RRP
agriculture news24.com
Health Care
Agriculture News
diamond egg
renata-ltd.com
Space for Add
Agriculture News
Spech for Promotion
avonah
Monday , 31 August 2026 |
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুরগির খামার–হ্যাচারি–কোম্পানি ব্রাজিলের জেবিএস।।

প্রতিবেদক
Dr. Bayezid Moral
August 31, 2026 12:08 am

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুরগির খামার–হ্যাচারি–কোম্পানি ব্রাজিলের জেবিএস।।

ছোট ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ৪৪৪ কোটি ব্রয়লার উৎপাদনের বিশ্বজয়।।প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, খামার–হ্যাচারি নেটওয়ার্ক, ঝুঁকি, দেউলিয়াত্ব, লোকসান, পুনরুদ্ধার ও বর্তমান অবস্থান।।

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একক মুরগির শেড বা একক হ্যাচারি কোনটি—এ বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্ভরযোগ্য র‌্যাঙ্কিং নেই। কারণ বড় পোল্ট্রি কোম্পানিগুলো সাধারণত হাজার হাজার নিজস্ব ও চুক্তিভিত্তিক খামার, ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারি, ফিডমিল, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এবং বিপণনব্যবস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়।

বার্ষিক ব্রয়লার উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাত মুরগির সংখ্যার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের Poultry International/WATT Global Media র‌্যাঙ্কিংয়ে ব্রাজিলভিত্তিক JBS বা জেবিএস-কে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্রয়লার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক পোল্ট্রি কার্যক্রমের সঙ্গে প্রধানত যুক্ত—

  • ব্রাজিলের Seara
  • যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও ইউরোপের Pilgrim’s
  • বিভিন্ন দেশের নিজস্ব ও চুক্তিভিত্তিক ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারি ও ব্রয়লার খামার

র‌্যাঙ্কিংয়ের হিসাব অনুযায়ী, জেবিএস পোল্ট্রি প্ল্যাটফর্ম বছরে আনুমানিক ৪.৪৩৬ বিলিয়ন বা প্রায় ৪৪৩ কোটি ৬০ লাখ ব্রয়লার উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাত করে। এই সংখ্যা কোম্পানির সব পোল্ট্রি ইউনিটের সম্মিলিত আনুমানিক উৎপাদন; এটি একটি একক খামারের উৎপাদন নয়। Poultry International-এর বৃহত্তম ব্রয়লার কোম্পানি র‌্যাঙ্কিং


১. জেবিএসের সূচনা: একটি ছোট কসাইখানা থেকে বিশ্বসেরা খাদ্য কোম্পানি

জেবিএসের যাত্রা সরাসরি মুরগির খামার দিয়ে শুরু হয়নি। ১৯৫৩ সালে ব্রাজিলের গোইয়াস রাজ্যের আনাপোলিস শহরে José Batista Sobrinho একটি ছোট পশু জবাই ও মাংস বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। প্রতিষ্ঠাতার নামের আদ্যক্ষর থেকেই পরে কোম্পানির নাম হয় JBS

ব্রাজিলের নতুন রাজধানী ব্রাসিলিয়া নির্মাণের সময় ওই অঞ্চলে শ্রমিক ও মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে মাংসের চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জেবিএস এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে—

  • পশু সংগ্রহব্যবস্থা গড়ে তোলে;
  • জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতা বাড়ায়;
  • অন্য প্রতিষ্ঠানের কারখানা অধিগ্রহণ করে;
  • দেশীয় বাজার থেকে রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করে;
  • গরুর মাংসের পাশাপাশি মুরগি, শূকর ও প্রস্তুত খাবারে বিনিয়োগ করে।

অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি শুরুতেই “পৃথিবীর সবচেয়ে বড়” হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হয়নি। স্থানীয় বাজারের একটি বাস্তব চাহিদা পূরণ করতে করতে অধিগ্রহণ, প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এটি বিশাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।


