RRP
agriculture news
Health Care
Open
diamond egg
renata-ltd.com
fishtech
Ad3
Spech for Promotion
avonah
Thursday , 30 July 2026 |
  1. অন্যান্য
  2. অন্যান্য
  3. ইউটিউব
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপন্যাশ
  6. এ্যাসিভমেন্ট
  7. ঔষধ
  8. কবিতা
  9. কীটনাশক
  10. কৃষি ব্যক্তিত্ব
  11. কৃষি সংবাদ
  12. কৃষি সেক্টরের নিদের্শনা
  13. কৌতুক
  14. খাবার
  15. খামার পদ্ধতি

সোনালী মুরগি পালনের ইতিহাস ও বিবর্তন

প্রতিবেদক
Md. Bayezid Moral
July 30, 2026 9:43 pm

ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন,

সোনালী মুরগি পালনের ইতিহাস ও বিবর্তন (গবেষণাগার থেকে বাংলাদেশের কোটি টাকার শিল্পে উত্তরণের ইতিহাস।)

ড. বায়েজিদ মোড়ল | AgricultureNews24.com


বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের ইতিহাসে এমন কিছু উদ্ভাবন রয়েছে, যেগুলো শুধু একটি নতুন জাতের মুরগির জন্ম দেয়নি; বরং বদলে দিয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দেশের প্রাণিজ আমিষের সরবরাহব্যবস্থাকে। সোনালী মুরগি তেমনই একটি সফল উদ্ভাবনের নাম।

আজ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং গ্রামে সোনালী মুরগির খামার দেখা যায়। কোনো কোনো এলাকায় ব্রয়লারের চেয়েও বেশি সোনালী মুরগি উৎপাদিত হচ্ছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিরিয়ানি হাউস, গ্রিল শপ থেকে শুরু করে সাধারণ পরিবারের রান্নাঘর—সবখানেই এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কারণ, এটি দেখতে অনেকটা দেশি মুরগির মতো, মাংসের স্বাদও দেশি মুরগির কাছাকাছি, অথচ উৎপাদনশীলতা দেশি মুরগির তুলনায় অনেক বেশি।

কিন্তু এই সাফল্য একদিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণা, সরকারি পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা, বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী চিন্তা এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সাহসী বিনিয়োগ। আজকের সোনালী মুরগির শিল্পকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক দশক আগের বাংলাদেশে।


স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতের বাস্তবতা

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সে সময় দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস ছিল দেশি মুরগি, হাঁস, গরু, ছাগল এবং নদী-খালের মাছ। কিন্তু দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সীমিত উৎপাদন এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থার অভাবে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না।

দেশি মুরগির কিছু উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা ছিল—

  • বছরে খুব কম ডিম দিত;
  • ওজন বাড়তে দীর্ঘ সময় লাগত;
  • বাণিজ্যিক উৎপাদনের উপযোগী ছিল না;
  • উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি ছিল।

অন্যদিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় তখন দ্রুত বিকাশ ঘটছিল বাণিজ্যিক ব্রয়লার ও লেয়ার শিল্পের। বাংলাদেশেও উন্নত জাতের মুরগি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দেখা গেল, বিদেশি জাতগুলো দেশের উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া, স্থানীয় রোগজীবাণু এবং গ্রামীণ ব্যবস্থাপনায় সহজে মানিয়ে নিতে পারছে না। ফলে এমন একটি জাতের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা হবে উৎপাদনশীল, আবার দেশীয় পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম।


গবেষণার সূচনা: নতুন জাতের সন্ধানে

এই বাস্তবতা থেকেই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (Department of Livestock Services – DLS) এবং দেশের পোল্ট্রি বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ গবেষণা কর্মসূচি হাতে নেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি সংকর (Crossbred) মুরগি তৈরি করা—

  • যা দেখতে দেশি মুরগির মতো হবে;
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকবে;
  • গ্রামীণ পরিবেশে সহজে পালন করা যাবে;
  • আবার বাণিজ্যিকভাবেও লাভজনক হবে।

বিভিন্ন বিদেশি জাত নিয়ে একাধিক সংকরায়ণ পরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে, Rhode Island Red (RIR) মোরগ এবং Fayoumi মুরগি-এর সংকর সবচেয়ে ভালো ফল দিচ্ছে। এই সংকরই পরবর্তীতে সোনালী মুরগি নামে পরিচিতি লাভ করে।

কোন দুই জাতের সংকর থেকে সোনালী মুরগি?

