ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন,
বাংলাদেশে ব্রয়লার মুরগি শিল্পের ইতিহাস ও বিবর্তন
( ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার শিল্পে পরিণত হওয়ার গল্প ।)
-ড. বায়েজিদ মোড়ল | AgricultureNews24.co

বাংলাদেশে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে ব্রয়লার মুরগি শিল্প একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মানুষ যে সাশ্রয়ী মূল্যে মুরগির মাংস কিনতে পারেন, তার পেছনে রয়েছে প্রায় চার দশকের গবেষণা, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং লাখো খামারির অক্লান্ত পরিশ্রম।
কিন্তু আজকের এই শিল্প একদিনে গড়ে ওঠেনি। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে হাতে গোনা কয়েকটি খামার দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে ব্রয়লার শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষিভিত্তিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন লক্ষাধিক খামারি, হ্যাচারি, ফিড মিল, ওষুধ ও ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন, প্রসেসিং ও বিপণন খাতের অসংখ্য মানুষ।
বাংলাদেশে ব্রয়লার শিল্প শুরুর প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন বাংলাদেশে মুরগি পালন ছিল মূলত দেশি ও আধা-উন্নত জাতের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন কম ছিল, বৃদ্ধি ধীরগতির ছিল এবং মুরগির মাংস সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল।
১৯৮০-এর দশকে দেশের প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কিছু বেসরকারি উদ্যোক্তা উপলব্ধি করেন যে, দ্রুত বর্ধনশীল ব্রয়লার প্রযুক্তি বাংলাদেশে চালু করা গেলে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
১৯৮০-এর দশক: পরীক্ষামূলক যাত্রা
১৯৮৭–১৯৮৯ সালের দিকে সীমিত পরিসরে বিদেশ থেকে ব্রয়লার প্যারেন্ট স্টক আমদানি শুরু হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে ব্রয়লার উৎপাদন শুরু করে।
প্রথমদিকে খামারিদের বড় সমস্যা ছিল—
- উন্নত মানের বাচ্চার অভাব
- উন্নত ফিডের সংকট
- রোগ সম্পর্কে অজ্ঞতা
- প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব
- বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা
তবুও কয়েকজন অগ্রগামী উদ্যোক্তার হাত ধরে শিল্পটির ভিত্তি তৈরি হয়।
১৯৯০-এর দশক: বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ
১৯৯০-এর দশক ছিল বাংলাদেশের ব্রয়লার শিল্পের প্রকৃত উত্থানের সময়।
এই সময়—
- বাণিজ্যিক হ্যাচারি স্থাপিত হয়
- উন্নত ফিড মিল গড়ে ওঠে
- ভ্যাকসিন সহজলভ্য হতে শুরু করে
- আধুনিক খামার নির্মাণ বাড়ে
- খামারিদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি পায়
এই দশকেই ব্রয়লার খামার দেশের প্রায় সব জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
সমন্বিত পোল্ট্রি কোম্পানির আবির্ভাব
বাংলাদেশে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান সমন্বিত (Integrated) পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করে। তারা একই ব্যবস্থার আওতায়—
- গ্র্যান্ড প্যারেন্ট/প্যারেন্ট স্টক
- হ্যাচারি
- ফিড মিল
- ওষুধ ও ভ্যাকসিন
- খামারি নেটওয়ার্ক
- বিপণন
পরিচালনা শুরু করে।
এর ফলে উৎপাদন ব্যয় কমে এবং মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।
২০০০ সালের পর শিল্পের দ্রুত বিস্তার
২০০০ সালের পর ব্রয়লার শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে।
এই সময়ে—
- হাজার হাজার নতুন খামার গড়ে ওঠে
- দেশীয় ফিড শিল্প শক্তিশালী হয়
- আধুনিক ইনকিউবেটর ব্যবহৃত হয়
- অটোমেটিক ড্রিংকার ও ফিডার চালু হয়
- পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত (Closed House) খামার চালু হয়
বাংলাদেশে মুরগির মাংস উৎপাদনে ব্রয়লার প্রধান উৎসে পরিণত হয়।
খাদ্য উৎপাদনে নতুন শিল্প
ব্রয়লার শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে বিশাল পশুখাদ্য শিল্প।
বর্তমানে দেশে অসংখ্য ফিড মিল বছরে লাখ লাখ টন ব্রয়লার ফিড উৎপাদন করছে।
