাকে। এজন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কৃমিনাশক ও এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখা প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণীর ক্ষতি
বন বা জলাভূমির কাছে দলবদ্ধ কুকুর বন্যপ্রাণীকে তাড়া বা আক্রমণ করতে পারে। সংরক্ষিত এলাকায় পথকুকুরের অবাধ প্রবেশ বন্ধ করতে হবে।
কুকুর কামড়ালে কী করবেন?
কুকুরের কামড়কে কখনো ছোট ঘটনা ভেবে অবহেলা করা যাবে না—এমনকি ক্ষত অল্প হলেও।
১. ক্ষতটি সঙ্গে সঙ্গে সাবান ও প্রচুর প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুতে হবে।
২. সম্ভব হলে আয়োডিনজাত জীবাণুনাশক ব্যবহার করা যায়।
৩. মরিচ, চুন, ছাই, তেল, হলুদ, গাছের রস বা অন্য কোনো উপাদান ক্ষতে লাগানো যাবে না।
৪. ক্ষত শক্ত করে বেঁধে রাখা বা নিজে থেকে সেলাই করা উচিত নয়।
৫. যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতাল বা নির্ধারিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধ কেন্দ্রে যেতে হবে।
৬. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা এবং প্রয়োজন হলে ক্ষতের মধ্যে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন নিতে হবে।
৭. টিটেনাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে।
৮. কুকুরটি পরিচিত হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টিকা বাদ দেওয়া যাবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্ষতটি কমপক্ষে ১৫ মিনিট সাবান ও পানি দিয়ে ধোয়া এবং দ্রুত কামড়-পরবর্তী চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। WHO—Rabies fact sheet
পথকুকুর দেখলে কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?
- অপরিচিত কুকুরকে হঠাৎ স্পর্শ করবেন না।
- খাওয়ার সময় বা বাচ্চার পাশে থাকা কুকুরের কাছে যাবেন না।
- ঘুমন্ত বা আহত কুকুরকে বিরক্ত করবেন না।
- কুকুর তাড়া করলে দৌড় না দিয়ে শান্তভাবে স্থির থাকার চেষ্টা করুন।
- সরাসরি চোখে চোখ রেখে ভয় দেখাবেন না।
- কুকুরের দিকে পাথর ছোড়ার ভঙ্গি করবেন না।
- শিশুদের একা অপরিচিত কুকুরের কাছে যেতে দেবেন না।
- কুকুরের দল দেখলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পথ পরিবর্তন করুন।
- মোটরসাইকেল বা সাইকেল তাড়া করলে সম্ভব হলে গতি কমিয়ে নিরাপদভাবে এলাকা পার হন।
- অসুস্থ বা অস্বাভাবিক আচরণকারী কুকুরের তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানান।
শিশুরা কুকুরের উচ্চতার কাছাকাছি হওয়ায় কামড়ালে মুখ ও মাথায় আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই বিদ্যালয়ে কুকুরের আচরণ ও কামড় প্রতিরোধ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
পথকুকুর সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদ্ধতি
১. এলাকার কুকুর গণনা ও মানচিত্র তৈরি
প্রতিটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়নে কত কুকুর আছে, কোথায় বেশি জমায়েত হয়, কতটি স্ত্রী ও পুরুষ, কতটি টিকাপ্রাপ্ত ও নির্বীজিত—এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। অনুমাননির্ভর কর্মসূচির পরিবর্তে ডিজিটাল তথ্যভান্ডার প্রয়োজন।
২. ব্যাপক জলাতঙ্ক টিকাদান
ওয়ার্ডভিত্তিক দল গঠন করে অল্প সময়ের মধ্যে অধিকাংশ কুকুরকে টিকা দিতে হবে। টিকাপ্রাপ্ত কুকুরের দৃশ্যমান চিহ্ন এবং ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে হবে। প্রয়োজনীয় সময় পর পুনরায় টিকাদানের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
৩. পরিকল্পিত নির্বীজন
শুধু স্ত্রী নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী পুরুষ কুকুরকেও নির্বীজনের আওতায় আনতে হবে। অস্ত্রোপচারের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ব্যথানাশক ও সংক্রমণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. একই এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়া