২. মুরগির ব্যবসায় জেবিএসের প্রবেশ

জেবিএস মূলত গরুর মাংসের কোম্পানি ছিল। পোল্ট্রি খাতে বিশ্ব নেতৃত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে দুটি সিদ্ধান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Pilgrim’s Pride অধিগ্রহণ

২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ মুরগি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান Pilgrim’s Pride দেউলিয়া সুরক্ষার জন্য আবেদন করে। কারণ ছিল—

  • ভুট্টা ও সয়াবিনসহ খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি;
  • বাজারে মুরগির অতিরিক্ত সরবরাহ;
  • মুরগির মাংসের কম দাম;
  • অতিরিক্ত ঋণ;
  • দ্রুত ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রসারণ।

২০০৯ সালে জেবিএস প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে পুনর্গঠিত Pilgrim’s-এর ৬৪ শতাংশ মালিকানা নেয়। এর ফলে Pilgrim’s দেউলিয়াত্ব থেকে বেরিয়ে আসে এবং জেবিএস সরাসরি উত্তর আমেরিকার বিশাল পোল্ট্রি বাজারে প্রবেশ করে। Pilgrim’s পুনর্গঠন ও জেবিএসের বিনিয়োগ

Seara অধিগ্রহণ

ব্রাজিলের Seara ১৯৫৬ সালে সান্তা ক্যাটারিনা রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ধীরে ধীরে মুরগি, শূকর, সসেজ, হিমায়িত খাবার ও প্রস্তুত খাদ্যের বড় ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।

২০১৩ সালে জেবিএস Seara অধিগ্রহণ করে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্রাজিলের পোল্ট্রি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং আন্তর্জাতিক মুরগির মাংস রপ্তানিতে নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানে পৌঁছে যায়। জেবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস


৩. Pilgrim’s-এর সূচনা ছিল মাত্র ৩,৫০০ ডলারে

জেবিএসের বর্তমান পোল্ট্রি সাম্রাজ্যের অন্যতম ভিত্তি Pilgrim’s-এর ইতিহাসও অত্যন্ত শিক্ষণীয়।

১৯৪৬ সালের ২ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের পিটসবার্গে Aubrey Pilgrim ও Pat Johns মাত্র ৩,৫০০ ডলার দিয়ে একটি ছোট ফিড ও বীজের দোকান কেনেন। পরে Aubrey-এর ভাই Lonnie “Bo” Pilgrim ব্যবসায় যোগ দেন।

তখন তাদের একটি জনপ্রিয় ব্যবসায়িক কৌশল ছিল—এক বস্তা মুরগির খাদ্যের সঙ্গে কৃষকদের প্রায় ১০০টি বাচ্চা দেওয়া। কৃষকেরা বাড়িতে বা ছোট খামারে বাচ্চাগুলো পালন করতেন। ফলে একই সঙ্গে—

  • ফিডের বিক্রি বাড়ত;
  • মুরগির বাচ্চার চাহিদা তৈরি হতো;
  • স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠত;
  • ভবিষ্যৎ চুক্তিভিত্তিক খামারি নেটওয়ার্কের ভিত্তি তৈরি হতো।

এই ছোট ফিডের দোকানই পরে ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারি, ফিডমিল, ব্রয়লার খামার এবং মুরগি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। Pilgrim’s-এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস


৪. জেবিএস কেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড়?

৪.১ বিপুলসংখ্যক মুরগি উৎপাদন

আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি র‌্যাঙ্কিং অনুসারে জেবিএসের পোল্ট্রি ইউনিটগুলো বছরে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪৪৪ কোটি ব্রয়লার উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাত করে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২১ লাখের বেশি মুরগির সমপরিমাণ উৎপাদনক্ষমতা।

তবে এটি ক্যালেন্ডারভিত্তিক গড় হিসাব; প্রতিদিন একই সংখ্যক মুরগি জবাই হয়—এমন নয়।

