RRP
agriculture news24.com
Health Care
Agriculture News
diamond egg
renata-ltd.com
Space for Add
Agriculture News
Spech for Promotion
avonah
Monday , 14 September 2026 |
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি

দাম বাড়লেও খামারি কেন লাভ পাচ্ছেন না—বাংলাদেশের মুরগির বাজারের নেপথ্যের হিসাব।।

প্রতিবেদক
Dr. Bayezid Moral
September 13, 2026 12:02 pm

দাম বাড়লেও খামারি কেন লাভ পাচ্ছেন না—বাংলাদেশের মুরগির বাজারের নেপথ্যের হিসাব।।

( খুচরা বাজারে ব্রয়লার ২০০ টাকা, কিন্তু উৎপাদকের ভাগ কত? বাচ্চা ও খাদ্যের উচ্চমূল্য, অস্বচ্ছ দর নির্ধারণ, মধ্যস্বত্বভোগী এবং বাজারের ঝুঁকিতে বিপর্যস্ত প্রান্তিক খামার।। )

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।।

রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি যখন ২০০ টাকায় বিক্রি হয়, তখন সাধারণ ভোক্তার ধারণা—খামারিরা নিশ্চয়ই ভালো লাভ করছেন। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই উল্টো। ভোক্তা বেশি দাম দিচ্ছেন, অথচ সেই বাড়তি অর্থের বড় অংশ খামারির কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

খামারিকে এক দিনের বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ, জীবাণুনাশক, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শ্রম, পরিবহন এবং ঋণের সুদ—সবকিছু বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। অথচ মুরগি বিক্রির সময় নিজের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দর নির্ধারণের ক্ষমতা তাঁর নেই। মুরগি নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পর প্রতিদিন খাদ্য খাওয়াতে হয় এবং রোগ ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে থাকে। ফলে যে দর পাওয়া যায়, অনেক সময় সেই দরেই বিক্রি করতে বাধ্য হন।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে ঢাকার কয়েকটি বাজারে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি প্রায় ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাসখানেক আগে দাম ছিল ১৭০–১৮০ টাকা। অর্থাৎ ভোক্তার বাজারে দাম বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে প্রান্তিক খামারিরা খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বাড়লেও জীবন্ত মুরগির খামার-দর সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

এটাই বাংলাদেশের মুরগির বাজারের মূল বৈপরীত্য—বাজারে দাম বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদক লাভ পাচ্ছেন না; অন্যদিকে ভোক্তাও কম দামে মুরগি কিনতে পারছেন না।

খুচরা দাম মানেই খামারির বিক্রয়মূল্য নয়

ব্রয়লার মুরগির বাজারে অন্তত তিনটি আলাদা দাম রয়েছে—

  1. খামার-দর: খামারি যে দামে জীবন্ত মুরগি বিক্রি করেন।
  2. পাইকারি বা আড়তদর: সংগ্রহ, পরিবহন ও আড়তের পর যে দাম দাঁড়ায়।
  3. খুচরা দর: ভোক্তা বাজার থেকে যে দামে মুরগি কেনেন।

খামারে প্রতি কেজি জীবন্ত মুরগি ১৬০ টাকায় বিক্রি হলেও ঢাকায় এসে সেটির খুচরা দর ১৯০–২০০ টাকা হতে পারে। এই ৩০–৪০ টাকা ব্যবধানের সবটাই অবশ্য কারও নিট মুনাফা নয়। এর মধ্যে পরিবহন, গাড়িভাড়া, শ্রমিক, বাজারের খাজনা, আড়ত কমিশন, দোকানভাড়া, মুরগির মৃত্যু, ওজন হ্রাস, অবিক্রীত মুরগির খাদ্য এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফা থাকে।

সমস্যা হলো, এই মূল্যশৃঙ্খলের প্রতিটি পর্যায়ের দর, ব্যয় ও মুনাফা প্রকাশিত হয় না। ফলে বোঝা যায় না—

  • খামারি কত টাকা পেলেন;
  • পাইকার কত দামে কিনলেন;
  • আড়ত কত কমিশন নিল;
  • পরিবহনে প্রকৃত খরচ কত হলো;
  • খুচরা বিক্রেতার মার্জিন কত;
  • ভোক্তার দেওয়া বাড়তি অর্থ শেষ পর্যন্ত কার কাছে গেল।

