
ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল: প্রতিদিন দেশের মানুষের স্বাভাবিক গোশতের চাহিদা মেটাতে প্রায় ১৮-২০ হাজার গরু মহিষ এবং প্রায় ২৭-২৮ হাজার ছাগল ভেড়া জবেহ করা হয়। আর খোদ ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ টনের মত গরু মহিষ এবং ছাগল ভেড়ার মাংসের জোগান দেয়া হয় বিভিন্ন উৎস্য থেকে।
১। আন্তর্জাতিক কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (FAO)-এর ২০০২ সনের (২০০৫ সনে প্রকাশিত) হিসাব মতে দেশে প্রতি বছর এনিমেল প্রোটিনে (মাংস, ডিম, দুধ) এর চাহিদা এবং সরবরাহ:
(ক) গবাদিপশু ও মহিষের মাংস সম্মিলিতভাবে উৎপাদন ০.১৮২ মিঃ মেঃ টন
(খ) ভেড়া ও খাসির মাংস সম্মিলিতভাবে উৎপাদন ০.১৪০ মিঃ মেঃ টন
(গ) মুরগির মাংসের উৎপাদন ০.১২৪ মিঃ মেঃ টন
মোট মাংস উৎপাদন = ০.৪৪৬ মিঃ মেঃ টন
(ঘ) মোট বার্ষিক দুধ উৎপাদন ২.২৫৪ মিঃ মেঃ টন
(ঙ) মোট বার্ষিক ডিম উৎপাদন ০.১৬১ মিলিয়ন সংখ্যা
২। আন্তর্জাতিক কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (FAO)-এর ২০০৭ সনের হিসাব মতে
দেশে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির মোট সংখ্যা:
(ক) গবাদিপশু ও মহিষ (সম্মিলিতভাবে) ২৫ মিলিয়ন
(খ) ছাগল-ভেড়া (সম্মিলিতভাবে) ৩৫ মলিয়ন
(গ) হাঁস-মুরগি ১৫১.৫ মিলিয়ন
৩। নিম্নের ছকে জাতীয় পর্যায়ে পশুসম্পদ খাত থেকে মাথা পিছু আমিষের চাহিদা, সরবরাহ ও ঘাটতির একটি চিত্র পেশ করা হলো;
ক্রমিক নং পণ্যের নাম জন প্রতি দৈঃ চাহিদা জন প্রতি বর্তমান দৈঃ প্রাপ্তি বছরে মোট দেশীয় উৎপাদন বাৎসরিক মোট চাহিদা বাৎসরিক মোট ঘাটতি/শতকরা হার
১ মাংস ১২০ গ্রাম /প্রতিদিন ২১ গ্রাম/প্রতিদিন ১.০৪ মিঃ মেঃ টন ৬.১৬ মিঃ মেঃ টন ৫.১২ মিঃ মেঃ টন (৮৩%)
২ দুধ ২৫০ মিঃ লিঃ/ প্রতিদিন ৪৫ মিঃ লিঃ ২.২৩ মিঃ মেঃ টন ১২.৮২ মিঃ মেঃ টন ১০.৫৪ মিঃ মেঃ টন (৮২%)
৩ ডিম ১০৪ টি/প্রতি বছর ৩৯ টি/প্রতি বছর ৫৩৬৯ মিলিয়ন টি ১৪৬.২২ মিলিয়ন টি ৯২৫৩ মিলিয়ন টি (৬৩.৩%)
পশুসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক ২০০৭ সনে প্রকাশিত তথ্য অবলম্বনে
মোটাতাজাকরণের উদ্দেশ্য:
- আমিষ সরবরাহ
- কর্মসংস্থান
- দারিদ্র বিমোচন
- গোবর, চনা জৈব সারের উৎস
- কৃষি উপজাতের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার
- চাষের জন্য উপযুক্ত পশু তৈরী করা
মোটাতাজাকরণের গুরুত্ব:
প্রতি বছর কোরবানী উপলক্ষ্যে সারা দেশে প্রায় ২৩-২৫ লক্ষ গবাদিপশু জবেহ করা হয় এবং ইহার প্রায় ৬০-৭০ ভাগই গরু। অতএব, প্রতি বছর এই বিপুল সংখ্যক পশুর কোরবাণী এবং প্রতিদিনের স্বাভাবিক গোশতের চাহিদা মেটাতে কি সংখ্যক পশুর প্রয়োজন হয় তা সহজেই অনুমেয়।
এ ছাড়াও বিভিন্ন পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণেও বিভিন্ন সময় গবাদি পশুর মাংসের চাহিদা হঠাৎ হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। একদিকে উৎপাদনে বিরাট ঘাটতি অন্যদিকে ক্রম বর্ধমান অতিরিক্ত চাহিদা এই দুই এর মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হলে পশু মোটা তাজা করণের কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশে মোরগ-মুরগীর বার্ড ফ্লু রোগ জনিত সমস্যার কারণে ইতো মধ্যেই হঠাৎ করে গবাদিপশুর মাংসের চাহিদা বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে পশুর সংখ্যা বা উৎপাদন আদৌ বাড়ে নাই। বরং যা ছিল তা এখনই কমতে শুরু করেছে। আর কিছুদিন পর যখন বাজারে মাছের আকাল দেখা দিবে এই সংকট তখন আমাদের সামনে আরো বেশী প্রকট হয়ে ধরা দিবে। সংকট ঘনিভূত হওয়ার আগেই তাই এখনই সময় থাকতে আমাদের সাবধান হতে হবে এবং বিলম্ব না করে দেশে ব্যাপক হারে গরু মোটাতাজা করণের দিকে নজর দিতে হবে। এর ফলে একদিকে যেমন বেকারদের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে মানুষের আমিষের ক্রমবর্ধমান বাড়তি চাহিদা পূরণের কাজও অনকটা সহজ হবে। পাশাপাশি পরোক্ষভাবে দেশ থেকে বাড়তি চামড়া রপ্তানী হয়ে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ প্রশস্ত হবে। এক দিকে দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানো অন্যদিকে কয়েক’শ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অমিত সম্ভাবনা; ইহা কেবল তখনই সম্ভব যখন মানুষ বেকার বসে না থেকে অল্প স্বল্প কিছু পুঁজি নিয়ে যার যতটুকু সুযোগ আছে সেখান থেকেই অনতিবিলম্বে একটি মোটাতাজা করণের খামার শুরু করবে। ভাবছেন কে আপনাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবে? হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। আমারাই আপনাদের পথ দেখাব এবং নিবেদিতপ্রাণ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিব যাদের পরামর্শে খুব সহজেই আপনারা সঠিকভাবে পথ চলতে পারবেন। মানুষ কখনও ঠেকে থাকে না যদি সত্যি সত্যিই সে সফল হওয়ার চেষ্টা করে।
গরু মোটাতাজাকরণের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ১৪-২২ মাস বয়সের ষাঁড়/বলদ গরুকে বাছাই করে প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্বল্প সময়ে স্বল্প খরচে বিশেষ ধরণের খাদ্য খাওয়ানো (ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র)এবং পরিচর্যার মাধ্যমে দ্রুত ৩০ মাস বয়স পর্যন্ত পালন করে দৈহিক ওজন বৃদ্ধি করা।
