বটিয়াঘাটায় ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি খামারিদের ক্ষতিপূরণ ও টেকসই কর্মসংস্থানের দাবিতে ফোয়াবের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত।

খবর বিজ্ঞপ্তি: হ্যাচারি থেকে সরবরাহ করা ভাইরাসযুক্ত চিংড়ি পোনা মরে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সেমি-ইনটেনসিভ চিংড়ি খামারিদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, তাদের টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং দেশের চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সহজ শর্তে সরল সুদে ঋণপ্রাপ্তির দাবিতে খুলনার বটিয়াঘাটায় এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) বিকেল ৪টায় খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার বটিয়াঘাটা সদর ইউনিয়নের শৈলমারী এলাকার সুতনু এগ্রো ফার্মে ফিস ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফোয়াব) বটিয়াঘাটা উপজেলা আঞ্চলিক কমিটির উদ্যোগে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় বটিয়াঘাটা অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি খামারিরা তাদের সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি, চিংড়ি পোনার মান, রোগ ও ভাইরাসের ঝুঁকি, উৎপাদন ব্যয়, পুঁজি সংকট এবং ক্ষতির পর নতুন করে উৎপাদনে ফেরার প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেন। একই সঙ্গে চিংড়ি খাতকে টেকসই করতে মানসম্মত ও রোগমুক্ত পোনা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের আর্থিক সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।
ভাইরাসযুক্ত পোনা সরবরাহের অভিযোগ, ব্যাপক ক্ষতির দাবি
মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, দেশ বাংলা ও ফিশটেক হ্যাচারি থেকে সরবরাহ করা পোনা ভাইরাসযুক্ত হওয়ায় শৈলমারী ও খলশিবুনিয়া এলাকার চিংড়ি খামারে মাছ মরে গিয়ে চাষিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে খামারিদের অভিযোগ।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেমি-ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের জন্য তাদের জমি ও ঘের প্রস্তুত, পোনা ক্রয়, খাবার, পানি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। কিন্তু পোনা ছাড়ার পর ভাইরাসজনিত সমস্যায় চিংড়ি মারা যাওয়ায় তাদের বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক খামারির পক্ষে নতুন করে পোনা কিনে আবার উৎপাদন শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
তবে হ্যাচারি থেকে সরবরাহ করা পোনাই ভাইরাস সংক্রমণের উৎস—এটি সভায় অংশ নেওয়া খামারি ও আয়োজকদের অভিযোগ। বিষয়টির কারণ ও দায় নির্ধারণে যথাযথ পরীক্ষাগারভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মত উঠে আসে।
ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পাশে দাঁড়ানোর দাবি
সভায় বক্তারা বলেন, চিংড়ি চাষ শুধু একজন খামারির ব্যক্তিগত ব্যবসা নয়। এর সঙ্গে পোনা উৎপাদন ও বিপণন, খাবার, শ্রমিক, পরিবহন, বরফ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিসহ একটি বড় অর্থনৈতিক শৃঙ্খল জড়িত।
একটি সেমি-ইনটেনসিভ চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু খামার মালিকের বিনিয়োগই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত বহু মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তাই ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ অথবা পুনর্বাসন সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা যাতে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারেন, সে জন্য তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সহজ শর্তে সরল সুদে ঋণ চান খামারিরা
মতবিনিময় সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি খামারিদের জন্য সহজ শর্তে সরল সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা।
সভায় বলা হয়, চিংড়ি খামারে একটি উৎপাদন চক্র শুরু করতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুঁজির প্রয়োজন হয়। পোনা, feed, পানি ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করার পর হঠাৎ রোগ বা ভাইরাসের কারণে উৎপাদন নষ্ট হলে একজন খামারির পক্ষে নিজস্ব অর্থে আবার ঘুরে দাঁড়ানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে এমন একটি ঋণব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং সুদের চাপ সহনীয় থাকবে।
খামারিরা মনে করেন, ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদকদের পুনরায় চাষে ফেরানো গেলে একদিকে তাদের কর্মসংস্থান ও আয় রক্ষা হবে, অন্যদিকে দেশের চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতেও তা ভূমিকা রাখবে।
মানসম্মত ও ভাইরাসমুক্ত পোনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব
সভায় চিংড়ি চাষের শুরুতেই মানসম্মত পোনা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। খামারিরা বলেন, সেমি-ইনটেনসিভ চাষে পোনা ছাড়ার পর feed, পানি ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খাতে পর্যায়ক্রমে বড় বিনিয়োগ করতে হয়। ফলে পোনার মানে সমস্যা থাকলে পরবর্তী পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এ কারণে হ্যাচারি থেকে চাষির কাছে পোনা পৌঁছানো পর্যন্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগারভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার দাবি উঠে আসে।
পোনা কেনার সময় খামারি যেন এর উৎস, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন—এমন একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
চিংড়ি রপ্তানি বাড়াতে উৎপাদন পর্যায় সুরক্ষিত করার দাবি
মতবিনিময় সভায় বক্তারা চিংড়িকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রপ্তানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমে মাঠপর্যায়ে চাষিদের উৎপাদন সুরক্ষিত করতে হবে।
রোগমুক্ত ও মানসম্মত পোনা, স্বাস্থ্যকর চাষ ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে খামারিদের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।
বিশেষ করে সেমি-ইনটেনসিভ চাষে বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় রোগের কারণে একটি উৎপাদন চক্র ব্যর্থ হলে খামারির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বড় হতে পারে। ফলে চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগের সঙ্গে খামারির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সুরক্ষাকে যুক্ত করার দাবি জানানো হয়।
সুতনু গাইনের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভা
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন শৈলমারী সুতনু এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী ও চিংড়ি খামারি সুতনু গাইন।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফিস ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফোয়াব)-এর সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান শাহিন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর খুলনা প্রতিনিধি ও দৈনিক প্রবাহের চিফ রিপোর্টার মুহাম্মদ নূরুজ্জামান এবং ফোয়াবের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ শাকিল হোসেন।
সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন ফোয়াবের খুলনা জেলা আহ্বায়ক মো. আবুল হোসেন।
নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরলেন চিংড়ি চাষিরা
ফোয়াবের খুলনা জেলা সদস্য সচিব জসিম উদ্দিন খাজার সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি চাষিরা তাদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি খামারিদের মধ্যে বক্তব্য দেন শুভংকর হালদার, বাবলু মন্ডল, শান্তনু গাইন, বিপ্রদাস বৈরাগী, গৌতম গোলদার, জিমুত ঢালী, অয়ন ঢালী, বিদ্যুৎ কবিরাজ, দেবাশীষ বাছাড়, বিপুলা রায়, বিপ্লব মন্ডল, হারান গাইন, মহানন্দ গাইন, রঞ্জন মালী ও চয়ন গাইন প্রমুখ।
তারা চিংড়ি চাষে নিজেদের বিনিয়োগ ও ক্ষতির কথা তুলে ধরে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও দায় নির্ধারণের দাবি
মতবিনিময় সভায় আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ। বক্তারা মনে করেন, কোন খামারে কত পোনা ছাড়া হয়েছিল, কতদিন পর mortality শুরু হয়েছে, কী ধরনের রোগের লক্ষণ দেখা গেছে এবং কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে—এসব তথ্য সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পোনায় ভাইরাস থাকার অভিযোগের বিষয়টিও নিরপেক্ষ পরীক্ষাগারভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠে আসে।
এর মাধ্যমে পোনা উৎপাদন ও সরবরাহের কোন পর্যায়ে সমস্যা হয়েছে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে বলে মত প্রকাশ করা হয়।
চিংড়ি খাতে টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার আহ্বান
সভায় বক্তারা বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষের জীবন-জীবিকা চিংড়ি চাষ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। খামার বন্ধ হয়ে গেলে বা একজন চাষি উৎপাদন থেকে সরে গেলে তার প্রভাব শ্রমিক থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পর্যন্ত অনেকের ওপর পড়ে।
তাই ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনে টিকিয়ে রাখার মতো টেকসই কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
খামারিদের মতে, মানসম্মত পোনা নিশ্চিত করা, রোগ শনাক্তকরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজার ও রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে উৎপাদকদের কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে চিংড়ি খাত আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ফোয়াবের পক্ষ থেকে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
