এক লিটার দুধ উৎপাদনে আসল খরচ কত—খামারি পান কত?
ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন

এক লিটার দুধের দাম জানতে বাজারে গেলেই উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু সেই দুধ উৎপাদন করে খামারি কত টাকা পান এবং তাঁর প্রকৃত খরচ কত—এই দুই প্রশ্নের উত্তর এত সহজ নয়। কারণ খামারি প্রতিদিন খাবার, শ্রম ও চিকিৎসার টাকা দিলেও গাভি কেনার বিনিয়োগ, দুধ বন্ধ থাকার সময়ের ব্যয় কিংবা পরিবারের সদস্যদের শ্রম অনেক সময় হিসাবে রাখেন না। ফলে হাতে নগদ টাকা থাকলেও খামারটি সত্যিকার অর্থে লাভে আছে কি না, তা অস্পষ্ট থেকে যায়।
প্রকাশিত গবেষণা থেকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ককে ২০২৬ সালের সারা বাংলাদেশের ‘আসল খরচ’ বলা যায় না। বাংলাদেশে স্থান, গাভির উৎপাদনক্ষমতা, খাবারের উৎস, খামারের আকার ও বিক্রির পথ অনুযায়ী প্রতি লিটারের খরচ এবং খামারির পাওয়া দাম বদলায়। এই প্রতিবেদনে গবেষণায় পাওয়া অঙ্কগুলোকে তাদের তথ্য সংগ্রহের সময়সহ দেখানো হয়েছে; পাশাপাশি বর্তমান খামারের খাতা থেকে প্রকৃত খরচ বের করার একটি নমুনা হিসাব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
ঢাকা জেলার নির্বাচিত এলাকায় ২০১৮ সালের মাঠতথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রতি গাভির দৈনিক উৎপাদন খরচ পাওয়া যায় ৪৮৭ টাকা ৮৩ পয়সা; প্রতিবেদনে প্রতি লিটার উৎপাদন খরচ দেখানো হয় ৪৮ টাকা ৭৮ পয়সা। ওই দৈনিক খরচের মধ্যে খাবার ৩০০ টাকা ২৯ পয়সা, শ্রম ৯৮ টাকা ৯৬ পয়সা এবং চিকিৎসক ও ওষুধ ২৯ টাকা ১৯ পয়সা। অর্থাৎ খাবারই ছিল মোট খরচের প্রায় ৬২ শতাংশ। গবেষণাটিতে বিপণন খরচ উৎপাদন খরচের বাইরে, প্রতি গাভি দৈনিক আরও ১৭ টাকা ১৬ পয়সা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এগুলো ২০১৮ সালের মাঠতথ্য, আজকের বাজারদর নয়।
একই গবেষণায় বিক্রির পথভেদে খামারির পাওয়া দামের বড় পার্থক্য দেখা যায়: সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রিতে লিটারপ্রতি ৮৪ টাকা, পাইকারের কাছে ৫৯ টাকা, মিষ্টির দোকানে ৫৮ টাকা এবং নিকটবর্তী বাজারে ৬৫ টাকা। এখানে সরাসরি বিক্রিতে বেশি দাম পেলেই পুরো ব্যবধান লাভ হয় না; দুধ পৌঁছানো, পাত্র, সময় ও বিক্রির ব্যয়ও খামারিকে বহন করতে হয়। এগুলোকেও বর্তমান বাজারের দর হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
অন্য একটি গবেষণায় গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিরাজগঞ্জের নির্বাচিত দুই গাভির খামার তুলনা করা হয়। সেখানে সমবায় সহায়তাপ্রাপ্ত মডেল খামারে প্রতি কেজি দুধের গড় উৎপাদন খরচ ৩৬ টাকা ৪৪ পয়সা, প্রচলিত খামারে ৩৯ টাকা ৪০ পয়সা পাওয়া যায়। গবেষণাটি ২০২০ সালে প্রকাশিত; এর অঙ্কও বর্তমান দর নয়। লক্ষণীয়, গবেষণায় একক কেজি—তাই অঙ্কগুলোকে সরাসরি ‘প্রতি লিটার’ লিখে তুলনা করা উচিত নয়।
এই গবেষণাগুলো একসঙ্গে যে কথাটি জানায় তা হলো: একই দেশে খামারভেদে খরচ আলাদা, আর একই দুধ বিক্রির পথভেদে খামারির আয়ও আলাদা।
এক লিটারের ‘আসল খরচ’ বের হবে কীভাবে?
