জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় সহনশীল অর্থনীতি গড়তে হবে: পরিবেশমন্ত্রী
কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামোয় জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি, অভিযোজন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে গুরুত্ব।।

বিশেষ সংবাদদাতা//ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় দেশের অর্থনীতিকে আরও সহনশীল করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও জনজীবনের জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিয়ে আগাম প্রস্তুতি ও কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে ফরিদপুর–৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল মান্নান এবং সংরক্ষিত মহিলা আসন–৪৯-এর সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন উপস্থিত ছিলেন।
জলবায়ুর প্রভাবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে চাপ
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বন্যা, অনাবৃষ্টি ও লবণাক্ততার প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত গরমে কারখানার শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমছে। উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমি ও সুপেয় পানির ওপর চাপ বাড়ছে।
তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বন্যায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতি অর্থনীতির বিদ্যমান চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি খাতের চাপসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তিনি বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ পূর্বাভাসের উল্লেখ করে বলেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। এটি চূড়ান্ত হিসাব না হলেও অর্থনৈতিক সহনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।
তাঁর মতে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে জলবায়ু ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা করা এখন জরুরি।

কৃষি সুরক্ষায় সময়োপযোগী অভিযোজনের তাগিদ
কৃষিকে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন পরিবেশমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষি শুধু খাদ্যের জোগান দেয় না; গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, বাজারের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও দেশের কৃষি এখনো অনেকাংশে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঝুঁকি কমাতে সময়োপযোগী অভিযোজন কৌশল ও ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও যথাযথ প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও কার্যকর অভিযোজনের মাধ্যমে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। বন্যায় ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর বিরূপ প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির দিকে বৈশ্বিক রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সবুজ শিল্পায়ন ও জলবায়ু অর্থায়নে গুরুত্ব

বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহীর এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন হ্যামস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস. এম. মনিরুল ইসলাম।
বক্তারা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, জলবায়ু অর্থায়ন ও টেকসই কৃষির ওপর গুরুত্ব দেন। এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের আহ্বান জানান তাঁরা।
আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যকর নীতিসহায়তার প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে।
সম্মাননা পেল হ্যামস গার্মেন্টস ও ইডকল
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও জলবায়ু অর্থায়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে হ্যামস গার্মেন্টস লিমিটেড ও ইডকলকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, হ্যামস গার্মেন্টস আন্তর্জাতিক লিড প্লাটিনাম সনদের মূল্যায়নে ১১০-এর মধ্যে ১০৮ স্কোর অর্জন করে বিশ্বসেরা অবস্থান অর্জন করেছে। অন্যদিকে সৌর হোম সিস্টেমের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিপরীতে ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কার্বন রাজস্ব দেশে আনার স্বীকৃতি পায় ইডকল।
পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, পরিবেশ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।






















