বিড়ালের কোন রোগ মানুষে ছড়ায় এবং সংক্রমণের আশঙ্কা হলে করণীয় কী? বিড়ালের রোগব্যাধি, প্রতিকার, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী ও জনসচেতনতামূলক প্রতিবেদন।।

বিড়াল মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় সঙ্গী প্রাণীগুলোর একটি। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রয়োজনীয় টিকা, সুষম খাবার এবং নিয়মিত পশুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হলে অধিকাংশ বিড়াল সুস্থ থাকে এবং মানুষের জন্য সংক্রমণের ঝুঁকিও খুব কম হয়। তবে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী, ছত্রাক, অপুষ্টি ও বংশগত কারণে বিড়াল বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
এসব রোগের সবগুলো মানুষে সংক্রমিত হয় না। যেমন—ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া, FIV, FeLV ও FIP বিড়ালের জন্য গুরুতর হলেও সাধারণত মানুষকে আক্রান্ত করে না। অন্যদিকে জলাতঙ্ক, রিংওয়ার্ম, টক্সোপ্লাজমোসিস, ক্যাট-স্ক্র্যাচ ডিজিজ ও কয়েকটি অন্ত্রের পরজীবী মানুষে সংক্রমিত হতে পারে।
সতর্কতা: রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় না করে বিড়ালকে অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড বা মানুষের কোনো ওষুধ দেওয়া বিপজ্জনক। চিকিৎসা ও ওষুধের মাত্রা অবশ্যই নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
বিড়াল অসুস্থ হওয়ার সাধারণ লক্ষণ
বিড়াল স্বভাবগতভাবে অসুস্থতা লুকিয়ে রাখে। তাই আচরণ ও দৈনন্দিন অভ্যাসের সামান্য পরিবর্তনও গুরুত্বসহকারে দেখা প্রয়োজন। উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলো হলো—
- খাবার বা পানি গ্রহণ হঠাৎ কমে যাওয়া;
- এক দিনের বেশি না খাওয়া;
- বমি বা পাতলা পায়খানা;
- নাক ও চোখ দিয়ে পানি বা পুঁজ পড়া;
- হাঁচি, কাশি বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া;
- অতিরিক্ত লালা ঝরা বা মুখে ঘা;
- শরীর গরম, দুর্বলতা বা সারাক্ষণ লুকিয়ে থাকা;
- হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া;
- অতিরিক্ত পানি পান ও ঘন ঘন প্রস্রাব;
- বারবার লিটার বক্সে গিয়েও প্রস্রাব না হওয়া;
- শরীর চুলকানো, পশম পড়ে যাওয়া বা গোলাকার ক্ষত;
- কানের ভেতর কালো ময়লা, দুর্গন্ধ বা মাথা ঝাঁকানো;
- খিঁচুনি, ভারসাম্যহীনতা বা অস্বাভাবিক আক্রমণাত্মক আচরণ।
বিড়ালের প্রধান সংক্রামক রোগ
১. ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া
এটি অত্যন্ত সংক্রামক ও প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। অনেকে একে ভুলভাবে “ক্যাট ডিস্টেম্পার” বলে থাকেন। বিশেষ করে টিকাবিহীন বাচ্চা বিড়ালের ঝুঁকি বেশি।
লক্ষণ: জ্বর, বমি, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, খাবার বন্ধ এবং দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়া।
ছড়ানোর পথ: আক্রান্ত বিড়ালের মল, বমি, শরীরের নিঃসরণ এবং দূষিত পাত্র, কাপড়, খাঁচা বা মানুষের জুতা-হাতের মাধ্যমে অন্য বিড়ালে ছড়াতে পারে।