মোটাতাজাকরণের মেয়াদ:
গরু মোটাতাজাকরণের মেয়াদ তিন ধাপে বিভক্ত করা যেতে পারে –
১। স্বল্প মেয়াদি (এক্ষেত্রে মাত্র ৩ মাস পর্যন্ত পশুকে পালন করা হয়)
২। মধ্যম মেয়াদি (এক্ষেত্রে পশুকে ৬মাস পর্যন্ত পালন করা হয়)
৩। দীর্ঘ মেয়াদি (এক্ষেত্রে পশুকে ১২মাস বা তদুর্দ্ধ সময়ের জন্য পালন করা হয়)
নোট- মধ্যম বয়সের (২ বছর বা এর উর্দ্ধের বয়সী) গরুকে স্বল্প মেয়াদে, অল্প বয়সের (১৪-২২ মাস বয়সী) ষাড় গরুকে যথাক্রমে মধ্যম মেয়াদে এবং দীর্ঘ মেয়াদে পালন করলে বেশী লাভ হয়। যথাযথ নিয়ম মেনে পালন করতে পারলে সাধারণতঃ অল্প বয়সী ষাড় (১৪-২২ মাস) গরুর ক্ষেত্রে দৈনিক দৈহিক ওজনের বৃদ্ধির হার অধিক হয় (প্রতিদিন ৭৫০-৯০০ গ্রাম)। স্বল্প বয়সী ষাঁড় বাছুরের ক্ষেত্রে এই হার প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫৫০ গ্রাম থেকে শুরু হয়। বয়স্ক ষাঁড়/বলদের ক্ষেত্রে দৈহিক বৃদ্ধির তেমন তারতম্য না হলেও খাদ্য রূপান্তর হার বৃদ্ধি পেয়ে এবং শারীরিক ওজ্জ্বল্যতা এবং মাংসের গুনগতমান বৃদ্ধি করে মাত্র ৩-৪ বা সর্বোচ্চ ৬ মাসেই প্রতিটি গরু থেকে ৩-৫ হাজার টাকা মুনাফা করা সম্ভব হয়।
মোটতাজাকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাত সমূহ:
১। শাহিওয়াল – শাহিওয়ালের গায়ের রং হালকা লাল, একটি বয়স্ক ষাড়ের গড় ওজন হয় ৫৫০ কেজি।
২। রেড সিন্ধি – এটি একটি ছোট আকারের গরু। গায়ের রং লাল। একটি বয়স্ক ষাড়ের ওজন হয় ৪৫০-৫০০ কেজি।
৩। জার্সি – ছোটখাট গরু এবং মোটতাজাকরণের জন্য এই জাত খুবই উপযোগী। একটি বয়স্ক
ষাড়ের ওজন হবে ৬০০-৭০০ কেজি।
৪। হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান – বড় আকার এবং মজবুত শরীর বিশিষ্ট জাত এটি। গায়ের রঙ কালো তবে সাদা স্পট বিদ্যমান। সারা দুনিয়ায় এখন এ জাত পাওয়া যায়। প্রাপ্ত বয়স্ক ষাড়ের ওজন হবে ৮০০-৯০০ কেজি। জন্মের সময় একটি বাচ্চার ওজন প্রায় ৪০ কেজি হয়।
পালনের জন্য পশু বাছাই করণ:
০১. দেহের আকৃতি ও চেহারা আকর্ষণীয় হবে
০২. চামড়া মসৃন, পাতলা ও হালকা লুজ হবে
০৩. দেহের গঠন চতূর্ভুজ আকৃতির এবং লম্বাটে হবে
০৪. পা অপেক্ষাকৃত খাট ও মজবুত হবে
০৫. শিং খাট, চোখা, সুঠাম এবং আকর্ষণীয় হবে, নড়বড়ে হওয়া চলবে না
০৬. শরীরের কোথাও কোন ক্ষত থাকা চলবে না
০৭. মুখ ছোট এবং কপাল চওড়া হবে
০৮. পেট ঢিলা বা অত্যাধিক নীচের দিকে ঝুলানো হবে না।
০৯. লেজ লম্বা, চেপ্টা এবং মেয়েদের বেণীরমত মোটা থেকে ধীরে ধীরে সরু হয়ে শেষ হবে
১০. লেজের মাথায় পর্যাপ্ত চুল থাকবে এবং লেজ উস্কো খুস্কো হওয়া চলবে না
১১. পায়ের ক্ষুর স্থির, মজবুত সুগঠিত হতে হবে, ক্ষুরের পিছনের আঙ্গুলের ন্যায় ছোট টোগুলি অক্ষত হতে হবে
১২. চোখ পরিষ্কার উজ্জ্বল, সজাগ এবং জলজল করবে
১৩. চুট উঁচু হবে, গলকম্বল ভরাট হবে এবং বুকের সিনা চওড়া থাকবে
১৪. শান্ত স্বভাবের পশুকে বাছাই করার চেষ্টা করতে হবে
সুস্থ্যপশু চেনার উপায়:
১. পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি পশু সজাগ থাকবে
২. শরীরের পশম মসৃণ ও তেলতেলে দেখাবে
৩. নাক, মুখ ও কান পরিস্কার থাকবে, মলদারের আশপাশ চকচক করবে, পরিষ্কার থাকবে
৪. নাকের উপরের মাজেলে বিন্দু বিন্দু ঘাম থাকবে
৫. লেজ ও কান সর্বদা নড়াচড়া করতে থাকবে
৬. শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকবে (লোকাল গরু-১০১ ডিগ্রী ফাঃ, শংকর জাত ১০২-১০২.৫ ডিগ্রী ফাঃ)
৭. পশু জাবর কাটবে, খাওয়ার প্রতি আগ্রহ থাকবে এবং পিপাসা স্বাভাবিক থাকবে
৮. মাজা সমান্তারাল বা নীচের দিকে কিছুটা দাবানো থাকবে
৯. পাশদিয়ে অপরিচিত কেউ গেলে ফোঁস ফোঁস করবে কিম্বা একটু সরে দাড়াবে
পশুর অসুস্থ্যতার লক্ষণ:
১. নাক-মুখ শুষ্ক থাকা, প্রচন্ড হাঁপানি এবং পশম খাড়া হয়ে থাকা
২. ঝিমানি ভাব, হাটতে অসমর্থ হওয়া বা গায়ে পায়ে ব্যথা অনুভূত হওয়া
৩. মুখ দিয়ে লালা পড়া, পাতলা বা অত্যাধিক শক্ত পায়খানা করা
৪. চোখের কোনে ময়লা জমে থাকা
৫. জাবর না কাটা এবং খাবারের প্রতি অনীহা থাকা এবং পশুর মন মরা ভাব
৬. মুখের মধ্যে কোন ক্ষত থাকলে পশুর মুখ দিয়ে ঘন ফ্যানা বের হবে এবং মুখে চপ চপ আওয়াজ করতে থাকবে।
ক্রয়ের সময় পশুর রং বাছাই করা:
গভীর লাল, গভীর কাল, ছাই বা ধূসর রং এবং চুট উঁচু পশুর প্রতি সব সময় ক্রেতাদের আগ্রহ বেশী থাকে, বিশেষ করে কোরবাণীর উদ্দেশ্যে এ ধরণের পশুর প্রতি ক্রেতাদের অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। তবে হলিষ্টিন ফ্রিজিয়ান গরুর চুট না থাকলেও মাংস এবং দৈহিক গঠনের দিক থেকে তার জুড়ি মেলা ভার এবং একবার একটি গরুকে গড়ে তুলতে পারলে অন্যান্য যেকোন গরুর চেয়ে দেড়গুন বেশী মূল্যে বিক্রয় করা সহজ।
আবাসন
খামারের স্থান নির্বাচন:
১. শুষ্ক এবং উচ্চভূমি যেখানে পানি জমে না
২. সুষ্ঠু যাতায়াত ব্যবস্থা আছে
৩. জনবসতি থেকে একটু দূরে
৪. ঘাস চাষের উপযোগী জমির প্রাপ্যতা
৫. বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা
৬. মুক্ত বাতাস, পানি ও আলোর সুব্যবস্থা আছে এমন জায়গায় ঘর করা
