এশিয়ার দুই বৃহৎ পোল্ট্রি প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও বিবর্তন।।
চীনের Wen’s Food Group এবং ভিয়েতনামের CPV Food Binh Phuoc Poultry Complex
এশিয়ার পোল্ট্রি শিল্পে Wen’s Food Group ও CPV Food Binh Phuoc Poultry Complex—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তবে এদের কাঠামো এক নয়। Wen’s একটি বিশাল কোম্পানি ও চুক্তিভিত্তিক খামার-নেটওয়ার্ক; অন্যদিকে CPV Food Binh Phuoc হচ্ছে নির্দিষ্ট অঞ্চলে গড়ে ওঠা সমন্বিত পোল্ট্রি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্স।
| বিষয় | Wen’s Food Group | CPV Food Binh Phuoc |
|---|---|---|
| দেশ | চীন | ভিয়েতনাম |
| প্রতিষ্ঠার ভিত্তি | ক্ষুদ্র সমবায়ধর্মী মুরগির খামার | বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক প্রকল্প |
| যাত্রা | ১৯৮৩ | প্রকল্প ঘোষণা ২০১৮; উৎপাদন শুরু ২০২০ |
| ব্যবসায়িক মডেল | কোম্পানি ও চুক্তিবদ্ধ খামারি | Feed–Farm–Food সমন্বিত ব্যবস্থা |
| প্রধান শক্তি | বিপুলসংখ্যক খামারিকে যুক্ত করা | একই ব্যবস্থায় খাদ্য, বাচ্চা, খামার, জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণ |
| উৎপাদন | বছরে ১০০ কোটির বেশি মুরগি | প্রথম ধাপে বছরে ৫ কোটি; ঘোষিত দ্বিতীয় ধাপের লক্ষ্য ১০ কোটি |
| বাজার | প্রধানত চীন | ভিয়েতনাম ও রপ্তানি বাজার |
প্রথম অধ্যায়
Wen’s Food Group: আট হাজার ইউয়ানের খামার থেকে এশিয়ার বৃহৎ পোল্ট্রি সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
Wen’s Foodstuff Group Co., Ltd.-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালের মে মাসে চীনের গুয়াংডং প্রদেশের ইউনফু অঞ্চলে। প্রতিষ্ঠাতা ওয়েন বেইইং (Wen Beiying) এবং তাঁর ছেলে ওয়েন পেংচেং (Wen Pengcheng) স্থানীয় আরও কয়েকজন কৃষককে সঙ্গে নিয়ে মাত্র ৮ হাজার চীনা ইউয়ান মূলধনে একটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রথম নাম ছিল Lezhu Livestock Associated Company। সাতটি পরিবারের মোট নয়জন সদস্য এতে যুক্ত ছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরের বছর প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে Lezhu Chicken Farm রাখা হয়। এই ছোট মুরগির খামারই পরবর্তী সময়ে Wen’s Food Group-এ রূপান্তরিত হয়। Wen’s agribusiness profile
শুরুর সময় চীনের গ্রামীণ অর্থনীতিতে আধুনিক মুরগি পালন, উন্নত জাত, মানসম্পন্ন খাদ্য, রোগনিয়ন্ত্রণ এবং নিশ্চিত বাজার—সবকিছুরই ঘাটতি ছিল। ক্ষুদ্র খামারিদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রযুক্তিও ছিল না। Wen’s-এর উদ্যোক্তারা উপলব্ধি করেন যে শুধু নিজেদের জমিতে বড় খামার করলেই দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব হবে না। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উৎপাদন বাড়াতে হবে।
“Company + Farmer” মডেলের সূচনা
Wen’s-এর সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন ছিল “কোম্পানি + খামারি” বা contract farming মডেল। এই ব্যবস্থায় কোম্পানি সাধারণত—
- উন্নত জাতের বাচ্চা সরবরাহ করে;
- নির্দিষ্ট মানের খাদ্য ও ওষুধ দেয়;
- কারিগরি ও পশুচিকিৎসা সহায়তা দেয়;
- উৎপাদন পদ্ধতি নির্ধারণ করে;
- খামার পর্যবেক্ষণ করে;
- এবং নির্ধারিত নিয়মে উৎপাদিত মুরগি সংগ্রহ বা বাজারজাত করে।
অন্যদিকে চুক্তিবদ্ধ খামারি জমি, শেড, শ্রম ও দৈনন্দিন পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করেন। ফলে Wen’s-কে সব খামারের জমি ও ভবনে এককভাবে বিনিয়োগ করতে হয়নি; আবার গ্রামীণ পরিবারগুলোও বাজার ও প্রযুক্তির নিশ্চয়তা পেয়েছে।
এই মডেলটি দ্রুত সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করে। একটি খামারের বদলে Wen’s হয়ে ওঠে হাজার হাজার খামারের কেন্দ্রীয় সংগঠক।
প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বিকাশ