এই অস্বচ্ছতাই “দাম বাড়লে খামারির লাভ হয়”—এমন ভুল ধারণা তৈরি করে।

এক হাজার ব্রয়লারের একটি খামারের আনুমানিক হিসাব

ব্রয়লারের উৎপাদন ব্যয় খামার, এলাকা, মৌসুম, বাচ্চার দাম, খাদ্যের মান, মৃত্যুহার, ওজন এবং ফিড কনভার্সন রেশিও বা FCR অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। নিচের হিসাবটি পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য একটি উদাহরণ; এটি কোনো নির্দিষ্ট দিনের সরকারি উৎপাদন ব্যয় নয়।

ধরা যাক, একজন খামারি এক হাজার ব্রয়লার বাচ্চা তুলেছেন।

ব্যয়ের খাতআনুমানিক হিসাব
এক হাজার বাচ্চা—প্রতি পিস ৬০–৮০ টাকা৬০,০০০–৮০,০০০ টাকা
খাদ্য—প্রায় ২.৫–২.৮ টন১,৭০,০০০–২,০৫,০০০ টাকা
ওষুধ, ভ্যাকসিন ও জীবাণুনাশক১০,০০০–১৮,০০০ টাকা
লিটার, গ্যাস ও ব্রুডিং৬,০০০–১২,০০০ টাকা
বিদ্যুৎ ও পানি৪,০০০–৮,০০০ টাকা
শ্রম ও ব্যবস্থাপনা৮,০০০–১৫,০০০ টাকা
পরিবহন, কমিশন ও অন্যান্য৫,০০০–১০,০০০ টাকা
ঘর ও সরঞ্জামের অবচয়, সুদ৫,০০০–১২,০০০ টাকা
মোট আনুমানিক ব্যয়২,৬৮,০০০–৩,৬০,০০০ টাকা

ধরা যাক, পাঁচ শতাংশ মুরগি মারা যাওয়ার পর বিক্রিযোগ্য থাকে ৯৫০টি। প্রতিটির গড় জীবন্ত ওজন ১.৮ কেজি হলে মোট বিক্রিযোগ্য ওজন হবে—৯৫০ × ১.৮ = ১,৭১০ কেজি।

মোট ব্যয় যদি ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা হয়, তাহলে উৎপাদন খরচ—২,৯৫,০০০ ÷ ১,৭১০ = প্রায় ১৭৩ টাকা প্রতি কেজি।

এখন খামারি যদি প্রতি কেজি ১৬৫ টাকায় বিক্রি করেন, তাঁর লোকসান হবে—৮ × ১,৭১০ = ১৩,৬৮০ টাকা।

অন্যদিকে খুচরা বাজারে সেই মুরগি ২০০ টাকা কেজি বিক্রি হলে ভোক্তার মনে হবে প্রতি কেজিতে ৩৫ টাকা লাভ হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদক ইতিমধ্যে লোকসানে মুরগি ছেড়ে দিয়েছেন।

আবার বাচ্চার দাম কম, FCR ভালো, মৃত্যুহার ২–৩ শতাংশ এবং গড় ওজন বেশি হলে উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে। তাই একটি একক সংখ্যা দিয়ে দেশের সব খামারের উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

খাদ্যেই চলে যায় সবচেয়ে বেশি অর্থ

ব্রয়লার উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ব্যয় খাদ্য। খামারিদের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্যের পেছনে চলে যেতে পারে। ২০২৬ সালের আগস্টে গাজীপুরের খামারিরা অভিযোগ করেন, ৫০ কেজির প্রতি বস্তা খাদ্যের দাম এক দফায় ১০০ টাকার বেশি বাড়ানো হয়েছে। তাঁদের হিসাবে দুই হাজার মুরগির একটি খামারে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা বাড়তি ব্যয় তৈরি হতে পারে।