৭. লম্বায় পূর্ব-পশ্চিম এবং প্রস্থে উত্তর-দক্ষিণ এবং দক্ষিণমুখী করে ঘর তৈরী করা
৮. ঘরের চাল বা ছাদ যতদুর সম্ভব ঢালু ও দোচালা করা
৯. ঘরের মেঝে পাকা হলে ভাল হয়, তবে মেঝে যেন কোনক্রমেই পিচ্ছিল না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা
১০. প্রতিটি গরুর জন্য আকৃতিভেদে কমবেশী লম্বায় ১৫০ সে:মি:X প্রস্থে ৯০ সে:মি: (মোটামুটি ৫ফুট লম্বাX৩ফুট চওড়া=১৫ বর্গফুট) স্থানের প্রয়োজন এবং একাধিক গরুর ক্ষেত্রে পাশাপাশি থাকা প্রতিটি গরুর জন্য পৃথক স্টল নির্মাণ করা
১১. প্রতিটি গরুর জন্য বিশেষজ্ঞের নির্দেশনা মোতাবেক খাবার পাত্র/পানির পাত্র স্থাপন করা
১২. নোংরা পানি ও খামারের বর্জ নিষ্কাষনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা
১৩. গরুকে গোসল করানোর প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের সুব্যবস্থা থাকা
১৪. খাবার রাখার জন্য একটি ষ্টোর থাকা
১৫. অসুস্থ্য গরকে পৃথকভাবে চিকিৎসা প্রদানের জন্য বা নতুন গরুকে খামারে আনার পর ১৪ দিন কোয়ারেনটাইনে রাখার জন্য পৃথক একটি সেড নির্মাণ করা
খামার স্থাপনে বিবেচ্য বিষয় সমূহ:
১. আবহাওয়া
২. ভৌগলিক অবস্থা
৩. অর্থনৈতিক অবস্থা
৪. অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতার উপর।
খামারের (ঘরের) প্রকারভেদ:
১. আলগা ঘর
২. প্রচলিত ঘর
প্রচলিত ঘর আবার দুইভাগে বিভক্ত:
১. একসারি বিশিষ্ট ঘর
২. দুই সারি বিশিষ্ট ঘর-
(ক) অর্ন্তমুখী ঘর
(খ) বর্হিমুখী ঘর
(ক) এক সারি বিশিষ্ট ঘর এর পরিমাপ:
১. খাদ্য সরবরাহ পথের প্রসস্থতা (চওড়া)- ৩ ফুট
২. খাদ্য পাত্রের প্রসস্থতা – ২ ফুট
৩. খাদ্য পাত্রের গভীরতা – ১৬ ইঞ্চি
৪. গাভী দাঁড়ানোর স্থান (দৈর্ঘ্য) – ৬ ফুট
৫. গাভী দাঁড়ানোর স্থান প্রসস্থতা (চওড়া)- ৪ ফুট
৬. নর্দমার প্রসস্থতা – ১ ফুট
৭. নর্দমার গভীরতা – ৬ ইঞ্চি
৮. পশু চলাচল স্থানের প্রসস্থতা (চওড়া)- ৬ ফুট
(খ) দুই সারি বিশিষ্ট বর্হিমুখী ঘর:
১. খাদ্য সরবরাহ পথের প্রসস্থতা (চওড়া)- ৩ ফুট
২. খাদ্য পাত্রের প্রসস্থতা – ২ ফুট
৩. খাদ্য পাত্রের গভীরতা – ১৬ ইঞ্চি
৪. গাভী দাঁড়ানোর স্থান (দৈর্ঘ্য) – ৬ ফুট
৫. গাভী দাঁড়ানোর স্থান প্রসস্থতা (চওড়া)- ৪ ফুট
৬. নর্দমার প্রসস্থতা – ১ ফুট
৭. নর্দমার গভীরতা – ৬ ইঞ্চি
৮. পশু চলাচল স্থানের প্রসস্থতা (চওড়া)- ৬ ফুট
(গ) দুই সারি বিশিষ্ট অর্ন্তমুখী ঘর:
১. খাদ্য সরবরাহ পথের প্রসস্থতা (চওড়া)- ৩ ফুট
২. খাদ্য পাত্রের প্রসস্থতা – ২ ফুট
৩. খাদ্য পাত্রের গভীরতা – ১৬ ইঞ্চি
৪. গাভী দাঁড়ানোর স্থান (দৈর্ঘ্য) – ৬ ফুট
৫. গাভী দাঁড়ানোর স্থান প্রসস্থতা (চওড়া)- ৪ ফুট
৬. নর্দমার প্রসস্থতা – ১ ফুট
৭. নর্দমার গভীরতা – ৬ ইঞ্চি
৮. পশু চলাচল স্থানের প্রসস্থতা (চওড়া)- ৬ ফুট
গোয়াল ঘর:
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গরুর খামার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জিরো গ্রেজিং পদ্ধতিতে করা হয় অর্থাৎ সারা বছরই গরু ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকে এবং সেখানেই খাদ্য, পানি সরবরাহ করা হয়। গোয়াল ঘর যেন সহজে পরিস্কার করা যায় তার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। ঘর শীতের দিনে গরম এবং গরমের দিনের ঠান্ডা দিবে এমন হওয়া উচিত। ছাদ কমপক্ষে ১০ ফুট উঁচু হলে ভাল। ছাদ টিন কিংবা ছনের হতে পারে। টিনের ক্ষেত্রে টিনের নীচে চাটাই এর সিলিং দিতে হবে। ঘরের চারিপার্শ্বে দেওয়ালের তেমন প্রয়োজন পড়েনা, তবে ছাদ অবশ্যই বাহিরের দিকে একটু বেশি (৩.৫/৪.০ফুট) প্রলম্বিত হতে হবে। মেঝে অবশ্যই শুকনা হতে হবে। শীতের দিনে ঘরের মেঝেতে গমের অথবা ধানের খড়/ নাড়া বিছানা হিসাবে দিতে হবে এবং ঘরের চারিদিকে চটের পর্দা ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত টাঙাতে হবে।
সঙ্গ নিরোধ ঘর:
এ ঘর অবশ্যই মুল ফার্মের দূরবর্তী স্থানে হতে হবে। যেখানে খামারে পালনের উদ্দেশ্যে নতুন কোন পশুকে আনার পর কমপক্ষে ১৪ দিন বিশ্রাম এবং পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। বাহির থেকে নিয়ে আসা যেকোন পশু নানারকম ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত থাকতে পারে যা খামারের সুস্থ্য পশুতে ছড়িয়ে খামারে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। এই ঘরে রাখা অবস্থায় পশুকে নানা রকম পরজীবি মুক্ত করা সহ প্রয়োজনীয় ৪টি টিকা প্রদান করতে হবে। ১২ ফুট ী ১২ ফুট আকারের একটি ঘর বানলেই চলবে
পশুর দৈহিক ওজন বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ:
সম্ভব হলে প্রতি সপ্তাহে একবার দৈহিক ওজন নেয়া দরকার। এতে দৈহিক পুষ্টি সাধন ও শরীর বর্ধনের পরিমাণ যাঁচাই করা যায়। জন্মকালীন সময় থেকে ২৪ মাস বয়স পর্যন্ত বাছুরের দৈহিক ওজন বৃদ্ধির হার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন বয়সের গরুর প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রাত্যহিক ওজন বৃদ্ধি
জাত জন্মকালীন ওজন (কেজি) প্রতিদিনের গড় দৈহিক ওজন বৃদ্ধি (গ্রাম) জন্ম থেকে ১ বৎসর ১ থেকে দেড় বৎসর দেড় থেকে ২ বৎসর
