সাকার মাছ বংশ বিস্তার করে যেভাবে
শৈবাল ও জৈব আবর্জনা খেয়ে বেড়ে ওঠা সাকার কোথায় ডিম পাড়ে, কীভাবে বাচ্চা বাঁচায় এবং দূষিত জলাশয় থেকে কোন ক্ষতিকর ধাতু শরীরে জমাতে পারে—গবেষণার আলোকে অনুসন্ধান।
ড. বায়েজিদ মোড়ল | সম্পাদক, AgricultureNews24.com

জলাশয়ের তলদেশে মুখ লাগিয়ে খাবার সংগ্রহ করে একটি মাছ। আবার প্রজননের সময় সেই মাছই পাড়ের মাটিতে গর্ত করে বংশবিস্তারের আশ্রয় তৈরি করে। স্ত্রী মাছ সেখানে ডিম দেয়, পুরুষ মাছ পাহারা দেয়। ডিম ফুটে বের হওয়া বাচ্চা প্রথমে নিজের কুসুমথলির পুষ্টিতে বেঁচে থাকে; পরে তলদেশের খাবার সংগ্রহ করতে শেখে। সাকার মাছের বিস্তার বুঝতে এই জীবনচক্র জানা জরুরি।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন—দূষিত জলাশয়ে থাকা সাকারের পেট ও শরীরে কী জমছে? বিদেশি গবেষণায় এই মাছের মাংসে সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। তবে সব এলাকার সাকারে একই মাত্রার দূষণ পাওয়া যায়নি। ফলে এর পরিবেশগত ক্ষতি এবং খাদ্য হিসেবে স্বাস্থ্যঝুঁকি—দুটি বিষয়ই প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।
প্রাকৃতিক জলাশয়ে সাকার কী খায়?
এ প্রতিবেদনে সাকার বলতে মূলত Pterygoplichthys গণের মাছ বোঝানো হয়েছে। খাদ্যাভ্যাস ও প্রজননের আলোচনায় বিশেষভাবে Pterygoplichthys pardalis নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা ব্যবহার করা হয়েছে।
সাকারের খাবারের বড় অংশ আসে জলাশয়ের তলদেশ থেকে। শৈবাল, উদ্ভিদের ক্ষুদ্র অংশ এবং পচে ভেঙে যাওয়া জৈব পদার্থ বা ডেট্রিটাস এর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। নিচের দিকে থাকা চোষকধর্মী মুখ দিয়ে ডুবে থাকা পৃষ্ঠে লেগে থাকা খাবার ঘষে সংগ্রহ করে।
মালয়েশিয়ার লাঙ্গাট নদীতে পরিচালিত গবেষণায় সাকারের খাদ্যে তলদেশের ডেট্রিটাসের গুরুত্ব পাওয়া যায়। মাছের পরিপাকতন্ত্রে শনাক্ত খাদ্যের সঙ্গে নদীর তলদেশে পাওয়া উপাদানের মিলও ছিল। অর্থাৎ, পরিবেশে সহজলভ্য ক্ষুদ্র খাদ্যকণা কাজে লাগানোর সক্ষমতা এই মাছের টিকে থাকার একটি সুবিধা। psasir.upm.edu.my
এ কারণে সাকারকে শুধু “ময়লা খাওয়া মাছ” বললে তার খাদ্যাভ্যাস সঠিকভাবে বোঝানো হয় না। পচা পাতা বা জৈব পদার্থ প্রাকৃতিক খাদ্যচক্রের অংশ; শিল্পবর্জ্য বা বিষাক্ত রাসায়নিক সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তবে দূষিত পরিবেশে খাদ্য সংগ্রহের সময় মাছ দূষকের সংস্পর্শে আসতে পারে।
অন্য মাছের ডিম ও পোনা কি খায়?
সাকারের প্রধান খাদ্যে শৈবাল ও জৈব পদার্থের গুরুত্ব থাকলেও অন্য মাছের ডিম ও সদ্য খাদ্য গ্রহণ শুরু করা পোনা খাওয়ার পরীক্ষামূলক প্রমাণ রয়েছে।
থাইল্যান্ডের একটি গবেষণায় দেশীয় ক্যাটফিশ Clarias macrocephalus-এর ডিম ও ছোট পোনা দিয়ে সাকারের খাদ্যগ্রহণ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার পরিবেশে সাকার উভয়টিই খেয়েছে। স্থির ও সহজলভ্য হওয়ায় ডিম বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। তবে পরীক্ষাগারের ফল দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি নদী বা হাওরে একই হারে ডিম ধ্বংস হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। স্থানীয় প্রভাব বুঝতে মাঠপর্যায়ের গবেষণা দরকার। Agriculture and Natural Resources
কোথায় ডিম পাড়ে—তলদেশে, নাকি পাড়ের গর্তে?