পোলট্রি খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো—

  • ভুট্টা;
  • সয়াবিন মিল;
  • চালের কুঁড়া;
  • তেল;
  • অ্যামাইনো অ্যাসিড;
  • ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্স;
  • এনজাইম;
  • টক্সিন বাইন্ডার;
  • অন্যান্য আমদানিনির্ভর উপকরণ।

ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, বন্দরের চার্জ, পরিবহন, জ্বালানি এবং স্থানীয় ভুট্টার বাজার—সবকিছুর প্রভাব খাদ্যের দামে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাঁচামালের দাম কমলে তৈরি খাদ্যের দাম কি একই গতিতে কমে? বিভিন্ন কোম্পানির খাদ্যের ঘোষিত মূল্য, ডিলার কমিশন এবং প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের মধ্যে পার্থক্য আছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত ও প্রকাশ্য হিসাব প্রয়োজন।

বাচ্চার দাম বাড়লেই উৎপাদন ব্যয় লাফিয়ে বাড়ে

এক দিনের ব্রয়লার বাচ্চা বা DOC-এর দাম মুরগি উৎপাদনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি যে বাচ্চা ২২–২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেটি ৮০–৮৫ টাকায় ওঠার খবর পাওয়া যায়। অর্থাৎ দুই মাসে দাম প্রায় তিন গুণ হয়েছিল।

এক হাজার বাচ্চার ক্ষেত্রে প্রতিটির দাম ২৫ টাকা থেকে ৮০ টাকায় উঠলে শুধু বাচ্চা কেনাতেই অতিরিক্ত লাগে—

৫৫ × ১,০০০ = ৫৫,০০০ টাকা।

বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়ার প্রায় এক মাস পর সেই মুরগি বাজারে আসে। ফলে ভোক্তা আজ যে মুরগি কিনছেন, তার উৎপাদন ব্যয় নির্ধারিত হয়েছিল তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ আগে। অথচ বিক্রির দিন বাজারদর কমে গেলে খামারি আগের উচ্চমূল্যের বাচ্চা ও খাদ্যের খরচ আর উদ্ধার করতে পারেন না।

বাচ্চার বাজারে আরও কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—

  • দেশে প্রতিদিন কত বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে?
  • কতগুলো প্যারেন্ট স্টক সক্রিয় রয়েছে?
  • কত বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে এবং কত বাচ্চা নষ্ট করা হচ্ছে?
  • কোম্পানির ঘোষিত দাম ও ডিলার পর্যায়ের দাম কত?
  • উৎপাদন খরচের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না?

এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ না হওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি প্রকৃত, নাকি কৃত্রিম—তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

খামারি মূল্যগ্রহীতা, মূল্যনির্ধারক নন

প্রান্তিক খামারি খাদ্য কেনার সময় দর নির্ধারণ করতে পারেন না। বাচ্চা কেনার সময়ও পারেন না। ওষুধ, বিদ্যুৎ ও পরিবহনের দামও তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই। অথচ মুরগি বিক্রির সময়ও তিনি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না।

জীবন্ত ব্রয়লার দীর্ঘদিন ধরে রাখা যায় না। নির্ধারিত বয়সের পর—

  • প্রতিদিন খাদ্য ব্যয় বাড়ে;
  • FCR খারাপ হতে পারে;
  • ঘরে জায়গার চাপ বাড়ে;
  • হিট স্ট্রেস ও রোগের ঝুঁকি বাড়ে;
  • মৃত্যুহার বাড়তে পারে;
  • বাজারে অতিরিক্ত ওজনের মুরগির চাহিদা কমে যেতে পারে।

পাইকার যদি বলেন, “আজকের দর ১৬০ টাকা”—খামারির সামনে অপেক্ষা করার সুযোগ খুবই সীমিত। এই বাধ্যবাধকতা পাইকার বা সংগ্রাহককে দর-কষাকষিতে তুলনামূলক সুবিধা দেয়।

দৈনিক দর কে নির্ধারণ করে?