দেশী ১২-১৪ ২৯০ ১৪০ ১২০
শংকর ফ্রিজিয়ান ২০-২৫ ৩২০ ১৯০ ১৭০
শাহীওয়াল ১৮-২২ ৩৭০ ১৮০ ১৫০
ফ্রিজিয়ান ৩০-৩৫ ৬৪০ ৩৬০ ১৯০
জার্সি ১৯-২০ ২৭০ ১৯০ ১৬০
উৎস : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর
বাছুরের খাদ্য ব্যবস্থাপনা
শরীরের ওজন (কেজি) বয়স (দিন) শালদুধ (লিটার/দিন) দুধ (লিটার/দিন) সকল বাচ্চা
০-৪ শরীরের মোট ওজনের ১০ ভাগের ১ ভাগ পরিমাণ (২-৩লিটার) –
৩০ কেজি পর্যন্ত ৫-৯০ – শরীরের মোট ওজনের ১০
ভাগের ১ ভাগ পরিমাণ
৩১-৬০ ৫-৯০ – শরীরের মোট ওজনের ২০
ভাগের ১ ভাগ পরিমাণ
মোটাতাজাকরণের উদ্দেশ্যে পালিত গরুর দানাদার খাদ্য মিশ্রণ
ক্রমিক নং খাদ্য উপকরণ পরিমাণ (কেজি) প্রতি কেজির বর্তমান মূল্য মোট মূল্য প্রতি কেজি মিশ্রিত খাবারের গড় মূল্য
১ গম/ভূট্টা ভাঙ্গা ১০ ১৫.৭৫ ১৫৭.৫০ ১৬.৩২
২ গমের ভূষি ৫৫ ১৮.০০ ৯৯০.০০
৩ চাউলের কুঁড়া ১৩ ৫.০০ ৬৫.০০
৪ তিলের খৈল ২০ ১৪.০০ ২৮০.০০
৭ লবণ ১ ৮.০০ ৮.০০
৮ মিনারেল ০.৫ ৩২.০০ ১৬.০০
৯ ভিটামিন ০.৫ ২৩০.০০ ১১৫.০০
মোট ১০০ কেজি মোট মূল্য ১৬৩১.৫০
মোটাতাজাকরণের গরুর দৈনিক খাদ্যের চাহিদা:
১. (আঁশ জাতীয় খাদ্য যেমন- পল/খড়/বিছালি/শুকনা কুটা, মোট দৈহিক ওজনের ১ ভাগ
২. যে কোন কাঁচা ঘাস মোট দৈহিক ওজনের ২-৩ ভাগ
৩. দানাদার মিশ্রণ প্রতি ১০০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১.০-১.৫ কেজি
যেভাবে শরীরের মাপ নিতে হবে:
বুকের বেড় = সামনের পায়ের পিছনে বুকের বেড় ফিতা দিয়ে মাপতে হবে।
শরীরের দৈর্ঘ্য= চুট বা কুজের মাথা থেকে লেজের গোড়ার দুপাশের যেকোন একদিকের একটি উঁচু হাড় পর্যন্ত।
গরুর দৈহিক ওজন নির্ণয় পদ্ধতি:
ওজন = [দৈর্ঘ্য X (বুকের বেড়)২]/৩০০ = পাউন্ড
যেমন- একটি গরুর দৈর্ঘ্য ৩০ ইঞ্চি এবং বুকের বেড় ৫০ ইঞ্চি হলে
ওজন হবে = (দৈর্ঘ্য ৩০X বুকের বেড় ৫০X৫০)/৩০০ = ৩০ X২৫০০/৩০০ = ৭৫০০০/৩০০ = ২৫০ পাউন্ড = ১১৩.৬ কেজি
*(২.২ পাউন্ড= ১ কেজি)।
(পশুর স্বাস্থ্যভেদে গড় দৈহিক ওজনের ৪৫- ৫০ ভাগ মাংস পাওয়া যায়)।
১। ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র(ইউ.এম.এস.) ও ২। ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক(ইউ.এম.বি.)
১। ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র কি ?
গরুকে মোটাতাজকরণের উদ্দেশ্যে পালন করতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় যে খাদ্য যেমন- খড়, ইউরিয়া ও চিটাগুড়ের দ্বারা প্রস্তুত করা হয় তাকে ইউ.এম.এস. বলা হয়।
(ক) মোটাতাজাকরণে ইউ.এম.এস.এর গুরুত্ব:
ক্স খড়ের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করে।
ক্স দেহের ওজন বৃদ্ধি করে।
ক্স পশুর দৈহিক উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
ক্স গরু আগ্রহভরে খায়।
ক্স সহজ প্রযুক্তি।
(খ) ইউ.এম.এস. তৈরীর প্রয়েজনীয় সরঞ্জামাদি:
ক্স পলিথিন ১টি (৪ হাত ী ৮ হাত)
ক্স বালতি ১টি (৫ লিটার ধরে এমন)
ক্স নিক্তি ১টি (২৫ গ্রাম থেকে ১ কেজি পাথরসহ)
ক্স কাস্তে ১টি (খড় কাটার জন্য)
(গ) ইউ.এম.এস. তৈরীতে বিভিন্ন উপাদানের অনুপাত
খড় (কেজি) পানি (লিটার) চিটাগুড় (কেজি) ইউরিয়া (গ্রাম)
৫ ২.৫-৩.৫ ১.০ -১.২৫ ১৫০
১০ ৫-৭ ২.০-২.৫০ ৩০০
২০ ১০-১৪ ৫.০-৫.৫০ ৬০০
৫০ ২৫-৩৫ ১০.০০-১২.০০ ১৫০০
১০০ ৫০-৭০ ২০.০০-২৪.০০ ৩০০০
* নোটঃ ইউ.এম.এস. এ ব্যবহৃত খড়, ইউরিয়া ও চিটাগুড়ের অনুপাত যথাক্রমে ৮২:৩:১৫।
(ঘ) ইউ.এম.এস. তৈরীর পদ্ধতি:
১. প্রথমে পাঁচ কেজি খড় মেপে কেটে নিতে হবে।
২. অতঃপর খড়গুলি পলিথিন দিয়ে বিছিয়ে তার উপর মাঝারিভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।
৩. এরপর বালতিতে ২.৫-৩.৫ লিটার পানি নিতে হবে।
৪. পানির সাথে ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে নিতে হবে।
৫. এ মিশ্রণের সাথে ১.০-১.২৫ কেজি চিটাগুড় ভালো ভাবে মিশিয়ে নিতে হবে।
৬. তারপর খড়গুলি উল্টিয়ে বাকী মিশ্রণ ছিটিয়ে দিতে হবে।
৭. খড়গুলির গায়ে ভালোভাবে মিশ্রণ লাগিয়ে উক্ত মিশ্রিত খড় গরুকে খেতে দিতে হবে।
৮. খেয়াল রাখতে হবে মিশ্রণ যেন পলিথিনে বেশি পরিমাণ জমা না হয়। পারলে সবটুকু মিশ্রণই খড়ের সাহায্যে চুষে নেওয়া উচিত।
৯. উপরে মাত্র ৫ কেজি খড়ের মিশ্রণ পদ্ধতি বলা হল। পশুর প্রয়োজনে খড় + ইউরিয়া + চিটাগুড় ও পানির মিশ্রণ আনুপাতিক হারে বাড়াতে হবে।
সাবধানতা:
১. উপরের সবগুলো একটি পলিথিনের উপর রেখে ভালোভাবে মিশ্রণ করে একটি গরুকে দৈনিক ১ থেকে ১.৫ কেজি খাওয়াতে হবে।
২. একটি প্রাপ্ত বয়স্ক গরুকে প্রতিদিন ৫০ গ্রামের অধিক ইউরিয়া মিশ্রিত খড় (১.৬৭ কেজি) খাওয়নো উচিত নয়।
৩. খড়, ইউরিয়া, মোলাসেস ও পানির অনুপাত সঠিক রাখতে হবে।
৪. এই পদ্ধতিতে তৈরী খড় তিনদিনের বেশি রাখা বা খাওয়ানো যাবেনা। কারণ এ সময়ের পর খড়ে ইউরিয়া ও লালি গুড়ের পরিমাণ কমে এবং ফাংগাস গ্রো করতে পারে।
৫. ইউরিয়ার পরিমাণ বেশি হলে গরু ইউরিয়া বিষক্রিয়ায় মারা যেতে পারে।
৬. ইউরিয়া মোলাসেস খড় খাওয়ানোর পরপরই পশুকে পেট ভরে পানি খাওয়ানো যাবেনা। বরং খড় খাওয়ানোর ৩০মিনিট পূর্বেই গরুকে পানি পান করিয়ে নেওয়া উত্তম।
২। ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক (ইউ.এম.বি.) কি?
