বন্য শিকারি থেকে মানুষের ঘরের আদরের সঙ্গী বিড়াল।।
বন্য শিকারি থেকে মানুষের ঘরের আদরের সঙ্গী বিড়াল//বিড়ালের ইতিহাস ও বিবর্তন।।
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

আজকের গৃহপালিত বিড়াল মানুষের বিছানায় ঘুমায়, কোলে বসে আদর নেয় এবং পরিবারের সদস্যের মতো বসবাস করে। অথচ তার শরীর, খাদ্যাভ্যাস, শিকারের কৌশল ও স্বাধীন স্বভাবের মধ্যে এখনো বন্য পূর্বপুরুষের বহু বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রয়েছে।
কুকুরকে মানুষ পরিকল্পিতভাবে পোষ মানিয়েছিল; কিন্তু বিড়ালের ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল অনেকটাই ভিন্ন। মানুষের কৃষিভিত্তিক বসতি, খাদ্যশস্যের গুদাম এবং সেখানে বেড়ে যাওয়া ইঁদুরই সম্ভবত বিড়ালকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে। বলা যায়, মানুষ যতটা বিড়ালকে পোষ মানিয়েছে, বিড়ালও ততটাই নিজের সুবিধায় মানুষের সঙ্গে বসবাস বেছে নিয়েছে।
বিড়াল পরিবারের প্রাচীন ইতিহাস
বিড়াল যে প্রাণীগোষ্ঠীর সদস্য, তার বৈজ্ঞানিক পরিবার হলো ফেলিডি। সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ, জাগুয়ার, চিতা, বনবিড়াল এবং গৃহপালিত বিড়াল—সবাই এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। জিনগত গবেষণা অনুযায়ী, আধুনিক বিড়াল পরিবারের প্রধান বিবর্তনীয় বিস্তার শুরু হয়েছিল এশিয়ায় আনুমানিক এক কোটি আট লাখ বছর আগে। সময়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামা এবং স্থলসেতু সৃষ্টি হওয়ায় বিড়ালের পূর্বপুরুষেরা এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। ভিন্ন পরিবেশে অভিযোজনের ফলে ধীরে ধীরে বাঘ, সিংহ, চিতা, লিংক্স, পুমা, বনবিড়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা
বর্তমানে বিশ্বে বিড়াল পরিবারের প্রায় ৪০টি প্রজাতি রয়েছে। তবে গৃহপালিত বিড়াল সরাসরি সিংহ বা বাঘের বংশধর নয়। এরা সবাই বহু পুরোনো একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন পথে বিবর্তিত হয়েছে।
গৃহপালিত বিড়ালের পূর্বপুরুষ
আধুনিক গৃহপালিত বিড়ালের বৈজ্ঞানিক নাম Felis catus। এর প্রধান পূর্বপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে আফ্রিকা ও নিকটপ্রাচ্যের বন্যবিড়াল—Felis silvestris lybica, বর্তমানে যাকে অনেক বিজ্ঞানী Felis lybica নামে উল্লেখ করেন। এই বন্যবিড়ালের সঙ্গে বর্তমান দেশি বিড়ালের আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে। যেমন—

- ছোট কিন্তু শক্তিশালী দেহ;
- শিকার ধরার উপযোগী ধারালো দাঁত ও নখ;
- রাতে ভালোভাবে দেখার ক্ষমতা;
- অত্যন্ত প্রখর শ্রবণশক্তি;
- নিঃশব্দে চলার দক্ষতা;
- একাকী শিকারের প্রবণতা;
- নিজের এলাকা চিহ্নিত ও রক্ষা করার স্বভাব। গৃহপালনের হাজার হাজার বছর পরও এসব বৈশিষ্ট্য প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
কৃষির সঙ্গে বিড়াল পালনের সূচনা