সুস্থ হওয়ার পর কুকুরকে সাধারণত তার পরিচিত এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়া জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক। তবে ব্যস্ত মহাসড়ক, বিমানবন্দর, হাসপাতালের সংবেদনশীল এলাকা, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য বা সংঘাতপ্রবণ স্থানে বিশেষ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
৫. অসুস্থ ও বিপজ্জনক কুকুরের পৃথক ব্যবস্থা
আহত, জলাতঙ্ক-সন্দেহজনক, গুরুতর অসুস্থ বা ধারাবাহিকভাবে মানুষকে কামড়ায় এমন কুকুরকে প্রশিক্ষিত দল দিয়ে নিরাপদভাবে ধরতে হবে। পশুচিকিৎসক আচরণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসন অথবা আইনসম্মত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।
৬. দায়িত্বশীল মালিকানা
পোষা কুকুরের নিবন্ধন, টিকা, পরিচয়চিহ্ন, প্রজনন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিত্যাগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কুকুর হারিয়ে গেলে বা মালিকানা পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো উচিত।
৭. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
হোটেল, বাজার, হাসপাতাল, কসাইখানা ও বাসাবাড়ির খাদ্যবর্জ্য খোলা স্থানে রাখা বন্ধ করতে হবে। বর্জ্যের উৎস নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শুধু কুকুর ধরে বা নির্বীজন করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যাবে না।
৮. দত্তক ও পুনর্বাসন
সামাজিকীকরণযোগ্য বাচ্চা, আহত কুকুর এবং পরিত্যক্ত পোষা কুকুরকে অগ্রাধিকার দিয়ে দত্তকের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে হাজার হাজার সুস্থ কুকুরকে দীর্ঘদিন ছোট আশ্রয়কেন্দ্রে আটকে রাখা বাস্তবসম্মত বা প্রাণিকল্যাণসম্মত নয়।
৯. নাগরিক অভিযোগ ও জরুরি সেবা
প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে একটি ফোন নম্বর বা ডিজিটাল অভিযোগব্যবস্থা থাকা দরকার। আহত কুকুর, কামড়, জলাতঙ্ক-সন্দেহ কিংবা স্কুলের সামনে কুকুরের দল—এসব অভিযোগ দ্রুত যাচাই করতে হবে।
১০. ‘ওয়ান হেলথ’ সমন্বয়
স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ বিভাগ, পশুচিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাণিকল্যাণ সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করাই ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির মূল কথা।
শুধু আশ্রয়কেন্দ্র বানালেই কি সমাধান হবে?
আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন, কিন্তু সব পথকুকুর ধরে সেখানে রাখাই স্থায়ী সমাধান নয়। একটি আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা, খাবার, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা, প্রশিক্ষিত কর্মী ও অর্থের সীমাবদ্ধতা থাকে। ধারণক্ষমতার বেশি কুকুর রাখলে রোগ, লড়াই, মানসিক চাপ এবং মৃত্যুহার বাড়তে পারে।
আশ্রয়কেন্দ্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—
- আহত ও অসুস্থ কুকুর;
- পরিত্যক্ত পোষা কুকুর;
- মা-হারা বাচ্চা;
- চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন এমন কুকুর;
- দত্তকযোগ্য কুকুর;
- পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন এমন কামড়ানো কুকুর।
সুস্থ, টিকাপ্রাপ্ত, নির্বীজিত ও এলাকায় গ্রহণযোগ্য কুকুরকে অনির্দিষ্টকাল খাঁচায় রাখার পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থাপনা করা অধিক বাস্তবসম্মত।
মানুষ ও কুকুরের মধ্যে সংঘাত কমাতে স্থানীয় মডেল
প্রতিটি ওয়ার্ডে ‘কমিউনিটি ডগ ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এর অধীনে—
- স্থানীয় কুকুরের ছবি ও সংখ্যা নিবন্ধন;
- টিকা ও নির্বীজনের তারিখ সংরক্ষণ;
- দুই বা তিনজন দায়িত্বশীল স্বেচ্ছাসেবক নির্বাচন;
- নির্দিষ্ট নিরাপদ স্থানে পরিমিত খাবার দেওয়া;
- খাবারের পর স্থান পরিষ্কার করা;
- আক্রমণাত্মক আচরণের তথ্য জানানো;
- বাচ্চা কুকুরের দত্তক ব্যবস্থা;
- স্কুল ও বাজারে সচেতনতা কার্যক্রম;