ইউরিয়া মোলালেস ব্লক একটি পুষ্টিকর দানাদার, শক্তিদায়ক, আমিষ সমৃদ্ধ জমাট পশুখাদ্য।
(ক) ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক (টগই) তৈরীর উপকরণ
ক্রমিক নং ব্লক তৈরীর উপকরণের নাম শতকরা হার প্রতি কেজির মূল্য মোট মূল্য প্রতি কেজি ব্লকের মূল্য
১ ইউরিয়া ১০ ভাগ ১২.০০ ১২০.০০ ১৫.৩৩/১১.৪৩
উভয় উপকরণ আধাআধি মিশিয়ে বানালে গড় মূল্য হবে ১৩.৩৮
২ মোলাসেস(চিটাগুড়) ৫৫ ভাগ ১৫.০০ ৮২৫.০০
৩ গমেরভূষি/চাউলের কুড়া ৩০ ভাগ ১৮.০০/৫.০০ ৫৪০.০০/১৫০.০০
৪ খাওয়ার চুন ৪ ভাগ ১০.০০ ৪০.০০
৫ লবন ১ ভাগ ৮.০০ ৮.০০
মোট ১০০%
(খ) ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক খাওয়ানোর উপকারিতা:
১. সরাসরি গবাদি পশুর পুষ্টি যোগায়।
২. আমিষ, শর্করা ও খনিজ পদার্থ সরবারহ করে।
৩. খড় জাতীয় খাদ্যের পাচ্যতা ও গহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
৪. গরু মোটা-তাজাকরণে এ খাদ্য বেশ কার্যকর।
৫. গবাদি পশুর দুধ উৎপাদন, কর্মশক্তি ও দৈহিক ওজন বৃদ্ধি পায়।
৬. উৎপাদন ব্যয় কম।
৭. সহজে হজম হয়।
(গ) ইউরিয়া মোলাসেস ব্লকের জন্য কাঠের ছাঁচ তৈরী:
এক কেজি ওজনের ব্লক তৈরীর জন্য ২২ সেঃমিঃ লম্বা, ৭.৫ সেঃমিঃ চওড়া ও ৫ সেঃমিঃ উচ্চতা বিশিষ্ট কাঠের ছাঁচ তৈরী করে নিতে হবে। আধা কেজি ওজনের জন্য ১৮ সেঃমিঃ লম্বা, ৬.৫ সেঃমিঃ চওড়া এবং ৪.৫ সেঃমিঃ উচ্চতা বিশিষ্ট ছাঁচ তৈরী করতে হবে।
(ঘ) ব্লক তৈরীর পদ্ধতি:
১. ব্লক তৈরীর জন্য আনুপাতিক হারে প্রয়োজনীয় উপকরণ মেপে নিতে হবে।
২. চিটাগুড় প্রথমে একটি পাত্রে জ্বাল দিয়ে আঁঠালো করে নিতে হবে।
৩. ৭০ক্ক সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জ্বাল দেওয়া চিটাগুড় চুলা থেকে নামানোর কিছুক্ষণ পর (২৫ক্ক সেলসিয়াস তাপমাত্রায়) ইউরিয়া, চুন ও লবণ একত্রে চিটাগুড়ের পাত্রে ঢেলে দিয়ে ভালভাবে মিশাতে হবে।
৪. এরপর গমের ভূষি/চাউলের কুঁড়া শক্ত লাঠি দিয়ে ভালভাবে পূর্বোক্ত মিশ্রণের সাথে মিশাতে হবে।
৫. সকল উপকরণ মিশানোর পর মিশ্রণটি কাঠের ছাঁচে ঢেলে দিতে হবে।
৬. ছাঁচে ঢালার পর উপরে ঢাকনা দিয়ে চাপ দিলে ব্লক সহজে জমাট বাঁধবে।
৭. জমাট বাঁধ ব্লক ছাঁচ থেকে বের করে আধা ঘন্টা সময় বাতাসে রেখে দিলে শক্ত হয়ে যাবে।
ঙ) ব্লক যেভাবে সংরক্ষণ করতে হয়:
১. জমাট বাঁধা শক্ত ব্লক পলিথিনের মোড়কে প্যাক করতে হয় যাতে ধূলা, বালি বা পানি না লাগে।
২. ইউ.এম.বি শুকনা পাত্রে বা স্থানে সংরক্ষণ করতে হয়। স্যাঁত-সে্যঁতে জায়গায় রাখলে ব্লকে বিষাক্ত ছত্রাক জন্মে পশুখাদ্যের অনুপযোগী হয়ে যায়।
(চ) ব্লক খাওয়ানোর নিয়ম:
১. গরু/ মহিষের জন্য দৈনিক ২৫০-৩০০ গ্রাম এবং ছাগল- ভেড়াকে দৈনিক ৫০ গ্রাম ব্লক খেতে দেওয়া যেতে পারে। বাড়ন্ত বাছুরকে আনুপাতিক হারে খাওয়াতে হবে।
২. অন্যান্য স্বাভাবিক খবারও পরিমাণ মত উক্ত সময়ে খেতে দিতে হবে।
(ছ) ব্লক খাওয়ানোর সুবিধা:
১. কর্মসংস্থান এবং আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক।
২. কাঁচা ঘাসের যখন খুবই অভাব তখন ব্লক সহজেই গবাদিকে খাওয়ানো যায়।
(জ) ব্লক খাওয়ানোর সাবধানতা:
১. খালি পেটে খাওয়ানো যাবে না।
২. গুঁড়া করে বা ভেঙে খাওয়ানো ঠিক নয়।
৩. সরাসরি পানিতে মিশিয়ে খাাওয়ানো যাবে না।
৪. ব্লক নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি খেতে দেওয়া যাবে না (প্রতিদিন সর্বোচ্চ পরিমান ২৫০-৩০০ গ্রাম)।
৫. পরিমানমত উপকরণ মিশিয়ে সঠিক ভাবে ব্লক তৈরী ও সংরক্ষণ না করলে ছত্রাক জন্মে বিষক্রিয়া হতে পারে।
৬. ঘোড়া, কুকুর, হাঁস-মুরগীকে এ ব্লক খেতে দেওয়া যাবে না।
৭. ব্লকের সাথে গবাদিপশু পলিথিন যাতে খেয়ে না ফেলে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
৮. ছয় মাসের কম বয়সের গরু/মহিষকে খাওয়ানো যাবে না।
৯. অসুস্থ ও গর্ভবতী অবস্থায় শেষের দিকে খাওয়নো যাবে না।
আমাদের দেশেই এক গবেষণায় দেখ গেছে শুধু শুকনা খড় খাওয়ালে বাড়ন্ত গরুর দৈহিক ওজন দৈনিক প্রায় ৩৮০ গ্রাম কমে যায়। অপরদিকে আর একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, একটি বাড়ন্ত ষাঁড়কে যথেচ্ছ পরিমাণ ইউ.এম.এস (ইউরিয়া, চিটাগুড় মিশ্রিত খড়) খাওয়ানোর পাশাপাশি ষাঁড়ের দৈহিক ওজনের শতকরা ০.০৮-১.০ ভাগ দানাদার খাদ্য খাওয়ালে দৈনিক ৭০০-৯০০ গ্রাম দৈহিক ওজন বৃদ্ধি পায়। কারণ- ইউরিয়া সার ব্যবহারের ফলে খড়ের পুষ্টিমান বৃদ্ধি পায়। সংরক্ষিত খড়ের পুষ্টিমান শুকানো খড়ের চেয়ে প্রায় ১.৪ গুন বেশী। শুকনো খড়ে প্রোটিনের পরিমান কমে যায়।
শুধুমাত্র শুকনো খড় এবং ইউরিয়া দিয়ে সংরক্ষিত তাজা খড়ের পুষ্টিমানের তুলনা
শুকনো খড় ইউরিয়া দ্বারা সংরক্ষিত খড়
প্রোটিন ৫% ৯-১২%
বিপাকীয় শক্তি প্রতি কেজিতে ৭ মেগাজুল ১০ মেগাজুল
শুধু খড় খাওয়ালে দৈনিক ওজনের পরিবর্তন – ৩৭৯ গ্রাম (কমে) + ২৮৩ গ্রাম (বাড়ে)