প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে পশ্চিম এশিয়ার উর্বর অর্ধচন্দ্রাকৃতির অঞ্চলে মানুষ শিকারনির্ভর জীবন থেকে কৃষিভিত্তিক স্থায়ী বসতিতে প্রবেশ করতে শুরু করে। উৎপাদিত গম, যব ও অন্যান্য খাদ্যশস্য গুদামে সংরক্ষণ করা হতো। শস্যের আকর্ষণে মানুষের বসতিতে ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে যায়।
ইঁদুরের সন্ধানে বন্যবিড়াল মানুষের বসতির কাছে আসতে শুরু করে। যেসব বিড়াল মানুষকে কম ভয় পেত, তারা সহজেই ইঁদুর শিকার করতে পারত। মানুষও বুঝতে পারে, এই প্রাণী শস্য ও খাদ্যভান্ডারকে ইঁদুরের ক্ষতি থেকে রক্ষা করছে। ফলে মানুষ তাদের হত্যা না করে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিতে শুরু করে। এভাবেই তৈরি হয় তিন পক্ষের একটি সম্পর্ক—
মানুষ শস্য উৎপাদন করল → শস্যের কাছে ইঁদুর এল → ইঁদুরের পেছনে বিড়াল এল। এ সম্পর্ক উভয়ের জন্য লাভজনক ছিল। বিড়াল পেল সহজ শিকার ও নিরাপদ আশ্রয়; মানুষ পেল প্রাকৃতিক ইঁদুর নিয়ন্ত্রক।
সাইপ্রাসে ৯ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো প্রমাণ
বিড়াল ও মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে ভূমধ্যসাগরের সাইপ্রাস দ্বীপে। সেখানে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ বছর আগের একটি মানবকবরের পাশে একটি বিড়ালের কঙ্কাল পাওয়া যায়।
সাইপ্রাসে প্রাকৃতিকভাবে বন্যবিড়াল ছিল না। অর্থাৎ মানুষই সম্ভবত নৌকায় করে বিড়ালটিকে দ্বীপে নিয়ে গিয়েছিল। মানুষের পাশে সম্মানের সঙ্গে কবর দেওয়ার ঘটনা থেকে অনুমান করা হয়, বিড়ালটি শুধু ইঁদুর শিকারি ছিল না; মানুষের সঙ্গে তার বিশেষ সামাজিক বা আবেগগত সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। Science গবেষণা
প্রাচীন মিসরে বিড়ালের মর্যাদা
বিড়াল গৃহপালনের সূচনা নিকটপ্রাচ্যে হলেও প্রাচীন মিসরে মানুষ ও বিড়ালের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। নীলনদের তীরবর্তী শস্যভান্ডারকে ইঁদুর, সাপ ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণী থেকে রক্ষায় বিড়াল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ধীরে ধীরে বিড়াল মিসরীয় সমাজে—

- গৃহরক্ষক;
- উর্বরতার প্রতীক;
- মাতৃত্ব ও সুরক্ষার প্রতীক;
- ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রাচীন মিসরের বাসতেত নামের দেবীকে কখনো সিংহীর মাথা, আবার কখনো বিড়ালের মাথাযুক্ত নারী হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। তিনি পরিবার, মাতৃত্ব, সুরক্ষা ও আনন্দের প্রতীক ছিলেন। মিসরের বিভিন্ন প্রত্নস্থানে বিপুলসংখ্যক মমি করা বিড়াল পাওয়া গেছে। তবে সব বিড়াল পারিবারিক পোষা প্রাণী হিসেবে মমি করা হয়নি; অনেক বিড়াল ধর্মীয় উৎসর্গের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্তার
প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, গৃহপালিত বিড়ালের বিশ্বব্যাপী বিস্তারে দুটি প্রধান কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে—
১. নিকটপ্রাচ্যের কৃষিভিত্তিক অঞ্চল;
২. পরবর্তী সময়ে প্রাচীন মিসর।
