খামারির লাভের পথ দেখাতে গুরুদাসপুরে আমান ফিডের আয়োজন।।
১২০ জনের বেশি ব্রয়লার ও মৎস্য খামারির অংশগ্রহণে সেমিনার; মানসম্মত খাদ্যের সঙ্গে সঠিক পরিচর্যা, জীবাণুনিরাপত্তা ও উৎপাদন দক্ষতায় গুরুত্ব।।

রাজশাহী সংবাদদাতার তথ্য উপাত্তে ড. বায়েজিদ মোড়ল//সামনে বসে আছেন ব্রয়লার ও মাছের খামারিরা। তাঁদের সামনে বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরছেন উৎপাদন ব্যবস্থাপনার নানা দিক—বাচ্চার সঠিক পরিচর্যা থেকে খাদ্যের কার্যকর ব্যবহার, জীবাণুনিরাপত্তা থেকে লাভজনক মাছ চাষ। আলোচনার কেন্দ্রে খামারির সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়টি: কীভাবে খামার পরিচালনায় দক্ষতা বাড়িয়ে লাভের সুযোগ তৈরি করা যায়।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈর বাজারে আমান ফিড পিএলসির উদ্যোগে আয়োজিত আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সেমিনারে এভাবেই গুরুত্ব পায় খামারের বাস্তব ব্যবস্থাপনা। মেসার্স একতা এন্টারপ্রাইজের সার্বিক সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে এলাকার ১২০ জনের বেশি সফল ও উদ্যমী ব্রয়লার ও মৎস্য খামারি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
একদিকে খামার পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে উপস্থিত উদ্যোক্তারা, অন্যদিকে পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের এই সম্মিলন আয়োজনটিকে খামার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানার এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে কারিগরি জ্ঞান মিলিয়ে দেখার একটি সুযোগ করে দেয়।
খাদ্য থেকে ব্যবস্থাপনা—আলোচনায় পুরো খামার
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আমান ফিডের নর্থ বেঙ্গল অর্থাৎ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জোনাল হেড, উপমহাব্যবস্থাপক ডা. জাহিদুজ্জামান সিদ্দিকী।
এ ছাড়া দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও ব্যবস্থাপক বাকিবিল্লাহ খান এবং রাজশাহী জোনের সেলস ইনচার্জ, উপব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম।
সেমিনারের বিষয়বস্তুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে—খামারের ভালো ফলাফলের জন্য খাদ্যের পাশাপাশি সেটি ব্যবহারের পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনাও জরুরি। বাচ্চার পরিচর্যা, খামারের পরিচ্ছন্নতা এবং উৎপাদনের হিসাবকে একই আলোচনায় যুক্ত করায় খামারিরা সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো জানার সুযোগ পান।
মানসম্মত খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খামারির সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এ ধরনের আয়োজনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। খামারি খাদ্য কেনার পাশাপাশি সেটি কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করবেন, কোন পর্যায়ে কারিগরি পরামর্শ প্রয়োজন এবং উৎপাদনের ফলাফল কীভাবে মূল্যায়ন করবেন—এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে ধারণা পেতে পারেন।
ব্রয়লার খামারের শুরুতেই যত্নের গুরুত্ব
ব্রয়লার খামার লাভজনক করার আধুনিক কৌশল ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আমান ফিড পিএলসির টেকনিক্যাল সার্ভিস ম্যানেজার ডা. মো. শাহরিয়ার মাহবুব।
তাঁর উপস্থাপনায় গুরুত্ব পায় সঠিক ব্রুডিং, বায়োসিকিউরিটি বা জীবাণুনিরাপত্তা এবং উন্নত এফসিআর অর্জনের বৈজ্ঞানিক উপায়। কারিগরি বিষয়গুলো তিনি খামারিদের সামনে সহজ ভাষায় তুলে ধরেন।
এই আলোচনার গুরুত্ব খামারের দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই রয়েছে। একটি ব্রয়লার খামার পরিচালনায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাচ্চার প্রাথমিক পরিচর্যা এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে দেখলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ার চিত্র পাওয়া যায় না। সেমিনারে বিষয়গুলো একসঙ্গে আসায় খামারিরা ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।
খামারের কাজে অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যুক্ত হলে সিদ্ধান্তের ভিত্তি আরও শক্ত হয়। বিশেষজ্ঞের সহজ উপস্থাপনা মাঠপর্যায়ের খামারির কাছে কারিগরি বিষয় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাই গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যের কার্যকর ব্যবহারেই নজর
ব্রয়লারবিষয়ক আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল উন্নত এফসিআর অর্জন। খাদ্য ব্যবহারের দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনের সম্পর্ক বোঝার এই বিষয়টি খামারির আর্থিক হিসাবেরও অংশ।
খামারে কত বস্তা খাদ্য ব্যবহার হলো, মোট কত ওজনের মুরগি বিক্রি হলো এবং সব ব্যয় বাদ দিয়ে কত টাকা থাকল—এই হিসাবগুলো পাশাপাশি রাখলে উৎপাদনের বাস্তব ফল বোঝা সহজ হয়। খাদ্যের দাম, ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনাকে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা এখানেই।
সেমিনারে খাদ্যের কার্যকর ব্যবহারের সঙ্গে ব্রুডিং ও জীবাণুনিরাপত্তার আলোচনা যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরও পূর্ণতা পায়। খামারের ফলাফল মূল্যায়নে একাধিক ব্যবস্থাপনা বিষয় বিবেচনা করতে হয়—আয়োজনের বিষয় নির্বাচন সেই প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
খামারির কাছে এমন আলোচনার মূল্য তখনই বাড়ে, যখন শেখা বিষয়গুলো নিজের খামারের হিসাব ও কাজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। নিয়মিত তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনমতো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার অভ্যাস সেই প্রয়োগের পথ সহজ করতে পারে।
