সাকার মাছে লুকিয়ে আছে বিষাক্ত ধাতু? রান্নাতেও কাটে না লেট সিসা-পারদের ঝুঁকি!
দূষিত জলাশয়ের সাকার মাছে সিসা–পারদসহ ক্ষতিকর ধাতুর প্রমাণ বিদেশি গবেষণায়; বাংলাদেশের মাছ পরীক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সতর্কতার দাবি।
ড. বায়েজিদ মোড়ল | সম্পাদক, AgricultureNews24.com

সাকার মাছ নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগের সঙ্গে বাড়ছে নানা প্রশ্ন। এই মাছ ভেজে, ভুনা করে কিংবা বারবিকিউ করে খাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। কেউ বলছেন, ভালোভাবে রান্না করলেই নিরাপদ; আবার কেউ দাবি করছেন, সাকার মাছ খেলেই কিডনি নষ্ট হয় বা ক্যানসার হয়। জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে এমন বিপরীত বক্তব্যের মধ্যে প্রয়োজন গবেষণার প্রমাণ এবং তার সীমাবদ্ধতা বোঝা।
প্রকাশিত গবেষণা বলছে, সাকার মাছ খাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ভর করে মাছটির উৎস, ভক্ষণযোগ্য মাংসে দূষকের পরিমাণ, কতটা ও কতদিন খাওয়া হচ্ছে এবং ভোক্তার বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর। ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন জলাশয়ের সাকার মাছ নিয়ে গবেষণায় ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে—কোথাও উদ্বেগজনক ধাতব দূষণ, কোথাও পরীক্ষিত ধাতুর মাত্রা সংশ্লিষ্ট মানের নিচে। ফলে একটি জলাশয়ের ফল সব এলাকার সাকার মাছের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। Garba Rujukan Digital
জলাশয় থেকে খাবারের পাতে: সাকার নিয়ে উদ্বেগ কেন?
সাকার মাছ: জলাশয়ে উদ্বেগ, খাবারের পাতেও সতর্কতা সাকার মাছ নিয়ে উদ্বেগ শুধু এর শক্ত বর্ম, ধারালো পাখনার কাঁটা কিংবা অস্বাভাবিক চেহারার কারণে নয়। বাংলাদেশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়া এই আক্রমণাত্মক মাছ দেশীয় জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বাংলাদেশের জলাভূমি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা পর্যালোচনাতেও এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন তুলে ধরা হয়েছে। www.banglajol.info
খাবারের পাতে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অদৃশ্য দূষণ। ইন্দোনেশিয়ার দূষিত চিলিউং নদীর সাকার মাছের মাংসে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও পারদের মাত্রা গবেষকদের ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রক সীমা ছাড়িয়েছে। ওই উৎসের মাছ খাওয়ার বিরুদ্ধে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। বাংলাদেশের সব সাকারে একই মাত্রার দূষণ রয়েছে—এমন প্রমাণ নেই; তবে দূষিত জলাশয়ের সাকারকে পরীক্ষা ছাড়াই নিরাপদ বলার সুযোগও নেই। garuda.kemdiktisaintek.go.id
ক্ষতিকর মাত্রায় এসব দূষক শরীরে প্রবেশ করলে পরিণতি গুরুতর হতে পারে। সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও শেখার ক্ষমতায় ক্ষতি করতে পারে এবং কিডনি ও রক্তচাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মিথাইলমারকারি স্নায়ুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর; বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে গর্ভস্থ শিশু ও ছোট শিশুরা। এসব দূষকের ক্ষতি সব সময় সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। www.who.int
আরও উদ্বেগের বিষয়, মাছের টিস্যুতে থাকা পারদ সাধারণ রান্না বা পরিষ্কার করার মাধ্যমে দূর হয় না। তাই ভাজা, ভুনা বা বারবিকিউ করলেই দূষিত মাছ নিরাপদ হয়ে যায়—এই ধারণা বিপজ্জনক। দেখতে স্বাভাবিক বা গন্ধহীন মাছেও দূষক থাকতে পারে। www.fda.gov
সাকার নিয়ে সতর্কবার্তা তাই স্পষ্ট: দূষিত বা অজানা উৎসের মাছকে সস্তা আমিষ ভেবে খাবারের পাতে তুলে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে প্রয়োজন উৎসভিত্তিক পরীক্ষা, প্রকাশ্য ফলাফল এবং প্রমাণভিত্তিক জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা।
সাকার মাছ কি নিজেই বিষাক্ত?