প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠানটি মূলত স্থানীয় বা হলুদ পালকের মুরগি উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়। চীনা ভোক্তাদের কাছে এ ধরনের মুরগির স্বাদ ও মাংসের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে কোম্পানি—
- নিজস্ব প্রজনন ও জেনেটিক উন্নয়ন;
- হ্যাচারি স্থাপন;
- খাদ্য উৎপাদন;
- প্রাণিস্বাস্থ্য ও জৈবপ্রযুক্তি;
- রোগ নির্ণয়;
- খামারের তথ্য সংগ্রহ;
- মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ;
- কোল্ড চেইন;
- এবং খুচরা বিপণনে বিনিয়োগ করে।
সাধারণ খামারি-নির্ভর ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ডিজিটাল তথ্য, কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থায় রূপ নেয়।
পোল্ট্রি থেকে বহুমুখী খাদ্যপ্রতিষ্ঠান
Wen’s শুধু মুরগির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে শূকর, হাঁস, ডিম, গরু, ভেড়া, দুগ্ধ, প্রাণিস্বাস্থ্য পণ্য, খামার সরঞ্জাম এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবসায় প্রবেশ করে।
এই বহুমুখীকরণ একদিকে নতুন বাজার সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে কোনো একটি খাতে সংকট দেখা দিলে অন্য খাত থেকে ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ দিয়েছে। তবে শূকর উৎপাদনে ব্যাপক সম্প্রসারণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি নতুন ধরনের আর্থিক ও রোগজনিত ঝুঁকিতেও পড়ে।
২০১৫ সালের ২ নভেম্বর Wen’s শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। এর মাধ্যমে পারিবারিক ও গ্রামীণ উদ্যোগ থেকে এটি একটি বৃহৎ পাবলিক কোম্পানিতে রূপ নেয়। Wen’s corporate information
Wen’s-কে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে
১. রোগব্যাধি ও জৈবনিরাপত্তা
হাজার হাজার বিচ্ছিন্ন খামার নিয়ে কাজ করার সুবিধা থাকলেও এটি বড় জৈবনিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করে। প্রতিটি খামারে একই মানের—
- জীবাণুনাশ;
- চলাচল নিয়ন্ত্রণ;
- টিকাদান;
- মৃত মুরগি অপসারণ;
- খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা;
- এবং রোগ শনাক্তকরণ নিশ্চিত করা কঠিন।
চীনে ২০১৩ সালের H7N9 এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার সময় মুরগির চাহিদা ও দাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুরো পোল্ট্রি শিল্পে বড় আর্থিক ক্ষতি হয় এবং জীবন্ত মুরগির বাজার সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছিল। Wen’s-এর মতো হলুদ পালকের জীবন্ত মুরগিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি ছিল বিশেষভাবে বড় বাজারঝুঁকি।
তবে নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত সূত্রে Wen’s-এর সব খামারে একযোগে কোনো একক বিপর্যয়কর বার্ড ফ্লু প্রাদুর্ভাবের প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং বিভিন্ন সময় চীনের সামগ্রিক রোগপরিস্থিতি, বাজার বন্ধ এবং ভোক্তার ভয় প্রতিষ্ঠানটির বিক্রিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
২. জীবন্ত মুরগিনির্ভর বাজার
Wen’s ঐতিহাসিকভাবে জীবন্ত মুরগি বিক্রির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু রোগনিয়ন্ত্রণ, নগরায়ণ ও খাদ্যনিরাপত্তার কারণে চীনের বিভিন্ন শহরে জীবন্ত পাখির বাজার সীমিত হতে থাকে।
এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে ধীরে ধীরে—
- কেন্দ্রীয় জবাই;
- ঠান্ডা ও হিমায়িত মাংস;
- কাটা ও প্যাকেটজাত মাংস;
- প্রস্তুত খাবার;
- এবং নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রের দিকে যেতে হয়েছে।
এটি ছিল শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; ভোক্তার বহুদিনের জীবন্ত মুরগি কেনার অভ্যাস পরিবর্তনেরও চ্যালেঞ্জ।
৩. খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি
ভুট্টা ও সয়াবিন মিল পোল্ট্রি খাদ্যের প্রধান উপাদান। আন্তর্জাতিক বাজার, আবহাওয়া, আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তনে এসব কাঁচামালের মূল্য বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।
কিন্তু মুরগির বাজারদর সব সময় একই হারে বাড়ে না। ফলে অধিক উৎপাদন করেও মুনাফা কমে যেতে পারে। Wen’s-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে খাদ্যের কাঁচামালের মূল্য, মুরগির বাজারদর এবং রোগকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
৪. চুক্তিবদ্ধ খামার ব্যবস্থাপনার জটিলতা
কোম্পানি ও খামারির স্বার্থ সব সময় এক রকম হয় না। সমস্যা দেখা দিতে পারে—
- বাচ্চা বা খাদ্যের মান নিয়ে;
- মুরগির মৃত্যুহার নিয়ে;
- ওজন ও ফিড কনভার্সন হিসাব নিয়ে;
- মুরগি সংগ্রহের সময় নিয়ে;
- পারিশ্রমিক বা উৎপাদনমূল্য নিয়ে;
- এবং রোগের ক্ষতি কার ওপর বর্তাবে—তা নিয়ে।
বিপুলসংখ্যক খামারিকে একই মানে পরিচালনা করতে শক্তিশালী মাঠপর্যায়ের জনবল, ডিজিটাল রেকর্ড ও স্বচ্ছ চুক্তি প্রয়োজন হয়েছে।
৫. শূকর খাতের বিপর্যয়
Wen’s-এর ইতিহাস বুঝতে এর শূকর ব্যবসার সংকটও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮–১৯ সালে চীনে African Swine Fever—ASF ছড়িয়ে পড়লে দেশের শূকর উৎপাদন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন পুনর্গঠনে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল বিনিয়োগ করে। কিন্তু উৎপাদন দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় শূকরের দাম কমে যায়; একই সঙ্গে রোগ, খাদ্যের দাম ও ঋণের চাপ বাড়ে। Reuters
২০২৩ সালেও অতিরিক্ত উৎপাদন ও কম দামের কারণে চীনের বড় শূকর উৎপাদকদের মতো Wen’s-ও বড় আর্থিক চাপের মুখে পড়ে। এটি দেখিয়েছে—বৃহৎ হওয়া মানেই ঝুঁকিমুক্ত হওয়া নয়। অতিরিক্ত দ্রুত সম্প্রসারণ, ঋণনির্ভর বিনিয়োগ এবং বাজারদরের পতন একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানকেও সংকটে ফেলতে পারে। Reuters analysis
৬. সাম্প্রতিক আর্থিক ওঠানামা
২০২৪ সালে Wen’s ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রায় ৯.২৩ বিলিয়ন ইউয়ান নিট মুনাফা অর্জন করে। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটির মুরগি বিক্রি প্রায় ১২১ কোটি বলে শিল্পসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু ২০২৫–২৬ সালে শূকরের বাজার আবার দুর্বল হওয়ায় কোম্পানির সামগ্রিক আয় ও মুনাফায় চাপ পড়ে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে Wen’s প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন ইউয়ান নিট লোকসান জানিয়েছে। তবে এটি মূলত কোম্পানির শূকর ব্যবসা ও কম বাজারদরের সঙ্গে সম্পর্কিত; শুধু মুরগি বিভাগের সংকট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। Reuters market report
Wen’s-এর বিবর্তনের সারসংক্ষেপ
দ্বিতীয় অধ্যায়
CPV Food Binh Phuoc: ভিয়েতনামের রপ্তানিমুখী সমন্বিত পোল্ট্রি কমপ্লেক্স
প্রেক্ষাপট
CPV Food Binh Phuoc-এর ইতিহাস শুরু হয়েছে মূলত থাইল্যান্ডের Charoen Pokphand Group বা CP Group এবং এর ভিয়েতনামি প্রতিষ্ঠান C.P. Vietnam Corporation-এর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে।
CP Group ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ভিয়েতনামে বিনিয়োগের উদ্যোগ নেয়। ১৯৯৩ সালে ভিয়েতনামে তাদের প্রথম বড় পশুখাদ্য কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটি খাদ্য উৎপাদন থেকে—
- মুরগি ও শূকরের উন্নত জাত;
- হ্যাচারি;
- বাণিজ্যিক খামার;
- চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন;
- জবাই;
- মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ;
- এবং খুচরা খাদ্যবাজারে প্রবেশ করে।
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই Binh Phuoc কমপ্লেক্সের পরিকল্পনা করা হয়।
প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা
২০১৮ সালে Binh Phuoc Investment Promotion Conference-এর পর CP Group সেখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের রপ্তানিমুখী মুরগি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্স তৈরির প্রতিশ্রুতি দেয়।
প্রায় দুই বছরের নির্মাণ ও প্রস্তুতির পর ২৩ ডিসেম্বর ২০২০ কমপ্লেক্সটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। CPF official announcement
এটি আসলে একটি খামার নয়
CPV Food Binh Phuoc-কে সাধারণভাবে “বিশাল মুরগির খামার” বলা হলেও এটি প্রকৃতপক্ষে একটি সমন্বিত উৎপাদন অঞ্চল। এর আওতায় রয়েছে—
- পশুখাদ্য কারখানা;
- প্যারেন্ট স্টক বা প্রজনন খামার;
- হ্যাচারি;
- ব্রয়লার খামার;
- জবাইখানা;
- মাংস কাটিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ;
- প্যাকেজিং;
- হিমাগার;
- পরীক্ষাগার;
- বর্জ্য ও বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনা;
- এবং রপ্তানি সরবরাহব্যবস্থা।
প্রথম ধাপে Binh Phuoc প্রদেশের ছয়টি এলাকায় উৎপাদন সম্প্রসারণ করা হয়। ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৯–২৩ পর্যায়ে বছরে প্রায় ৫ কোটি মুরগি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে বছরে ১০ কোটি মুরগি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ঘোষিত সক্ষমতা এবং বাস্তবে প্রতিবছর উৎপাদিত মুরগির সংখ্যা এক বিষয় নয়। The Poultry Site
“Feed–Farm–Food” মডেল
এই কমপ্লেক্সের মূল শক্তি হলো Feed–Farm–Food ব্যবস্থা। একই কর্তৃপক্ষ পুরো শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করায় কোনো সমস্যা হলে খাদ্যের কাঁচামাল থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য পর্যন্ত ব্যাচ শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে। উন্নত বাজারে রপ্তানির জন্য এই traceability অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
CPV Binh Phuoc-কে যেসব চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে
১. রোগমুক্ত উৎপাদন অঞ্চল তৈরি
ভিয়েতনামে ছোট ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পোল্ট্রি খামার, জীবন্ত পাখির বাজার এবং বিভিন্ন পর্যায়ের জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউক্যাসল রোগের ঝুঁকি রয়েছে।
রপ্তানি করতে হলে শুধু একটি কারখানা পরিষ্কার থাকলেই হয় না; প্রজনন খামার, হ্যাচারি, ব্রয়লার খামার এবং আশপাশের উৎপাদন অঞ্চলকেও রোগনিয়ন্ত্রিত রাখতে হয়। এ জন্য CPV-কে—
- খামারের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ;
- মানুষ ও যানবাহনের চলাচল সীমিত করা;
- নিয়মিত পরীক্ষা;
- টিকাদান;
- মৃত মুরগির নিরাপদ নিষ্পত্তি;
- বন্য পাখি ও স্থানীয় খামারের সংস্পর্শ কমানো;
- এবং সরকারি প্রাণিস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউক্যাসল রোগ থেকে নিরাপদ খামারব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি করে। Binh Phuoc-এর সংশ্লিষ্ট এলাকাকে আন্তর্জাতিক মানের disease-safe zone হিসেবে গড়ে তোলাও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। তবে ২০২৪ সালের সরকারি খাতের প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুরো প্রদেশকে WOAH মানের রোগমুক্ত উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজ তখনো ২০৩০ লক্ষ্য সামনে রেখে চলছিল। অর্থাৎ উদ্বোধনের সময়কার “রোগমুক্ত অঞ্চলের পথে” থাকা এবং চূড়ান্ত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—দুটিকে এক করে দেখা যাবে না। Vietnam Agriculture
২. আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের দীর্ঘ প্রক্রিয়া
কমপ্লেক্স ২০২০ সালে চালু হলেও জাপানে প্রথম প্রক্রিয়াজাত মুরগির চালান যায় ২০২২ সালের অক্টোবরে। প্রথম চালানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩.৬ টন।
এই দুই বছরের ব্যবধান দেখায় যে কারখানা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। রপ্তানির জন্য প্রয়োজন হয়েছে—
- দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে বাণিজ্য ও প্রাণিস্বাস্থ্য সমঝোতা;
- উৎপাদনস্থল পরিদর্শন;
- খাদ্যনিরাপত্তা যাচাই;
- জীবাণু ও রাসায়নিক অবশিষ্ট পরীক্ষা;
- হ্যাজার্ড নিয়ন্ত্রণ;
- সম্পূর্ণ traceability;
- এবং ক্রেতার নির্ধারিত পণ্যমান অর্জন।
২০২২ সালের আগে ভিয়েতনাম ও জাপানের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত পোল্ট্রি রপ্তানির কার্যকর আনুষ্ঠানিক কাঠামো না থাকাও বড় বাধা ছিল। Vietnam Investment Review
৩. কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে চালু হওয়া
কমপ্লেক্সটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ২০২০ সালের শেষ দিকে—কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে। তখন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, বিশেষজ্ঞ চলাচল, শ্রম ব্যবস্থাপনা, পরিবহন এবং রপ্তানি বাজারে অনিশ্চয়তা ছিল।
প্রকাশিত তথ্যে মহামারির কারণে প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ নেই। তবে মহামারির মধ্যে এত বড় এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু রাখা নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ ছিল।
৪. উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি চাহিদার সমন্বয়
বছরে ১০ কোটি মুরগি প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা থাকলেও সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে সমপরিমাণ স্থিতিশীল বাজার প্রয়োজন। নতুন রপ্তানি বাজারে অনুমোদন পেতে সময় লাগে। ফলে—
- কারখানার সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকার ঝুঁকি;
- স্থায়ী খরচ বেড়ে যাওয়া;
- আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা;
- এবং ক্রেতানির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রথম পরিকল্পনায় জাপান, ইউরোপ, এশিয়ার অন্যান্য দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। কিন্তু সব বাজারে একই সময়ে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি জাপানে মোট ১০ হাজার টন প্রক্রিয়াজাত মুরগি রপ্তানির মাইলফলক অর্জন করে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে বার্ষিক রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য জানায়। Vietnam News
৫. পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
বছরে কোটি কোটি মুরগির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ—
- বিষ্ঠা;
- পালক;
- রক্ত;
- নাড়িভুঁড়ি;
- হাড়;
- বর্জ্যপানি;
- দুর্গন্ধ;
- এবং প্যাকেজিং বর্জ্য তৈরি হয়।
এগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে পানি, মাটি, বায়ু ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি মাংসের ছাঁটাই অংশ, পালক ও হাড় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করে খাদ্যের কাঁচামাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। বর্জ্যপানি পরিশোধন ও উৎপাদনে পানি পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য কাঁচামালের প্রায় ৮০ শতাংশ পুনঃব্যবহার করে ধীরে ধীরে zero-waste ব্যবস্থার দিকে যাওয়া। Vietnam Investment Review
৬. প্রাণিকল্যাণ ও ক্রেতার মানদণ্ড
ইউরোপ, জাপান ও অন্যান্য উন্নত বাজারে শুধু মাংস নিরাপদ হলেই যথেষ্ট নয়। মুরগির পালনঘনত্ব, পরিবহন, ধরার পদ্ধতি, জবাইয়ের আগে অচেতন করা, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং খামারের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই CPV-কে স্থানীয় বাজারের প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে কঠোর প্রাণিকল্যাণ ও নথি সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়েছে। এসব ব্যবস্থা উৎপাদন খরচ বাড়ালেও উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয়।
CPV Food কি কখনো বড় সমস্যায় পড়েছে?
