নদী–জলাশয় সাকারমুক্ত হবে কীভাবে?
ড. বায়েজিদ মোড়ল | সম্পাদক, AgricultureNews24.com

বাংলাদেশের নদী ও জলাশয় থেকে সাকার মাছ সরাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযান। শুধু একদিন জাল টেনে মাছ ধরা কিংবা পুকুরের পানি কমিয়ে দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে—এমন প্রমাণ নেই। কার্যকর উদ্যোগে একসঙ্গে থাকতে হবে নতুন বিস্তার বন্ধ, নিয়মিত অপসারণ, প্রজননস্থল ব্যবস্থাপনা এবং অপসারণের পর পর্যবেক্ষণ।
শুরুতেই একটি বাস্তবতা স্পষ্ট করা জরুরি: ছোট, বিচ্ছিন্ন ও নতুন আক্রান্ত জলাশয়ে সাকার সম্পূর্ণ নির্মূলের সুযোগ থাকতে পারে; কিন্তু বিস্তৃত, পরস্পরসংযুক্ত নদী–হাওরে দ্রুত শতভাগ নির্মূলের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। সেখানে প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত মাছটির সংখ্যা ও বিস্তার কমানো এবং দেশি মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাস রক্ষা করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার রেইনবো নদীতে সীমিত সংখ্যক সাকার নিয়মিত অনুসন্ধান ও সরাসরি অপসারণের মাধ্যমে নির্মূলের নজির রয়েছে। তবে সেখানে মাছের সংখ্যা কম, পানি স্বচ্ছ এবং অন্য উৎস থেকে নতুন মাছ প্রবেশের সুযোগ সীমিত ছিল। বাংলাদেশের ঘোলা পানি ও বিস্তৃত নদীব্যবস্থায় একই ফল পেতে ভিন্ন কৌশল প্রয়োজন। researchgate.net
প্রথম কাজ: কোথায় কত সাকার, তার মানচিত্র তৈরি
অভিযানের আগে জানতে হবে কোন জলাশয়ে সাকার আছে, কোথায় বংশবিস্তার করছে এবং কোন সংযোগপথ দিয়ে অন্য এলাকায় যাচ্ছে। উপজেলা মৎস্য দপ্তর, গবেষক ও স্থানীয় জেলেদের সমন্বয়ে একই নিয়মে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
প্রতিটি স্থানে ধরা সাকারের সংখ্যা, ওজন, আকার, ধরার সময়, জাল ব্যবহারের সময়কাল এবং অন্য মাছের উপস্থিতি লিখে রাখতে হবে। একই স্থানে একই পরিমাণ সময় ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে পুনরায় নমুনা নিলে নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি তুলনা করা সম্ভব হবে।
জলাশয়গুলোকে তিনভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে:
| জলাশয়ের অবস্থা | প্রধান লক্ষ্য | প্রস্তাবিত ব্যবস্থা |
|---|---|---|
| নতুন আক্রান্ত, ছোট ও বিচ্ছিন্ন | সম্পূর্ণ অপসারণের চেষ্টা | দ্রুত অনুসন্ধান, বারবার অপসারণ, প্রবেশপথ সুরক্ষা |
| আক্রান্ত পুকুর ও নিয়ন্ত্রিত ঘের | মাছ ও প্রজননস্থল অপসারণ | দেশি মাছ উদ্ধার, পানি নিষ্কাশন, গর্ত পরীক্ষা ও সংস্কার |
| ব্যাপক আক্রান্ত নদী–বিল–হাওর | সংখ্যা ও বিস্তার কমানো | অগ্রাধিকার এলাকায় ধারাবাহিক অপসারণ ও পর্যবেক্ষণ |
এটি বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো; দেশব্যাপী পরীক্ষিত সাফল্যের দাবি নয়।
পুকুরে শুধু পানি সেচে দিলেই কাজ শেষ নয়
ভারতের পূর্ব কলকাতা জলাভূমির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বারবার জাল টানা ও পানি নিষ্কাশনের পরও সাকার থেকে যেতে পারে। গবেষকেরা সর্বোচ্চ ৫৮ সেন্টিমিটার গভীর গর্ত পেয়েছেন; পানি সরানোর ১২ দিন পরও কোনো কোনো গর্তে পানি ছিল। সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁরা পানি নিষ্কাশনের পর অন্তত চার সপ্তাহ বা তার বেশি সময় রোদে উন্মুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। এই সময়সীমা বাংলাদেশের সব মাটি ও মৌসুমে একইভাবে কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ij-aquaticbiology.com
