পোল্ট্রি পরিবারের মিলনমেলায় জমজমাট ‘প্যারাগন নাইট’
প্যারাগনের আতিথেয়তায় পোল্ট্রি পরিবারের মিলনমেলা, আলোচনায় প্রাণিসম্পদ ও আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি প্রদর্শনী।।
ড. বায়েজিদ মোড়ল | সম্পাদক, AgricultureNews24.com

বাংলাদেশের পোল্ট্রি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে পরিচিত একটি নাম প্যারাগন গ্রুপ। বাচ্চা উৎপাদন, পোল্ট্রি পালন, প্রাণী ও মৎস্যখাদ্য এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত। খামারের উৎপাদন থেকে ভোক্তার খাবার পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি জৈব সার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো ক্ষেত্রেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। পোল্ট্রি, ফিড ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বহুমুখী কার্যক্রম প্যারাগনকে দেশের কৃষিভিত্তিক ব্যবসার একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

সেই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা মশিউর রহমান ও ইয়াসমিন রহমানের আন্তরিক আতিথেয়তায় এবার একত্র হলেন পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। গত ৩১ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় রাজধানীর গুলশানে তাঁদের বাসভবনে আয়োজন করা হয় ‘পোল্ট্রি গেট টুগেদার’। পারিবারিক পরিবেশের এই আয়োজন পোল্ট্রি খাতের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের পাশাপাশি আসন্ন দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীর প্রস্তুতি ও অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনারও সুযোগ তৈরি করে।

বাসার ছাদে আয়োজন করা হয় নৈশভোজের। পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে একই পরিসরে বসে খাবার গ্রহণ, কুশল বিনিময় ও আলাপচারিতায় সময় কাটান অতিথিরা। আয়োজক দম্পতির আতিথেয়তায় সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে পোল্ট্রি পরিবারের একটি আন্তরিক মিলনক্ষেত্র। ব্যবসার সূত্রে গড়ে ওঠা পরিচয় সেখানে পায় পারিবারিক সৌহার্দ্যের আবহ।

আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান তুহিন, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ডা. শাকিলা ফারুক, রেনেটার কায়সার কবির, এসিআই এগ্রিবিজনেসের ড. এফ এইচ আনসারী, WPSA-BB-এর সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ অন্জন, আহকাবের সভাপতি সায়েমুল হক, WPSA-BB-এর সাবেক সেক্রেটারি ড. এম এ সালেক, তৈয়বুর রহমান, ফয়েজুর রহমান, আস্থা ফিডের মোশাররফ হোসেন, আরআরপি গ্রুপের পরিচালক আজমল হক, এভোন এনিমেল হেল্থের মাহবুব হাসান, এভারেস্ট এগ্রোজেনেটিকের মো. শাহিন শাহ, চিকস অ্যান্ড ফিডের এখলাসুল হক, আকিজ ফিডের এ টি এম হাবিব উল্লাহ, আলাল ফিডের মো. আলাল হোসেন, এসিআই গোদরেজের নজরুল ইসলাম এবং ইনসেপ্টার নুরল হক শাওন, আদিয়ান এর ডাঃ জামিল আহামেদ , এসিআই এগ্রিবিজনেসের জয়ন্ত দত্ত গুপ্ত , বিপ্লব কুমার প্রামানিক, ফিসটেকে তারেক সরকার, ইউকে বাংলা ফিডের ডাঃ জাহিদ হাসান, প্লানেট গ্রুপের ফাহাদ হাবিব, কোয়ালিটি ফিডের সাফির রহমান, কেমিনের ডা. গোলাম মোর্শেদসহ পোল্ট্রি ও সংশ্লিষ্ট খাতের পাঁচ শতাধিক অতিথির উপস্থিতিতে আয়োজনটি হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা।

সংশ্লিস্ট কৃষি সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাপ্তাহিক কৃষি ও আমিষ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, AgricultureNews24.com-এর সম্পাদক ড. বায়েজিদ মোড়ল, এগ্রিলাইফ২৪.কম-এর শফিউল আজম, বাংলাদেশ পোল্ট্রি এন্ড ফিস পত্রিকার সম্পাদক মো: আফজাল হোসেন, মাসিক পুনশ্চ পত্রিকার সম্পাদক এ.বি.এম. আসাদুজ্জামান, এগ্রিনিউজ২৪.কম-এর সম্পাদক খোরশেদ আলম জুয়েল, কৃষি সুরক্ষা পত্রিকার জাহিদ হাসান, ফিড নিউজ ২৪.কম-এর মো: আলামিন প্রমুখ।

নৈশভোজের পর বাসার বসার ঘরে উপস্থিত সবাইকে নিয়ে আলোচনায় উঠে আসে প্রাণিসম্পদ খাতের আসন্ন আয়োজন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান তুহিন দেশের পোল্ট্রি, ডেইরি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাণিসম্পদ মেলায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি জানান, আগামী ২৬, ২৭ ও ২৮ তারিখ ঢাকার শেরেবাংলা নগরের পুরাতন বাণিজ্যমেলার মাঠে প্রাণিসম্পদ মেলা অনুষ্ঠিত হবে। পোল্ট্রি, ডেইরি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের জন্য সেখানে ১২০টি স্টল বরাদ্দ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের পণ্য, সেবা ও কার্যক্রম তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