সাকারের প্রজননের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আশ্রয়যুক্ত স্থানে ডিম দেওয়া। ভারতের কেরালার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে গবেষকেরা দেখেছেন, পুরুষ P. pardalis প্রজননের আগে পাড়ে গর্ত খনন করে। স্ত্রী মাছ সেই আশ্রয়ে ডিম দেয় এবং পুরুষ মাছ পাহারা দেয়।
ওই গবেষণায় পাড়ের গর্তের পাশাপাশি পাথরের দেয়ালের ফাঁকেও প্রজননের ব্যবহার দেখা গেছে। কিছু আনুভূমিক গর্তের গভীরতা ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ মিটার। এটি নির্দিষ্ট এলাকার পর্যবেক্ষণ; সব জলাশয়ের গর্ত একই আকারের হবে না। গর্ত তৈরি ও বাসা পাহারা দেওয়ার এই আচরণ বংশবিস্তারের জন্য সাকারকে সুবিধা দেয়। threatenedtaxa.org
ডিম থেকে কীভাবে বাচ্চা হয়?
নিষিক্ত ডিমের ভেতরে প্রথমে কোষ বিভাজন শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে ভ্রূণের মাথা, চোখ, দেহ ও লেজ গড়ে ওঠে। বিকাশ সম্পন্ন হলে ভ্রূণ ডিমের আবরণ ভেঙে বেরিয়ে আসে।
ফিলিপাইনের মারিকিনা নদী থেকে সংগৃহীত P. pardalis নিয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত একটি গবেষণায় নিষেকের প্রায় সাত দিন পর ডিম ফোটার পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়। এটি গবেষণার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ফল; প্রাকৃতিক জলাশয়ে তাপমাত্রা ও অন্যান্য পরিবেশগত অবস্থার কারণে সময় বদলাতে পারে। তাই “সাকারের ডিম ঠিক সাত দিনেই ফোটে”—এভাবে সর্বজনীন দাবি করা ঠিক হবে না। researchgate.net
সদ্য জন্মানো বাচ্চা কী খেয়ে বাঁচে?
ডিম ফুটেই সাকারের বাচ্চাকে বড় মাছের মতো খাবার সংগ্রহ করতে হয় না। তার দেহের সঙ্গে থাকা কুসুমথলিতে সঞ্চিত পুষ্টি প্রথম দিকের বিকাশে শক্তি জোগায়।
ফিলিপাইনের উল্লিখিত গবেষণায় ডিম ফোটার পর অষ্টম দিনে কুসুম পুরোপুরি শোষিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এ সময় মুখ ও পরিপাকতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে বাইরের খাদ্য গ্রহণের উপযোগিতা তৈরি হয়। চোষক মুখ নিচের দিকে কার্যকর অবস্থান নেয় এবং শৈবাল ঘষে সংগ্রহের বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে। researchgate.net
এরপর ছোট সাকার পরিবেশে পাওয়া সূক্ষ্ম শৈবাল, পৃষ্ঠে লেগে থাকা খাদ্যস্তর এবং ক্ষুদ্র জৈব কণা ব্যবহার করে বড় হতে পারে। তবে বাংলাদেশের নদী-হাওরে সদ্য জন্মানো সাকার কোন খাদ্য কত অনুপাতে খায়, সে প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর পেতে বয়সভিত্তিক পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা প্রয়োজন।
সাকারের পেটে কী থাকে—আর শরীরে কী জমে?
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা জরুরি। পেট বা অন্ত্রের ভেতরের খাদ্য-পলি এবং শরীরের মাংসে জমা ধাতু এক জিনিস নয়।
পরিপাকতন্ত্রের ভেতরে সদ্য খাওয়া শৈবাল, জৈব পদার্থ ও সঙ্গে আসা পলি থাকতে পারে। অন্যদিকে, দূষকের সংস্পর্শে আসার পর কিছু ধাতু শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে জমতে পারে। ফলে পেটের উপাদান পরীক্ষা করে যে ফল পাওয়া যায়, তা সরাসরি ভক্ষণযোগ্য মাংসের দূষণের মাত্রা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
ইন্দোনেশিয়ার টেম্পে হ্রদের সাকার নিয়ে গবেষণায় যকৃৎ, অন্ত্র, ফুলকা, মাংস, হাড় ও চামড়াসহ বিভিন্ন অংশে পারদ, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা তাঁদের ব্যবহৃত মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষিত নমুনার মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার নিচে পেয়েছেন বলে জানান। Biodiversitas Journal of Biological Diversity
কোন ক্ষতিকর ধাতু পাওয়া গেছে?
অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার চিলিউং নদীর একটি স্থান থেকে সংগৃহীত P. pardalis-এর মাংস পরীক্ষায় ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। সেখানে শনাক্ত উপাদানের মধ্যে ছিল:
| উপাদান | প্রতীক |
|---|---|
| সিসা | Pb |
| ক্যাডমিয়াম | Cd |
| পারদ | Hg |
| আর্সেনিক—প্রযুক্তিগতভাবে উপধাতু | As |
| ক্রোমিয়াম | Cr |
একই গবেষণায় কোবাল্ট, লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, রুপা ও দস্তাও শনাক্ত হয়। গবেষকেরা আর্সেনিক, পারদ, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ তাঁদের ব্যবহৃত ইন্দোনেশীয় নিয়ন্ত্রক মানের বেশি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এই ফল সংশ্লিষ্ট স্থান ও নমুনার জন্য প্রযোজ্য। সব শনাক্ত উপাদানকে একই মাত্রায় বিষাক্ত বলা বা সব সাকারে একই ফল ধরে নেওয়া সঠিক নয়। jurnal.uai.ac.id
দুটি এলাকার ভিন্ন ফল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: কোন জলাশয়ের মাছ, কোন অংশ পরীক্ষা হয়েছে এবং কত মাত্রায় দূষক পাওয়া গেছে—এসব না জেনে নিরাপদ বা বিপজ্জনক ঘোষণা করা যায় না। বিদেশের ফল বাংলাদেশের সাকারের দূষণের পরিমাপ হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে না।
পেট পরিষ্কার বা রান্না করলেই কি ঝুঁকি দূর হয়?
পেট ফেলে দেওয়া ও ভালোভাবে রান্না করাকে সব ধরনের দূষণ দূর করার নিশ্চয়তা ধরা যাবে না। বিশেষ করে পারদ মাছের টিস্যুর মধ্যে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন—এফডিএ জানিয়েছে, মাছ পরিষ্কার বা রান্না করলে তার পারদের পরিমাণ কমে না। ফলে “ভালো করে ভাজলেই দূষিত মাছ নিরাপদ”—এমন ধারণা ভুল। FDA
বাংলাদেশে এখন কী জানা প্রয়োজন?
সাকার নিয়ন্ত্রণে শুধু বড় মাছ ধরার পরিমাণ জানলেই হবে না। কোন পাড়ে বাসা তৈরি হচ্ছে, কোথায় ছোট সাকার পাওয়া যাচ্ছে এবং কোন মৌসুমে প্রজনন বাড়ছে—এসব তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন। স্থানীয় জীবনচক্র বুঝলে অপসারণের সময় ও স্থান নির্ধারণ আরও কার্যকর হতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন একই জলাশয়ের পানি, পলি, অন্ত্রের উপাদান, যকৃৎ এবং ভক্ষণযোগ্য মাংস আলাদাভাবে পরীক্ষা। ফল প্রকাশের সময় নমুনার স্থান, মাছের আকার, পরীক্ষাপদ্ধতি এবং ভেজা না শুকনা ওজনের ভিত্তিতে ফল দেওয়া হয়েছে—সেটিও জানাতে হবে।
সাকারের বিস্তার মোকাবিলায় তার খাদ্যাভ্যাস ও বংশবিস্তারের দুর্বল জায়গা চিহ্নিত করা জরুরি। পাশাপাশি দূষিত জলাশয়ের মাছ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে কী ঝুঁকি তৈরি হয়, তা নির্ধারণ করতে হবে পরীক্ষার মাধ্যমে। সাকারের শরীরে কী জমছে—এই প্রশ্নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উত্তর মিলবে নির্দিষ্ট জলাশয় থেকে সংগৃহীত নমুনার স্বচ্ছ পরীক্ষায়।





















