https://agriculturenews24.com/বাজারে কিভাবে কমবে মাংস ও দুধের দাম…
গবাদি প্রাণির খাদ্যের অন্যতম উপাদান হলো ঘাস। তাছাড়া বর্তমান বাজারে দানাদার খাদ্যের চেয়ে কাঁচা ঘাসের দাম অনেক কম। উৎপাদনের বড় খরচ হচ্ছে খাদ্যের খরচ (প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ)। কাজেই উচ্চমূলের দানাদার খাবারের ওপর বেশি নির্ভরশীল না হয়ে উন্নত জাতের অধিক পুষ্টিসম্পন্ন ঘাস চাষের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদন খরচ কমিয়ে, গবাদি প্রাণির শরীরের যথাযথ পুষ্টির জোগান নিশ্চিতে দৈনিক তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ কাঁচা ঘাস যুক্ত করা খুবই জরুরি। উৎপাদন খরচ কমলে বাজারে কমবে মাংস ও দুধের দাম।

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গবাদি প্রাণির জন্য এক কেজি দানাদার খাদ্য কিনতে ব্যয় হয় ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। অন্যদিকে এক কেজি সবুজ ঘাস কিনতে কৃষকের খরচ করতে হয় মাত্র ৪ থেকে ৫ টাকা। পুষ্টির দিক থেকে সবুজ ঘাস অতি উন্নত মানের বলে বিশ্বাস করে সকল খামারী। সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টায় সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে গত দুই দশকে বাংলাদেশে মাংস ও দুধের উৎপাদন বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে বাংলাদেশ মাংস উৎপাদনে ইতোমধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দুধ উৎপাদনেও বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে।
বাংলাদেশে যেসব ঘাস পাওয়া যায়, এর মধ্যে কিছু হলো স্থায়ী ঘাস আর কিছু অস্থায়ী বা মৌসুমি ঘাস। স্থায়ী ঘাসগুলো একবার লাগালে কয়েক বছর বেঁচে থাকে এবং বছর বছর সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু মৌসুমি ঘাসগুলো একবার কেটে খাওয়ালেই শেষ। স্থায়ী ঘাসের মধ্যে রয়েছে জারা, নেপিয়ার, পাকচুং, জার্মান, পারা, ডেসমোডিয়ার ইত্যাদি। আবার অস্থায়ী ঘাসের মধ্যে রয়েছে ভুট্টা, সরগম, ওটস, মাষকলাই ইত্যাদি।

এসব ঘাসের মধ্যে কিছু আবার নডিউল যুক্ত। যেমন খোসারি, শিম ইত্যাদি। বর্তমানে বিভিন্ন উন্নত জাতের ঘাস চাষের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে কৃষকদের মধ্যে। নিজের খামারের গরুর জন্যই এই ঘাস চাষ করেন খামারিরা। খামার লাভজনক করতে হলে দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বেশি বেশি কাঁচা ঘাস খাওয়াতে হবে, যা গবাদি প্রাণির শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দেয়। এখানে উল্লেখ্য যে একটি দুগ্ধবতীর গাভীর জন্য ৮ শতক ও মোটাতাজাকরন ষাড়ের জন্য ৭ শতক জমিতে জারা ঘাস চাষ করা হলে সারা বছর চলবে।
ঘাসের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাঁচা ঘাসের বেশির ভাগ অংশজুড়ে থাকে পানি। এই পানি বা জলীয় অংশ বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে তা হলো ড্রাইমেটার বা শুষ্ক অংশ। মূলত খাদ্যের পাঁচটি উপাদান শর্করা, আমিষ, চর্বি, ভিটামিন, মিনারেল ও আঁশজাতীয় বিভিন্ন উপাদান থাকে এই অংশে।