বাংলাদেশের সোনালী মুরগি মূলত দুইটি বিখ্যাত বিদেশি জাতের সংকর।

পুরুষ (Cock):

  • Rhode Island Red (RIR)

মহিলা (Hen):

  • Fayoumi

অর্থাৎ

Rhode Island Red ♂ × Fayoumi ♀ = Sonali Chicken

Rhode Island Red এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

Fayoumi এসেছে মিশর থেকে।

এই দুই জাতের বৈশিষ্ট্য একত্র করে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন উৎপাদনশীল সংকর জাত তৈরি করা হয়।


কেন নাম রাখা হলো “সোনালী”?

সংকর বাচ্চাগুলোর পালকের রঙ ছিল হালকা সোনালি বা বাদামি।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই গবেষকরা নাম দেন—

সোনালী মুরগি।

বর্তমানে “Sonali Chicken” নামটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও পরিচিত।


Rhode Island Red: শক্তিশালী পিতৃজাত

Rhode Island Red (RIR) জাতের উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে। এটি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় দ্বৈত-উদ্দেশ্য (Dual Purpose) মুরগির জাত। অর্থাৎ একই সঙ্গে মাংস এবং ডিম—উভয় উৎপাদনের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।

এই জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—

  • দ্রুত বৃদ্ধি,
  • তুলনামূলক ভারী ওজন,
  • উন্নত মাংস উৎপাদন,
  • ভালো ডিম উৎপাদন,
  • শক্তিশালী দেহগঠন।

বাংলাদেশের গবেষকরা মনে করেছিলেন, এই জাতের বৃদ্ধির ক্ষমতা যদি দেশীয় পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া কোনো জাতের সঙ্গে সংকরায়ণ করা যায়, তাহলে একটি নতুন সম্ভাবনাময় জাত তৈরি হতে পারে।


Fayoumi: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অনন্য উৎস

Fayoumi জাতের উৎপত্তি মিশরের ফাইয়ুম (Fayoum) অঞ্চলে। শত শত বছর ধরে মরু অঞ্চলের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কারণে এই জাতের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত উন্নত।

Fayoumi-এর বৈশিষ্ট্য—

  • গরম আবহাওয়া সহ্য করতে পারে;
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি;
  • কম খাদ্যেও টিকে থাকতে পারে;
  • চঞ্চল ও সক্রিয়;
  • গ্রামীণ পরিবেশে সহজে মানিয়ে নেয়।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিজ্ঞানীরা Fayoumi-কে মাতৃজাত হিসেবে নির্বাচন করেন।


কীভাবে জন্ম নিল “সোনালী” মুরগি?

দীর্ঘ গবেষণার পর দেখা যায়—

Rhode Island Red (♂) × Fayoumi (♀)

এই সংকরটি বাংলাদেশের পরিবেশে সর্বোত্তম ফল দিচ্ছে।

নতুন সংকরের গায়ের পালকের রং ছিল সোনালি-বাদামি। সেই বৈশিষ্ট্য থেকেই এর নাম রাখা হয় “সোনালী”

এটি শুধু একটি সংকর নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের জলবায়ু, কৃষক ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় তৈরি একটি পরিকল্পিত উদ্ভাবন। পরে এই সংকর বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।


গবেষণাগার থেকে মাঠে

গবেষণায় সফল হওয়ার পর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আটটি সরকারি সোনালী হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করে। এসব হ্যাচারিতে বিশুদ্ধ Rhode Island Red ও Fayoumi প্যারেন্ট স্টক সংরক্ষণ করে সোনালী ডে-ওল্ড চিক উৎপাদন শুরু হয়। এই সরকারি উদ্যোগই পরবর্তীতে বাংলাদেশের সোনালী শিল্পের জেনেটিক ভিত্তি তৈরি করে।