৪.২ বিশাল হ্যাচারি ও খামারি নেটওয়ার্ক

শুধু Pilgrim’s-এর ২০২৪ সালের তথ্যেই ছিল—

কার্যক্রমসংখ্যা
চুক্তিভিত্তিক খামারিপ্রায় ৪,৫০০
ফিডমিল৩৫টি
হ্যাচারি৪৯টি
মুরগি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা৩৯টি
প্রস্তুত খাবার কারখানা৩০টি
বিতরণকেন্দ্র২৯টি
প্রোটিন রূপান্তর কেন্দ্র১২টি
পোষা প্রাণীর খাদ্য কারখানা৫টি

২০২৫ সালের মার্চে Pilgrim’s-এর সপ্তাহে প্রায় ৪ কোটি ১৩ লাখ মুরগি প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা এবং প্রায় ৬২,৬০০ কর্মী ছিল। Pilgrim’s-এর SEC প্রতিবেদন

এর সঙ্গে ব্রাজিলের Seara এবং জেবিএসের অন্যান্য দেশের কার্যক্রম যোগ করলে সামগ্রিক নেটওয়ার্ক আরও অনেক বড়।

৪.৩ সম্পূর্ণ সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা

জেবিএস শুধু খামার থেকে মুরগি কিনে বিক্রি করে না। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ বা তত্ত্বাবধানে রয়েছে—





এই ব্যবস্থায় কোম্পানি বাচ্চা, খাদ্য, স্বাস্থ্যনীতি ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে চুক্তিবদ্ধ খামারি সাধারণত শেড, শ্রম, পানি, বিদ্যুৎ ও দৈনন্দিন পরিচর্যা দেন।

৪.৪ একই পণ্য নয়—বহুমুখী বাজার

কোম্পানিটি শুধু আস্ত বা কাটা মুরগি বিক্রি করে না। এর পণ্যের মধ্যে রয়েছে—

  • তাজা ও হিমায়িত মুরগি;
  • ব্রেস্ট, লেগ, উইং ও অন্যান্য কাট;
  • নাগেটস;
  • বার্গার প্যাটি;
  • সসেজ;
  • ব্রেডেড চিকেন;
  • রান্নার জন্য প্রস্তুত খাবার;
  • সম্পূর্ণ রান্না করা মুরগির পণ্য;
  • হালাল পণ্য;
  • রেস্তোরাঁ ও খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ পণ্য;
  • প্রক্রিয়াজাত উপাদান থেকে পেট ফুড ও অন্যান্য উপজাত।

কাঁচা মুরগির তুলনায় প্রস্তুত ও ব্র্যান্ডেড খাবারে লাভের হার সাধারণত বেশি। তাই জেবিএস পরিমাণের পাশাপাশি মূল্য সংযোজনেও গুরুত্ব দিয়েছে।


৫. সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: দ্রুত সম্প্রসারণ

জেবিএস ও Pilgrim’s উভয় প্রতিষ্ঠানই বড় হওয়ার পথে আগ্রাসীভাবে অন্য কোম্পানি ও কারখানা কিনেছে। এই কৌশলে দ্রুত বাজার পাওয়া যায়, কিন্তু কয়েকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়—

  • বিপুল ঋণের চাপ;
  • নতুন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা একীভূত করার সমস্যা;
  • এক দেশের লোকসান অন্য দেশের মুনাফাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা;
  • বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদন;
  • ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়া;
  • বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা;
  • প্রতিযোগিতা ও দুর্নীতিবিরোধী আইনের ঝুঁকি।

Pilgrim’s-এর ক্ষেত্রে বড় অধিগ্রহণ ও ঋণনির্ভর সম্প্রসারণই ২০০৮ সালের সংকটকে আরও ভয়াবহ করেছিল।


৬. Pilgrim’s কীভাবে দেউলিয়া হয়েছিল?

২০০৮ সালে Pilgrim’s Pride যুক্তরাষ্ট্রের Chapter 11 bankruptcy protection-এর আবেদন করে। এটি সরাসরি ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং আদালতের তত্ত্বাবধানে ঋণ পুনর্গঠন করে প্রতিষ্ঠানকে সচল রাখার ব্যবস্থা।

দেউলিয়া হওয়ার প্রধান কারণ ছিল—

উচ্চ খাদ্যমূল্য

মুরগি উৎপাদন খরচের সবচেয়ে বড় অংশ খাদ্য। ভুট্টা ও সয়াবিনের দাম দ্রুত বাড়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