ঘাস থেকে পাওয়া প্রোটিন অনেক সহজলভ্য। গবাদি প্রাণি খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দামি উপাদান হলো আমিষ বা প্রোটিন। আমদানি করা প্রোটিনের চেয়ে ঘাস থেকে প্রাপ্ত প্রোটিন অনেক সস্তা, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। ঘাসে যে প্রোটিন পাওয়া যায়, তা মূলত ক্রুড প্রোটিন; যেখানে নাইট্রোজেনের পরিমাণ ৬ দশমিক ২৫ গুণ বেশি। এই ক্রুড প্রোটিনের ৮০ শতাংশ হলো ট্রু প্রোটিন, অবশিষ্ট অংশটুকু হলো নন-প্রোটিন নাট্রোজেন। দুই ধরনের প্রোটিনই গবাদি প্রাণির শরীরে ব্যবহৃত হয়। তবে ট্রু প্রোটিন গবাদি প্রাণির শরীরে মাংস ও দুধ বাড়াতে সহায়তা করে। আর নন-প্রোটিন নাইট্রোজেনের বেশির ভাগ অংশ গবাদি প্রাণির শরীর থেকে বের হয়ে যায়। ক্রুড প্রোটিন রুমেনে দুভাবে বিভক্ত হয়, যার একটি অংশ রুমেনের অণুজীব দ্বারা ভেঙে মাইক্রোবিয়াল প্রোটিনে পরিণত হয়; যা পরবর্তী সময়ে মাইক্রোবসের সঙ্গে হজম হয়ে যায়। আর বাকি অংশ রুমেনে হজম না হয়ে ক্ষুদ্রান্তে চলে আসে এবং সেখানে হজম হয়।
গবাদি প্রাণি যে পরিমাণ প্রোটিন গ্রহণ করে, তার ২০ শতাংশ শরীরে কাজে লাগে বাকিগুলো বর্জ্য হিসেবে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। মূলত ট্রু প্রোটিনটি গবাদি প্রাণির কাজে লাগে। গবাদি প্রাণির খাদ্য উপাদানের মধ্যে অন্যতম হলো আঁশ বা ফাইবার। রুমেনে খাদ্য নড়াচড়া করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ফাইবার। গবাদি প্রাণির খাদ্যে আঁশজাতীয় খাদ্য পর্যাপ্ত থাকলে রুমেনে খাদ্যের পরিপাক সঠিক সময়ে শেষ হয়, তাই গবাদি প্রাণির নিজে থেকে খাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। এ জন্য খাদ্যে ড্রাই মেটারের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আঁশ থাকা প্রয়োজন।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৯৩ লাখ মেট্রিক টন (প্রায় ১০ গুণ)। মোট মাংস উৎপাদনের একটি বড় অংশ (প্রায় ৪৯ দশমিক ৮১ শতাংশ) আসে গরু থেকে (ডিএলএস, ২০২৩)। যদিও গত ১০ বছরে গরুর সংখ্যা মাত্র ৬ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু মাংস উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১৫৬ শতাংশ। ডিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ লাখ খামার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ৯৪ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সবুজ ঘাসের চাষ হচ্ছে, হচ্ছে সেখানে উৎপাদিত ঘাসের বাজারজাতকরণ। সেখানে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এগুলোর মধ্যে দেশের উত্তারাঞ্চলের বিশেষ করে দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলায় গবাদি প্রাণির খাদ্য হিসেবে সবুজ ঘাসের চাহিদা এবং উৎপাদন ব্যাপক। এখানকার বেশির ভাগ বাজারে সপ্তাহের একাধিক দিন হাটে বিক্রি হয় সবুজ ঘাস। কেনাবেচা হয় লাখ লাখ টাকার ঘাস।
দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় দুগ্ধ খামারের সংখ্যা ৬১টি। গরুর খামার ৩৭টি। ছাগলের খামার পাঁচটি। উপজেলায় কৃত্রিম প্রজনন উপকেন্দ্রের সংখ্যা একটি এবং কৃত্রিম প্রজনন সেন্টার পাঁচটি। এই এলাকায় গোখাদ্য হিসেবে সবুজ ঘাসের ব্যবহার অন্য এলাকার তুলনায় বেশি বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এ খাতের উন্নয়নে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সরকার এবং বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় খামারিদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, টিকা, ঔষুধ এবং প্রণোদনা দেওয়া হয়। পণ্য ডাইভারসিফিকেশনেও কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ম্যাচিং গ্রান্টের আওতায় উদ্যোক্তাদের ফিড মিল, মিল্ক কুলিং সেন্টার, ডেইরি হাব, দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ, গবাদি প্রাণির বর্জ্য থেকে তৈরি সার ব্যবস্থাপনাসহ ৯টি খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের প্রায় ৪০ শতাংশ অনুদান দেওয়া হচ্ছে।
আগে গবাদি প্রাণি রোগাক্রান্ত হলে হাসপাতালে আনতে হতো, এখন হাসপাতালের পাশাপাশি এ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ৩৬০টি উপজেলায় মাবাইল ভ্যাটেরিনারি ক্লিনিক চালু করা হয়েছে। গবাদি প্রাণির জাত উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত জাতের বকনা আমদানি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৬৫ উপজেলায় ফিডার প্রডাকশন ইউনিট চালু করা হয়েছে। গবাদি প্রাণির উৎপাদন খরচ কমাতে না পারলে মাংস ও দুধের দাম কমানো কষ্টসাধ্য হবে। উৎপাদন খরচ কমাতে সবুজ ঘাসের বিকল্প নেই। গো-খাদ্য হিসেবে সবুজ ঘাস নিশ্চিত করতে পারলে মাংস ও দুধের দাম কমানো সম্ভব।