ব্যবসায়ী, সৈনিক ও নাবিকেরা জাহাজে বিড়াল রাখতেন। কারণ জাহাজের খাদ্য ও মালামাল ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রক্ষায় বিড়াল অত্যন্ত কার্যকর ছিল। ফিনিশীয়, গ্রিক, রোমান এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন বণিকগোষ্ঠীর নৌপথ ও স্থলবাণিজ্যের মাধ্যমে বিড়াল ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। Nature-এর প্রাচীন ডিএনএ গবেষণা
রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার ইউরোপে গৃহপালিত বিড়ালের স্থায়ী জনসংখ্যা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে বাণিজ্যপথ ও রেশমপথ অনুসরণ করে বিড়াল মধ্য ও পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছে যায়। বাংলা অঞ্চল এবং ভারতীয় উপমহাদেশেও বিড়াল সম্ভবত প্রাচীন কৃষি, খাদ্য সংরক্ষণ, নদীপথ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে বিস্তার লাভ করেছে। তবে উপমহাদেশে ঠিক কখন গৃহপালিত বিড়ালের আগমন ঘটেছিল, তা নির্দিষ্ট করার মতো পর্যাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রাচীন ডিএনএ গবেষণা এখনো সীমিত।
মধ্যযুগে বিড়ালের ভালো-মন্দ সময়
মধ্যযুগের বিভিন্ন সমাজে বিড়াল সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী ধারণা ছিল। কোথাও বিড়ালকে শস্য ও খাদ্য রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় প্রাণী হিসেবে দেখা হতো; আবার ইউরোপের কোনো কোনো অঞ্চলে, বিশেষত কালো বিড়ালকে কেন্দ্র করে কুসংস্কার তৈরি হয়েছিল।
তবে “মধ্যযুগে ইউরোপজুড়ে বিড়ালকে নিয়মিতভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিল এবং এজন্যই প্লেগ ছড়িয়েছিল”—এ ধরনের বহুল প্রচলিত বক্তব্যের পক্ষে শক্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত। বাস্তবে অঞ্চল, সময় ও সংস্কৃতিভেদে বিড়ালের প্রতি মানুষের মনোভাব ভিন্ন ছিল।
ইসলামি সভ্যতায় বিড়াল সাধারণত পরিচ্ছন্ন ও মানুষের বসতিতে গ্রহণযোগ্য প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে মুসলিম সমাজে বাড়ি, মসজিদ, বাজার ও খাদ্যগুদামের আশপাশে বিড়ালের উপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
বিড়ালের গৃহপালন কেন কুকুরের চেয়ে আলাদা?
কুকুরকে মানুষ শিকার, পাহারা, পশুচারণ ও পরিবহনের মতো নির্দিষ্ট কাজের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন ও প্রজনন করিয়েছে। ফলে নেকড়ে ও কুকুরের আচরণ ও শারীরিক গঠনের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। বিড়ালের ক্ষেত্রে মানুষের পরিকল্পিত নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অনেক পরে শুরু হয়। প্রথমদিকে মানুষ প্রধানত সেই বিড়ালগুলোকেই সহ্য করত, যেগুলো—
- মানুষের উপস্থিতিতে অতিরিক্ত ভয় পেত না;
- আক্রমণাত্মক ছিল না;
- বসতির আশপাশে থাকত;
- ভালোভাবে ইঁদুর শিকার করত।
এ কারণে গৃহপালিত বিড়াল ও তার বন্য পূর্বপুরুষের মধ্যে শারীরিক ও জিনগত পার্থক্য তুলনামূলকভাবে কম। গৃহপালিত বিড়াল সুযোগ পেলে এখনো নিজে শিকার করতে এবং মানুষ ছাড়াই টিকে থাকতে পারে।
বিবর্তনে কী কী পরিবর্তন এসেছে?