মুরগির কম বাজারদর

উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে মুরগির দাম একই হারে বাড়েনি। অতিরিক্ত সরবরাহ মূল্য আরও কমিয়ে দেয়।

অতিরিক্ত ঋণ

বড় কোম্পানি ও কারখানা অধিগ্রহণের জন্য নেওয়া ঋণ প্রতিষ্ঠানটির নগদ অর্থপ্রবাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

উৎপাদন দ্রুত কমাতে না পারা

ডিম, বাচ্চা, ব্রয়লার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ—পুরো উৎপাদনচক্র আগে থেকে পরিকল্পিত থাকে। বাজারে দাম কমে গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বন্ধ করা যায় না।


৭. দেউলিয়াত্ব থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়?

Pilgrim’s-এর পুনরুদ্ধারে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

উৎপাদন কমানো

লোকসানি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ সামঞ্জস্য করা হয়।

অদক্ষ কারখানা বন্ধ বা বিক্রি

কম উৎপাদনশীল ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল কিছু কারখানা বন্ধ বা বিক্রি করা হয়।

ঋণ পুনর্গঠন

আদালতের তত্ত্বাবধানে ঋণ, পরিশোধের সময়সূচি এবং মূলধন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়।

জেবিএসের নতুন মূলধন

জেবিএসের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কোম্পানিকে দেউলিয়াত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করে।

ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা

কারখানার দক্ষতা, খাদ্য রূপান্তর হার, মৃত্যু, শ্রম ব্যয়, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং নগদ অর্থপ্রবাহের ওপর বেশি নজর দেওয়া হয়।

প্রস্তুত খাবারে বিনিয়োগ

শুধু কম দামের কাঁচা মুরগির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্র্যান্ডেড ও মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্য বাড়ানো হয়।

২০০৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে Pilgrim’s দেউলিয়া সুরক্ষা থেকে বেরিয়ে আসে। তখন প্রতিষ্ঠানটিকে আগের তুলনায় “শক্তিশালী, কম ব্যয়বহুল এবং উন্নত মূলধন কাঠামোর কোম্পানি” হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়েছিল।


৮. জেবিএস কি কখনো বড় লোকসানের মুখে পড়েছিল?

হ্যাঁ। ২০২৩ সাল জেবিএস ও বিশেষ করে Seara-এর জন্য কঠিন ছিল। প্রধান কারণ ছিল—

  • বিশ্ববাজারে পোল্ট্রির অতিরিক্ত সরবরাহ;
  • বছরের প্রথমার্ধে শস্য ও খাদ্যের বেশি দাম;
  • নতুন কারখানা ও উৎপাদনক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারা;
  • পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও বিতরণে দুর্বলতা;
  • উচ্চ ঋণ ও সুদ;
  • যুক্তরাষ্ট্রের গরুর মাংস ব্যবসায় নেতিবাচক পরিস্থিতি।

২০২৩ সালে পুরো জেবিএস গ্রুপ প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ নিট লোকসান করে। এটি শুধু মুরগি ব্যবসার লোকসান ছিল না; গ্রুপের সব ব্যবসার সম্মিলিত ফল।


৯. Seara কীভাবে ঘুরে দাঁড়াল?

Seara-এর পুনরুদ্ধারে জেবিএস কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ নেয়—

  • কম দক্ষ ইউনিটের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস;
  • খামার থেকে কারখানা পর্যন্ত উৎপাদন পরিকল্পনার সমন্বয়;
  • ফিড ও অন্যান্য কাঁচামালের ব্যবহার দক্ষ করা;
  • কারখানার অব্যবহৃত সক্ষমতা কাজে লাগানো;
  • পণ্যের মূল্য পুনর্নির্ধারণ;
  • কম লাভজনক পণ্য কমিয়ে বেশি লাভের পণ্য বাড়ানো;
  • ব্র্যান্ড ও বাজারজাতকরণ শক্তিশালী করা;
  • প্রস্তুত ও মূল্য সংযোজিত খাদ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি;
  • মজুত, পরিবহন ও গ্রাহকসেবা উন্নত করা।