গবেষণাগার থেকে গ্রামের উঠোনে

সোনালী মুরগির উদ্ভাবন ছিল বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। কিন্তু কোনো নতুন জাত উদ্ভাবন করাই শেষ কথা নয়; প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন সেই প্রযুক্তি গবেষণাগারের গণ্ডি পেরিয়ে কৃষকের হাতে পৌঁছে যায়। সোনালী মুরগির ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছিল।

১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLS) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আটটি সরকারি সোনালী হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করে। এসব হ্যাচারির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশুদ্ধ Rhode Island Red (RIR)Fayoumi প্যারেন্ট স্টক সংরক্ষণ এবং সেখান থেকে মানসম্মত সোনালী ডে-ওল্ড চিক (DOC) উৎপাদন। সরকারি এই উদ্যোগই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সোনালী মুরগি শিল্পের জেনেটিক ভিত্তি গড়ে তোলে।


DANIDA-এর সহযোগিতায় নতুন দিগন্ত

১৯৯০-এর দশকে ডেনমার্কের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা DANIDA বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র প্রাণিসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলেই চালু হয় Smallholder Livestock Development Project (SLDP) এবং পরে Participatory Livestock Development Project (PLDP)

এই প্রকল্পগুলোর অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল সোনালী মুরগি পালন।

প্রকল্পের আওতায়—

  • গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়,
  • স্বল্পমূল্যে বাচ্চা সরবরাহ করা হয়,
  • টিকাদান ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হয়,
  • খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়,
  • উৎপাদিত মুরগি বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়।

ফলে সোনালী মুরগি শুধু একটি নতুন জাত হিসেবেই নয়, বরং একটি দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।


এক মিলিয়নেরও বেশি নারীর সম্পৃক্ততা

SLDP ও PLDP প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ লাখ গ্রামীণ নারী সরাসরি সোনালী মুরগি পালনের সঙ্গে যুক্ত হন। এই নারীদের অধিকাংশই আগে কোনো আয়মুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

প্রতিটি পরিবারে ১০–৩০টি করে সোনালী মুরগি পালন দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক পরিবার এটিকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যায়।

এর ফলে—

  • নারীর নিজস্ব আয় সৃষ্টি হয়,
  • পরিবারের পুষ্টির উন্নতি ঘটে,
  • শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ে,
  • গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়।

বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ইতিহাসে সোনালী মুরগির অবদান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।


উত্তরাঞ্চলে সোনালী মুরগির দ্রুত বিস্তার

প্রাথমিকভাবে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে সোনালী মুরগি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল—

  • তুলনামূলক শুষ্ক আবহাওয়া,
  • ক্ষুদ্র খামারের আধিক্য,
  • গ্রামীণ নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ,
  • বাজারে দেশি ধরনের মুরগির উচ্চ চাহিদা।

১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে উত্তরাঞ্চলে প্রকল্পভিত্তিক সোনালী মুরগির বিস্তার এতটাই সফল হয় যে পরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।


সরকারি হ্যাচারি থেকে বেসরকারি শিল্প

সোনালী মুরগির জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি হ্যাচারির উৎপাদন চাহিদা পূরণে অক্ষম হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসেন।

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে দেশে একের পর এক প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে—

  • প্যারেন্ট স্টক ফার্ম,
  • বাণিজ্যিক হ্যাচারি,
  • ফিড মিল,
  • ভেটেরিনারি ওষুধ কোম্পানি,
  • ডিলার ও পরিবেশক নেটওয়ার্ক।

সরকারের প্রযুক্তিগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বেসরকারি খাত সোনালী মুরগিকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পে রূপান্তরিত করে। বর্তমানে সরকারি হ্যাচারিগুলো জেনেটিক উৎস সংরক্ষণে ভূমিকা রাখলেও উৎপাদনের বড় অংশ বেসরকারি খাত পরিচালনা করছে।


কেন বাজারে এত দ্রুত জনপ্রিয় হলো?