চিকিৎসা: নির্দিষ্টভাবে ভাইরাস ধ্বংসকারী সাধারণ চিকিৎসা নেই। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে তরল, বমি নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক চিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রতিরোধ: নির্ধারিত বয়সে FPV-সমৃদ্ধ মূল টিকা, নতুন বিড়ালকে আলাদা রাখা এবং পরিবেশ জীবাণুমুক্ত করা।
২. ফেলাইন হারপিস ও ক্যালিসিভাইরাস
এই দুটি ভাইরাস বিড়ালের শ্বাসতন্ত্রের রোগ বা “ক্যাট ফ্লু”-এর প্রধান কারণ।
লক্ষণ: হাঁচি, নাক দিয়ে পানি, চোখ লাল হওয়া, চোখ দিয়ে পুঁজ, জ্বর, মুখে বা জিহ্বায় ঘা এবং খাবার না খাওয়া।
চিকিৎসা: চোখ-নাক পরিষ্কার রাখা, পানিশূন্যতা রোধ, পুষ্টিসহায়তা ও প্রয়োজনে নেবুলাইজেশন। ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না; দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। Merck Veterinary Manual
প্রতিরোধ: FHV-1 ও FCV-সমৃদ্ধ মূল টিকা, অসুস্থ বিড়ালকে আলাদা রাখা এবং খাবার-পানির পাত্র আলাদা করা।
৩. ফেলাইন লিউকেমিয়া ভাইরাস—FeLV
এই ভাইরাস বিড়ালের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে; রক্তস্বল্পতা ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ছড়ানোর পথ: লালা, নাকের নিঃসরণ, প্রস্রাব, মল, দুধ, কামড় এবং দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ।
লক্ষণ: ওজন কমা, বারবার সংক্রমণ, মাড়ি ফ্যাকাশে হওয়া, জ্বর এবং লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া।
করণীয়: রক্ত পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে হয়। আক্রান্ত বিড়ালকে ঘরের মধ্যে রেখে অন্য বিড়াল থেকে আলাদা করতে হবে। নতুন বিড়াল ঘরে আনার আগে FeLV পরীক্ষা করা উচিত। Cornell Feline Health Center
৪. ফেলাইন ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস—FIV
FIV-কে অনেক সময় “ফেলাইন এইডস” বলা হলেও এটি মানুষের HIV নয় এবং মানুষে ছড়ায় না।
ছড়ানোর প্রধান পথ: গভীর কামড়ের ক্ষত, বিশেষ করে বাইরে ঘুরে বেড়ানো ও মারামারিতে জড়ানো পুরুষ বিড়ালের মধ্যে।
চিকিৎসা: ভাইরাস সম্পূর্ণ নির্মূলের চিকিৎসা নেই। তবে ঘরের মধ্যে রাখা, নির্বীজন, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসায় আক্রান্ত বিড়াল অনেক বছর বেঁচে থাকতে পারে। Cornell-এর FIV নির্দেশনা
৫. ফেলাইন ইনফেকশাস পেরিটোনাইটিস—FIP
বিড়ালের একটি করোনাভাইরাসের পরিবর্তিত রূপ থেকে কোনো কোনো বিড়ালের শরীরে FIP সৃষ্টি হয়। বহু বিড়াল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও অল্পসংখ্যক বিড়ালে FIP তৈরি হয়।
লক্ষণ: দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, ওজন কমা, পেট বা বুকে তরল জমা, শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা ও স্নায়বিক লক্ষণ।
চিকিৎসা: বর্তমানে নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসায় অনেক বিড়াল সুস্থ হচ্ছে। তবে ওষুধের বৈধতা, প্রাপ্যতা এবং চিকিৎসা-পদ্ধতি দেশভেদে ভিন্ন। নিশ্চিত রোগনির্ণয় ও বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের তত্ত্বাবধান অপরিহার্য।