ফলে ২০২৪ সালে Seara-এর নিট রাজস্ব প্রায় ৮.৮ বিলিয়ন ডলার এবং সমন্বিত EBITDA প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার হয়। আগের বছরের তুলনায় EBITDA প্রায় ৩২২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একই বছরে Pilgrim’s-এর রাজস্ব ছিল প্রায় ১৭.৯ বিলিয়ন ডলারজেবিএসের ২০২৪ সালের ফলাফল

২০২৪ সালে পুরো জেবিএস গ্রুপ ২০২৩ সালের লোকসান কাটিয়ে আবার প্রায় ৯.৬১৫ বিলিয়ন ব্রাজিলিয়ান রিয়াল নিট মুনাফায় ফিরে আসে।


১০. রোগব্যাধি ও জীবাণু নিরাপত্তার ঝুঁকি

বিশাল পোল্ট্রি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে ভয়াবহ ঝুঁকির একটি হলো এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু। একটি অঞ্চলে রোগ শনাক্ত হলে—

  • পাখি নিধন করতে হতে পারে;
  • খামারে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়;
  • হ্যাচিং এগ ও বাচ্চা পরিবহন ব্যাহত হয়;
  • আমদানিকারক দেশ নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে;
  • কয়েক মাসের জন্য রপ্তানি বাজার হারাতে হয়;
  • বাজারে কোম্পানির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

২০২৫ সালে ব্রাজিলে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হওয়ার পর চীন ও ইউরোপসহ কয়েকটি বাজার ব্রাজিলীয় মুরগির ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তা সত্ত্বেও Seara দেশীয় বাজার, বিকল্প রপ্তানি গন্তব্য এবং বহুমুখী পণ্যের কারণে বড় ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম হয়।

এখান থেকে বোঝা যায়, শুধু খামারের জীবাণু নিরাপত্তা নয়—একাধিক অঞ্চল ও বাজারে উপস্থিত থাকাও ব্যবসায়িক সুরক্ষার অংশ।


১১. আইনগত ও সুনামের ঝুঁকি

জেবিএসের ইতিহাস শুধু সাফল্যের নয়। প্রতিষ্ঠান ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সময়ে—

  • দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগ;
  • প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের মামলা;
  • মূল্য নির্ধারণে যোগসাজশের অভিযোগ;
  • শ্রমিক নিরাপত্তা;
  • পরিবেশ ও বন উজাড়সংক্রান্ত সমালোচনা;
  • পশুকল্যাণ ও সরবরাহশৃঙ্খলের স্বচ্ছতা

নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।

এসব ঘটনা দেখায়, বড় উৎপাদনক্ষমতা কোনো কোম্পানিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদর্শ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে না। খাদ্যনিরাপত্তা, শ্রম অধিকার, পরিবেশ, পশুকল্যাণ, আইন মেনে চলা এবং তথ্যের স্বচ্ছতাও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অপরিহার্য অংশ।


১২. বর্তমানে জেবিএসের অবস্থান

২০২৫ অর্থবছরে জেবিএস গ্রুপ রেকর্ড প্রায় ৮৬.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব এবং প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা অর্জনের কথা জানিয়েছে। এর পেছনে Pilgrim’s, Seara ও অস্ট্রেলীয় ব্যবসার শক্তিশালী অবদান ছিল। জেবিএসের ২০২৫ সালের ফলাফল

২০২৫ সালে শুধু Pilgrim’s অংশের নিট রাজস্ব ছিল প্রায় ১৮.৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে Pilgrim’s-এর কার্যক্রম রয়েছে—

  • যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি রাজ্যে;
  • মেক্সিকো;
  • পুয়ের্তো রিকো;
  • যুক্তরাজ্য;
  • ফ্রান্স;
  • নেদারল্যান্ডস;
  • আয়ারল্যান্ডে।

অন্যদিকে Seara ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বাজারে পরিচিত। সৌদি আরবে Seara ইতোমধ্যে শীর্ষস্থানীয় মাংসের ব্র্যান্ডগুলোর একটি হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছে।