বাংলাদেশের ভোক্তারা বরাবরই দেশি মুরগির স্বাদ ও গঠন পছন্দ করেন। কিন্তু দেশি মুরগির উৎপাদন কম হওয়ায় এর দাম বেশি।

অন্যদিকে ব্রয়লার দ্রুত উৎপাদিত হলেও অনেক ভোক্তার কাছে এর স্বাদ দেশি মুরগির তুলনায় কম গ্রহণযোগ্য।

সোনালী মুরগি এই দুইয়ের মধ্যে একটি সফল সমন্বয় তৈরি করেছে—

  • দেখতে দেশি মুরগির মতো,
  • মাংস তুলনামূলক শক্ত,
  • রান্নার স্বাদ ভালো,
  • বাজারে সহজে বিক্রি হয়,
  • ব্রয়লারের তুলনায় বেশি দাম পাওয়া যায়।

এই কারণেই সোনালী মুরগি খুব অল্প সময়ে কৃষক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের আস্থা অর্জন করে।


একটি নতুন মূল্যশৃঙ্খলের জন্ম

সোনালী মুরগিকে ঘিরে ধীরে ধীরে একটি বিশাল ভ্যালু চেইন (Value Chain) গড়ে ওঠে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়—

  • গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক খামার,
  • হ্যাচারি,
  • ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান,
  • ওষুধ ও ভ্যাকসিন কোম্পানি,
  • পরিবহন ব্যবসা,
  • পাইকারি ও খুচরা বাজার,
  • রেস্তোরাঁ ও খাদ্যশিল্প।

ফলে সোনালী মুরগি আর শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক কৃষি-শিল্পে পরিণত হয়, যা গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়।


গবেষণার নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BAU), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI), বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সোনালী মুরগির—

  • উৎপাদনশীলতা,
  • ডিম উৎপাদন,
  • খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা (FCR),
  • রোগ প্রতিরোধ,
  • জেনেটিক উন্নয়ন,
  • মাংসের গুণগত মান

নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে আরও উন্নত সোনালী লাইন উদ্ভাবনের পথ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে সোনালী মুরগির অবস্থান

একসময় সোনালী মুরগিকে শুধুমাত্র একটি গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু গত তিন দশকে এর অবস্থান আমূল বদলে গেছে। বর্তমানে সোনালী মুরগি বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপখাতে পরিণত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি এখন দেশের মুরগির মাংসের বাজারে একটি বড় অংশ দখল করেছে এবং ভোক্তাদের কাছে দেশি মুরগির কার্যকর বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ভোগ হওয়া মুরগির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন সোনালী এবং এর বাজারচাহিদা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই সাফল্যের মূল কারণ হলো—সোনালী মুরগি একদিকে ব্রয়লারের তুলনায় উন্নত স্বাদ ও আকর্ষণীয় গঠন বজায় রেখেছে, অন্যদিকে দেশি মুরগির তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক।


ভোক্তার পছন্দের শীর্ষে কেন সোনালী?

বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে স্বাদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর ধরে দেশি মুরগি ছিল মানুষের প্রথম পছন্দ। কিন্তু সীমিত উৎপাদন ও উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকে।

এই শূন্যস্থান পূরণ করে সোনালী মুরগি।

ভোক্তাদের মতে—

  • মাংস তুলনামূলক শক্ত ও সুস্বাদু;
  • রান্নার পর দেশি মুরগির মতো ঘ্রাণ পাওয়া যায়;
  • ঝোল, রোস্ট, গ্রিল ও বিরিয়ানিতে ভালো মান বজায় থাকে;
  • বাজারে সহজে পাওয়া যায়।

এই কারণে শহর ও গ্রাম—উভয় বাজারেই সোনালীর চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাস্থ্যসচেতন ও তুলনামূলক উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের মধ্যেও সোনালীর গ্রহণযোগ্যতা বেশি।


একটি বিশাল মূল্যশৃঙ্খলের কেন্দ্রবিন্দু

বর্তমানে সোনালী মুরগিকে ঘিরে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠেছে।