প্রতিরোধ: অতিরিক্ত ভিড় কমানো, লিটার বক্স নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং খাবার-পানির পাত্র থেকে লিটার বক্স দূরে রাখা। Cornell-এর FIP নির্দেশনা
পরজীবী ও চর্মরোগ
কৃমি
বিড়ালের মধ্যে রাউন্ডওয়ার্ম, হুকওয়ার্ম ও টেপওয়ার্ম বেশি দেখা যায়।
লক্ষণ: পেট ফুলে যাওয়া, ওজন না বাড়া, পাতলা পায়খানা, বমি, পশমের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া এবং মলে কৃমি দেখা।
প্রতিকার: মল পরীক্ষার ভিত্তিতে উপযুক্ত কৃমিনাশক দিতে হবে। ওষুধের ধরন ও মাত্রা বয়স, ওজন এবং পরজীবীর প্রজাতির ওপর নির্ভর করে।
মাছি ও টিক
মাছি চুলকানি, অ্যালার্জি, রক্তস্বল্পতা, টেপওয়ার্ম এবং Bartonella সংক্রমণে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিরোধ: চিকিৎসকের পরামর্শে বিড়ালের জন্য অনুমোদিত ফ্লি-টিক নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। কুকুরের কিছু টিকনাশক—বিশেষ করে পারমেথ্রিনযুক্ত পণ্য—বিড়ালের জন্য মারাত্মক বিষাক্ত হতে পারে।
কানের মাইট
লক্ষণ: কানে কফির গুঁড়ার মতো কালো ময়লা, চুলকানি, মাথা ঝাঁকানো ও দুর্গন্ধ।
চিকিৎসা: কান পরীক্ষা করে মাইট, ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট—কোনটি দায়ী তা নির্ণয় করতে হবে। কটন বাড কানের গভীরে ঢোকানো যাবে না।
রিংওয়ার্ম
নামের মধ্যে “ওয়ার্ম” থাকলেও এটি কৃমি নয়; এটি ছত্রাকজনিত রোগ।
লক্ষণ: গোলাকার পশমহীন জায়গা, খুশকির মতো আবরণ, চুলকানি ও ভঙ্গুর পশম।
চিকিৎসা: অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ, প্রয়োজন হলে ঔষধি শ্যাম্পু এবং পরিবেশ পরিষ্কার করা। আক্রান্ত বিড়ালকে সাময়িকভাবে অন্য প্রাণী ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে।
অসংক্রামক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রোগ
প্রস্রাবের রাস্তা বন্ধ হওয়া
বিশেষ করে পুরুষ বিড়ালের প্রস্রাবের নালি বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জীবনসংকট তৈরি হতে পারে।
লক্ষণ: বারবার লিটার বক্সে যাওয়া, অল্প বা কোনো প্রস্রাব না হওয়া, ব্যথায় ডাকাডাকি, যৌনাঙ্গ চাটা, বমি ও দুর্বলতা।
করণীয়: এটি জরুরি অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে পশু হাসপাতালে নিতে হবে। বাড়িতে পেট চাপা, মূত্রবর্ধক বা অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে না।
কিডনি রোগ
বয়স্ক বিড়ালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ বেশি দেখা যায়।
লক্ষণ: অতিরিক্ত পানি পান, বেশি প্রস্রাব, ওজন কমা, বমি, মুখে দুর্গন্ধ এবং খাবারে অনীহা।
চিকিৎসা: রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করে রোগের স্তর নির্ণয় করতে হয়। বিশেষ খাবার, তরল, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হতে পারে।
ডায়াবেটিস ও স্থূলতা
অতিরিক্ত ওজন, কম চলাফেরা এবং কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে বিড়ালের ডায়াবেটিস হতে পারে।
লক্ষণ: অতিরিক্ত পানি পান ও প্রস্রাব, ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও ওজন কমা এবং পেছনের পায়ে দুর্বলতা।