- নতুন বা পরিত্যক্ত কুকুর শনাক্ত করা।
এতে স্থানীয় মানুষ জানতে পারবেন কোন কুকুরটি টিকাপ্রাপ্ত, কোনটি নতুন এসেছে এবং কোনটির চিকিৎসা প্রয়োজন। অপরিচিত কুকুরের অনুপ্রবেশও দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।
পথকুকুর সংরক্ষণে নাগরিকদের করণীয়
১. কুকুরকে মারধর, বিষ প্রয়োগ বা গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করবেন না।
২. আহত কুকুর দেখলে পশুচিকিৎসক বা প্রাণিকল্যাণ সংগঠনকে জানান।
৩. খাবার দিলে রাস্তার মাঝখানে নয়, নিরাপদ ও নির্দিষ্ট স্থানে দিন।
৪. অবশিষ্ট খাবার, প্লাস্টিক ও পাত্র পরিষ্কার করুন।
৫. এলাকার কুকুরের টিকা ও নির্বীজন কর্মসূচিতে সহযোগিতা করুন।
৬. সম্ভব হলে একটি দেশি কুকুর দত্তক নিন।
৭. পোষা কুকুরকে রাস্তায় ছেড়ে দেবেন না।
৮. শিশুদের কুকুরের সঙ্গে নিরাপদ আচরণ শেখান।
৯. কামড়ের ঘটনা গোপন না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
১০. জলাতঙ্ক-সন্দেহজনক কুকুর নিজে ধরতে যাবেন না।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়ন
পথকুকুর নিয়ে বিতর্কে দুটি চরম অবস্থান দেখা যায়। এক পক্ষ সব কুকুরকে বিপজ্জনক মনে করে হত্যা বা উচ্ছেদের দাবি করেন। অন্য পক্ষ কখনো মানুষের কামড়, জলাতঙ্ক, দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত ক্ষতির বাস্তব উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। কোনো অবস্থানই পূর্ণাঙ্গ সমাধান দেয় না।
গবেষণার আলোকে সবচেয়ে কার্যকর নীতি হলো—সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তাকে একসঙ্গে পরিচালনা করা। সুস্থ ও শান্ত কুকুরকে টিকা ও নির্বীজন করে স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। আহত কুকুরকে চিকিৎসা, দত্তকযোগ্য কুকুরকে পরিবার এবং বিপজ্জনক বা জলাতঙ্ক-সন্দেহজনক কুকুরকে দ্রুত পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
কুকুরের সংখ্যা বাড়ার মূল উৎস—খোলা খাদ্যবর্জ্য, পোষা কুকুর পরিত্যাগ এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন—বন্ধ না করে শুধু রাস্তার কুকুর সরালে সমস্যার সমাধান হবে না। একইভাবে শুধু খাবার দেওয়া কিন্তু টিকা, নির্বীজন ও পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব না নেওয়াও প্রকৃত প্রাণিকল্যাণ নয়।
শেষ কথা
পথকুকুর সংরক্ষণ করা দরকার, কারণ তারা অনুভূতিশীল প্রাণী, মানুষের দীর্ঘদিনের সহচর এবং আমাদেরই তৈরি সামাজিক পরিবেশের অংশ। কিন্তু তাদের সংরক্ষণ অবশ্যই দায়িত্বশীল ও বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে।
নির্বিচারে হত্যা সাময়িকভাবে রাস্তা ফাঁকা দেখাতে পারে; কিন্তু খাদ্যবর্জ্য, পরিত্যাগ ও অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন চলতে থাকলে নতুন কুকুর সেই স্থান পূরণ করবে। বিপরীতে ব্যাপক টিকাদান মানুষের জলাতঙ্কের ঝুঁকি কমায়, নির্বীজন জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কুকুরের অনিয়ন্ত্রিত জমায়েত কমায় এবং দত্তক গ্রহণ পথকুকুরকে নিরাপদ পরিবার দেয়।
আমার গবেষণার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো—পথকুকুর সংরক্ষণ মানে মানুষের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা নয়; বরং টিকা, নির্বীজন, চিকিৎসা, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে মানুষ ও কুকুরের জন্য একটি নিরাপদ সহাবস্থান তৈরি করা। সভ্যতার পরিচয় পথকুকুরহীন শহর নয়—জলাতঙ্কমুক্ত, নিয়ন্ত্রিত এবং নিষ্ঠুরতামুক্ত শহর।

তথ্যসূত্র
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা—জলাতঙ্ক ও কামড়-পরবর্তী চিকিৎসা
২. WHO South-East Asia—Zero Rabies Deaths by 2030
৩. বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা—কুকুরের সংখ্যা ব্যবস্থাপনা
৪. বাংলাদেশের প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯
৫. The Lancet Regional Health—বাংলাদেশের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ






