এই শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে—

  • গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক খামার;
  • শত শত বেসরকারি হ্যাচারি;
  • ফিড মিল;
  • ভেটেরিনারি ওষুধ ও ভ্যাকসিন কোম্পানি;
  • পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা;
  • পাইকারি ও খুচরা বাজার;
  • রেস্তোরাঁ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, সোনালী মুরগির জেনেটিক্স কোনো একক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে নয়; বরং বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি হ্যাচারির মাধ্যমে একটি বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই বৈশিষ্ট্য সোনালী শিল্পকে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাবান্ধব করেছে।


ব্রয়লার, সোনালী ও দেশি মুরগি: একটি তুলনামূলক চিত্র

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন ধরনের মুরগিরই আলাদা ক্রেতা রয়েছে।

ব্রয়লার

  • দ্রুত বৃদ্ধি পায়;
  • উৎপাদন খরচ কম;
  • দাম তুলনামূলক কম;
  • কিন্তু স্বাদ নিয়ে অনেক ভোক্তার আপত্তি রয়েছে।

দেশি মুরগি

  • স্বাদ সবচেয়ে ভালো;
  • উৎপাদন কম;
  • দাম অনেক বেশি;
  • বাণিজ্যিকভাবে সীমিত।

সোনালী মুরগি

  • স্বাদ দেশির কাছাকাছি;
  • উৎপাদন ব্রয়লারের তুলনায় ধীর হলেও লাভজনক;
  • বাজারমূল্য ব্রয়লারের চেয়ে বেশি;
  • ভোক্তার আস্থা বেশি।

এই কারণেই সোনালী বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যম ও উচ্চমূল্যের বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।


খামারিদের বর্তমান সংকট

যদিও সোনালী শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে, তবুও এই খাত নানা সমস্যার মুখোমুখি।

১. মানসম্মত বাচ্চার সংকট

সব হ্যাচারি একই মানের ডে-ওল্ড চিক উৎপাদন করতে পারে না। অনেক খামারি অভিযোগ করেন, দুর্বল বাচ্চার কারণে মৃত্যুহার বেড়ে যায় এবং প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া যায় না।

২. খাদ্যের উচ্চমূল্য

ফিডের দাম বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ। খাদ্য খরচ মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৬০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে বাজারদর কমে গেলে খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।

৩. রোগব্যাধি

নিউক্যাসল ডিজিজ, গামবোরো, কক্সিডিওসিস, কোলিব্যাসিলোসিস, ক্রনিক রেসপিরেটরি ডিজিজ (CRD) এবং এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

৪. বাজারমূল্যের অস্থিরতা

অনেক সময় উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারদর কমে যায়। আবার উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে দাম বেড়ে গেলেও বছরের অন্য সময় খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েন।


গবেষণা ও জেনেটিক উন্নয়নের প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সোনালী শিল্পকে টেকসই রাখতে হলে গবেষণায় আরও বিনিয়োগ করতে হবে।

প্রয়োজন—

  • উন্নত Parent Stock উন্নয়ন;
  • জেনেটিক বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ;
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি;
  • কম খাদ্যে বেশি উৎপাদন সক্ষম নতুন লাইন উদ্ভাবন;
  • মানসম্মত হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI) এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

বাংলাদেশে সোনালী মুরগির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

কারণ—

  • দেশি ধরনের মাংসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে;
  • শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে সোনালীর জনপ্রিয়তা বাড়ছে;
  • ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা সহজে এই খাতে বিনিয়োগ করতে পারছেন;
  • স্থানীয় জেনেটিক ভিত্তির কারণে উৎপাদন ব্যবস্থায় তুলনামূলক স্বাধীনতা রয়েছে।

যদি সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে ভবিষ্যতে সোনালী মুরগি বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী কৃষিভিত্তিক শিল্পে পরিণত হতে পারে।


ড. বায়েজিদ মোড়ল যা যা ভাবে

সোনালী মুরগি শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে আমি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করছি—