গৃহপালনের ফলে বিড়ালের দেহের চেয়ে আচরণে বেশি পরিবর্তন এসেছে। মানুষের আশপাশে টিকে থাকা বিড়ালগুলোর মধ্যে ধীরে ধীরে—

- মানুষের প্রতি ভয় কমেছে;
- সহনশীলতা বেড়েছে;
- মানুষের দেওয়া খাবার গ্রহণের প্রবণতা তৈরি হয়েছে;
- একই স্থানে একাধিক বিড়ালের বসবাসের সক্ষমতা বেড়েছে;
- মানুষের অঙ্গভঙ্গি ও দৈনন্দিন অভ্যাস বোঝার দক্ষতা তৈরি হয়েছে;
- মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন ধরনের ডাক ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
জিনগত গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহপালিত বিড়ালের কিছু নির্বাচিত জিন স্মৃতি, ভয় নিয়ন্ত্রণ, উদ্দীপনা ও পুরস্কারনির্ভর শেখার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ যেসব বিড়াল মানুষকে কম ভয় পেত এবং মানুষের কাছ থেকে খাবার ও নিরাপত্তা পাওয়ার বিষয়টি দ্রুত শিখতে পারত, তাদের টিকে থাকা ও বংশবিস্তার সহজ হয়েছিল। গৃহপালিত বিড়ালের জিনোম গবেষণা
বিড়াল কি সত্যিই পুরোপুরি গৃহপালিত?
বিজ্ঞানীদের একাংশ বিড়ালকে “আংশিকভাবে গৃহপালিত” বা গৃহপালনের তুলনামূলক স্বাধীন মডেল হিসেবে দেখেন। কারণ—
- অধিকাংশ বিড়ালের প্রজনন মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে না;
- তারা একাকী শিকার করতে পারে;
- সুযোগ পেলে বন্য পরিবেশে ফিরে যেতে পারে;
- বন্যবিড়ালের সঙ্গে প্রজনন করতে পারে;
- মানুষের ওপর নির্ভরতা কুকুর বা গবাদিপশুর তুলনায় কম।
তবু হাজার বছরের সহাবস্থানে বিড়াল মানুষের সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে মানিয়ে নিয়েছে। মানুষের সঙ্গে আবেগগত বন্ধন তৈরি, পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর শনাক্ত এবং নিরাপত্তার জন্য মালিকের কাছে ফিরে আসার মতো আচরণ এখন গৃহপালিত বিড়ালের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
বিড়ালের গায়ের রং ও নকশার বিবর্তন
প্রাচীন গৃহপালিত বিড়ালের অধিকাংশের গায়ে বন্যবিড়ালের মতো ডোরাকাটা নকশা ছিল। এতে শিকারের সময় পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকা সহজ হতো।
গৃহপালনের পর বিভিন্ন জিনগত পরিবর্তনে কালো, সাদা, ধূসর, কমলা, মিশ্র রং, ছোপযুক্ত এবং বিভিন্ন ধরনের ডোরাকাটা বিড়ালের জন্ম হয়। মানুষ বিশেষ রং ও বৈশিষ্ট্যের বিড়াল পছন্দ করে প্রজনন করানোর ফলে এসব বৈশিষ্ট্য ছড়িয়ে পড়ে। তবে অধিকাংশ আধুনিক বিড়ালজাত খুব প্রাচীন নয়। মূলত উনিশ শতক থেকে পরিকল্পিত প্রজনন ও বিড়াল প্রদর্শনীর প্রসারের পর পার্সিয়ান, সিয়ামিজ, ব্রিটিশ শর্টহেয়ারসহ বিভিন্ন স্বীকৃত জাতের বিকাশ দ্রুত ঘটে।
শিকারি বৈশিষ্ট্য কেন এখনো অক্ষুণ্ন?
গৃহপালিত বিড়াল এখনো একটি বাধ্যতামূলক মাংসাশী প্রাণী। তার শরীর প্রাণিজ আমিষ থেকে নির্দিষ্ট পুষ্টি গ্রহণের জন্য বিবর্তিত হয়েছে। যেমন—

- টরিন;
- অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড;
- নির্দিষ্ট ধরনের ভিটামিন এ;
- উচ্চমানের প্রাণিজ আমিষ।
বিড়ালের চোখ কম আলোতে শিকার দেখার উপযোগী। কান ক্ষুদ্র প্রাণীর উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ শনাক্ত করতে পারে। গোঁফ অন্ধকারে প্রতিবন্ধকতা ও সংকীর্ণ জায়গা বুঝতে সাহায্য করে। পায়ের নরম পাতা নিঃশব্দে চলার সুবিধা দেয়। ভেতরে টেনে রাখা যায় এমন নখ শিকারের সময় হঠাৎ বের করা যায়। অর্থাৎ ঘরের সোফায় বসে থাকা বিড়ালটির ভেতরেও একজন দক্ষ ক্ষুদ্র শিকারির সম্পূর্ণ কাঠামো বিদ্যমান।
মানুষ কেন বিড়ালকে ভালোবাসে?
বিড়ালের কিছু আচরণ মানুষের যত্ন নেওয়ার প্রবৃত্তিকে উদ্দীপ্ত করে। গোল মুখ, বড় চোখ, নরম লোম, ছোট নাক ও মৃদু ডাক মানুষের কাছে শিশুসুলভ মনে হতে পারে। আবার বিড়ালের স্বাধীনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সীমিত জায়গায় বসবাসের সক্ষমতা তাকে আধুনিক শহুরে জীবনের উপযোগী করেছে।
বিড়ালের গরগর শব্দ সাধারণত স্বস্তি ও যোগাযোগের প্রকাশ। তবে অসুস্থতা, ভয় বা ব্যথার সময়ও কোনো কোনো বিড়াল গরগর শব্দ করতে পারে। তাই শুধু এই শব্দ শুনেই তার শারীরিক অবস্থা নির্ধারণ করা উচিত নয়।
বিড়ালের বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থান
বর্তমানে গৃহপালিত বিড়াল পৃথিবীর প্রায় সব জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে রয়েছে। তারা মানুষের সঙ্গী, ইঁদুর নিয়ন্ত্রক এবং অনেক পরিবারের আবেগগত আশ্রয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত প্রজননের ফলে পথবিড়ালের সংখ্যা বৃদ্ধি, রোগবিস্তার, অপুষ্টি ও প্রাণীকল্যাণের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আবার অবাধে বাইরে ঘুরে বেড়ানো বিড়াল পাখি, সরীসৃপ ও ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করতে পারে। এই কারণে দায়িত্বশীল বিড়াল পালনে প্রয়োজন—

- নিয়মিত টিকাদান;
- জলাতঙ্ক প্রতিরোধ;
- কৃমিনাশক ও চিকিৎসা;
- নির্বীজন;
- ঘরের মধ্যে বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাখা;
- পুষ্টিসম্মত খাদ্য;
- পরিত্যাগ না করা;
- বন্যপ্রাণী শিকার সীমিত করা।
শেষ কথা
বিড়ালের ইতিহাস কেবল একটি বন্য প্রাণীর গৃহপালিত হওয়ার গল্প নয়; এটি কৃষি, খাদ্য সংরক্ষণ, নৌবাণিজ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং মানুষের আবেগগত বিবর্তনেরও ইতিহাস।
প্রায় ১০ হাজার বছর আগে ইঁদুরের পেছনে মানুষের বসতিতে আসা বন্যবিড়াল আজ পরিবারের প্রিয় সদস্যে পরিণত হয়েছে। তবু তার দেহ ও আচরণে এখনো বেঁচে আছে প্রাচীন শিকারির স্বভাব। মানুষের সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্ক তাই নিয়ন্ত্রণের নয়; বরং পারস্পরিক সুবিধা, সহাবস্থান এবং ধীরে গড়ে ওঠা বিশ্বাসের সম্পর্ক।






