একই আলোচনায় দেশের নারীদের জন্য কুকিং প্রতিযোগিতা আয়োজনের ঘোষণাও দেন মহাপরিচালক। প্রাণিজ খাদ্যের বহুমুখী ব্যবহার তুলে ধরতে এমন প্রতিযোগিতা একটি আকর্ষণীয় সংযোজন হতে পারে। রান্নায় নারীদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা প্রদর্শনের পাশাপাশি ডিম, দুধ ও মাংস দিয়ে বৈচিত্র্যময় খাবার তৈরির ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও তৈরি করবে এই উদ্যোগ।

মেলার আয়োজন ও অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো শেষে মহাপরিচালক তাঁর সঙ্গে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বিদায় নেন। এরপর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে আগামী বছরের আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনার।

মশিউর রহমান উপস্থিত অতিথিদের সামনে ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন–বাংলাদেশ শাখা বা WPSA-BB-এর আসন্ন আয়োজনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। আগামী ২০২৭ সালের ১৬ ও ১৭ মার্চ রাজধানীর লে মেরিডিয়ান হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি সেমিনার। এরপর ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায়—আইসিসিবিতে অনুষ্ঠিত হবে আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো। সেমিনার ও প্রদর্শনীর এই সময়সূচি আয়োজকদের আনুষ্ঠানিক তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে।

আলোচনায় জানানো হয়, পোল্ট্রি শোতে ৯০৩টি স্টল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের পোল্ট্রি উৎপাদনকারী, ফিড প্রস্তুতকারক, ওষুধ ও ভ্যাকসিন প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশে ব্যবসারত বিদেশি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে সমৃদ্ধ করবে। উৎপাদন প্রযুক্তি, পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ, খামার ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন সমাধান একই স্থানে দেখার সুযোগ পাবেন সংশ্লিষ্টরা।
সন্ধ্যার আলোচনায় তুলে ধরা স্পন্সরশিপের হিসাব অনুযায়ী, আয়োজনে প্লাটিনাম শ্রেণিতে ২২টি, গোল্ড শ্রেণিতে ৭টি, সিলভার শ্রেণিতে ২টি এবং ব্রোঞ্জ শ্রেণিতে ১৩টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। চারটি শ্রেণিতে মোট ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের এই সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক আয়োজনটি ঘিরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহের চিত্র তুলে ধরে।

WPSA-BB-এর গুরুত্ব বুঝতে হলে এর বিজ্ঞানভিত্তিক ভূমিকার দিকে তাকাতে হয়। আন্তর্জাতিক WPSA একটি অলাভজনক সংগঠন, যার মূল উদ্দেশ্য পোল্ট্রি বিজ্ঞান ও শিল্প সম্পর্কে জ্ঞানের প্রসার এবং গবেষক, শিক্ষক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো। বাংলাদেশের শাখার আয়োজনগুলো সেই জ্ঞান বিনিময়কে দেশের খামার ও শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করে।

একজন গবেষকের পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফল কীভাবে খামারির কাজে লাগবে, একটি নতুন প্রযুক্তি কীভাবে উৎপাদন দক্ষতা বাড়াবে কিংবা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কী পরিবর্তন আনতে হবে—এসব প্রশ্নে গবেষণা ও ব্যবসার মানুষের সরাসরি যোগাযোগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সেমিনার ও পোল্ট্রি শো সেই যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

২০২৭ সালের সেমিনারের প্রতিপাদ্য ‘Safe Poultry for Global Markets’—বিশ্ববাজারের জন্য নিরাপদ পোল্ট্রি। এর আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে পোল্ট্রি পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা, রোগ প্রতিরোধ ও জীবাণুনিরাপত্তা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, অটোমেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানির প্রস্তুতি। ফলে আয়োজনটি পণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি নিরাপদ, টেকসই ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম পোল্ট্রি খাত গড়ার আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করবে।

আলোচনা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সময় কাটানোর পর অতিথিদের জন্য ছিল প্যারাগন গ্রুপের পক্ষ থেকে উপহার। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্য দিয়ে ভরা দুটি করে ব্যাগ উপস্থিত সবার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
প্যারাগনের ভোক্তা খাদ্যপণ্যের পরিসরে রয়েছে ডিম, মুরগির মাংস, হিমায়িত স্ন্যাকস, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, মিষ্টি, চা, শুকনা খাবার এবং কেক-পেস্ট্রি। তাদের পণ্যতালিকায় চিকেন বল, স্প্রিং রোল, পরোটা-রুটি, পাস্তুরিত ও ইউএইচটি দুধ, দই-লাবান, মাখন ও ঘিসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। উৎপাদনের এই বৈচিত্র্য পোল্ট্রি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসা থেকে ভোক্তার দৈনন্দিন খাবারে প্রতিষ্ঠানটির বিস্তৃত উপস্থিতির পরিচয় দেয়।
অতিথিদের হাতে উপহারের ব্যাগ তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন। ইয়াসমিন ও মশিউর রহমানের বাসভবনের সেই সন্ধ্যায় ছাদের নৈশভোজ, বসার ঘরের আলোচনা এবং বিদায়ের আন্তরিকতায় একসঙ্গে জায়গা পায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও শিল্পের আগামী দিনের প্রস্তুতি।










































