শুধু আজকের গোখাদ্যের দামকে আজকের দুধ দিয়ে ভাগ করলে খরচ কম দেখাতে পারে। পূর্ণ খামারের হিসাবের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়—যেমন এক মাস—বেছে নিতে হবে।
প্রতি লিটার প্রকৃত খরচ = ওই মাসে ডেইরি খামারের মোট প্রাসঙ্গিক ব্যয় ÷ ওই মাসে উৎপাদিত বিক্রয়যোগ্য দুধের মোট লিটার
খরচের খাতাগুলো হবে:
| খরচের খাত | হিসাবে যা ধরতে হবে |
|---|---|
| খাবার | দানাদার খাবার, ঘাস, খড়, সাইলেজ, লবণ ও মিনারেল; নিজের জমির ঘাসের উৎপাদন খরচও |
| শ্রম | বেতনভুক্ত কর্মীর মজুরি এবং পরিবারের সদস্যের কাজের যুক্তিসংগত মূল্য |
| স্বাস্থ্য ও প্রজনন | টিকা, কৃমিনাশক, চিকিৎসা, ওষুধ, কৃত্রিম প্রজনন |
| খামার পরিচালনা | বিদ্যুৎ, পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মেরামত |
| দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় | শেড ও যন্ত্রপাতির অবচয়; ঋণের সুদ বা মূলধনের ব্যয় |
| দুধ সংগ্রহ ও বিক্রি | পাত্র, শীতলীকরণ, পরিবহন, পরীক্ষার ফি ও বিক্রিসংক্রান্ত ব্যয় |
দুধ দেওয়া গাভির পাশাপাশি শুকনা গাভি ও ভবিষ্যতের দুধেল গাভি তৈরির ব্যয় হিসাব থেকে বাদ দিলে দীর্ঘমেয়াদি খরচ কম দেখা যায়। তবে কোনো বাছুর পালনের খরচ ও পরে তার বিক্রয়মূল্য একাধিক জায়গায় ধরলে হিসাব উল্টো ফুলে যাবে। একইভাবে গোবর বা বাছুর বিক্রি থেকে আয় হলে সেটি আলাদা আয় হিসেবে দেখাতে হবে, অথবা স্পষ্ট পদ্ধতিতে দুধের খরচ থেকে বাদ দিতে হবে—দুই পদ্ধতি একসঙ্গে নয়।
একটি নমুনা খামারের হিসাব
ধরা যাক, একটি খামার মাসে ৩,০০০ লিটার বিক্রয়যোগ্য দুধ উৎপাদন করেছে। নিচের অঙ্কগুলো হিসাব বোঝানোর জন্য কল্পিত, বাংলাদেশের বর্তমান গড় বাজারদর বা মাঠজরিপের ফল নয়।
| মাসিক ব্যয় | টাকা |
|---|---|
| খাবার | ১,০৫,০০০ |
| শ্রম | ৩৩,০০০ |
| চিকিৎসা ও প্রজনন | ৯,০০০ |
| বিদ্যুৎ, পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা | ১২,০০০ |
| শেড ও যন্ত্রপাতির অবচয় | ১৫,০০০ |
| মূলধনের ব্যয় ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক খরচ | ১২,০০০ |
| দুধ সংগ্রহ ও পরিবহন | ১২,০০০ |
| মোট | ১,৯৮,০০০ |
এখানে প্রতি লিটারের পূর্ণ খরচ ১,৯৮,০০০ ÷ ৩,০০০ = ৬৬ টাকা। খামারি যদি প্রতি লিটার ৭০ টাকা পান, তবে দুধ বিক্রিতে লিটারপ্রতি ৪ টাকা, মাসে ১২,০০০ টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে। আর দাম ৬২ টাকা হলে লিটারপ্রতি ৪ টাকা, মাসে ১২,০০০ টাকা ঘাটতি হবে। গোবর বা বাছুর বিক্রির আয় এই উদাহরণে ধরা হয়নি; সেগুলো যোগ করলে খামারের মোট ফল বদলাবে।