বাংলাদেশে জীবন্ত ব্রয়লারের দর প্রতিদিন ওঠানামা করে। বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল ফোন, অনলাইন গ্রুপ, আড়ত, ডিলার এবং বড় ক্রেতাদের মাধ্যমে “আজকের দর” ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সাধারণ খামারি জানেন না—

  • দরটি কোন বাজারের বাস্তব লেনদেনের ওপর নির্ধারিত;
  • কত মুরগি কেনাবেচা হয়েছে;
  • আগের দিনের মজুত কত;
  • অঞ্চলভেদে সরবরাহের পার্থক্য কত;
  • ঘোষিত দর নির্ধারণে কারা অংশ নিয়েছেন।

অতএব, দর নির্ধারণের জন্য একটি প্রকাশ্য ও প্রমাণনির্ভর পদ্ধতি জরুরি। অভিযোগ থাকলেই “সিন্ডিকেট” বলা যথেষ্ট নয়; আবার অভিযোগ উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। প্রতিযোগিতা কমিশন, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে তথ্যনির্ভর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

সরবরাহ কমলেই খুচরা দাম বাড়ে, কিন্তু সব খামারি লাভ করেন না

অনেক খামারি লোকসানে উৎপাদন বন্ধ করলে কয়েক সপ্তাহ পর বাজারে মুরগির সরবরাহ কমে যায়। তখন খুচরা দাম বাড়তে শুরু করে। কিন্তু যে খামারি আগেই লোকসানে খামার খালি করেছেন, তিনি এই উচ্চমূল্যের সুফল পান না।

পরবর্তী সময়ে বেশি দামের আশায় খামারিরা আবার একসঙ্গে বাচ্চা তোলেন। ফলে কয়েক সপ্তাহ পর বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম পড়ে যায়। তখন আবার লোকসান শুরু হয়।

এই চক্রটি এমন—লোকসান → খামার বন্ধ → সরবরাহ কম → দাম বৃদ্ধি → আবার বাচ্চা তোলা → সরবরাহ বৃদ্ধি → দাম পতন → পুনরায় লোকসান।

উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস না থাকায় বাংলাদেশের পোলট্রি বাজার বারবার এই চক্রে পড়ে।

চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ও স্বাধীন খামারির অসম প্রতিযোগিতা

বড় সমন্বিত কোম্পানির অনেকেরই নিজস্ব—

  • প্যারেন্ট স্টক ও হ্যাচারি;
  • খাদ্য কারখানা;
  • ওষুধ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহব্যবস্থা;
  • চুক্তিভিত্তিক খামার;
  • পরিবহন;
  • সংগ্রহ ও বিক্রয় নেটওয়ার্ক;
  • প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র্যান্ডেড বাজার রয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠানের এক অংশে সাময়িক লোকসান হলে অন্য অংশের আয় দিয়ে তা সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু স্বাধীন প্রান্তিক খামারিকে বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধ খুচরা বা ডিলার পর্যায়ের দামে কিনতে হয় এবং জীবন্ত মুরগি পাইকারের কাছে বিক্রি করতে হয়।

ফলে একই বাজারে প্রতিযোগিতা করলেও দুই পক্ষের ব্যয়, ঝুঁকি ও দর-কষাকষির ক্ষমতা সমান নয়।

চুক্তিভিত্তিক খামারে বাজারঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। তবে চুক্তিতে যদি বাচ্চার মান, খাদ্যের পরিমাণ, মৃত্যু, ওজন, প্রণোদনা, কর্তন এবং অর্থ পরিশোধের নিয়ম পরিষ্কার না থাকে, তাহলে খামারি নতুন ধরনের নির্ভরতার মধ্যে পড়তে পারেন।

মুরগির ওজনেও রয়েছে নীরব লোকসান

ওজন নির্ধারণ মুরগির বাজারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আলোচিত বিষয়। খামার থেকে মুরগি নেওয়ার সময়—

  • দাঁড়িপাল্লা বা ডিজিটাল স্কেলের নির্ভুলতা;
  • খাঁচার ওজন;
  • মুরগির পেট খালি থাকার সময়;
  • পরিবহনের আগে ও পরে ওজনের পার্থক্য;
  • মৃত মুরগির দায়;
  • লোডিংয়ের সময় ক্ষতি—