মৎস্য খামারিদের জন্য পৃথক কারিগরি আলোচনা
সেমিনারে আধুনিক ও লাভজনক মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আমান ফিড পিএলসির হেড অব ফিশারিজ, উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মেহবুবুল ইসলাম।
ব্রয়লার খামারিদের পাশাপাশি মাছচাষিদের জন্য পৃথক বিষয়ে প্রবন্ধ রাখা আয়োজনটির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এতে দুই খাতের খামারিরা তাঁদের নিজ নিজ উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত আলোচনা শোনার সুযোগ পান।
মাছ চাষে বিনিয়োগের পর ফল পেতে একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ে চাষ পরিচালনা, ব্যয় এবং উৎপাদনের অগ্রগতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে লাভজনক মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষজ্ঞের আলোচনা উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাসঙ্গিক।
আমান ফিডের মৎস্য বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উপস্থিতিও এই অংশকে গুরুত্ব দেয়। স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে কারিগরি বিভাগের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হওয়া এ ধরনের আয়োজনের একটি ইতিবাচক দিক।
দীর্ঘ উৎপাদন অভিজ্ঞতা আমান ফিডের শক্তি
সেমিনারের আলোচনার সঙ্গে আমান ফিডের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতাও প্রাসঙ্গিক। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, আমান ফিড ২০০৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৬ সালের ১২ জুলাই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন অবকাঠামো সম্প্রসারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। amanfeed.com
দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্য উৎপাদনে যুক্ত থাকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পণ্যপরিসরও বহুমুখী। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৪–২৫ অর্থবছরের পরিচালকদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমান ফিড প্রধানত ব্রয়লার, লেয়ার, মাছ ও গবাদিপ্রাণির খাদ্য উৎপাদন করে। একাধিক খাতের জন্য খাদ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। amanfeed.com
গুরুদাসপুরের আয়োজনেও সেই বহুমুখী কাজের প্রতিফলন দেখা যায়। ব্রয়লার ও মৎস্য খামারিদের একই আয়োজনে যুক্ত করার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থাপনা রাখা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের পণ্যপরিসরের সঙ্গে কারিগরি যোগাযোগের একটি যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও মান উন্নয়নে অঙ্গীকার
আমান ফিডের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় জার্মানি থেকে আমদানি করা আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের পরিচালকদের প্রতিবেদনে উৎপাদন দক্ষতা ও পণ্যের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিদ্যমান কারখানায় উন্নয়ন ও পরিবর্তন আনার কথাও উল্লেখ রয়েছে। উৎপাদন অবকাঠামোর এই উন্নয়নপ্রচেষ্টা প্রতিষ্ঠানটির ইতিবাচক দিকগুলোর একটি। amanfeed.com
পাশাপাশি আমান ফিডের ঘোষিত লক্ষ্য ও কর্মকৌশলে মানসম্মত খাদ্য, উন্নত সেবা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার মাধ্যমে পণ্যপরিসর উন্নয়ন ও গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলার অঙ্গীকারও প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে রয়েছে। amanfeed.com
এসব ঘোষিত অগ্রাধিকারের সঙ্গে খামারিদের জন্য কারিগরি সেমিনার আয়োজনের সম্পর্ক রয়েছে। উৎপাদনপ্রযুক্তির তথ্য এবং খামার পরিচালনার পরামর্শ যখন সরাসরি উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, তখন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবহারকারীর মধ্যে যোগাযোগের পরিসর বাড়ে।
চাঁচকৈরের আয়োজনটির গুরুত্বও এখানে। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা মাঠপর্যায়ের খামারিদের সামনে এসে ব্যবস্থাপনাবিষয়ক আলোচনা করেছেন। খামারির দক্ষতা বাড়ানোর প্রচেষ্টায় এটি একটি কার্যকর উদ্যোগ।
খামারিদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত আয়োজন
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নাটোরের উপব্যবস্থাপক—বিক্রয় মো. নজরুল ইসলাম, ফিশারিজ অফিসার মো. হাবিবুর রহমান এবং ক্যাটল অফিসার মো. শরিফুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
মেসার্স একতা এন্টারপ্রাইজের সহযোগিতা স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এলাকার খামারিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ পুরো অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলে। বিশেষজ্ঞ ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের এই সম্মিলন ভবিষ্যতের কারিগরি যোগাযোগেরও সুযোগ তৈরি করে।
শেষ পর্বে আমান ফিডের পক্ষ থেকে আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এরপর প্রীতি মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়ে সেমিনারের সমাপ্তি ঘটে।
গুরুদাসপুরের এই আয়োজনে খামারির লাভের প্রশ্নটি এসেছে ব্যবস্থাপনার আলোচনার মধ্য দিয়ে। মানসম্মত খাদ্য, সঠিক পরিচর্যা, জীবাণুনিরাপত্তা এবং উৎপাদনের দক্ষতা—প্রতিটি বিষয়ই পেয়েছে গুরুত্ব। সেমিনারে উপস্থাপিত জ্ঞান নিজেদের খামারে প্রয়োগ এবং ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন করতে পারলে অংশগ্রহণকারী খামারিদের জন্য এই আয়োজনের সুফল আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে।