১. জাতীয় পর্যায়ে সোনালী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন।
২. সরকারি পর্যায়ে বিশুদ্ধ Parent Stock সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ।
৩. প্রতিটি হ্যাচারির জন্য বাধ্যতামূলক মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
৪. সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা।
৫. জাতীয় রোগ নজরদারি ও বায়োসিকিউরিটি কর্মসূচি জোরদার করা।
৬. খামারিদের জন্য সহজশর্তে কৃষিঋণ ও বীমা চালু করা।
৭. জেলা পর্যায়ে সোনালী মুরগি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
৮. গবেষণা ও জেনেটিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
৯. আধুনিক জবাই, প্রসেসিং ও ব্র্যান্ডিং অবকাঠামো গড়ে তোলা।
১০. ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মান অর্জনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত পোল্ট্রি পণ্য রপ্তানির প্রস্তুতি নেওয়া।

এখন প্রশ্ন—সোনালী মুরগির ভবিষ্যৎ কোথায়?

গত চার দশকের পথচলা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সোনালী মুরগি আর কোনো পরীক্ষামূলক সংকর জাত নয়; এটি এখন বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের একটি স্বতন্ত্র উপখাত। একসময় গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকা এই সংকর জাত আজ দেশের লাখো খামারির আয়ের উৎস, হাজারো উদ্যোক্তার ব্যবসা এবং কোটি কোটি ভোক্তার পছন্দের মাংস।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে—সোনালী মুরগি কি কেবল দেশীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারবে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আজকের পরিকল্পনা, গবেষণা, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বিনিয়োগের ওপর।


বিশ্বের পোল্ট্রি শিল্প থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের নিজস্ব জাত বা উৎপাদনব্যবস্থাকে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।

যেমন—

  • থাইল্যান্ড আজ বিশ্বের অন্যতম বড় রান্না করা (Cooked Chicken) পোল্ট্রি পণ্য রপ্তানিকারক।
  • ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুরগির মাংস রপ্তানিকারক।
  • নেদারল্যান্ডস জেনেটিক্স, হ্যাচারি প্রযুক্তি ও প্রসেসিংয়ে বিশ্বনেতা।
  • যুক্তরাষ্ট্র উন্নত Parent Stock ও Grand Parent Stock উৎপাদনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সোনালী মুরগি একটি আলাদা বাজার সৃষ্টি করতে পারে, কারণ এটি প্রচলিত ব্রয়লারের মতো নয়; এর স্বাদ, গঠন ও বাজার অবস্থান ভিন্ন।


রপ্তানির সম্ভাবনা কতটা?

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সোনালী মুরগি বা এর মাংস রপ্তানি হয় না। এর প্রধান কারণগুলো হলো—

  • আন্তর্জাতিক মানের জবাইখানার অভাব,
  • রোগমুক্ত অঞ্চল (Disease Free Zone) প্রতিষ্ঠিত না হওয়া,
  • ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা না থাকা,
  • আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা সনদের সীমাবদ্ধতা,
  • পর্যাপ্ত কোল্ড-চেইন অবকাঠামোর অভাব।

তবে সম্ভাবনা একেবারেই নেই—এমন নয়।

মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু দেশে দেশি ধরনের স্বাদযুক্ত মুরগির চাহিদা রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে সোনালী মুরগির প্রক্রিয়াজাত পণ্য সেই বাজারে প্রবেশ করতে পারে।


“বাংলাদেশ সোনালী”—একটি সম্ভাব্য জাতীয় ব্র্যান্ড

আমার মতে, এখন সময় এসেছে “Bangladesh Sonali Chicken”-কে একটি জাতীয় কৃষি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার।

যেমন—

  • ইলিশ বাংলাদেশের পরিচয়,
  • জামদানি বাংলাদেশের পরিচয়,
  • ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বাংলাদেশের পরিচয়,

তেমনি সোনালী মুরগিকেও একটি স্বীকৃত জাতীয় কৃষিপণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরা যেতে পারে।

এর জন্য প্রয়োজন—

  • জাতীয় ব্র্যান্ডিং,
  • মান নিয়ন্ত্রণ,
  • জিআই (Geographical Indication) সম্ভাবনা মূল্যায়ন,
  • আন্তর্জাতিক প্রচারণা,
  • এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ।

গবেষণায় এখন কী করা উচিত?

