রোববার শুরু জাতীয় মৎস্য পক্ষ, স্বর্ণপদক পাচ্ছেন ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।।

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬:
‘রূপালি মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আগামী রোববার (১৬ আগস্ট) শুরু হচ্ছে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬। এবারের আয়োজনে মৎস্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৩টি ক্যাটাগরিতে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণপদক) দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, জাতীয় মৎস্য পক্ষের কেন্দ্রীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের জর্জ ইনস্টিটিউট মিনি স্টেডিয়াম মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবেন এবং নির্বাচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে জাতীয় মৎস্য পদক তুলে দেবেন।
মৎস্য খাতে যুক্ত ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ
সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিতে মৎস্য খাতের অবদান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীও রয়েছেন।
তিনি বলেন, দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারের নীতি সহায়তা, গবেষণা ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং মৎস্যচাষি, জেলে, উদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ খাতকে আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
মাছ উৎপাদন ৫১ লাখ ১১ হাজার মেট্রিক টন
দেশে মাছের উৎপাদন ও প্রাপ্যতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে মাথাপিছু দৈনিক মাছের প্রাপ্যতা ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রাম, যেখানে জাতীয় পুষ্টিচাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে দৈনিক ৬০ গ্রাম। অর্থাৎ জাতীয় চাহিদার তুলনায় মাছের প্রাপ্যতা ইতোমধ্যে বেশি।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৫১ দশমিক ১১ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। মৎস্যজীবী, মৎস্যচাষি, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।
মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বিশ্বে দ্বিতীয় বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের মৎস্য খাত শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) ‘The State of World Fisheries and Aquaculture 2026’ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ইলিশ আহরণে বিশ্বে প্রথম, তেলাপিয়া উৎপাদনে অষ্টম, ক্রাস্টেশিয়ান আহরণে ষষ্ঠ এবং উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, এসব অর্জন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আরও সুস্পষ্ট করেছে।
নিবন্ধিত জেলে ১৮ লাখের বেশি
দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৮ লাখ ১১ হাজার ৫৫২ জন। এর মধ্যে ইলিশ আহরণকারী জেলে ৬ লাখ ৫০ হাজার ২৫১ জন, হাওরাঞ্চলের জেলে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৮ জন এবং সমুদ্রগামী জেলে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২১১ জন।
মন্ত্রী বলেন, মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে শুধু আইন প্রয়োগ করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের পরিবারকে খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষিদ্ধ মৌসুমে ৪০ হাজার ইলিশ জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা
মন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ১৫ হাজার ৫০৩ দশমিক ৫০১ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল বিতরণ করা হয়েছে।
একই সময়ে জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় চার মাসে ৫৮ হাজার ৭২০ দশমিক ১৬১ মেট্রিক টন, সমুদ্রে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ২৪ হাজার ১৬৫ দশমিক ৬২৫ মেট্রিক টন এবং কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলেদের মধ্যে ১ হাজার ৬১০ দশমিক ৭০১ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মাছ ধরতে গিয়ে নিহত ২৬ জেলের পরিবারকে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা, নিখোঁজ ১৩ জেলের পরিবারকে একই পরিমাণ অর্থ এবং অক্ষম একজন জেলেকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বিকল্প কর্মসংস্থানের অংশ হিসেবে ১ হাজার ২৯৫ জন উপকারভোগীকে হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন, সবজি বাগান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
‘জাল যার, জলা তার’ নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ
মৎস্য খাত নিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওরের ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে ‘জাল যার, জলা তার’ নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এসব জলাশয় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের চিংড়িকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিতে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদেশের সুপারশপগুলোতে মানসম্মত বাংলাদেশি চিংড়ি সরবরাহ সহজ করা এবং এর মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মৎস্য খাতকে আরও টেকসই করার প্রত্যয়
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মৎস্য খাত এখন শুধু দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস নয়; কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গবেষণা, প্রযুক্তি, নিরাপদ মাছ উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ খাতকে আরও টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত সচিব ইমাম উদ্দীন কবির, অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওয়ারা জাহান, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।






