মোটাতাজাকরণের বিস্তারিত খরচের বিবরণ:
১. গোয়াল ঘর নির্মাণ প্রতিটি গরুর জন্য কমবেশী লম্বায় ১৫০ সে:মি:X প্রস্থে ৯০ সে:মি: (মোটামুটি ৫ফুট লম্বাX৩ফুট চওড়া=১৫ বর্গফুট)। চাল চাটাই,দুই স্তর বিশিষ্ট পলিথিন এবং বাশের ফ্রেম দিয়ে বানালে খরচ খুবই কম পড়বে।
২. খাদ্য, যেমন-পল/খড়, ভূট্টা, গমের ভুষি, চাউলের কুড়া, তিলের খৈল, চিটাগুড়, লবন, ভিটামিন, মিনারেল
৩. খাদ্যপাত্র ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক উপকরণ, যেমন- চাঁটাই, খাবার পরিবহনের ট্রলি, খাবার রাখার জন্য প্লাষ্টিকের হাফ ড্রাম, নান্দা (মেঞ্জার), প্লাষ্টিকের তৈরী ৩/৪ ইঞ্চি ব্যাসের পানির নল, কাস্তে/বটি, পাটের দড়ি ও পাট, চট, বালতি, পানি ছিটানোর ঝাঁজরি, পলিথিন, বাঁশের তৈরী ডোল, ঝুড়ি, কিছু বাঁশ, টাবালি, বেলচা, ক্ষুরপি, কোঁদাল, দাউ, খুন্তি/শাবল ইত্যাদি।
৪. পশু ক্রয় (মধ্যম সাইজের) প্রতিটি ১২০০০-১৫০০০/-(গড় দৈহিক ওজন ১৫০-২০০ কেজি), ছোট ষাড় বাছুর হলে (১২-১৫ মাস বয়স এবং প্রতিটি ১২৫-১৫০কেজি দৈহিক ওজন বিশিষ্ট) প্রতিটির মূল্য ১০,০০০-১২০০০/-(দশ থেকে বার হাজার টাকা)।
প্রতিটি গরুর জন্য প্রতিদিন খাদ্য বাবদ খরচ:
(ক) ইউ.এম.এস প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১.৫ কেজি X৫.৫০ (প্রতি কেজি)= ৮.২৫
ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০ গ্রাম X ১৩.৩৮ কেজি = ৪.০০
অতিরিক্ত শুকনা পল/খড় সর্বোচ্চ২.০০কেজিী১.২৫(প্রতি কেজির মূল্য) = ২.৫০
কাঁচা ঘাস সর্বোচ্চ ৫.০ কেজি X১.০০ (প্রতি কেজির মূল্য) = ৫.০০
মিশ্রিত দানাদার খাবার সর্বোচ্চ ২.০কেজিী১৬.৩২(প্রতি কেজির মূল্য) =৩২.৬৪
প্রতিদিন প্রতিটি গরুর জন্য খাদ্য বাবদ মোট খরচ =৫২.৩৯
(খ) প্রতিটি গরুর জন্য ১৮০ দিনে খাদ্য বাবদ খরচ ৫২.৩৯ X ১৮০= ৯৪২০.২০
(গ)অন্যান্য খরচ
(০১) প্রাথমিকভাবে কৃমি সহ অন্যান্য পরজীবি মুক্তকরণ খরচ প্রতিটি= ১০০.০০
(০২) ৩য় মাসে ২য় মাত্রা কৃমিনাশক প্রয়োগ = ১০০.০০
(০৩) ৬ষ্ঠ মাসে ৩য় মাত্রা কৃমিনাশক প্রয়োগ = ১০০.০০
(০৪) প্রতিটি গরুকে ৪ পদের রোগ প্রতিষেধক টিকা প্রদান
(1) ক্ষুরা রোগের টিকা মোট ২ মাত্রা (প্রতিমাত্রা ৬.০০) = ১২.০০
(2) তড়কা রোগের টিকা ১ মাত্রা (প্রতি মাত্রার মূল্য ০.৩০) = ০.৩০
(3) গলাফুলা বা এইচ.এস টিকা ১ মাত্রা (প্রতি মাত্রার মূল্য ০.৫০ )= ০.৫০
(4) বাদলা বা ব্লাক কোয়াটার টিকা ১ মাত্রা (প্রতি মাত্রার মূল্য ১.১০)=১.১০
(০৫) প্যরাভেট বা টিকা প্রদানকারীর ২বারের পারিশ্র্মিক = ৪০.০০
(০৬) বিশেষ ধরণের ভিটামিন ইনজেকশন ৩ মাত্রা (প্রতিটি ১০০.০০)=৩০০.০০
(০৭) বিশেষ ধরণের ক্যালসিয়াম ইনজেকশ ৩মাত্রা(প্রতিটি১০০.০০)= ৩০০.০০
(০৮) ২য় মাসে (০৪ এবং ০৫এর ভিটামিন/ক্যালসিয়াম পূনঃ প্রয়োগ= ৩০০.০০
(০৯) অপ্রত্যাশিত চিকিৎসা বাবদ খরচ প্রতিটি গরুর জন্য = ২০০.০০
(১০) কনসালটেন্সী খরচ (গরু প্রতি) = ৫০০.০০
(১১) গরু প্রতি রাখাল খরচ(৬মাস পর্যন্ত, প্রতিমাসে ২জন ৪০০০)= ১২০০.০০
গরু প্রতি মোট ১৮০ দিনে খরচ =১২,৫৭৪.১০
আয়ব্যয়ের হিসাব
(০১)খাত ওয়ারী ব্যয়:
(ক)অপেক্ষাকৃত দূর্বল প্রকৃতির প্রতিটি পশুর ক্রয় মূল্য=১২,৫০০/-(সর্বোচ্চ ব্যয়)
(খ) প্রতিটি পশুর জন্য সার্বিক ব্যয় (৬ মাস/১৮০দিন পর্যন্ত) = ১২,৫৭৪.১০
(গ) গরু প্রতি (খামার গড়ে তোলার প্রাক্কালে) প্রাথমিক
আনুষাঙ্গিক ব্যয় = ২০০.০
সর্বমোট ব্যয় = ২৫,২৭৪.১০
(০২) খাতওয়ারী আয়:
(ক) (প্রতিটি পশুর ক্রয় কালে কমপক্ষে ২০০ কেজি দৈহিক ওজন থাকতে হবে)
উন্নত পদ্ধতিতে বিশেষ যতœ সহকারে পালনের ফলে প্রতিদিন প্রতিটি পশুর দৈহিক ওজন বৃদ্ধি গড়ে ৮০০ গ্রাম। অতএব, প্রতিটি পশুর মাসিক দৈহিক ওজন বৃদ্ধি ০.৮০০ কেজি ী ৩০ = ২৪.০ কেজি ী ৬ মাস = ১৪৪ কেজি প্রতি দৈহিক ১কেজির বিক্রয় মূল্য মূল্য = ৮০.০০। ৬ মাস পালনের পর দৈহিক ওজন দাড়াবে = ক্রয়ের সময় মোট ওজন + পালনকালে বর্দ্ধিত ওজন = (২০০+১৪৪ কেজি) = ৩৪৪ কেজি ী ৮০.০০ = ২৭,৫২০/-
(খ) একটি গরু প্রতিদিন গড়ে ৫-৭ কেজি গোবর দেয়, প্রতি কেজি গোবরের মূল্য ০.৭৫ টাকা = ৭ কেজি ী ০.৭৫ = ৫.২৫ ী ৩০ দিন = ১৫৭.৫০ ী ৬ মাস = ৯৪৫/- (নয়শত পয়তাল্লিশ টাকা)। মোট আয় (ক+খ) = (২৭৫২০/- + ৯৪৫/- ) = ২৮,১৯৫/-
(খ) ৬ মাস পালন করার পর একটি গরুর বিক্রয় মূল্য কমপক্ষে= ২৮,১৯৫.০০
(ক) একটি গরু ক্রয় সহ মোট পালন ব্যয় = ২৫,২৭৪.১০
গরু প্রতি নীট মুনাফা (খ-ক) = ২,৯২০.৯০
মোটাতাজা করণের মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জনের উপায়
১. (ক) যদি ঘাস এবং খড় নিজের ক্ষেতে উৎপাদন করা যায়।
২. প্রতি লটে কমপক্ষে ২টি গরু (শতকরা ১০টি) ব্যতিক্রমী স্বাস্থ্য নিয়ে গড়ে উঠবে, যার বিক্রয় মূল্য সরাসরি কেবল শরীরের মাংসের সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকে না বরং দৃষ্টি নন্দন ও দর্শণীয় মূল্যে বিক্রয় হয় (বিশেষ করে কোরবাণী উপলক্ষে)।