প্রতিরোধ: পরিমিত সুষম খাবার, শরীরের আদর্শ ওজন এবং নিয়মিত খেলাধুলা।
দাঁত ও মাড়ির রোগ
মুখে দুর্গন্ধ, লালা ঝরা, শক্ত খাবার খেতে না পারা এবং দাঁতের গোড়ায় লালভাব দাঁত বা মাড়ির রোগের লক্ষণ হতে পারে। নিয়মিত মুখ পরীক্ষা ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মাধ্যমে দাঁত পরিষ্কার করা দরকার।
বিড়ালের যেসব রোগ মানুষে সংক্রমিত হতে পারে
| রোগ | মানুষে ছড়ানোর পথ | মানুষের সম্ভাব্য লক্ষণ | করণীয় |
|---|---|---|---|
| জলাতঙ্ক | কামড়, আঁচড় অথবা ক্ষত/চোখ-মুখে আক্রান্ত লালা | জ্বর, ব্যথা, স্নায়বিক সমস্যা; লক্ষণ শুরু হলে প্রায় সর্বদা প্রাণঘাতী | ক্ষত ১৫ মিনিট ধুয়ে দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে PEP |
| ক্যাট-স্ক্র্যাচ ডিজিজ | মাছিবাহিত Bartonella বহনকারী বিড়ালের আঁচড়/কামড় | আঁচড়ের স্থানে গুটি, জ্বর, লিম্ফ নোড ফোলা | ক্ষত ধোয়া; জ্বর বা গ্রন্থি ফুললে চিকিৎসক |
| রিংওয়ার্ম | আক্রান্ত পশম, ত্বক, বিছানা বা সরঞ্জাম | গোলাকার চুলকানিযুক্ত দাগ | মানুষ ও বিড়াল—উভয়ের চিকিৎসা এবং পরিবেশ পরিষ্কার |
| টক্সোপ্লাজমোসিস | দূষিত মাটি বা মল মুখে যাওয়া; কাঁচা/অর্ধসিদ্ধ মাংস | অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃদু; গর্ভস্থ শিশু ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধে গুরুতর | দৈনিক লিটার পরিষ্কার, গ্লাভস, ভালোভাবে রান্না করা খাবার |
| রাউন্ডওয়ার্ম | দূষিত মাটি বা মল থেকে ডিম মুখে প্রবেশ | জ্বর, কাশি, পেটব্যথা; কখনো চোখ ক্ষতিগ্রস্ত | কৃমিনাশক, মল অপসারণ, হাত ধোয়া |
| হুকওয়ার্ম | দূষিত মাটি দিয়ে লার্ভা ত্বকে প্রবেশ | আঁকাবাঁকা চুলকানিযুক্ত ত্বকের ক্ষত | খালি পায়ে না হাঁটা, পরিবেশ পরিষ্কার |
| সালমোনেলা/ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর | মল, দূষিত খাবার বা কাঁচা মাংস | ডায়রিয়া, জ্বর, পেটব্যথা | হাত ধোয়া, কাঁচা খাবার না দেওয়া, চিকিৎসা |
| জিয়ার্ডিয়া | মলদূষিত পানি বা পরিবেশ | ডায়রিয়া ও পেটের সমস্যা | পানি ও লিটার পরিচ্ছন্নতা; পরীক্ষা ও চিকিৎসা |
| স্পোরোট্রাইকোসিস | আক্রান্ত বিড়ালের আঁচড়, কামড় বা ক্ষত থেকে নিঃসরণ | ত্বকে গুটি ও না-শুকানো ক্ষত | গ্লাভস পরে ধরতে হবে; দ্রুত চিকিৎসক ও ভেটেরিনারিয়ান |
CDC-এর তথ্যমতে, আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ বিড়ালও কোনো কোনো জীবাণু বহন করতে পারে। তাই নিয়মিত পশুচিকিৎসা ও পরিচ্ছন্নতা গুরুত্বপূর্ণ। CDC—Cats and human health
জলাতঙ্কের ঝুঁকিতে সবচেয়ে জরুরি করণীয়
অপরিচিত, টিকাবিহীন বা অস্বাভাবিক আচরণকারী বিড়াল কামড়ালে কিংবা চামড়া কেটে যায় এমনভাবে আঁচড় দিলে বিষয়টিকে জরুরি হিসেবে নিতে হবে।
১. ক্ষতস্থান সঙ্গে সঙ্গে প্রবাহমান পানি ও সাবান দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুতে হবে।
২. সম্ভব হলে পোভিডোন-আয়োডিনের মতো উপযুক্ত জীবাণুনাশক ব্যবহার করা যায়।
৩. ক্ষতে মরিচ, হলুদ, চুন, তেল, ছাই বা মাটি লাগানো যাবে না।
৪. ক্ষত শক্ত করে ব্যান্ডেজ বা নিজে থেকে সেলাই করা যাবে না।