সোনালী মুরগি নিয়ে গবেষণা এখনো থেমে থাকা উচিত নয়।

আগামী দিনের গবেষণার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—

১. জেনেটিক উন্নয়ন

বাংলাদেশের জন্য আরও উন্নত সোনালী লাইন তৈরি করা।

২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

কম ওষুধে বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করা।

৩. খাদ্য দক্ষতা (Feed Efficiency)

কম খাদ্যে বেশি ওজন বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

৪. জলবায়ু সহনশীলতা

উচ্চ তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম নতুন লাইন তৈরি।

৫. দেশীয় Parent Stock

বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব Parent Stock উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করা।


নীতিগতভাবে কী করা জরুরি?

বাংলাদেশে সোনালী শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

আমার সুপারিশ

১. জাতীয় সোনালী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন।

২. সরকারি Parent Stock Farm আধুনিকায়ন।

৩. সরকারি Genetic Resource Center প্রতিষ্ঠা।

৪. সব হ্যাচারির বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং ও মান নিয়ন্ত্রণ।

৫. সোনালী মুরগির জন্য পৃথক গবেষণা তহবিল।

৬. জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

৭. আধুনিক জবাই ও প্রসেসিং অবকাঠামো।

৮. আন্তর্জাতিক মানের Disease Free Zone গঠন।

৯. সহজশর্তে কৃষিঋণ ও বীমা।

১০. জাতীয় পর্যায়ে Sonali Development Board গঠন।


খামারিদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

বাংলাদেশের সোনালী শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে খামারিদের দক্ষতার ওপর।

খামারিদের প্রতি আমার পরামর্শ—

  • নিবন্ধিত হ্যাচারি থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করুন।
  • মানসম্মত ফিড ব্যবহার করুন।
  • বায়োসিকিউরিটি কঠোরভাবে অনুসরণ করুন।
  • নিয়মিত টিকাদান সম্পন্ন করুন।
  • উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করুন।
  • বাজার পরিস্থিতি বুঝে উৎপাদন পরিকল্পনা করুন।
  • প্রশিক্ষণ গ্রহণ করুন।
  • সমবায়ভিত্তিক বিপণনে যুক্ত হোন।

আগামী ২০ বছরে সোনালী শিল্প কোথায় যেতে পারে?

যদি সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করা হয়, তাহলে আগামী দুই দশকে—

  • সোনালী মুরগির উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে;
  • লাখো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে;
  • গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে;
  • আধুনিক প্রসেসিং শিল্প গড়ে উঠতে পারে;
  • আন্তর্জাতিক বাজারে “Bangladesh Sonali Chicken” একটি স্বীকৃত ব্র্যান্ড হতে পারে।

সমাপনী মূল্যায়ন

বাংলাদেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের ইতিহাসে সোনালী মুরগির উদ্ভাবন একটি মাইলফলক। Rhode Island RedFayoumi জাতের বৈজ্ঞানিক সংকরায়ণ থেকে জন্ম নেওয়া এই জাতটি আজ শুধু একটি মুরগি নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক আন্দোলন, একটি সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক এবং একটি সফল প্রযুক্তি স্থানান্তরের উদাহরণ।

সরকারি গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং লক্ষ খামারির পরিশ্রমের সমন্বয়ে সোনালী মুরগি আজ দেশের পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে জেনেটিক বিশুদ্ধতা রক্ষা, মানসম্মত প্যারেন্ট স্টক উৎপাদন, গবেষণায় বিনিয়োগ, রোগ নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ একসময় নিজস্ব চাহিদা পূরণের জন্য সোনালী মুরগি উদ্ভাবন করেছিল। আজ সময় এসেছে সেই সোনালীকে বিশ্বের দরবারে “Bangladesh Sonali Chicken” নামে একটি স্বীকৃত কৃষি-ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে সোনালী মুরগি শুধু দেশের খাদ্য নিরাপত্তাই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

ড. বায়েজিদ মোড়ল | AgricultureNews24.com

সর্বশেষ - ছাগল পালন