১৩. বিশ্বব্যাপী পরিচিতির কারণ

জেবিএসের নাম সব দেশের সাধারণ ভোক্তার কাছে সমান পরিচিত নয়। কারণ কোম্পানি অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব করপোরেট নামের পরিবর্তে আঞ্চলিক ব্র্যান্ডে পণ্য বিক্রি করে। যেমন—

  • Seara
  • Pilgrim’s
  • Just Bare
  • Gold’n Plump
  • Moy Park
  • Richmond
  • Fridge Raiders
  • বিভিন্ন দেশের সুপারশপের নিজস্ব ব্র্যান্ড

বিশ্বজুড়ে পরিচিত হওয়ার প্রধান কারণ—

১. বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্রয়লার উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ;
২. একাধিক মহাদেশে উৎপাদনকেন্দ্র;
৩. হাজার হাজার চুক্তিভিত্তিক খামারি;
৪. বিশাল হ্যাচারি ও ফিডমিল নেটওয়ার্ক;
৫. হালালসহ বিভিন্ন বাজারের উপযোগী পণ্য;
৬. কাঁচা মাংস থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত খাবার পর্যন্ত বৈচিত্র্য;
৭. সুপারশপ, রেস্তোরাঁ ও আন্তর্জাতিক খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরবরাহ সম্পর্ক;
৮. সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে লাভজনক করার সক্ষমতা।


১৪. জেবিএস মডেলের শক্তি

বহুদেশে কার্যক্রম

এক দেশে রোগ, মুদ্রাস্ফীতি বা আমদানি নিষেধাজ্ঞা দেখা দিলে অন্য দেশের ব্যবসা ক্ষতি কিছুটা সামাল দিতে পারে।

বহুমুখী প্রোটিন

গরু, মুরগি, শূকর, ভেড়া ও প্রস্তুত খাবারের ব্যবসা থাকায় শুধু একটি প্রাণিজ পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না।

চুক্তিভিত্তিক খামার

সব শেড নিজের অর্থে নির্মাণ না করে স্থানীয় খামারিদের অবকাঠামো কাজে লাগানো যায়। এতে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

ব্যাপক উৎপাদনের সুবিধা

বিপুল পরিমাণ ভুট্টা, সয়াবিন, ওষুধ, প্যাকেজিং ও পরিবহনসেবা কেনায় তুলনামূলক কম খরচে দরকষাকষি করা যায়।

তথ্য ও প্রযুক্তি

মুরগির দৈনিক ওজন, খাদ্য গ্রহণ, পানির ব্যবহার, মৃত্যু, পরিবেশ, কারখানার ফলন এবং বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


১৫. এই মডেলের দুর্বলতা

বিশাল আকারের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ঝুঁকিও বিশাল—

  • খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও মোট খরচ বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়;
  • রোগ ছড়ালে বড়সংখ্যক পাখি ও বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়;
  • হাজার হাজার খামারির মান একরকম রাখা কঠিন;
  • অতিরিক্ত ঋণ কোম্পানিকে সংকটে ফেলতে পারে;
  • বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদন হলে মূল্য দ্রুত পড়ে যায়;
  • শ্রমিক, পরিবেশ ও পশুকল্যাণের একটি ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে;
  • রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বিশাল উৎপাদনকে দেশীয় বাজারে ঠেলে দিয়ে দাম কমিয়ে দিতে পারে।

১৬. বাংলাদেশের খামারি ও উদ্যোক্তাদের জন্য শিক্ষা

জেবিএসের ইতিহাস থেকে বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে।

একবারে বড় হওয়ার প্রয়োজন নেই

JBS ছোট মাংসের ব্যবসা এবং Pilgrim’s ছোট ফিডের দোকান থেকে শুরু হয়েছিল। প্রথমে দক্ষ ও লাভজনক মডেল গড়ে তুলে পরে সম্প্রসারণই তুলনামূলক নিরাপদ।