আরও একটি বিষয় খেয়াল করার মতো: একই ১,৯৮,০০০ টাকা খরচে উৎপাদন ৩,০০০ লিটারের বদলে ২,৫০০ লিটার হলে প্রতি লিটারের খরচ বেড়ে ৭৯ টাকা ২০ পয়সা হবে। বাস্তবে দুধ কমলে খাবারসহ কিছু ব্যয়ও বদলাতে পারে; তবু উদাহরণটি দেখায়, উৎপাদন কমে গেলে স্থায়ী ব্যয়ের চাপ প্রতি লিটারে দ্রুত বাড়ে।
খামারি পান কত—একটি দাম কেন বলা যাচ্ছে না?
খামারের গেট থেকে সরাসরি পরিবারের কাছে, স্থানীয় বাজারে, মিষ্টির দোকানে, সমবায়ে অথবা প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে—দুধ নানা পথে যায়। সিরাজগঞ্জের ১৩০ জন বাণিজ্যিক খামারিকে নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, সরাসরি চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে বিক্রিতে খামারির অংশ বেশি ছিল। তবে সমবায়, প্রক্রিয়াজাতকারী ও মধ্যস্থতাকারীর কাছে বিক্রির আকর্ষণ ছিল নিয়মিত দুধ বিক্রির সুযোগ এবং কিছু সহায়ক সেবা। অর্থাৎ খামারির সিদ্ধান্তে দাম ও নিশ্চিত বিক্রি—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত যাচাই করা সূত্রে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের জন্য একই পদ্ধতিতে সংগৃহীত, চলতি মাসের একটি নির্ভরযোগ্য গড় খামারদর পাওয়া যায়নি। তাই আজ খামারি ‘লিটারপ্রতি ঠিক এত টাকা পান’—এমন একটি জাতীয় অঙ্ক দেওয়া বিভ্রান্তিকর হবে। প্রকাশনার জন্য বর্তমান দর জানতে হলে অন্তত কয়েকটি প্রধান দুধ উৎপাদন অঞ্চল থেকে একই সপ্তাহে খামারি, সংগ্রহকেন্দ্র, সমবায় ও সরাসরি বিক্রেতার দর নিতে হবে। দামের সঙ্গে দুধের মানভিত্তিক কাটতি, পরিবহন ব্যয় এবং টাকা পাওয়ার সময়ও লিখতে হবে।
দোকানের দামের সঙ্গে খামারের দামের পুরো ব্যবধান কি লাভ?
না। খামার থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত দুধ সংগ্রহ, মান পরীক্ষা, শীতলীকরণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেট, দোকানের ব্যয় এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এসবের প্রকৃত হিসাব ছাড়া দোকানের দাম থেকে খামারির দাম বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পুরো টাকাকে কারও লাভ বলা যায় না।
তবে ব্যবধানটি অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। খামারির উৎপাদন খরচ বাড়ার সময় তাঁর পাওয়া দাম স্থির থাকলে এবং ভোক্তার দাম বাড়লে প্রশ্ন উঠবে—মূল্যবৃদ্ধির কোন অংশ কোন ধাপে যাচ্ছে? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রতি ধাপের ক্রয়মূল্য, খরচ, অপচয় ও বিক্রয়মূল্য প্রকাশ প্রয়োজন।
খাবারের দাম বাড়লে কী ঘটে?