৩. খোলা বাজারে চিটাগুড়ের মূল্য কেজি প্রতি ১৫ টাকা হলেও সুগার মিলে প্রতি কেজি ৫-৬ টাকার উর্দ্ধে নয়। সরাসরি মিল থেকে কিম্বা পাইকারী বাজার থেকে চিটাগুড় বা মোলাসেস সংগ্রহ করা গেলে খাদ্য খরচ তিনভাগের একভাগ কমে যাবে।
৪. নিজের ক্ষেতে নেপিয়ার, জার্মান সহ অন্যান্য মৌসুমি ঘাসের চাষ করলে প্রতি দিন নিজের গরুকে ঘাস খাওয়ানোর পরও প্রতি কেজি ১.০০-১.২৫ কেজি দরে স্থানীয় বাজারে খুব সহজেই বিক্রয় করে যা আয় হবে তা দিয়ে ২টি রাখালের মাসিক বেতন পরিশোধ করা ১০০ ভাগ সম্ভব।
৫. সুপেয় পানিসহ খামারের পরিবেশ অধিক পরিচ্ছন্ন হলে পশুর তেমন কোন রোগ ব্যধি হবে না বল্লেই চলে, ফলে পশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি কম হবে এবং বাড়তি চিকিৎসা ব্যয় হবে না।
৬. গোবর থেকে জৈব গ্যাস উৎপাদন করলে খামারের প্রয়োজনীয় সমস্ত জ্বলানী খরচ মিটিয়েও আশেপাশে কম পক্ষে ৩/৪টি বাড়ীতে অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রয় করা সম্ভব হবে এবং গ্যাস উৎপাদনের পরও গোবর সারের গুনাগুন অবিকল ও অবিকৃত থাকবে (এই প্রকল্পের জন্য এককালিন অতিরিক্ত ৬০,০০০/- ব্যয় হয়)।
৭. গরুর চনা একটি উৎকৃষ্ট বালাইনাশক হিসেবে ক্ষেতে পোকা-মাকড় দমনের জন্য ¯েপ্র আকারে ব্যবহার করা যায় যা পরিবেশ বান্ধব।
৮. গরুর গোবর উত্তম জৈব সার বিধায় ২০টি গরুর গোবর দিয়ে ২০-২৫ বিঘা জমির জৈব সারের চাহিদা মিটানো ১০০ ভাগ সম্ভব ইহাতে একদিকে জমির উর্বরতা রক্ষা পাবে এবং এই সার শতভাগ নিষ্কলুষ ও পরিবেশ বান্ধব।
খামারে যে কারণে লোকসান হতে পারে:
১. গোয়াল ঘরের রাজমিস্ত্রির বুদ্ধিতে ঘর বানালে। তাদের গতানুগতিক পরামর্শে গোয়ালঘর বানালে সারা বৎসর মালিক এবং গরু উভয়ই কষ্ট পাবে এবং পশুর স্বাস্থ্য ঘন ঘন খারাপ হবে।
২. বেখেয়ালি রাখাল- যার উপর খামারের আয় উন্নতি প্রায় ৫০ ভাগ নির্ভরশীল।
৩. অতিলোভী (অতিচালাক) মালিক যিনি হরহামেশা যত্রতত্র পরামর্শ নিয়ে বারংবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।
৪. বাজার থেকে অতি সস্তায় এবং অনির্ভরশীল বিক্রেতার কাছ থেকে খাদ্য উপকরণ সংগ্রহ করার প্রবণতা।
৫. রান্নাকরা খাবার খাওয়ায়ে সস্তায় গরু পালন করে মুনাফা অর্জন করতে চাওয়া।
৬. কোনভাবে একবার খামারে ক্ষুরা (এফ.এম.ডি) রোগ দেখা দিলে।
৭. কখনও পঁচাবাশি খাবার খাওয়ানোর ফলে পশুর বিষক্রিয়া/ডায়রিয়া দেখা দিলে।
৮. চিকিৎসক না হয়েও চিকিৎসক সেজে নিজের পশু নিজে চিকিৎসা করা কিম্বা কোন অনভিজ্ঞ হাঁতূড়ে চিকিৎসকের পরামর্শে খামার পরিচালনা করা এবং চিকিৎসা করান।
৯. বাজার থেকে যখন তখন ইচ্ছামত যেকোন পশু ক্রয় করে সরাসরি খামারের অন্যান্য গরুর সাথে মিশিয়ে ফেলা (ইহার ফলে যেকোন ছোঁয়াচে রোগ যেকোন সময় খামারে প্রবেশ করে খামারকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে)।
১০. পঁচা বাশি খাবার, ভাতের মাড়, বিয়ে বাড়ীর উচ্ছিষ্ট/বাশিভাত ইত্যাদি গবাদিপশুকে খাওয়ালে যে কোন সময় আকষ্মিকভাবে পশু বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে।
মোটাতাজকরণ খামারে যা করা উচিৎ এবং যা করা উচিৎ নয়:
১. প্রতিদিন পশুকে ভালভাবে গোসল করানোর পর শরীর ভালভাবে মুছে দেওয়া এবং শরীর ভালভাবে ম্যাসেজ করে দেওয়া।
২. পশুকে গোয়াল থেকে বের করে অতিরিক্ত হাঁটাচলা না করানো।
৩. গোবর পরীক্ষা করায়ে ৩ মাস পর পর অবশ্যই কৃমিনাশক ঔষধ প্রয়োগ করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে টিকা দেওয়া।
৪. কোন প্রকারের অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শে জরুরীভিত্তিতে চিকিৎসা গ্রহন করা।
৫. খালিপেটে (বিশেষ করে সকালে) কখনও কোন ডাউল জাতীয় সবুজ ঘাস, কাঁঠাল/তরমুজের খোসা, ইউরিয়া মিশ্রিত কোন গো-খাদ্য পশুকে খাওয়ানো উচিৎ নয়।
৬. পূর্বেরদিনের বাশি খাবার কখনই না খাওয়ানো।
৭. খুব সকালে এবং রাতে শোবার পূর্বে পশুকে অবশ্যই ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
৮. পশুর গলার দড়ি অত্যাধিক খাট কিম্বা ঢিলা (লম্বা) করে না বাঁধা।
৯. কখনও কোন কারণে কোন পশুর পেট ফাঁপলে যতদ্রুত সম্ভব পেটের গ্যাস বের করে ফেলা।
১০. রোগাক্রান্ত পশুকে অবশ্যই সুস্থ্য পশু থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পৃথক কোয়ারেনটাইন সেডে নিয়ে পৃথকভাবে সেবাযত্ন করা।
নেপিয়ার ঘাসের চাষ পদ্ধতি:
১১. জমি নির্বাচন ঃ সব মাটিতেই জন্মে তবে বেলে-দোআঁশ মাটি এ ঘাস চাষের জন্য উত্তম। একবার লাগালে ৩-৪ বছর পর্যন্ত ফলন দেয় এবং শীতকালের ২-৩ মাস ছাড়া প্রায় সারা বছরই এর বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে।