উন্মুক্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র পর্যালোচনায় CPV Food Binh Phuoc কমপ্লেক্সে বড় ধরনের বার্ড ফ্লু প্রাদুর্ভাব, ব্যাপক মুরগি নিধন, গুরুতর খাদ্য প্রত্যাহার বা দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন বন্ধের নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাসহ বলতে হবে: তথ্য না পাওয়া মানেই কোনো ছোট ঘটনা কখনো ঘটেনি—এমন নয়। তবে প্রকাশিত প্রমাণ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রোগ, খাদ্যদূষণ বা অনিয়মের দাবি করা দায়িত্বশীল হবে না।
২০২৫ সালের জুনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কারখানার খাদ্যনিরাপত্তা কার্যক্রম পরিদর্শন করেছে—এটি নিয়মিত নিয়ন্ত্রক নজরদারির অংশ; প্রকাশিত প্রতিবেদনে বড় অপরাধ বা বিপর্যয়ের কথা বলা হয়নি। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক খাদ্যমান সনদও পেয়েছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের বিবর্তনের মূল পার্থক্য
Wen’s-এর বিবর্তন
Wen’s-এর সাফল্যের মূল কথা হলো কম মূলধন থেকে খামারিদের সংগঠিত করে দ্রুত বিস্তার। প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনের জমি ও শ্রমের বড় অংশ খামারিদের কাছ থেকে পেয়েছে এবং তাদের প্রযুক্তি, উপকরণ ও বাজার দিয়েছে।
কিন্তু এই মডেলে হাজার হাজার বিচ্ছিন্ন খামারে সমমানের জৈবনিরাপত্তা ও ন্যায্য চুক্তি নিশ্চিত করা কঠিন।
CPV Binh Phuoc-এর বিবর্তন
CPV-এর পথ বিপরীত। প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে খাদ্য থেকে প্রক্রিয়াজাত মাংস পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলকে একই নিয়ন্ত্রণে এনেছে।
এতে মাননিয়ন্ত্রণ ও traceability শক্তিশালী হয়েছে; তবে বিনিয়োগ, স্থায়ী খরচ এবং পর্যাপ্ত রপ্তানি বাজার তৈরির চাপ অনেক বেশি।
| শিক্ষণীয় বিষয় | Wen’s | CPV Binh Phuoc |
|---|---|---|
| সম্প্রসারণের ভিত্তি | খামারিদের অংশগ্রহণ | বৃহৎ মূলধন ও অবকাঠামো |
| ঝুঁকি | ছড়িয়ে থাকা খামারে মান নিয়ন্ত্রণ | বৃহৎ বিনিয়োগের বিপরীতে বাজার নিশ্চিত করা |
| রোগনিয়ন্ত্রণ | নেটওয়ার্কজুড়ে অভিন্ন ব্যবস্থা | অঞ্চলভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন |
| বাজার পরিবর্তন | জীবন্ত মুরগি থেকে প্রক্রিয়াজাত মাংস | দেশীয় বাজার থেকে উচ্চমানের রপ্তানি |
| প্রধান শিক্ষা | খামারিকে সঙ্গে নিয়ে বড় হওয়া | পুরো শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করে মান নিশ্চিত করা |
শেষ কথা
Wen’s Food Group-এর ইতিহাস হলো গ্রামীণ অংশীদারত্ব, চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ও দ্রুত সম্প্রসারণের ইতিহাস। মাত্র ৮ হাজার ইউয়ানের উদ্যোগ কয়েক দশকে শতকোটির বেশি মুরগি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু রোগ, খাদ্যের মূল্য, জীবন্ত মুরগির বাজার সংকোচন, চুক্তিবদ্ধ খামার ব্যবস্থাপনা এবং অন্য খাতে অতিরিক্ত সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানটিকে বারবার পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
অন্যদিকে CPV Food Binh Phuoc-এর ইতিহাস হলো বিপুল বিনিয়োগ, পূর্ণাঙ্গ সরবরাহশৃঙ্খল, রোগমুক্ত অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক বাজার অর্জনের সংগ্রাম। কারখানা উদ্বোধনের পরও জাপানের মতো বাজারে প্রবেশ করতে প্রায় দুই বছর প্রস্তুতি ও সরকারি সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে।
দুটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে—শুধু বড় শেড বা বেশি মুরগি দিয়ে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় না। প্রয়োজন খামারির সঙ্গে ন্যায্য অংশীদারত্ব, নিজস্ব খাদ্য ও বাচ্চা উৎপাদন, শক্তিশালী জৈবনিরাপত্তা, রোগনির্ণয়, ব্যাচভিত্তিক traceability, আধুনিক জবাই–প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার পরিকল্পনা।

তথ্যসূত্র
- Wen’s Foodstuff Group Co., Ltd.—বার্ষিক প্রতিবেদন ও কোম্পানির ইতিহাস: Wen’s Official Website
- Reuters—Wen’s-এর উৎপাদন, বাজার পরিস্থিতি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ: Reuters Company Profile
- Charoen Pokphand Foods—CPV Food Binh Phuoc প্রকল্পের সরকারি তথ্য: CPF Worldwide
- The Poultry Site—CPV Food Binh Phuoc-এর বিনিয়োগ ও উৎপাদনক্ষমতা: The Poultry Site
- Vietnam News—CPV Food-এর রপ্তানি অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: Vietnam News
- Vietnam Investment Review—CPV-এর Feed–Farm–Food মডেল ও বিবর্তন: VIR





