মতবিনিময় সভা থেকে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, মৎস্য বিভাগ, গবেষণা ও পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হ্যাচারি এবং চিংড়ি খাতের অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের ক্ষয়ক্ষতি যাচাই, পোনায় ভাইরাস থাকার অভিযোগের বৈজ্ঞানিক তদন্ত, দায় নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, সহজ শর্তে সরল সুদে ঋণ এবং ভবিষ্যতে মানসম্মত ও রোগমুক্ত পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সভায় অংশ নেওয়া খামারিরা আশা প্রকাশ করেন, তাদের দাবি ও বাস্তব সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে চিংড়ি চাষিদের উৎপাদনে টিকিয়ে রেখে দেশের চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
মূল দাবি
মতবিনিময় সভায় ক্ষতিগ্রস্ত সেমি-ইনটেনসিভ চিংড়ি খামারিদের পক্ষ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে প্রধান হলো—ক্ষতিগ্রস্ত খামারগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান, খামারিদের টেকসই কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি, সহজ শর্তে সরল সুদে ঋণের ব্যবস্থা, পোনায় ভাইরাস থাকার অভিযোগের নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত এবং ভবিষ্যতে হ্যাচারি পর্যায় থেকেই মানসম্মত ও রোগমুক্ত চিংড়ি পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করা।
খামারিদের দাবি, শৈলমারী ও খলশিবুনিয়া এলাকায় যেসব সেমি-ইনটেনসিভ চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোর খামারভিত্তিক ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা প্রয়োজন। কত পোনা মজুত করা হয়েছিল, পোনা ছাড়ার কতদিন পর mortality শুরু হয়েছে, কী ধরনের রোগের লক্ষণ দেখা গেছে এবং feed, পোনা, পানি ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক ও অন্যান্য খাতে একজন খামারির কত টাকা বিনিয়োগ হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে হ্যাচারি থেকে সরবরাহ করা পোনায় ভাইরাস থাকার যে অভিযোগ খামারিরা তুলেছেন, সেটি নিরপেক্ষ পরীক্ষাগারভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হয়। পোনা উৎপাদন, পরীক্ষা, পরিবহন ও খামারে সরবরাহ—এই পুরো প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়ে সমস্যা হয়েছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করা গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।
খামারিরা বলেন, সেমি-ইনটেনসিভ চিংড়ি চাষে শুরুতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়। ঘের প্রস্তুত, পোনা ক্রয়, feed, পানি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহনের পর একটি উৎপাদন চক্র নষ্ট হয়ে গেলে অনেক খামারির পক্ষে নিজস্ব অর্থে আবার চাষ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সহজ শর্তে সরল সুদে পর্যাপ্ত ঋণ দিয়ে দ্রুত উৎপাদনে ফেরানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।
তাদের মতে, ক্ষতিপূরণ শুধু অতীতের ক্ষতি পূরণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে খামারিদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও চিংড়ি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা সরাসরি জড়িত। একজন খামারি উৎপাদন থেকে সরে গেলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, পোনা ও feed সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, আড়তদার, প্রক্রিয়াজাতকারীসহ পুরো মূল্যশৃঙ্খলের ওপর প্রভাব পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসনকে চিংড়ি খাতের টেকসই কর্মসংস্থানের অংশ হিসেবে বিবেচনার দাবি জানানো হয়।
ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় এড়াতে হ্যাচারি পর্যায়ে পোনার স্বাস্থ্য ও মান নিয়ন্ত্রণ, রোগ ও ভাইরাস পরীক্ষা এবং পোনার উৎস শনাক্তযোগ্য করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। খামারিরা যেন পোনা কেনার সময় সেটির উৎস ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পান—এমন জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি উঠে আসে।
খামারিদের বক্তব্য, চিংড়ি রপ্তানি বাড়াতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ বা রপ্তানি প্রণোদনার দিকে তাকালে হবে না; উৎপাদনের একেবারে প্রথম ধাপ—মানসম্মত ও রোগমুক্ত পোনা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের খামারিকে সুরক্ষা দিতে হবে। রোগের কারণে বারবার উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের চিংড়ির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
তাই তাদের দাবি—“নিরাপদ পোনা → সুরক্ষিত খামারি → টেকসই উৎপাদন → কর্মসংস্থান → মানসম্মত চিংড়ি → রপ্তানি বৃদ্ধি”—এই পুরো শৃঙ্খলকে একসঙ্গে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সবশেষে সভা থেকে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, মৎস্য বিভাগ, গবেষণা ও পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হ্যাচারি মালিক এবং চিংড়ি খাতের অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। খামারিদের বক্তব্য, খামারি উৎপাদনে টিকে থাকলেই চিংড়ি শিল্প টিকে থাকবে; আর উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বাংলাদেশের চিংড়ি রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ আরও শক্তিশালী হবে।






