এসব নিয়ে প্রায়ই বিরোধ দেখা দেয়।

মাত্র এক শতাংশ ওজন কম ধরা হলেও ১,৭০০ কেজি মুরগিতে ১৭ কেজির মূল্য হারান খামারি। কেজিপ্রতি ১৬৫ টাকা হলে লোকসান ২,৮০৫ টাকা। দুই বা তিন শতাংশ কম হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে।

তাই প্রত্যেক লেনদেনে যাচাইকৃত ডিজিটাল স্কেল, লিখিত ওজন রসিদ এবং খামারি–ক্রেতা উভয়ের স্বাক্ষর থাকা উচিত।

মৃত্যুহার ও FCR লাভের হিসাব পাল্টে দেয়

সব খামারের উৎপাদন খরচ এক নয়। লাভ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় দুটি কারিগরি সূচক হলো—

মৃত্যুহার

এক হাজার বাচ্চার মধ্যে ৫০টি মারা গেলে সেই ৫০টির বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ ও পরিচর্যার খরচ জীবিত মুরগির ওপর এসে পড়ে।

ফিড কনভার্সন রেশিও

এক কেজি জীবন্ত ওজন তৈরিতে কত কেজি খাদ্য প্রয়োজন, সেটিই FCR। FCR ১.৫০ থেকে ১.৭০ হলে খাদ্যের মূল্য বেশি থাকার কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

বাচ্চার নিম্নমান, খাদ্যের পুষ্টিমান, তাপমাত্রা, বায়ু চলাচল, পানির মান, রোগ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা—সবকিছু FCR খারাপ করতে পারে। তাই শুধু খাদ্যের বস্তার দাম নয়, প্রতি কেজি মাংস উৎপাদনে খাদ্যের প্রকৃত খরচ হিসাব করতে হবে।

বাকিতে উপকরণ কেনার অতিরিক্ত মূল্য

অনেক ছোট খামারির কার্যকর মূলধন নেই। তাঁরা ডিলারের কাছ থেকে বাকিতে বাচ্চা, খাদ্য বা ওষুধ নেন। এর বিনিময়ে—

  • নগদ মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিতে হয়;
  • নির্দিষ্ট কোম্পানির পণ্য নিতে হয়;
  • উৎপাদিত মুরগি নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে বিক্রির চাপ থাকে;
  • বিক্রির টাকা থেকে আগের দেনা কেটে নেওয়া হয়।

কাগজে এটি সুদ হিসেবে লেখা না থাকলেও বাস্তবে বাকির বাড়তি মূল্য অর্থায়ন ব্যয় হিসেবে উৎপাদন খরচের সঙ্গে যুক্ত হয়। অথচ প্রচলিত হিসাবের সময় এই ব্যয় প্রায়ই বাদ দেওয়া হয়।

ভোক্তাও ক্ষতিগ্রস্ত

বাজারের অদক্ষতা শুধু খামারিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। ভোক্তাও কয়েকভাবে ক্ষতির শিকার হন—

  • উৎপাদন কমলে হঠাৎ দাম বেড়ে যায়;
  • খামারি লোকসানে পড়লে মানসম্পন্ন উৎপাদনে বিনিয়োগ কমে;
  • জীবন্ত পাখি পরিবহনে ওজন ও গুণগত ক্ষতি হয়;
  • অস্বাস্থ্যকর বাজারে জবাইয়ের কারণে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে;
  • মাংসের দামের অস্থিরতায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ কমে যায়।

অতএব, ন্যায্য বাজারব্যবস্থা মানে শুধু খামারিকে বেশি দাম দেওয়া নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত—খামারিকে টেকসই মূল্য, ব্যবসায়ীকে যৌক্তিক মার্জিন এবং ভোক্তাকে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মাংস নিশ্চিত করা।

বাজার স্থিতিশীল করতে যা করা প্রয়োজন

১. দৈনিক তিন স্তরের দর প্রকাশ

প্রতিটি প্রধান উৎপাদন এলাকায় প্রতিদিন প্রকাশ করতে হবে—

  • খামার-দর;
  • পাইকারি দর;
  • খুচরা দর;
  • লেনদেনের পরিমাণ;
  • বাচ্চা ও খাদ্যের মূল্য।

তথ্য এসএমএস, ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রকাশ করা যেতে পারে।