বাংলাদেশে সাকার নামে পরিচিত মাছের মধ্যে Pterygoplichthys গণের প্রজাতি রয়েছে। এর স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আলাদা করা জরুরি—মাছটির পরিবেশগত ক্ষতি এবং মানুষের খাদ্য হিসেবে নিরাপত্তা।
পর্যালোচিত গবেষণাগুলোতে মানুষের খাদ্যঝুঁকির প্রধান আলোচ্য বিষয় মাছের নিজস্ব কোনো সর্বজনীন বিষ নয়; বরং জলাশয় থেকে শরীরে জমা হওয়া দূষক। দূষিত পরিবেশে মাছ বেঁচে থাকতে পারা মানেই সেই মাছ মানুষের জন্য নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়। ইন্দোনেশিয়ার চিলিউং নদীর সাকার মাছ নিয়ে গবেষণায় মাংস ও অন্যান্য অঙ্গে ভারী ধাতু জমার প্রমাণ পাওয়া গেছে। Repository Universitas Al Azhar Indonesia
অন্যদিকে, কোনো আক্রমণাত্মক প্রজাতি জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করতে পারে বলেই সেটি খেলে নির্দিষ্ট রোগ হবেই—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। খাদ্যনিরাপত্তা নির্ধারণে প্রয়োজন আলাদা পরীক্ষা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: দূষিত জলাশয়ের সাকার কেন খাদ্যনিরাপত্তার উদ্বেগ?
বুড়িগঙ্গার মতো দূষিত নদী থেকে ধরা সাকার মাছ পরীক্ষা ছাড়াই মানুষের খাবারের পাতে পৌঁছানো জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের এই নদীর বিভিন্ন মাছ নিয়ে গবেষণায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি উঠে এসেছে। যদিও এসব গবেষণা সরাসরি সাকার মাছের ওপর করা হয়নি, ফলাফলগুলো ওই জলাশয় থেকে সংগৃহীত মাছের নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজন স্পষ্ট করে। pmc.ncbi.nlm.nih.gov
সাকার মাছের ক্ষেত্রে উদ্বেগের সরাসরি আন্তর্জাতিক প্রমাণও রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার দূষিত চিলিউং নদীর সাকার মাছের মাংসে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও সিসার মাত্রা গবেষকদের ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রক সীমা অতিক্রম করেছে। গবেষকেরা ওই উৎসের মাছ মানুষের খাদ্য হিসেবে গ্রহণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। এই ফল বাংলাদেশের সাকারের দূষণমাত্রা প্রমাণ করে না; তবে দূষিত পরিবেশের সাকারকে পরীক্ষা ছাড়া নিরাপদ ধরে নেওয়ার বিপদ দেখায়। garuda.kemdiktisaintek.go.id
এসব দূষক ক্ষতিকর মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি ও শিশুর বিকাশে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে সিসা ও মিথাইলমারকারির সংস্পর্শ শিশু ও গর্ভস্থ সন্তানের জন্য উদ্বেগজনক। মাছের টিস্যুতে থাকা পারদ সাধারণ রান্না বা পরিষ্কার করার মাধ্যমে দূর হয় না। ফলে “ভালো করে ভেজে খেলেই নিরাপদ”—এমন প্রচার জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। www.who.int
বাংলাদেশে সাকার মাছ খেয়ে নির্দিষ্ট রোগ হওয়ার সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাগত তথ্য না পাওয়া নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নয়। স্থানীয় দূষণমাত্রা ও মানুষের সংস্পর্শ সম্পর্কে তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে ঝুঁকির প্রকৃত চিত্রও অজানা থাকে। তাই দূষিত বা অজানা উৎসের সাকার মাছ খাওয়া এড়িয়ে চলা এবং পরীক্ষাহীন মাছকে খাদ্য হিসেবে প্রচার না করাই সতর্কতামূলক অবস্থান হওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি দায়িত্ব হলো ভক্ষণযোগ্য মাংস পরীক্ষা, ফল প্রকাশ এবং সেই প্রমাণের ভিত্তিতে জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা দেওয়া।
ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ: একই মাছ, ভিন্ন জলাশয়ে ভিন্ন ফল
জাকার্তার চিলিউং নদীর Pterygoplichthys pardalis নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় মাংসে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও সিসার মাত্রা গবেষকদের ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রক সীমার ওপরে পাওয়া যায়। গবেষকেরা ওই উৎসের মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। এটি নির্দিষ্ট এলাকার নমুনায় দূষণের প্রমাণ; সেখানকার ভোক্তাদের মধ্যে রোগের হার নির্ণয়ের গবেষণা নয়। Garba Rujukan Digital
বিপরীতে, দক্ষিণ সুলাওয়েসির ওয়াজো এলাকার তিনটি স্থান থেকে সংগৃহীত সাকার মাছের গবেষণায় সিসা শনাক্ত হয়নি এবং পরীক্ষিত পারদ ও আর্সেনিকের মাত্রা সংশ্লিষ্ট ইন্দোনেশীয় সীমা অতিক্রম করেনি। এর অর্থ ওই নমুনাগুলো পরীক্ষিত ধাতুর বিচারে তুলনামূলকভাবে আশ্বস্ত করার মতো ছিল। তবে শুধু কয়েকটি ধাতুর পরীক্ষা দিয়ে সব ধরনের জীবাণু ও রাসায়নিক ঝুঁকি বাদ দেওয়া যায় না। Agrikan Jurnal Agribisnis Perikanan
দুটি গবেষণার শিক্ষা হলো: মাছের নাম বা চেহারা দেখে নিরাপত্তা নির্ধারণ করা যায় না। উৎসভিত্তিক পরীক্ষাই সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
দূষিত সাকার মাছ খেলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
নিচের স্বাস্থ্যসমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট দূষকের পরিচিত প্রভাব। এগুলোকে সাকার মাছ খাওয়া প্রত্যেক মানুষের অবধারিত রোগ হিসেবে দেখা যাবে না।
| ঝুঁকির উপাদান | ক্ষতিকর মাত্রায় সংস্পর্শে সম্ভাব্য প্রভাব | প্রমাণ বোঝার শর্ত |
|---|---|---|
| সিসা | শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখা ও মনোযোগে ক্ষতি; রক্তস্বল্পতা; কিডনির ক্ষতি; প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ | মাছের মাংসে মাত্রা ও গ্রহণের পরিমাণ জানতে হবে |
| মিথাইলমারকারি | স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি; অনুভূতি, চলাফেরা ও ভারসাম্যে সমস্যা; গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতি | মোট পারদ ও মিথাইলমারকারি এক বিষয় নয় |
| ক্যাডমিয়াম | দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে কিডনি ও হাড়ের ক্ষতি | নিয়মিত গ্রহণ ও মোট সংস্পর্শ বিবেচ্য |
| অজৈব আর্সেনিক | দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ত্বকের পরিবর্তন এবং কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি | শুধু মোট আর্সেনিক শনাক্ত হওয়া যথেষ্ট নয়; রাসায়নিক রূপ গুরুত্বপূর্ণ |
| খাদ্যবাহিত জীবাণু | বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও জ্বর | অপর্যাপ্ত রান্না, সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত |
এসব প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের তথ্য রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট মাছের কারণে কারও রোগ হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে খাদ্যপরীক্ষা, গ্রহণের ইতিহাস এবং চিকিৎসাগত মূল্যায়ন প্রয়োজন। who.int
শিশু ও গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে উদ্বেগ বেশি কেন?