ঢাকা অঞ্চলের গবেষণায় খাবার ছিল সবচেয়ে বড় খরচের খাত। ফলে খাবারের খরচ নিয়ন্ত্রণ ডেইরি খামারের লাভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু খাবার কমিয়ে দেওয়া সমাধান নয়। অপর্যাপ্ত বা ভারসাম্যহীন খাবারে দুধ কমলে প্রতি লিটারের খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে। গবেষণার ওই ৬২ শতাংশ অংশকে সব খামারের স্থায়ী অনুপাত ভাবা যাবে না; খামারভেদে নিজস্ব ঘাস, কেনা খাবার ও শ্রমের অংশ বদলায়।
নমুনা খামারটির কথাই ধরা যাক। মাসিক খাবারের ব্যয় ১,০৫,০০০ টাকা থেকে ১০ শতাংশ বাড়লে, অন্য সবকিছু এবং উৎপাদন একই থাকলে মোট খরচ বাড়বে ১০,৫০০ টাকা—প্রতি লিটারে ৩ টাকা ৫০ পয়সা। খামারির পাওয়া দাম না বাড়লে এই চাপ সরাসরি তাঁর উদ্বৃত্ত কমাবে। এটি একটি হিসাবভিত্তিক উদাহরণ, বাজারদরের পূর্বাভাস নয়।
জাতীয় উৎপাদন বাড়লেও খামারির লাভ নিশ্চিত নয়
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদন ছিল ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ মেট্রিক টন এবং জনপ্রতি দৈনিক প্রাপ্যতা ২৩৯ দশমিক ২৯ মিলিলিটার। জাতীয় উৎপাদনের এই তথ্য খাতের আকার বোঝায়; কিন্তু কোনো খামারের প্রতি লিটার খরচ বা লাভ জানায় না। তা জানতে খামার পর্যায়ের আয়-ব্যয়ের হিসাবই প্রয়োজন।
ড. বায়েজিদ মোড়লের পর্যবেক্ষণ: অনুসন্ধান শুরু হোক খামারের খাতা থেকে
খামারির ন্যায্য দাম নিয়ে কার্যকর আলোচনা করতে হলে প্রথমে একই পদ্ধতিতে খরচ মাপতে হবে। প্রতিটি খামারে মাসভিত্তিক মোট খাবার ব্যয়, দুধেল ও শুকনা গাভির সংখ্যা, উৎপাদিত ও বিক্রিত দুধ, রোগে দুধ কমার দিন, বিক্রির পথ এবং হাতে পাওয়া নিট টাকা লিখে রাখা প্রয়োজন। নিজের ঘাস ও পরিবারের শ্রমের মূল্যও আলাদা ঘরে থাকতে হবে।
এরপর অঞ্চলভিত্তিক নিয়মিত খামারদর ও উৎপাদন খরচ প্রকাশ করা গেলে তিনটি প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর মিলবে: কোন অঞ্চলে প্রতি লিটারের খরচ কত, কোন পথে বিক্রিতে খামারি নিট বেশি পান, এবং খাবার বা পরিবহন ব্যয় বাড়লে দাম কীভাবে বদলায়। সেই তথ্য খামারি, ক্রেতা ও নীতিনির্ধারক—সবার জন্য কাজে লাগবে।
সারকথা: এক লিটার দুধের প্রকৃত খরচের কোনো স্থায়ী জাতীয় অঙ্ক নেই। যাচাই করা পুরোনো গবেষণাগুলো খরচের গঠন ও বিক্রয়পথের পার্থক্য দেখায়; আজকের উত্তর পেতে আজকের পূর্ণ খরচ এবং খামারির হাতে পাওয়া নিট দাম একই সময় ও একই এলাকায় মাপতে হবে।






