২. সাপ্তাহিক উৎপাদন ব্যয় সূচক

ভুট্টা, সয়াবিন, বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয়ের ভিত্তিতে অঞ্চলভিত্তিক একটি Broiler Production Cost Index প্রকাশ করা দরকার। এতে খামারি, সরকার ও ভোক্তা সবাই প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে পারবেন।

৩. বাচ্চার উৎপাদন ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ

হ্যাচারিভিত্তিক সাপ্তাহিক তথ্য থাকা প্রয়োজন—

  • ডিম সেট করার সংখ্যা;
  • বাচ্চা উৎপাদন;
  • বিক্রয়;
  • নষ্ট বা ধ্বংস করা বাচ্চা;
  • ঘোষিত দাম;
  • ডিলার পর্যায়ের দাম।

৪. খাদ্যের মূল্য নিরীক্ষা

কাঁচামালের আমদানি মূল্য, শুল্ক, পরিবহন, উৎপাদন ব্যয়, ডিলার কমিশন এবং খুচরা মূল্য পর্যালোচনা করতে হবে। কাঁচামালের দাম কমলে তৈরি খাদ্যের দামও যৌক্তিক সময়ের মধ্যে কমছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

৫. ওজনের ডিজিটাল রসিদ

খামার থেকে মুরগি কেনার সময় অনুমোদিত ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার এবং খামারিকে তাৎক্ষণিক লিখিত বা এসএমএস রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

৬. উৎপাদক সংগঠন ও সমবায় বিপণন

ছোট খামারিরা পৃথকভাবে দর-কষাকষিতে দুর্বল। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে সংগঠিত হয়ে তাঁরা—

  • একসঙ্গে খাদ্য ও বাচ্চা কিনতে;
  • পশুচিকিৎসা ও ল্যাব সুবিধা ভাগাভাগি করতে;
  • মুরগি সম্মিলিতভাবে বাজারজাত করতে;
  • পরিবহন ব্যয় কমাতে;
  • বড় ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করতে পারেন।

৭. সুলভ ঋণ ও কার্যকর মূলধন

পোলট্রি খামারিকে কৃষিঋণের আওতায় বাস্তবসম্মত জামানত ও সহজ প্রক্রিয়ায় কার্যকর মূলধন দিতে হবে। এতে তাঁরা বাকিতে বাড়তি দামে উপকরণ কিনতে বাধ্য হবেন না।

৮. প্রক্রিয়াজাত ও শীতল বিপণনব্যবস্থা

জীবন্ত মুরগির বাজারের পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে—

  • নির্ধারিত স্বাস্থ্যসম্মত জবাইখানা;
  • কোল্ড চেইন;
  • চিলড ও ফ্রোজেন মাংস;
  • ওজন ও মানভিত্তিক গ্রেডিং;
  • প্যাকেটজাত বিপণন—

বাড়ানো প্রয়োজন। এতে খামারিকে নির্দিষ্ট দিনেই সব মুরগি বিক্রির চাপ কমানো সম্ভব হবে।

৯. অস্বাভাবিক মূল্য ও প্রতিযোগিতা তদন্ত

বাজারে একযোগে অস্বাভাবিক দাম বাড়া বা কমার অভিযোগ উঠলে প্রতিযোগিতা কমিশনকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তবে তদন্ত হতে হবে কোম্পানি, ডিলার, পাইকার, আড়তদার এবং খুচরা বাজার—সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খল ধরে।

১০. খামার নিবন্ধন ও উৎপাদন পূর্বাভাস

কোন অঞ্চলে কত খামার সক্রিয়, কত বাচ্চা উঠেছে এবং তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ পরে আনুমানিক কত মুরগি বাজারে আসবে—এর পূর্বাভাস প্রকাশ করা গেলে হঠাৎ সরবরাহ সংকট বা অতিরিক্ত উৎপাদন কমানো সম্ভব।

পরামর্শ

মুরগির খুচরা দাম বাড়লেই খামারি লাভ করছেন—এ ধারণা থেকে নীতিনির্ধারকদের বেরিয়ে আসতে হবে। খামারির লাভ নির্ধারণ হয় খুচরা বাজারের দাম দিয়ে নয়; নির্ধারণ হয় তাঁর প্রতি কেজি উৎপাদন ব্যয় ও প্রকৃত খামার-দরের ব্যবধান দিয়ে।

সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বাজারের প্রতিটি স্তরের হিসাব দৃশ্যমান করা। এক দিনের বাচ্চা থেকে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত কোথায় কত ব্যয় ও মার্জিন যোগ হচ্ছে, তার একটি জাতীয় মূল্যশৃঙ্খল মানচিত্র তৈরি করা দরকার। কোম্পানি বা ব্যবসায়ীকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে এবং খামারিকে শুধু ভর্তুকি দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন প্রতিযোগিতামূলক বাজার, স্বচ্ছ দর, চুক্তির সুরক্ষা, সঠিক ওজন, সুলভ অর্থায়ন, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং খামারির সম্মিলিত বিপণনক্ষমতা।

পাশাপাশি খামারিকেও প্রতিটি ব্যাচের বাচ্চার দাম, খাদ্য গ্রহণ, ওজন, FCR, মৃত্যুহার, ওষুধ, শ্রম, বিদ্যুৎ, সুদ ও বিক্রয়মূল্য লিখে রাখতে হবে। হিসাব না রেখে শুধু বাজারদরের ওপর নির্ভর করলে প্রকৃত লাভ–লোকসান জানা সম্ভব নয়।

শেষ কথা

বাংলাদেশের মুরগির বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু দাম বেশি বা কম হওয়া নয়; বড় সমস্যা হলো দাম ও ঝুঁকির অসম বণ্টন। উৎপাদনের প্রায় সব ঝুঁকি বহন করেন খামারি, কিন্তু বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে তাঁর ক্ষমতা সবচেয়ে কম। অন্যদিকে ভোক্তা বেশি দাম দিলেও সেই অর্থের ন্যায্য অংশ উৎপাদকের কাছে পৌঁছায় না।

এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে প্রান্তিক খামার বন্ধ হবে, উৎপাদন বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হবে এবং বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। তখন ভোক্তা, খামারি এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা—তিনটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই এখন প্রয়োজন একটি স্পষ্ট নীতি—খামারিকে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য, ব্যবসায়ীকে যৌক্তিক মুনাফা এবং ভোক্তাকে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মুরগির মাংস দিতে হবে।

এর জন্য অনুমাননির্ভর বক্তব্য নয়; প্রয়োজন দৈনিক নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রকাশ্য হিসাব, কার্যকর নজরদারি এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত জবাবদিহিমূলক বাজারব্যবস্থা।

তথ্যসূত্র

  • কৃষি বিপণন অধিদপ্তর—ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাজারদর ও উৎপাদন ব্যয়ের তথ্য।
  • প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর—বাংলাদেশের পোল্ট্রি উৎপাদন ও খামারসংক্রান্ত তথ্য।
  • প্রথম আলো, ২০২৬—ব্রয়লার, বাচ্চা ও পোল্ট্রি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিবিষয়ক প্রতিবেদন।
  • দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস—পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয়, খামার-দর ও বাজার বিশ্লেষণ।
  • বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ও প্রান্তিক খামারিদের বক্তব্য।

সর্বশেষ - ছাগল পালন

আপনার জন্য নির্বাচিত

আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৩

ইলিশ অভয়াশ্রম এলাকা পরিদর্শন করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা

সবজীক্ষেতের কিছু আগাছার পরিচিতি

কৃষির উপখাত হলেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত কোন ভর্তূকি পায় না-মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা

নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, গড়বো স্মার্ট বাংলাদেশ

পৃথিবীতে ব্রয়লার ও লেয়ার পোল্ট্রি পালনের ইতিহাস

সফলভাবে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারলে দেশে পেঁয়াজ নিয়ে অস্থিরতা ও সংকট দূর হবে

সবুজ বাংলার উপস্থাপিকা – কৃষিবিদ সোনিয়া সুলতানা

জুলাই ঘোষণাপত্র

ব্রয়লার মুরগির কোন কোন খাবার মোটাতাজাকরণ গরুকে খাওয়ালে ক্ষতি হতে পারে?—বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