সিসা শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্কে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তুলনামূলক কম সংস্পর্শেও শেখা, মনোযোগ ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় সিসার সংস্পর্শ ভ্রূণের বৃদ্ধি ও জন্মের সময়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। who.int
মিথাইলমারকারির ক্ষেত্রেও গর্ভস্থ শিশু, নবজাতক ও শিশুরা বিশেষভাবে সংবেদনশীল। ক্ষতিকর সংস্পর্শে স্মৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং সূক্ষ্ম ও বড় পেশির সমন্বয়ে সমস্যা হতে পারে। তাই উৎস ও নিরাপত্তা অজানা মাছকে এসব জনগোষ্ঠীর খাবার হিসেবে বেছে নেওয়া উচিত নয়। FDA
‘সাকার মাছ খেলে ক্যানসার হয়’—দাবিটি কতটা সঠিক?
এভাবে সরাসরি বলা বৈজ্ঞানিকভাবে যথার্থ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, দীর্ঘদিন অজৈব আর্সেনিকযুক্ত পানি ও খাবার গ্রহণে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু কোনো মাছের পরীক্ষায় শুধু মোট আর্সেনিক পাওয়া গেলেই একই মাত্রার ঝুঁকি ধরে নেওয়া যায় না। আর্সেনিকের রাসায়নিক রূপ গুরুত্বপূর্ণ; সামুদ্রিক খাবারে এর অনেকটাই তুলনামূলক কম বিষাক্ত জৈব রূপে থাকে। who.int
সুতরাং গ্রহণযোগ্য বক্তব্য হবে: ক্ষতিকর দূষকে আক্রান্ত মাছ নিয়মিত খেলে সংশ্লিষ্ট দূষকের কারণে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সাকার মাছের নামের সঙ্গে সরাসরি ক্যানসার জুড়ে দেওয়া প্রমাণের সীমা অতিক্রম করে।
জাপানের মিনামাটা: দূষিত মাছের ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা
দূষিত মাছ মানুষের বড় ধরনের স্বাস্থ্যবিপর্যয়ের কারণ হতে পারে—জাপানের মিনামাটা তার প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ। শিল্পকারখানা থেকে নির্গত মিথাইলমারকারি মাছ ও শামুকজাতীয় প্রাণীতে জমে এবং সেগুলো খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে গুরুতর রোগ সৃষ্টি করে। জাপান সরকার ১৯৬৮ সালে দূষিত মাছ ও শামুক খাওয়ার সঙ্গে রোগটির কারণগত সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। env.go.jp
মিনামাটার ঘটনাটি সাকার মাছকেন্দ্রিক ছিল না। তাই এটি সাকার খেলে মিনামাটা রোগ হবে—এমন প্রমাণ নয়। এর শিক্ষা হলো, মাছ স্বাভাবিক দেখতে হলেও তাতে বিপজ্জনক দূষক থাকতে পারে; চোখে দেখা বা স্বাদ দিয়ে সেই নিরাপত্তা বিচার করা যায় না। nimd.env.go.jp
ভাজা, সেদ্ধ বা শুকালে কি নিরাপদ হয়?