৫. দ্রুত হাসপাতাল বা নির্ধারিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধক কেন্দ্রে যেতে হবে।
৬. চিকিৎসক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে জলাতঙ্কের টিকা এবং প্রয়োজন হলে ক্ষতের মধ্যে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন বা অনুমোদিত মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি দিতে পারেন।
৭. বিড়ালটি পরিচিত হলেও “দেখি কিছু হয় কি না”—এই ভেবে চিকিৎসা বিলম্বিত করা যাবে না। প্রাণী পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা বা টিকার সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সম্ভাব্য সংস্পর্শের পর দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার, টিকা এবং প্রয়োজন অনুসারে ইমিউনোগ্লোবুলিন জীবন রক্ষা করতে পারে। কিন্তু মানুষের শরীরে জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর কার্যকর চিকিৎসা প্রায় নেই। WHO—Rabies
টক্সোপ্লাজমোসিস নিয়ে অযথা আতঙ্ক নয়
গর্ভবতী নারীকে বিড়াল ছেড়ে দিতে হবে—এ ধারণা সঠিক নয়। সংক্রমণ এড়াতে প্রয়োজন—
- সম্ভব হলে অন্য কাউকে লিটার পরিষ্কার করতে দেওয়া;
- নিজে করলে গ্লাভস পরে পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া;
- প্রতিদিন মল পরিষ্কার করা—কারণ পরজীবীটি মলের সঙ্গে বের হওয়ার পর সংক্রামক হতে সাধারণত ১–৫ দিন লাগে;
- বিড়ালকে কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মাংস না দেওয়া;
- বিড়ালকে ঘরের মধ্যে রাখা এবং শিকার করতে না দেওয়া;
- মাটি নিয়ে কাজ করার সময় গ্লাভস পরা;
- মাংস ভালোভাবে রান্না এবং ফল-সবজি ধুয়ে খাওয়া।
মানুষের টক্সোপ্লাজমোসিসের গুরুত্বপূর্ণ উৎস কেবল বিড়াল নয়; অর্ধসিদ্ধ মাংস, দূষিত মাটি ও অপরিষ্কার ফল-সবজিও উৎস হতে পারে। CDC—Toxoplasmosis prevention
কামড় বা আঁচড়ের পর আর কী খেয়াল রাখতে হবে?
জলাতঙ্ক ছাড়াও বিড়ালের কামড়ে Pasteurella-সহ বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে দ্রুত সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে হাত, আঙুল, কবজি, মুখ বা গভীর কামড়ের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
নিচের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—
- ক্ষত লাল, গরম বা ফুলে যাওয়া;
- পুঁজ, ব্যথা বা লাল দাগ ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়া;
- জ্বর বা লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া;
- হাত-পায়ের নড়াচড়া কমে যাওয়া;
- ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, HIV বা রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম থাকার ইতিহাস;
- আক্রান্ত ব্যক্তি শিশু, বয়স্ক বা গর্ভবতী হলে।
টিটেনাস টিকার অবস্থা চিকিৎসককে জানাতে হবে। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।
নিয়মিত প্রতিরোধব্যবস্থা
টিকা
আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় সাধারণত মূল টিকার মধ্যে রয়েছে—
- র্যাবিস;
- ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া—FPV;
- ফেলাইন হারপিস ভাইরাস—FHV-1;