১২. রোপনের সময় ঃ বৈশাখ হতে আশ্বিন বা এপ্রিল-মে হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোপন করা যায়। তবে বৈশাখের প্রথম বৃষ্টির পর পরই ঘাস দ্রুত শিকড় গজায় এবং ফলন ভাল হয়।
রোপনের দুরুত্ব: সারি থেকে সারির দূরুত্ব ৩.০ ফুট এবং গাছ থেকে গাছের দূরুত্ব ১.৫ ফুট। এক একর জমিতে ১২০০০টি কাটিং এর দরকার হয়।
কাটিং তৈরী: নেপিয়ারের কাটিং/মোথা লাগাতে হয় মাটির সাথে ৪৫ডিগ্রী কোনে।প্রতিটি কাটিং এর ৩টি গিরা রেখে কাটতে হয় এবং একটি গিরা মাটির মধ্যে পুঁতে দিয়ে মধ্যের গিরা মাটির কাছাকাছি বা সমানে রেখে দিতে হয়। একটি গাছ থেকে ৬/৭টি কাটিং পাওয়া যায়। একটি মোথা থেকে ৪/৫টি চারা করা যায়।
রোপন পদ্ধতি: সমতল জমিতে ৪/৫টি চাষ দিয়ে এবং ভালভাবে মই দিয়ে জমি সমান করে মধ্যের গিরা মাটির কাছাকাছি বা সমানে রেখে পুতে দিতে হয়। ভাদ্র মাসের শেষভাগে যখন কম বৃষ্টিপাত থাকে তখনও নেপিয়ার ঘাস লাগালে ভাল ফলন দেয়। অতিবৃষ্টিতে কাটিং লাগালে কাটিং পঁচে যাবার সম্ভবনা থাকে।
সার প্রয়োগ: নেপিয়ার ঘাস দ্রুত বর্দ্ধনশীল এবং বছরে ৪-৬ বার কাটা যায়। তাই এই ঘাসের জন্য প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজন হয়। জমি চাষের সময় একর প্রতি ৪/৫টন গোবর সার, ২৬ কেজি টি.এস.পি, ২০ কেজি এম.পি সার জমির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিয়ে তারপর চারা রোপন করতে হবে চারা মাটিরে সাথে ধরে গেলে অর্থাৎ ১০/১২দিন পর একর প্রতি ৩০-৩৫ কেজি এবং রোপনের ৩০ দিন পর একর প্রতি পুনরায় ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হয়। জমির উর্বরতার উপর ভিত্তি করে সারের পরিমাণ কম/বেশী হতে পারে। ইউরিয়া প্রয়োগের পর জমিতে রস না থাকলে সেচ দিতে হবে।
ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ: প্রতিবার ঘাস কাটার পর একর প্রতি ৩০-৩৫ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে।ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় গাছের পাতা ভিজা থাকা চলবে না। অতএব, দুপুরে রোদ্রের মধ্যে সার ছিটনো উত্তম।
ঘাস কাটা/সংগ্রহ: কাটিং লাগানোর ৬০-৭০দিনের মাথায় প্রথমবারের মত এবং এর পর প্রতি ৬-৮ সপ্তাহ পর পর ঘাস কর্তন করা যাবে। মাটি থেকে ৫/৬ ইঞ্চি উপর থেকে ঘাস কাটতে হয়। উপযুক্ত সময়ের পূর্বে ঘাস কাটলে ফলনের পরিমাণ কমে যাবে, আবার বেশী বিলম্বে কাটলে ঘাসের গুনগত মান নষ্ট হবে। একবার এঘাস লাগালে ৩/৪ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়ের পর সমস্ত মোথা মাটি থেকে তুলে জমি পরিবর্তন কিম্বা একই জমি পূনরায় প্রস্তুত করে পূর্বের নিয়মে আবার চাষ করে কাটিং অথবা মোথা লাগাতে হবে।
ফলন: নেপিয়ার ঘাস বছরে ৪-৬বার কাটা যায় এবং প্রতিবারে একর প্রতি ১০-১২ টন ফলন পাওয়া যায়। ভাল পরিচর্যা, পরিমিত সার, সময়মত সেচ প্রয়োগ করলে বছরে একর প্রতি ৮০ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।
সংরক্ষণ: অতিরিক্ত ঘাস সময়মত সংগ্রহ করে সাইলেজ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে দীর্ঘদিন রেখে খাওয়ানো যায়। ইহাতে ঘাসের পুষ্টিমানও বৃদ্ধি পায়। অথবা স্থানীয়ভাবে বাজার সৃষ্টি করে বিক্রয় করলেও প্রতি কেজি কমপক্ষে ১.০০-১.২৫ টাকায় বিক্রয় করে খামারের আয় বৃদ্ধি করা যায়।
একটি গরু প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ কেজি নেপিয়ার খেলে ২০টির জন্য প্রয়োজন হবে ২০০ কেজি। ৩০ দিনে প্রয়োজন ২০০ী৩০ = ৬০০ কেজি, ১৮০দিনে বা ৬ মাসে প্রয়োজন ৬০০ ী ৬ = ৩৬০০ কেজি বা প্রায় সাড়ে ৩ টন। সেই বিবেচনায় দু দফায় ২০+২০= ৪০টি টি গরুর জন্য মাত্র ১ বিঘা নেপিয়ার চাষ করলে ফলন পাওয়া যাবে প্রতি কাটিং এ ৩.৫-৪.০ টন, যা একটি খামারের জন্য অতিরিক্ত। ৬ কাটিং এ উৎপাদন হবে কমপক্ষে ২৪-২৫টন। দু দফায় ৪০টি গরুর জন্য প্রয়োজন হবে মাত্র ৩.৫ ী ২ টন। অতিরিক্ত থাকবে ২০টন। প্রতি কেজি নেপিয়ার ঘাসের বাজার মূল্য ন্যুনপক্ষে ১.০০। ২০ টন তথা ২০,০০০ কেজি, যার বাজার মূল্য কমপক্ষে ২০,০০০/-।
প্রথম বছরে একবিঘা জমিতে ঘাস চাষের খরচ:
(ক) একবার কাটিং সংগ্রহ বাবদ খরচ = ২০০.০০
(খ) প্রারম্ভিক জমি চাষ বাবদ সাকুল্যে খরচ = ১০০০.০০
(গ) এক বছরে ইউরিয়া সার প্রয়োগ ৬ বারে মোট ৬০ কেজি,
প্রতি কেজির মূল্য ১২.০০ X৬০ = ৭২০.০০
(ঘ) টি.এস.পি এবং এম.পি সার দুটি মিলে
১৫ কেজি প্রতি কেজি ৮.০০ X ১৫ = ১২০.০০
(ঙ) শুষ্ক মৌসুমে ৪টি সেচ বাবদ প্রতিবার খরচ ১০০.০০ X ৪= ৪০০.০০
(চ) অন্যান্য খরচ = ৫০০.০০
একবিঘা জমিতে নেপিয়ার চাষ বাবদ প্রথম বছরে খরচ = ২৯৪০.০০
১ বিঘা চাষের জন্য যদি সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকাও খরচ হয়, তারপরেও কেবল ১ বিঘা জমির ঘাস থেকেই বছরে আয় হতে পারে কমপক্ষে ১৫,০০০.০০(পনের হাজার টাকা)।
সূত্র: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর
