মকাই, সয়াবিন মিল, ভিটামিন, মিনারেল, এনজাইমসহ একটি বড় শিল্পখাত এই ব্রয়লার শিল্পকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে।
হ্যাচারি শিল্পের বিকাশ
বাংলাদেশে আধুনিক হ্যাচারি শিল্প ব্রয়লার উৎপাদনের অন্যতম ভিত্তি।
বর্তমানে অত্যাধুনিক কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ইনকিউবেটরে কোটি কোটি ডে-ওল্ড চিক (DOC) উৎপাদিত হচ্ছে।
এই শিল্পে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
ভ্যাকসিন ও ওষুধ শিল্পের প্রসারব্রয়লার শিল্পের বিকাশের ফলে দেশে—
- ভ্যাকসিন উৎপাদন
- ভেটেরিনারি ওষুধ
- বায়োসিকিউরিটি পণ্য
- জীবাণুনাশক
- পুষ্টি সম্পূরক
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
কর্মসংস্থানে ব্রয়লার শিল্প
বাংলাদেশের ব্রয়লার শিল্পের মাধ্যমে—
- খামারি
- শ্রমিক
- পশুচিকিৎসক
- প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা
- ফিড ডিলার
- ওষুধ ব্যবসায়ী
- পরিবহন শ্রমিক
- প্রসেসিং কারখানার কর্মী
- খুচরা বিক্রেতা
মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান
ব্রয়লার শিল্পের সবচেয়ে বড় অবদান হলো—
- স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসার সুযোগ
- নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
- যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি
- গ্রামে নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি
- কৃষির সঙ্গে শিল্পের সংযোগ
অনেক বেকার যুবক ব্রয়লার খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
সংকটের সময়
এই শিল্প বিভিন্ন সময় নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
যেমন—
- বার্ড ফ্লু
- খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি
- ডে-ওল্ড চিকের অস্বাভাবিক দাম
- বাজারমূল্যের ওঠানামা
- উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ
- করোনা মহামারি
এসব কারণে বহু খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
প্রযুক্তির নতুন যুগ
বর্তমানে বাংলাদেশেও ব্যবহৃত হচ্ছে—
- ক্লোজড হাউস
- স্বয়ংক্রিয় ফিডিং
- স্বয়ংক্রিয় পানির ব্যবস্থা
- কম্পিউটারভিত্তিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ
- ডিজিটাল মনিটরিং
- উন্নত জেনেটিক ব্রয়লার
এর ফলে উৎপাদনশীলতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
রপ্তানির সম্ভাবনা
বাংলাদেশে ব্রয়লার উৎপাদন দ্রুত বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে এখনও উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি হয়নি।
যদি—
- আন্তর্জাতিক মানের প্রসেসিং প্ল্যান্ট,
- রোগমুক্ত উৎপাদন অঞ্চল,
- ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা,
- আন্তর্জাতিক মানের খাদ্য নিরাপত্তা,
- হালাল সার্টিফিকেশন,
- শক্তিশালী রপ্তানি নীতি
বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্রয়লার মাংস ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
আগামী দিনে শিল্পটিকে টেকসই করতে প্রয়োজন—
- উৎপাদন ব্যয় কমানো
- ভুট্টা ও সয়াবিন উৎপাদন বৃদ্ধি
- উন্নত গবেষণা
- দেশীয় জেনেটিক উন্নয়ন
- অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার
- পরিবেশবান্ধব খামার
- আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
- খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ
সমাপনী মূল্যায়ন
বাংলাদেশে ব্রয়লার শিল্পের ইতিহাস কেবল একটি কৃষি-উৎপাদন ব্যবস্থার ইতিহাস নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এক সফল অধ্যায়। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে এই শিল্প একটি বৃহৎ কৃষি-শিল্পে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষণা, প্রযুক্তি, জৈবনিরাপত্তা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এই শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও রপ্তানিমুখী করা সম্ভব। সেই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত এবং খামারিদের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে বাংলাদেশের ব্রয়লার শিল্পের আগামী দিনের সাফল্যের ভিত্তি।