যথাযথ রান্না খাদ্যবাহিত জীবাণুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। FDA সাধারণভাবে মাছের ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর নির্দেশনা দেয়। তবে এই নির্দেশনা রাসায়নিকভাবে দূষিত মাছকে নিরাপদ করার পদ্ধতি নয়। FDA
পারদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট: মাছের টিস্যুতে থাকা পারদ পরিষ্কার করা বা রান্নায় দূর হয় না। তাই মসলা দিয়ে ভাজা, সেদ্ধ করা কিংবা বারবিকিউ করাকে পারদমুক্ত করার উপায় ভাবা যাবে না। শুকানো বা গুঁড়া করার পরও পরীক্ষার বিকল্প নেই। FDA
পেট, নাড়িভুঁড়ি বা চামড়া ফেলে দিলেও মাংস নিরাপদ হওয়ার নিশ্চয়তা মেলে না। আবার পরিপাকতন্ত্রে পলি বা বর্জ্য দেখা গেলেই মাংসে একই মাত্রার বিষ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। কোন অঙ্গে কত দূষক আছে, তা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
দুর্গন্ধ নেই মানেই কি নিরাপদ?
অস্বাভাবিক টক, পচা বা অ্যামোনিয়ার গন্ধ মাছ নষ্ট হওয়ার সতর্কসংকেত; এমন মাছ খাওয়া উচিত নয়। কিন্তু গন্ধ না থাকাকে রাসায়নিক নিরাপত্তার প্রমাণ বলা যায় না। ভারী ধাতুর উপস্থিতি নির্ধারণে পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণ প্রয়োজন। FDA
কেউ ইতিমধ্যে খেয়ে ফেললে কী করবেন?
একবার খেয়েছেন বলেই গুরুতর রোগ হয়েছে ধরে নেওয়া যাবে না। ঝুঁকি বুঝতে মাছের উৎস, খাওয়ার পরিমাণ, কতবার খেয়েছেন এবং উপসর্গ আছে কি না—এসব গুরুত্বপূর্ণ।
খাওয়ার পর বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা বা জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। গুরুতর অসুস্থতা বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন সন্দেহজনক উৎসের মাছ খাওয়ার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসককে তা জানান। ধাতব বিষক্রিয়ার পরীক্ষা বা চিকিৎসা প্রয়োজন কি না, তিনি নির্ধারণ করবেন; নিজে থেকে ‘বিষ নামানোর’ ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন কী?
জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে সাকার মাছের ভক্ষণযোগ্য মাংসের উৎসভিত্তিক পরীক্ষা জরুরি। বুড়িগঙ্গা–তুরাগের মতো শিল্প ও নগরবর্জ্যপ্রভাবিত এলাকা এবং অন্য জলাশয়ের নমুনা আলাদাভাবে নিতে হবে। পরীক্ষায় সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও আর্সেনিকের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জীবাণু ও অন্যান্য দূষক অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
ফল প্রকাশের সময় মাছের প্রজাতি, সংগ্রহস্থল, নমুনাসংখ্যা, মৌসুম, পরীক্ষিত অঙ্গ এবং ফল কাঁচা না শুকনা ওজনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে—এসব স্পষ্ট রাখতে হবে। মাছের শরীরে দূষক পাওয়ার গবেষণা এবং সেই মাছ খেয়ে মানুষের রোগ হওয়ার গবেষণাকে পৃথকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
পরীক্ষাহীন সাকার মাছকে নিরাপদ খাদ্য হিসেবে প্রচার করা যেমন দায়িত্বশীল নয়, তেমনি ‘খেলেই মৃত্যু’ বা ‘নিশ্চিত ক্যানসার’ বলাও গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের মানুষের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় পরীক্ষার প্রকাশ্য ফল, সন্দেহজনক খাদ্যের নজরদারি এবং প্রমাণভিত্তিক জনসচেতনতা। সস্তা আমিষের অনুসন্ধান যেন অজানা দূষণকে মানুষের খাবারের পাতে পৌঁছে না দেয়।

Sources: World Health Organization (WHO)—health effects of lead, mercury and arsenic; U.S. FDA—mercury in fish and the limitations of cooking; studies on heavy metals in Buriganga River fish (2016 and 2023); research on metal contamination in suckermouth catfish from Indonesia’s Ciliwung River; Japan’s Ministry of the Environment—history of Minamata disease.






