উৎপাদনের আগে বাজার নিশ্চিত করতে হবে

শুধু বেশি বাচ্চা বা মুরগি উৎপাদন করলে চলবে না। কাকে, কোন দামে এবং কোন ধরনের পণ্য বিক্রি করা হবে—তা আগে জানতে হবে।

অতিরিক্ত ঋণ বিপজ্জনক

দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য ঋণ নেওয়া যায়, কিন্তু খাদ্যের দাম বৃদ্ধি বা বাজারদর পতনের ধাক্কা সহ্য করার মতো নগদ অর্থ থাকতে হবে।

ফিড–হ্যাচারি–খামারের সমন্বয় দরকার

হ্যাচারির বাচ্চা উৎপাদন, ফিডমিলের খাদ্য এবং বাজারে ব্রয়লারের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে পুরো শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কাঁচা মুরগির বাইরে যেতে হবে

নাগেটস, সসেজ, কাট-আপ চিকেন, ম্যারিনেটেড মাংস, রান্নার জন্য প্রস্তুত ও সম্পূর্ণ রান্না করা পণ্য তৈরি করলে বাজার ও লাভের সুযোগ বাড়ে।

খামারিকে অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে

চুক্তিভিত্তিক খামারে বাচ্চা, খাদ্য, চিকিৎসা, ন্যায্য মূল্য এবং স্বচ্ছ চুক্তি নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনব্যবস্থা টেকসই হয় না।

রোগ প্রতিরোধে অঞ্চলভিত্তিক ব্যবস্থা

সব ব্রিডার, হ্যাচারি ও ব্রয়লার খামার একই এলাকায় কেন্দ্রীভূত করলে রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন ও শক্তিশালী জীবাণু নিরাপত্তা জরুরি।


শেষ কথা

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুরগি উৎপাদনকারী কোম্পানি জেবিএস কোনো একটি বিশাল খামারের নাম নয়; এটি হাজার হাজার খামারি, ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারি, ফিডমিল, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সমন্বিত একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা।

এর সাফল্যের ভিত্তি হলো—ছোট ব্যবসা থেকে শুরু, বাজারের সঙ্গে উৎপাদনের সমন্বয়, সম্পূর্ণ সরবরাহশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ, সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ, মূল্য সংযোজিত পণ্য এবং বহুদেশে বিনিয়োগ।

একই সঙ্গে Pilgrim’s-এর দেউলিয়াত্ব ও JBS–Seara-এর ২০২৩ সালের লোকসান প্রমাণ করে—বড় প্রতিষ্ঠানও ভুল সম্প্রসারণ, অতিরিক্ত ঋণ, উচ্চ খাদ্যমূল্য, কম বাজারদর এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনায় বিপর্যস্ত হতে পারে। তাই প্রকৃত সাফল্য শুধু বেশি মুরগি উৎপাদন নয়; বরং উৎপাদন, বাজার, ঋণ, রোগ, পরিবেশ, আইন এবং খামারির স্বার্থ—সবকিছুর মধ্যে টেকসই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।

সংক্ষিপ্ত তথ্যসূত্র

সর্বশেষ - ছাগল পালন

আপনার জন্য নির্বাচিত

বন ও বৃক্ষ নিধনে শাস্তির বিধান রেখে জারি হয়েছে ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’

ফুল কপির  বীজতলা

রমজানে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংসের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কার্যক্রম উদ্বোধন// মানুষ যাতে সাধ্যের মধ্যে দুধ, ডিম ও মাংস কিনতে পারেন সেজন্য ভ্রাম্যমান বিক্রয় কার্যক্রম – মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

মুরগির বাচ্চার ঝিমানো সমস্যার সহজ সমাধান

আম রপ্তানির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

নিরাপদ আম উৎপাদন কার্যক্রম পরিদর্শন করলেন রাষ্ট্রদূতগণ

অভয়াশ্রম গড়ে তুলি, দেশি মাছে দেশ ভরি

মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্ববিদ্যালয় লেক হতে পারে নতুন দৃষ্টান্ত

ব্রাজিল থেকে মাংস আমদানির খবর ভিত্তিহীন

কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ক্ষতি পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা।