RRP
agriculture news24.com
Health Care
Agriculture News
diamond egg
renata-ltd.com
Space for Add
Agriculture News
Spech for Promotion
avonah
Sunday , 20 September 2026 |
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি

বাংলাদেশে ‘অজানা হাইব্রিড ঘাস’: পরিচয়, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, চাষপদ্ধতি ও রোগবালাই।।

প্রতিবেদক
Dr. Bayezid Moral
September 6, 2026 3:46 pm

বাংলাদেশে ‘অজানা হাইব্রিড ঘাস’: পরিচয়, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, চাষপদ্ধতি ও রোগবালাই।।

জলাবদ্ধ জমিতে সম্ভাবনাময়—তবে বৈজ্ঞানিক পরিচয় নিশ্চিত না করে বাণিজ্যিক চাষ ও পশুকে নির্বিচারে খাওয়ানো ঝুঁকিপূর্ণ ।।

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

বাংলাদেশে গবাদিপশুর খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সাম্প্রতিক সময়ে খামারিদের মধ্যে ‘অজানা হাইব্রিড ঘাস’ নামে একটি ঘাস বেশ আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে নিচু, স্যাঁতসেঁতে ও মৌসুমি জলাবদ্ধ জমিতে জন্মানোর ক্ষমতা, দ্রুত বিস্তার এবং তুলনামূলক বেশি সবুজ ঘাস উৎপাদনের দাবি এর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘অজানা হাইব্রিড’ কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নাম নয়। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট—বিএলআরআই, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত উদ্ভিদতাত্ত্বিক তথ্যভান্ডারে এখন পর্যন্ত এ নামে নিবন্ধিত জাত, এর উদ্ভাবক, পিতৃ-মাতৃজাত কিংবা পরীক্ষিত পুষ্টিমান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায় না।

অনলাইন ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কাটিং বিক্রেতাদের প্রচারণায় নামটির ব্যবহার পাওয়া গেলেও এর সুনির্দিষ্ট উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় এখনো অস্পষ্ট। তাই প্রতিবেদনটিতে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও জলাভূমি-সহিষ্ণু স্বীকৃত ঘাসের বৈজ্ঞানিক তথ্য আলাদা করে উপস্থাপন করা হয়েছে।


‘অজানা হাইব্রিড’ নামটির অর্থ কী?

এখানে ‘অজানা’ শব্দটি সম্ভবত ঘাসটির আনুষ্ঠানিক জাতের নাম নয়। বরং এর মূল উৎস বা জাতপরিচয় অজানা থাকায় স্থানীয়ভাবে নামটি চালু হয়েছে। পরে কোনো কোনো কাটিং বিক্রেতা এটিকে ‘Ojana Hybrid Grass’ নামে বাণিজ্যিকভাবে প্রচার করতে শুরু করেন।

ঘাসটির প্রচারিত বৈশিষ্ট্য—মাটির ওপর দিয়ে লতা বা কাণ্ড ছড়িয়ে যাওয়া, গিঁট থেকে শিকড় তৈরি, কাটিং দিয়ে দ্রুত বংশবিস্তার এবং জলাবদ্ধ জমিতে টিকে থাকা—দেখে ধারণা করা যায় এটি প্যারা ঘাস, জার্মান ঘাস বা জলাভূমি-সহিষ্ণু অন্য কোনো ঘাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে কেবল ছবি দেখে জাত নির্ধারণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্যারা ঘাসের স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নাম Urochloa mutica—পুরোনো নাম Brachiaria mutica। অন্যদিকে জার্মান ঘাস নামে পরিচিত জলাভূমি-সহিষ্ণু ঘাসের বৈজ্ঞানিক নাম Echinochloa polystachya। উভয় ঘাসই আর্দ্র ও জলাবদ্ধ পরিবেশে জন্মাতে পারে। কারিব ঘাসসহ আরও কয়েকটি প্রজাতিকেও প্যারা ঘাসের সঙ্গে ভুল করা হয়। Feedipedia—Para grass, Feedipedia—German grass, Feedipedia—Carib grass

তাই নিশ্চিতভাবে যা বলা যাবে

  • ‘অজানা হাইব্রিড’ বর্তমানে একটি স্থানীয় বা বাণিজ্যিক নাম।
  • এটি প্রকৃত হাইব্রিড—এমন প্রকাশিত বংশতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
  • এর বৈজ্ঞানিক নাম ও জাতের উৎস নিশ্চিত নয়।
  • পুষ্টিমান, নিরাপত্তা ও ফলনের সরকারি পরীক্ষিত মানও পাওয়া যায়নি।
  • হার্বেরিয়াম ও ডিএনএ পরীক্ষার আগে একে কোনো স্বীকৃত প্রজাতির নাম দেওয়া ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে চাষের ইতিহাস

বাংলাদেশে প্যারা, জার্মান, নেপিয়ার, জাম্বো, পাকচং, ভুট্টা, জোয়ার ও ওট বহুদিন ধরে পশুখাদ্য হিসেবে চাষ করা হচ্ছে। কিন্তু ‘অজানা হাইব্রিড’ নামটির ইতিহাস তুলনামূলক নতুন।

অনলাইনে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, অন্তত ২০২২ সাল থেকে এ নামের ঘাস নিয়ে বাংলাদেশের কৃষি ও খামারবিষয়ক ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইউটিউব, ফেসবুক এবং অনলাইন কৃষিপণ্য বিক্রয়মাধ্যমে কাটিং বিক্রি ও চাষাবাদের প্রচারণা বাড়ে। ২০২৪–২০২৬ সালে জলাবদ্ধ জমিতে চাষ, কাটিং সংগ্রহ এবং ঘাস খাওয়ানোর বিষয়ে আরও ভিডিও ও বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়।

তবে কোথা থেকে প্রথম ঘাসটি বাংলাদেশে এসেছে, কে জাতটি উদ্ভাবন করেছেন, কোন দুটি জাতের সংকরায়ণে এটি তৈরি অথবা প্রথম কোথায় পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে—এসব বিষয়ে যাচাইযোগ্য গবেষণা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। অতএব, এর ইতিহাস লিখতে গিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উদ্ভাবক হিসেবে উল্লেখ করা এখনই সমীচীন নয়।


ঘাসটির মাঠপর্যায়ে প্রচারিত বৈশিষ্ট্য

চাষি ও কাটিং বিক্রেতাদের বর্ণনা অনুযায়ী ঘাসটির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো—

  1. জলাবদ্ধতা সহ্য করার ক্ষমতা: নিচু জমি, পুকুরপাড়, খালপাড় এবং অল্প পানিযুক্ত জায়গায় জন্মাতে পারে বলে দাবি করা হয়।
  2. দ্রুত বিস্তার: কাণ্ড মাটির ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং গিঁট মাটির সংস্পর্শে এলে নতুন শিকড় ও কুশি তৈরি করতে পারে।
  3. কাটিং দিয়ে বংশবিস্তার: সাধারণত বীজের পরিবর্তে পরিণত কাণ্ডের কাটিং দিয়ে রোপণ করা হয়।
  4. নরম অবস্থায় গ্রহণযোগ্যতা: কচি অবস্থায় কেটে কুচি করে দিলে গরু ও মহিষ খেতে পারে। তবে প্রাণীর গ্রহণযোগ্যতা খামারভেদে পরীক্ষা করতে হবে।
  5. বারবার কাটার সম্ভাবনা: গোড়া অক্ষত রেখে কাটলে পুনরায় কুশি বের হয়।
  6. দ্রুত জমি ঢেকে ফেলা: অনুকূল আর্দ্রতা ও পুষ্টি পেলে আগাছার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এসব বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলো প্যারা ও জার্মান ঘাসের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়। FAO-এর তথ্য অনুযায়ী প্যারা ঘাস ভেজা পরিবেশে ভালো জন্মায়; তবে এটি কিছুটা মোটা এবং সহজে শুকায় না। FAO—Choice of Hay Crops


পুষ্টিমান সম্পর্কে সতর্কতা

‘অজানা হাইব্রিড ঘাসে ১৫–২০ শতাংশ প্রোটিন’ বা এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি বাজারে শোনা গেলেও নমুনা, কাটার বয়স, শুষ্ক পদার্থের ভিত্তি এবং পরীক্ষাগারের নাম ছাড়া এসব দাবি গ্রহণ করা উচিত নয়। ঘাসের পুষ্টিমান প্রধানত নির্ভর করে—

  • প্রজাতি ও জাত;
  • কাটার বয়স;
  • মাটির উর্বরতা;
  • নাইট্রোজেন সারের মাত্রা;
  • পানি ও মৌসুম;
  • পাতা-কাণ্ডের অনুপাত;
  • সংরক্ষণ এবং খাওয়ানোর পদ্ধতির ওপর।

বাংলাদেশে প্যারা, জার্মান ও ধল ঘাস নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পরিপক্বতার স্তর পরিবর্তনের সঙ্গে পরিপাচ্যতা ও শক্তিমানও পরিবর্তিত হয়। পরীক্ষায় জার্মান ঘাসের জৈব পদার্থের পরীক্ষাগারভিত্তিক পরিপাচ্যতা প্রায় ৫৮–৬২ শতাংশ পাওয়া গেলেও এই ফল সরাসরি ‘অজানা হাইব্রিড’-এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না। Bangladesh Journal of Animal Science

পুষ্টিমান জানতে যে পরীক্ষা প্রয়োজন

একটি প্রতিনিধিত্বশীল নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে অন্তত পরীক্ষা করা উচিত—

  • শুষ্ক পদার্থ—DM;
  • ক্রুড প্রোটিন—CP;
  • ক্রুড ফাইবার;
  • NDF ও ADF;
  • অ্যাশ;
  • ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস;
  • নাইট্রেট;
  • প্রয়োজন অনুযায়ী ভারী ধাতু, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও মাইকোটক্সিন।

চাষপদ্ধতি

জাতটির বৈজ্ঞানিক পরিচয় নিশ্চিত নয় বলে নিচের পদ্ধতিকে প্রাথমিক মাঠপর্যায়ের নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথমে ছোট জমিতে পরীক্ষামূলক চাষ করাই নিরাপদ।

১. জমি নির্বাচন

মাঝারি নিচু, স্যাঁতসেঁতে বা মৌসুমি জলাবদ্ধ জমি নির্বাচন করা যেতে পারে। পুকুর ও খালের উঁচু পাড়েও পরীক্ষা করা যায়। তবে শিল্পবর্জ্য, নর্দমা, হাসপাতালের বর্জ্য কিংবা রাসায়নিক দূষিত পানি প্রবাহিত জমিতে পশুখাদ্য উৎপাদন করা যাবে না।

স্থির পচা পানিতে দীর্ঘদিন ডুবে থাকা এবং পরিষ্কার মৌসুমি জলাবদ্ধতা এক বিষয় নয়। গোসলখানা বা নর্দমার পানি ব্যবহার করলে জীবাণু, ডিটারজেন্ট, লবণ, ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষক ঘাসে জমতে পারে।

২. জমি প্রস্তুতি

শুকনা বা আর্দ্র জমিতে সাধারণত—

  • ২–৩টি চাষ ও মই দিয়ে জমি সমান করতে হবে;
  • আগাছা ও আগের ফসলের মোটা অবশিষ্টাংশ সরাতে হবে;
  • জলাবদ্ধ জমিতে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য নালা রাখতে হবে;
  • জমি অতিরিক্ত কাদাময় হলে কিছুটা পানি কমার পর কাটিং বসাতে হবে।

৩. কাটিং নির্বাচন

রোগমুক্ত, পরিণত ও সুস্থ কাণ্ড থেকে কাটিং নিতে হবে। প্রতিটি কাটিংয়ে অন্তত ২–৩টি জীবন্ত গিঁট রাখা ভালো। শুকনো, পচা, কালো দাগযুক্ত অথবা দুর্গন্ধযুক্ত কাটিং বাদ দিতে হবে। অপরিচিত বিক্রেতার কাছ থেকে বেশি দামে বড় পরিমাণ কাটিং কেনার আগে—

  • মাতৃক্ষেত পরিদর্শন;
  • ঘাসের ফুলসহ ছবি সংগ্রহ;
  • রোগের উপস্থিতি পরীক্ষা;
  • অল্প কাটিং দিয়ে পরীক্ষামূলক রোপণ করা উচিত।

৪. রোপণের সময়

বাংলাদেশে বর্ষার শুরু—এপ্রিলের শেষ থেকে জুন—রোপণের উপযোগী সময়। সেচের ব্যবস্থা থাকলে অন্য সময়েও লাগানো যেতে পারে। অতিবৃষ্টিতে স্রোতযুক্ত জমিতে নতুন কাটিং লাগালে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৫. রোপণপদ্ধতি

কাটিং আড়াআড়িভাবে অগভীর নালায় শুইয়ে অথবা কিছুটা কাত করে বসানো যায়। অন্তত একটি গিঁট মাটির নিচে এবং একটি গিঁট মাটির কাছাকাছি রাখতে হবে।

প্রাথমিকভাবে সারি থেকে সারি প্রায় ৪৫–৬০ সেন্টিমিটার এবং কাটিং থেকে কাটিং ৩০–৪৫ সেন্টিমিটার দূরত্ব পরীক্ষা করা যেতে পারে। মাটির ধরন ও ঘাসটির বিস্তার দেখে পরে দূরত্ব সমন্বয় করতে হবে।

৬. সার প্রয়োগ

মাটি পরীক্ষা ছাড়া নির্দিষ্ট সারের মাত্রা দেওয়া উচিত নয়। জমি তৈরির সময় ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা যায়। ফসফরাস, পটাশ ও সালফারের ঘাটতি থাকলে মাটি পরীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে। ঘাস কাটার পর নাইট্রোজেন প্রয়োগ করলে সাধারণত পুনর্বৃদ্ধি বাড়ে। কিন্তু অতিরিক্ত ইউরিয়া দিলে—

  • নাইট্রেট জমার ঝুঁকি;
  • কাণ্ড নরম হয়ে পড়ে যাওয়া;
  • রোগের প্রবণতা;
  • উৎপাদন খরচ ও পরিবেশদূষণ বাড়তে পারে।

সার প্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণে স্থানীয় উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস বা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৭. সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা

শুকনা মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে। জমি স্যাঁতসেঁতে রাখা আর সবসময় গভীর পানির নিচে রাখা এক নয়। নতুন কাটিং প্রতিষ্ঠার আগে তীব্র জলাবদ্ধতা এড়াতে হবে। নোনা এলাকায় চাষের আগে মাটি ও পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

৮. আগাছা নিয়ন্ত্রণ

রোপণের প্রথম ৩০–৪৫ দিন আগাছা নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাত দিয়ে বা নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করা নিরাপদ। ঘাসটির পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় নির্বাচিত আগাছানাশক ব্যবহারে মূল ঘাসও নষ্ট হতে পারে।

৯. প্রথম ও পরবর্তী কাটিং

ঘাসের উচ্চতা নয়, কাণ্ডের কোমলতা, পাতা-কাণ্ডের অনুপাত ও বয়স বিবেচনা করে কাটতে হবে। প্রথম কাটিংয়ের আগে শিকড় ও কুশি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এরপর পরিবেশ অনুযায়ী আনুমানিক ৪০–৬০ দিন অন্তর কাটা যেতে পারে। মাটি থেকে প্রায় ১০–১৫ সেন্টিমিটার গোড়া রেখে কাটলে পুনরায় কুশি বের হওয়ার সুযোগ থাকে। খুব নিচ থেকে বারবার কাটলে গাছ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।


পশুকে খাওয়ানোর নিয়ম

ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করা

প্রথম দিন থেকেই বেশি পরিমাণে দেওয়া যাবে না। পরিচিত খাদ্যের সঙ্গে অল্প করে মিশিয়ে ৭–১০ দিনে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়াতে হবে।

কুচি করে দেওয়া

ঘাস ২–৫ সেন্টিমিটার আকারে কুচি করলে খাদ্যের অপচয় কমে এবং অন্য উপকরণের সঙ্গে মেশানো সহজ হয়। কাদামাটি, শামুক, প্লাস্টিক বা দূষিত পদার্থ থাকলে পরিষ্কার করতে হবে।

একমাত্র খাদ্য নয়

এই ঘাসকে একমাত্র খাদ্য হিসেবে দেওয়া উচিত নয়। গবাদিপশুর বয়স, ওজন, উৎপাদন ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে শুকনা খড়, অন্যান্য সবুজ ঘাস, দানাদার খাদ্য, খনিজ মিশ্রণ ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে সুষম রেশন তৈরি করতে হবে।

যে অবস্থায় খাওয়ানো যাবে না

  • পচা, দুর্গন্ধযুক্ত বা ছত্রাকাক্রান্ত ঘাস;
  • নর্দমা বা শিল্পবর্জ্যের পানিতে উৎপাদিত ঘাস;
  • কীটনাশক ছিটানোর পর অপেক্ষাকাল শেষ না হওয়া ঘাস;
  • অতিরিক্ত ইউরিয়া দেওয়ার পরপর কাটা ঘাস;
  • দীর্ঘ খরা বা প্রতিকূলতার পর হঠাৎ বেড়ে ওঠা সন্দেহজনক ঘাস;
  • অচেনা ঘাসে বিষাক্ত উদ্ভিদ মিশে থাকলে;
  • মৃত প্রাণী বা রোগজীবাণুতে দূষিত পানির জমিতে জন্মানো ঘাস।

প্রধান রোগবালাই ও প্রতিকার

‘অজানা হাইব্রিড’ নামে কোনো প্রামাণ্য রোগতালিকা নেই। তবে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে জন্মানো ঘাসে নিম্নোক্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

১. পাতায় দাগ রোগ

লক্ষণ

পাতায় বাদামি, কালো বা ধূসর দাগ; দাগ বড় হয়ে পাতা শুকিয়ে যাওয়া।

ব্যবস্থাপনা

  • আক্রান্ত অংশ কেটে জমির বাইরে অপসারণ;
  • অতিরিক্ত ঘনত্ব ও ইউরিয়া কমানো;
  • বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা;
  • একই জমিতে দীর্ঘদিন রোগাক্রান্ত কাটিং ব্যবহার না করা;
  • রোগ গুরুতর হলে নমুনা নিয়ে কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা।

২. পাতার মরিচা

লক্ষণ

পাতায় হলুদ, কমলা বা বাদামি গুঁড়ার মতো দাগ এবং আগাম পাতা শুকানো।

ব্যবস্থাপনা

রোগমুক্ত কাটিং, সময়মতো কাটিং, আক্রান্ত অবশিষ্টাংশ অপসারণ এবং সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। রোগ নিশ্চিত না করে ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করা উচিত নয়।

৩. গোড়া বা কাণ্ড পচা

লক্ষণ

কাণ্ড নরম হওয়া, গোড়া কালো হয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধ এবং কুশি মরে যাওয়া।

ব্যবস্থাপনা

  • দূষিত স্থির পানি অপসারণ;
  • নালা তৈরি;
  • পচা কাটিং তুলে ধ্বংস;
  • আক্রান্ত জমি থেকে নতুন জমিতে কাটিং না নেওয়া।

৪. পাতা ঝলসানো

পাতার আগা ও কিনারা শুকিয়ে যাওয়া রোগের পাশাপাশি লবণাক্ততা, সারজনিত পোড়া, পানি বা পুষ্টির ভারসাম্যহীনতার কারণেও হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখে সরাসরি ওষুধ না দিয়ে মাটি, পানি ও আক্রান্ত পাতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

৫. কাটুই পোকা ও শুঁয়োপোকা

লক্ষণ

কচি কাণ্ড কেটে যাওয়া, পাতায় অনিয়মিত ছিদ্র এবং কখনো দ্রুত পাতা খেয়ে ফেলা।

সমন্বিত দমন

  • নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন;
  • ডিম ও শুঁয়োপোকা সংগ্রহ করে ধ্বংস;
  • আগাছা পরিষ্কার;
  • পাখি বসার ডাল স্থাপন;
  • অনুমোদিত জৈব বা রাসায়নিক বালাইনাশক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ব্যবহার।

৬. জাবপোকা ও রসচোষা পোকা

পাতা কুঁকড়ে যাওয়া, হলুদ হওয়া এবং আঠালো পদার্থ দেখা যেতে পারে। প্রথমে আক্রান্ত অংশ অপসারণ ও পানির জোরালো ধারা ব্যবহার করা যায়। মারাত্মক আক্রমণে অনুমোদিত বালাইনাশক প্রয়োজন হতে পারে।

কীটনাশক ব্যবহারে অত্যাবশ্যকীয় নিয়ম

পশুখাদ্যের ঘাসে কীটনাশক প্রয়োগের পর লেবেলে উল্লেখিত pre-harvest interval বা অপেক্ষাকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘাস কাটা কিংবা পশুকে খাওয়ানো যাবে না। নির্বিচারে ওষুধ ব্যবহার দুধ ও মাংসে অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি তৈরি করে।


পশুর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি

নাইট্রেট বিষক্রিয়া

অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার, মেঘলা আবহাওয়া, খরা, জলাবদ্ধতার চাপ বা কম বয়সে কাটার কারণে কোনো কোনো ঘাসে নাইট্রেট জমতে পারে।

সম্ভাব্য লক্ষণ

  • দ্রুত বা কষ্ট করে শ্বাস নেওয়া;
  • দুর্বলতা;
  • পেট ফাঁপা;
  • কাঁপুনি;
  • মুখের ঝিল্লি বাদামি বা নীলচে হওয়া;
  • আকস্মিক মৃত্যু।

এমন হলে ঘাস খাওয়ানো বন্ধ করে দ্রুত নিবন্ধিত প্রাণিচিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ প্রয়োগ করা নিরাপদ নয়।

হঠাৎ খাদ্য পরিবর্তন

অতিরিক্ত কচি ও রসালো ঘাস একসঙ্গে দিলে পাতলা পায়খানা, রুমেনের সমস্যা কিংবা পেট ফাঁপা দেখা দিতে পারে। তাই শুকনা আঁশজাতীয় খাদ্যের সঙ্গে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করতে হবে।

পরিচয়-সম্পর্কিত ঝুঁকি

কিছু Brachiaria/Urochloa প্রজাতি সংবেদনশীল প্রাণী—বিশেষ করে ভেড়ায়—আলোক-সংবেদনশীলতা ও যকৃতের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ‘অজানা হাইব্রিড’ সেই গণের উদ্ভিদ কি না নিশ্চিত নয়; বিষয়টি এখানে শুধু সতর্কতার জন্য উল্লেখ করা হচ্ছে। কোনো অস্বাভাবিক চর্মরোগ, ক্ষুধামন্দা বা জন্ডিস দেখা দিলে ঘাস বন্ধ করে চিকিৎসককে নমুনা দেখাতে হবে।


সাইলেজ ও সংরক্ষণ

জলাবদ্ধ জমির ঘাসে সাধারণত আর্দ্রতা বেশি হতে পারে। সরাসরি সাইলেজ করলে অতিরিক্ত রস বের হওয়া, দুর্গন্ধ এবং নিম্নমানের গাঁজনের ঝুঁকি থাকে।

সাইলেজ করতে হলে—

  • পরিচ্ছন্ন ও রোগমুক্ত ঘাস ব্যবহার;
  • কাটার পর প্রয়োজনমতো ছায়ায় ঝরিয়ে নেওয়া;
  • ২–৩ সেন্টিমিটার করে কাটা;
  • প্রয়োজন অনুযায়ী শুকনা উপকরণের সঙ্গে মেশানো;
  • বায়ুরোধীভাবে চাপ দিয়ে সংরক্ষণ;
  • খোলার পর দুর্গন্ধ, কালো পচন বা ছত্রাক থাকলে ব্যবহার না করা উচিত।

ঘাসটির শুষ্ক পদার্থ ও শর্করার মাত্রা না জেনে বড় আকারে সাইলেজ না করাই ভালো।


অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

যেসব নিচু জমিতে নেপিয়ার বা ভুট্টা ভালো হয় না, সেখানে এই ঘাস কার্যকর প্রমাণিত হলে খামারির নিজস্ব সবুজ খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারে। কাটিং দিয়ে দ্রুত বংশবিস্তারও সুবিধাজনক হতে পারে।

তবে লাভের হিসাব করার সময় শুধু সবুজ ঘাসের ওজন নয়, বিবেচনা করতে হবে—

  • প্রতি কেজি শুষ্ক পদার্থ উৎপাদন খরচ;
  • প্রোটিন ও পরিপাচ্যতা;
  • পশুর খাদ্যগ্রহণ;
  • দুধ বা ওজন বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া;
  • জমি, শ্রম, সার ও সেচের ব্যয়;
  • রোগবালাই ও পুনরোপণের প্রয়োজন;
  • বিকল্প ঘাসের তুলনামূলক ফলন।

পানিসমৃদ্ধ ঘাসের সবুজ ওজন বেশি হলেও প্রকৃত পুষ্টিকর শুষ্ক পদার্থ কম হতে পারে। তাই ‘বিঘাপ্রতি কত টন সবুজ ঘাস’—এই একটি তথ্য দিয়ে লাভ নির্ধারণ করা বিভ্রান্তিকর।


ড. বায়েজিদ মোড়লের পরামর্শ

১. আগে পরিচয়, পরে সম্প্রসারণ: ‘হাইব্রিড’ লেখা বিজ্ঞাপন দেখে বড় পরিসরে চাষ করবেন না। ঘাসের ফুল, পাতা, কাণ্ড, শিকড় ও কাটিং সংগ্রহ করে বিএলআরআই, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বীকৃত উদ্ভিদবিদের মাধ্যমে প্রজাতি শনাক্ত করা প্রয়োজন।

২. প্রথমে পরীক্ষামূলক প্লট করুন: ৫–১০ শতাংশ জমিতে চাষ করে এক বছর বর্ষা, শীত ও শুষ্ক মৌসুমের ফলন পর্যবেক্ষণ করুন।

৩. নিজস্ব তুলনামূলক পরীক্ষা রাখুন: একই আয়তনে প্যারা, জার্মান বা বিএলআরআইয়ের স্বীকৃত নেপিয়ার জাত লাগিয়ে ফলন, খরচ ও পশুর গ্রহণযোগ্যতা তুলনা করুন।

৪. পুষ্টিমান পরীক্ষা ছাড়া প্রোটিনের দাবি নয়: ক্রুড প্রোটিন, শুষ্ক পদার্থ ও NDF পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টিমান প্রচার করা উচিত নয়।

৫. দূষিত পানিকে সহনশীলতা ভাববেন না: কোনো ঘাস নোংরা পানিতে বেঁচে থাকলেই সেই ঘাস পশুর জন্য নিরাপদ হয়ে যায় না। দূষিত পানি থেকে রোগজীবাণু ও রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে।

৬. পশুকে ধীরে অভ্যস্ত করুন: শুরুতে অল্প পরিমাণে পরিচিত ঘাসের সঙ্গে মিশিয়ে দিন। পাতলা পায়খানা, ক্ষুধামন্দা, পেট ফাঁপা বা ত্বকের অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করুন।

৭. একক খাদ্য হিসেবে ব্যবহার নয়: ভালো ঘাসও একা পূর্ণাঙ্গ রেশন নয়। উৎপাদনক্ষম প্রাণীর জন্য পুষ্টিবিদের সহায়তায় সুষম রেশন তৈরি করতে হবে।

৮. অতিরিক্ত ইউরিয়া পরিহার করুন: বেশি ইউরিয়া মানেই বেশি লাভ নয়। এতে খরচ, রোগ এবং নাইট্রেট বিষক্রিয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে।

৯. কাটিং বিক্রির আগে জাত নিশ্চিত করুন: অজানা ঘাসকে ‘উচ্চ প্রোটিন হাইব্রিড’ বলে অতিরঞ্জিত দাবি করে বিক্রি করা কৃষকের সঙ্গে প্রতারণার পর্যায়ে যেতে পারে।

১০. জাতীয়ভাবে গবেষণা প্রয়োজন: বিএলআরআই ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয়, ডিএনএ বারকোডিং, মৌসুমভিত্তিক ফলন, পুষ্টিমান, নাইট্রেট, দূষক এবং প্রাণীর উৎপাদন প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা উচিত।


শেষ কথা

‘অজানা হাইব্রিড ঘাস’ বাংলাদেশের জলাবদ্ধ ও অব্যবহৃত জমিতে পশুখাদ্য উৎপাদনের একটি সম্ভাবনাময় স্থানীয় উপাদান হতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনা আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। এর বৈজ্ঞানিক পরিচয়, প্রকৃত ফলন, পুষ্টিমান এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এখনো নির্ভরযোগ্য গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সুতরাং ঘাসটিকে বাতিল না করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার আওতায় আনা দরকার। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগে সীমিত জমিতে পরীক্ষা, পুষ্টি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ এবং পশুকে ধীরে ধীরে খাওয়ানোই হবে খামারির জন্য সবচেয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।

তথ্যসূত্র

সর্বশেষ - ছাগল পালন