বাংলাদেশে আক্রান্ত চাষের পুকুরে মৎস্য কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রথমে দেশি ও চাষের মাছ উদ্ধার করতে হবে। এরপর পানি কমিয়ে সাকার সংগ্রহ, অবশিষ্ট পানির ছোট গর্ত পরীক্ষা এবং পাড়ের সুড়ঙ্গ শনাক্ত করা প্রয়োজন।
নিশ্চিতভাবে শনাক্ত সাকারের গর্তে মাছ বা ডিম থাকলে প্রশিক্ষিত দল তা সংগ্রহ করবে। তারপর পাড় সংস্কার করতে হবে। নির্বিচারে সব গর্ত খুঁড়ে পাড় দুর্বল করা যাবে না। পুনরায় পানি ভরার আগে প্রবেশমুখ সুরক্ষিত করা এবং পরবর্তী পর্যবেক্ষণে সাকার পাওয়া যাচ্ছে কি না দেখা জরুরি।
নদীতে একদিনের অভিযানের বদলে নিয়মিত অপসারণ
বড় নদীতে পুরো পানি সরানো সম্ভব নয়। তাই প্রস্তাব হচ্ছে, জরিপে চিহ্নিত বেশি আক্রান্ত অংশে নির্ধারিত বিরতিতে অপসারণ চালানো। স্থানীয় জেলেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরীক্ষামূলক আহরণের ফল মিলিয়ে সময়, স্থান ও সরঞ্জাম নির্বাচন করতে হবে।
কোন জাল বা ফাঁদে বেশি সাকার ধরা পড়ে এবং দেশি মাছ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা ছোট পরিসরে তুলনা করা প্রয়োজন। পরীক্ষায় কার্যকর প্রমাণিত পদ্ধতিই বিস্তৃত করা উচিত। দেশি মাছ ধরা পড়লে দ্রুত পানিতে ফেরানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
কেবল বড় সাকার ধরলে চলবে না; ছোট মাছও থেকে যাচ্ছে কি না দেখতে হবে। তবে ছোট সাকার ধরার নামে নির্বিচারে সূক্ষ্ম জাল ব্যবহার করলে দেশি মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সরঞ্জাম নির্বাচন ও অনুমোদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে থাকা প্রয়োজন।
প্রবেশপথ বন্ধ না করলে আবার ফিরে আসবে
একটি পুকুর পরিষ্কার করার পর পাশের খাল থেকে সাকার ঢুকলে আগের ব্যয় ও শ্রম অনেকটাই নষ্ট হবে। নিয়ন্ত্রিত পুকুর ও ঘেরে পানি প্রবেশের স্থানে মজবুত ছাঁকনি, পরীক্ষা করার সংগ্রহকক্ষ এবং নিয়মিত পরিষ্কারের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
পূর্ব কলকাতার গবেষণায় সাধারণ বাঁশ ও জালের বাধা আংশিক কার্যকর পাওয়া গেছে। গবেষকেরা শক্ত উপকরণের ছাঁকনি ও সংগ্রহকক্ষসহ উন্নত বাধার নকশা প্রস্তাব করেছেন। বাংলাদেশের স্থানীয় পানি প্রবাহ ও বন্যার পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব নকশা পরীক্ষা করতে হবে। agris.fao.org
তবে উন্মুক্ত নদী বা খালের মুখ নির্বিচারে বন্ধ করা যাবে না। এতে দেশি মাছের চলাচল, পানি নিষ্কাশন ও নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জেলেকে নিয়ন্ত্রণ অভিযানের অংশীদার করতে হবে
সাকার সংগ্রহে জেলেদের সময়, শ্রম ও সরঞ্জামের খরচ হয়। তাই নির্দিষ্ট জলাশয়ে অনুমোদিত অপসারণ কাজে তাঁদের পারিশ্রমিক দেওয়ার পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
শুধু প্রতি কেজি মাছের বিপরীতে সীমাহীন অর্থ দিলে অন্য এলাকা থেকে সাকার আনা বা ইচ্ছাকৃতভাবে ধরে রাখার উল্টো প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। বিকল্পভাবে নির্ধারিত কর্মদিবস, যাচাইকৃত অপসারণ এবং নির্দিষ্ট এলাকার কাজের ভিত্তিতে অর্থ দেওয়া যায়। সংগ্রহের স্থান, ওজন ও নিষ্পত্তির হিসাব একসঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের প্রজ্ঞাপনে সাকার আমদানি, চাষ, পরিবহন, বিক্রয়, সরবরাহ ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করার কথা সরকারি তথ্যবিবরণীতে জানানো হয়েছিল। ফলে নিয়ন্ত্রণ অভিযানে সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্যও কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট আইনসম্মত কার্যপদ্ধতি দিতে হবে। শিরোনাম
ধরা মাছ কোথায় যাবে—অভিযানের আগেই সিদ্ধান্ত চাই
ধরা সাকার নদীর পাড়ে ফেলে রাখা বা অন্য জলাশয়ে ছেড়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা নয়। সংগ্রহস্থলে নিরাপদ হ্যান্ডলিং, অনুমোদিত মানবিক নিধন এবং পরিবেশসম্মত নিষ্পত্তির লিখিত নির্দেশনা প্রয়োজন।
দূষিত এলাকার মাছের ক্ষেত্রে পরীক্ষাবিহীনভাবে খাদ্য, পশুখাদ্য বা সার তৈরির ঘোষণা দেওয়া উচিত নয়। কোনো ব্যবহার বিবেচনা করলে সংশ্লিষ্ট উপাদান ও চূড়ান্ত পণ্যের দূষক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন লাগবে। অপসারণ কর্মসূচির সাফল্য যেন সাকারের বাজার টিকিয়ে রাখার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে।
যে পদ্ধতিগুলো অভিযানের অংশ হওয়া উচিত নয়
উন্মুক্ত জলাশয়ে বিষ, কীটনাশক বা নির্বিচার বিদ্যুৎ প্রয়োগ করে সাকার দমনের উদ্যোগ নেওয়া যাবে না। এগুলো দেশি মাছ ও অন্য জলজ প্রাণীর ক্ষতি করতে পারে। সাকার খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে নতুন বিদেশি শিকারি মাছ ছাড়ার উদ্যোগও গ্রহণ করা উচিত নয়।
একইভাবে সব পাড় কংক্রিট করা কিংবা সব জলজ উদ্ভিদ তুলে ফেলা বাংলাদেশের নদী–জলাভূমির উপযোগী সাধারণ সমাধান হতে পারে না। লক্ষ্যভিত্তিক কাজের আগে স্থানীয় পরিবেশের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্রথম বছরে কী করা যেতে পারে
প্রথম তিন মাসে নির্বাচিত এলাকার জরিপ, অপসারণ ও নিষ্পত্তির নির্দেশনা তৈরি এবং নতুন আক্রান্ত ছোট জলাশয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী ছয় মাসে কয়েকটি ভিন্ন ধরনের পুকুর, খাল ও নদীর অংশে পরীক্ষামূলক অভিযান চালিয়ে খরচ, অপসারণের ফল ও দেশি মাছের ক্ষতি তুলনা করা দরকার।
বছরের শেষ পর্যায়ে দেখতে হবে—সমান আহরণ প্রচেষ্টায় সাকার কম ধরা পড়ছে কি না, ছোট সাকারের উপস্থিতি কমেছে কি না এবং নতুন এলাকায় বিস্তার ঘটছে কি না। শুধু মোট কত টন মাছ সরানো হয়েছে, তা দিয়ে সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের জন্য কার্যকর পথ হলো: নতুন বিস্তার বন্ধ করা, ছোট আক্রান্ত জলাশয়ে দ্রুত সম্পূর্ণ অপসারণের চেষ্টা এবং বড় নদী–জলাভূমিতে নিয়মিত সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। মৎস্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও জেলেদের যুক্ত করে পরীক্ষিত পদ্ধতি ধাপে ধাপে বিস্তৃত করতে হবে। সাকারমুক্ত জলাশয়ের লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি অপসারণ অভিযানের সঙ্গে পুনঃপ্রবেশ ঠেকানো ও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি যুক্ত থাকা জরুরি।






















