ফিশটেক বিডি লিমিটেডের ‘অ্যাকুয়াকালচার নলেজ ডে–২০২৬’-এ উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব।।
ঢাকা, রবিবার, ৮ ভাদ্র (২৩ আগস্ট): দেশের মৎস্য খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব চাষপদ্ধতি এবং নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদন উৎসাহিত করতে ‘অ্যাকুয়াকালচার নলেজ ডে–২০২৬’ আয়োজন করেছে ফিশটেক বিডি লিমিটেড। রাজধানীর বনানীর হোটেল সারিনায় অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে সরকারের নীতিনির্ধারক, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক, মৎস্যখামারি এবং উদ্যোক্তারা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা, মাছের গুণগত মান, অ্যান্টিবায়োটিকনির্ভরতা কমানো, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্যপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
আয়োজকেরা জানান, দেশের মৎস্য খাতকে টেকসই ও লাভজনক করতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা, পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ খাদ্য প্রয়োগ, রোগ প্রতিরোধ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং ভালো চাষপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এসব বিষয়ে খামারি, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করতেই ফিশটেক বিডি লিমিটেড এ আয়োজন করেছে।
উৎপাদন বাড়লেও মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যচাহিদা পূরণে দেশে মাছের উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে। তবে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে কোনোভাবেই গুণগত মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না।
মন্ত্রী বলেন, গবেষক, বিজ্ঞানী, খামারি এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্য ও কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ফিশটেক বিডি লিমিটেডের এ উদ্যোগের মাধ্যমে মৎস্য খাতের বিভিন্ন পক্ষকে একই মঞ্চে এনে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের আয়োজন মাঠপর্যায়ে আধুনিক ও নিরাপদ মৎস্যচাষের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এখন বড় চ্যালেঞ্জ
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি নেই। কিন্তু গুণগত মানসম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিভিত্তিক পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান দুটি লক্ষ্য হলো—দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি করা। এ লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদনকারী, গবেষক, প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
গবেষণা ও প্রযুক্তির সুফল পৌঁছাতে হবে খামারিদের কাছে
‘অ্যাকুয়াকালচার নলেজ ডে–২০২৬’-এ আধুনিক মৎস্য প্রযুক্তি ও গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ের খামারিদের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচকেরা বলেন, গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি খামারিদের কাছে পৌঁছানো না গেলে মৎস্য খাতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না। অন্যদিকে খামারির বাস্তব অভিজ্ঞতা গবেষক ও প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের কাছে পৌঁছানোও জরুরি। ফিশটেক বিডি লিমিটেডের এ আয়োজন গবেষণা, প্রযুক্তি এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
অ্যান্টিবায়োটিকনির্ভরতা কমানোর আহ্বান
গবেষকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিক ও ভ্যাকসিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে রোগ প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন উৎপাদন সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মানুষ এখন শুধু বেশি খাদ্য চায় না; নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন খাদ্য চায়। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এমন কোনো উপকরণ বা পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে না, যা মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
মৎস্যচাষে পানির গুণগত মান, সঠিক ঘনত্বে মাছ মজুত, পরিমিত ও নিরাপদ খাদ্য প্রয়োগ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং দায়িত্বশীলভাবে ওষুধ ব্যবহারের ওপরও অনুষ্ঠানে গুরুত্বারোপ করা হয়।
মাটি ও পানিদূষণ রোধে কাজ করছে সরকার
মন্ত্রী বলেন, মাটি, পানি, আলো-বাতাস এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে। মাটি ও পানিদূষণ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি জানান, দেশের মাটি ও পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পানিতে সিসা ও আর্সেনিকের মতো ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি চালেও ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
ক্ষতিকর এসব উপাদান মাটি, ভূগর্ভস্থ পানি, সার নাকি কীটনাশক—কোন উৎস থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, তা চিহ্নিত করতে সরকার গবেষণা শুরু করেছে।
মাছের উৎপাদনের সঙ্গে পানি ও জলজ পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় বিষয়টি মৎস্য খাতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুষ্ঠানে পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলাশয়ের স্বাস্থ্য বজায় রেখে মাছ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
তরুণদের মৎস্য উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ
মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা নয়; কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ে পড়াশোনা করা তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। তরুণেরা সম্ভাবনাময় ও বাস্তবসম্মত প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে এলে সরকার তাদের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ফিশটেক বিডি লিমিটেডের এ আয়োজন তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আধুনিক মৎস্যচাষ, নতুন প্রযুক্তি, খামার ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ উৎপাদন এবং বাজারসংযোগ সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ তরুণেরা মৎস্য খাতে যুক্ত হলে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান—দুটিই বাড়বে।
দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন এবং মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক।
বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন জন্না ভ্যান ডের লিন্ডেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন ফিশটেক বিডি লিমিটেডের চেয়ারম্যান খন্দকার ফরহাদ হোসেন।
এ ছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক, প্রান্তিক পর্যায়ের মৎস্যখামারি, উদ্যোক্তা এবং ফিশটেক বিডি লিমিটেডের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
টেকসই মৎস্য খাত গঠনে ফিশটেক বিডির উদ্যোগ
‘অ্যাকুয়াকালচার নলেজ ডে–২০২৬’-এ আধুনিক মৎস্য প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব চাষপদ্ধতি, জলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয়।
ফিশটেক বিডি লিমিটেডের এ আয়োজন দেশের মৎস্য খাতের নীতিনির্ধারক, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা ও খামারিদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর একটি কার্যকর মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আয়োজনটির মূল বার্তা ছিল—মাছের উৎপাদন অবশ্যই বাড়াতে হবে, কিন্তু সেই উৎপাদন হতে হবে নিরাপদ, মানসম্মত, পরিবেশবান্ধব এবং ভোক্তার স্বাস্থ্যের জন্য নির্ভরযোগ্য।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ফিশটেক বিডির এমন জ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ দেশের খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করবে এবং বাংলাদেশের মৎস্য খাতকে আরও উৎপাদনশীল, টেকসই ও রপ্তানিযোগ্য করে তুলতে সহায়তা করবে।






