- ফেলাইন ক্যালিসিভাইরাস—FCV;
- নির্দিষ্ট বয়স ও ঝুঁকিতে ফেলাইন লিউকেমিয়া—FeLV।
বাচ্চা বিড়ালের টিকা সাধারণত কয়েক দফায় দিতে হয়। তবে প্রথম টিকার বয়স, ডোজের ব্যবধান ও বুস্টার দেশ, পণ্যের নিবন্ধন, বয়স, স্বাস্থ্য ও সংক্রমণঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন। AAHA–AAFP-এর মূল টিকা নির্দেশনা
দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা
- বিড়ালকে যথাসম্ভব ঘরের মধ্যে নিরাপদে রাখা;
- বিশুদ্ধ পানি ও বয়সোপযোগী পূর্ণাঙ্গ খাবার দেওয়া;
- কাঁচা মাংস, কাঁচা ডিম ও অপরিশোধিত দুধ না দেওয়া;
- প্রতিদিন লিটার থেকে মল অপসারণ;
- লিটার বক্স ও খাবারের পাত্র আলাদা স্থানে রাখা;
- প্রতিটি বিড়ালের জন্য পর্যাপ্ত লিটার বক্স রাখা;
- নতুন বিড়ালকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত আলাদা রাখা;
- নিয়মিত কৃমি, মাছি ও টিক নিয়ন্ত্রণ;
- বংশবিস্তার না করালে নির্বীজন;
- বছরে অন্তত একবার এবং বয়স্ক বা অসুস্থ বিড়ালকে আরও ঘন ঘন পরীক্ষা;
- বিড়ালের সঙ্গে খেলার পর এবং মল পরিষ্কারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া;
- বিড়ালকে মানুষের মুখ, খোলা ক্ষত বা খাবারের পাত্র চাটতে না দেওয়া।
যেসব অবস্থায় তাৎক্ষণিক পশু হাসপাতালে নিতে হবে
- মুখ খুলে বা কষ্ট করে শ্বাস নেওয়া;
- প্রস্রাব একেবারে বন্ধ;
- বিষাক্ত পদার্থ বা মানুষের ওষুধ খাওয়া;
- খিঁচুনি, অজ্ঞান বা পক্ষাঘাত;
- গাড়ির আঘাত, উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া বা প্রচুর রক্তপাত;
- একাধিকবার বমি ও মারাত্মক পানিশূন্যতা;
- বাচ্চা বিড়ালের খাবার বন্ধ ও দ্রুত দুর্বল হয়ে যাওয়া;
- চোখে আঘাত বা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি হারানো;
- প্রসবের সময় দীর্ঘক্ষণ চাপ দেওয়ার পরও বাচ্চা না হওয়া;
- অস্বাভাবিক আক্রমণাত্মক আচরণ, অতিরিক্ত লালা ও গিলতে অসুবিধা।
মানুষের ওষুধ বিড়ালকে দেওয়া যাবে না
মানুষের প্যারাসিটামল বা অ্যাসিটামিনোফেন, আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ঘুমের ওষুধ, ঠান্ডার ওষুধ কিংবা অবশিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক বিড়ালের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। একইভাবে কুকুরের জন্য তৈরি সব ওষুধও বিড়ালের উপযোগী নয়। সন্দেহজনক কিছু খেলে ওষুধের মোড়কসহ দ্রুত পশু হাসপাতালে নিতে হবে।
শেষ কথা
বিড়াল থেকে মানুষে রোগ ছড়াতে পারে—কিন্তু এ কারণে বিড়াল পরিত্যাগ করা কোনো সমাধান নয়। অধিকাংশ ঝুঁকি টিকা, নিয়মিত কৃমিনাশক ও মাছি নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্ন লিটার ব্যবস্থাপনা, কাঁচা খাবার পরিহার এবং কামড়-আঁচড়ের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বিড়ালের অধিকাংশ রোগ মানুষে সংক্রমিত হয় না। দায়িত্বশীল পালন, সঠিক রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসক ও ভেটেরিনারিয়ানের সমন্বিত “ওয়ান হেলথ” দৃষ্টিভঙ্গিই বিড়াল, মালিক এবং সমাজ—সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ।






















