পোল্ট্রি রপ্তানির দরজা খুলবে কীভাবে: দাবির সঙ্গে চাই নিরাপত্তার প্রমাণ
বার্ড ফ্লু নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও যাচাইযোগ্য উৎপাদনব্যবস্থায় বাংলাদেশের বিশ্ববাজারে প্রবেশের পথ
কৃষি সাংবাদিক ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন

আমার ২৬ বছরের কৃষি সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় সরেজমিনে দেখেছি ও জেনেছি, খামারে ভালো মুরগি উৎপাদন করা এবং সেই মুরগি বিদেশের বাজারে বিক্রি করার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। একজন খামারি সুস্থ মুরগি উৎপাদন করলেন, একটি প্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন পরিবেশে মাংস প্রক্রিয়াজাত করল—এগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু বিদেশি ক্রেতা ও আমদানিকারক দেশের কর্তৃপক্ষ জানতে চাইবে, এই উৎপাদনব্যবস্থা কতটা নিরাপদ এবং তার প্রমাণ কী?
বাংলাদেশের পোল্ট্রি রপ্তানি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই প্রশ্নটিই সামনে আসে। আমরা কী উৎপাদন করছি, তার পাশাপাশি দেখাতে হবে কীভাবে উৎপাদন করছি, রোগের ঝুঁকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছি এবং সেই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষণ করছি।
৩ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন—বাংলাদেশ শাখার আন্তর্জাতিক কারিগরি সেমিনারের একটি উপস্থাপনার সারসংক্ষেপে এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল হাসান সিকদারের উপস্থাপনার বিষয় ছিল, উচ্চ রোগসৃষ্টিকারী এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোল্ট্রি রপ্তানির বাজারে প্রবেশের পথ, পণ্যভিত্তিক প্রস্তুতি এবং প্রাণিস্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রমাণ।
আমদানিকারককে আশ্বস্ত করতে হলে দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে।
হালাল সনদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত গ্রহণযোগ্যতা
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের বাজারে বাংলাদেশের পোল্ট্রি পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। সেখানে হালাল উৎপাদন ও জবাইব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। তবে হালাল সনদ থাকলেই পণ্য আমদানির সব শর্ত পূরণ হয়ে যায় না।
উপস্থাপনার সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, পোল্ট্রি রপ্তানির জন্য আমদানিকারক দেশের প্রাণিস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের স্বাস্থ্যগত গ্রহণযোগ্যতা অপরিহার্য। হালাল বাজারে এর সঙ্গে যুক্ত হয় হালাল নিশ্চয়তার শর্ত।
অর্থাৎ একটি পণ্যের ক্ষেত্রে দুটি আলাদা প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। প্রথমত, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ হালাল নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, পণ্যটি প্রাণিরোগ ও খাদ্যনিরাপত্তার বিবেচনায় আমদানির উপযোগী কি না।
বাংলাদেশের প্রস্তুতিতেও তাই এই দুই দিক একসঙ্গে রাখতে হবে। ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি রোগনিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষার ফল, উৎপাদনের নথি ও সরকারি স্বাস্থ্যসনদের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হবে।
বার্ড ফ্লুর ঝুঁকিতে সব পণ্যের পথ এক নয়
উচ্চ রোগসৃষ্টিকারী এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা এইচপিএআই পোল্ট্রি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা। তবে কোনো দেশে এই রোগের ঝুঁকি থাকলে সেই দেশের সব ধরনের পোল্ট্রি পণ্যের বাণিজ্য একইভাবে বিবেচিত হয় না।
বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা—ডব্লিউওএএইচের নির্দেশনায় পণ্যের ধরন এবং ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা অনুযায়ী নিরাপদ বাণিজ্যের পথ রয়েছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করা মাংস ও ডিমজাত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য স্বাস্থ্যগত ব্যবস্থা অনুসরণ করে বাণিজ্য সম্ভব হতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাঁচা মাংস, তাপপ্রক্রিয়াজাত মাংস এবং ডিমজাত পণ্যকে একইভাবে দেখা যাবে না। একটি দেশের একটি পণ্য গ্রহণযোগ্য হলেও অন্য পণ্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়ে যায় না।
উপস্থাপনার সারসংক্ষেপেও পণ্যভিত্তিক এবং বাজারভিত্তিক প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোন দেশে কোন পণ্য পাঠানো হবে, সেই দেশের কর্তৃপক্ষ কী ধরনের প্রমাণ চায়—শুরুতেই তা জানতে হবে।
প্রক্রিয়াজাত পণ্য দিয়ে শুরু করার সুযোগ
সারসংক্ষেপে বাংলাদেশের জন্য ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তৈরি পোল্ট্রি ও ডিমজাত পণ্যকে রপ্তানির একটি সম্ভাব্য প্রাথমিক পথ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এটি একটি বাস্তবসম্মত বিবেচনা। কাঁচা মাংস রপ্তানির জন্য যে ধরনের রোগমুক্ত উৎস ও নজরদারির প্রমাণ প্রয়োজন, প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে প্রক্রিয়ার কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে শুধু “রান্না করা” বা “প্রক্রিয়াজাত” লেখা যথেষ্ট নয়। ব্যবহৃত প্রক্রিয়া ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম কি না, তা যাচাই করতে হবে। ডব্লিউওএএইচের বিধিতে পণ্যভেদে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াকরণ ও পুনরায় দূষণ প্রতিরোধের শর্ত রয়েছে। woah.org
তাই রপ্তানিমুখী কারখানায় তাপমাত্রা ও প্রক্রিয়াকরণের সময়ের নথি, যন্ত্রপাতির যথাযথ কার্যকারিতা এবং প্রক্রিয়াকরণের পর পণ্য সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। আমদানিকারক দেশের শর্ত অনুযায়ী এগুলো যাচাইযোগ্য হতে হবে।
রোগমুক্ত উৎপাদনব্যবস্থা গড়তে হবে কীভাবে
উপস্থাপনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘কম্পার্টমেন্ট’। সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি নির্দিষ্ট উৎপাদনব্যবস্থা, যেখানে অভিন্ন জীবাণুনিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট প্রাণিস্বাস্থ্য অবস্থা বজায় রাখা হয়।
এটি শুধু একটি খামারের চারদিকে দেয়াল তোলার বিষয় নয়। রপ্তানির জন্য নির্বাচিত উৎপাদনব্যবস্থায় বাচ্চার উৎস, খামার, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মধ্যে রোগ প্রবেশের ঝুঁকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তার সামগ্রিক প্রমাণ প্রয়োজন।
ভৌগোলিক রোগমুক্ত অঞ্চল এবং কম্পার্টমেন্টের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। একটি মূলত নির্দিষ্ট এলাকার ভিত্তিতে বিবেচিত হয়; অন্যটি ব্যবস্থাপনা ও জীবাণুনিরাপত্তার ভিত্তিতে চিহ্নিত উৎপাদনব্যবস্থা।
সারসংক্ষেপে বাংলাদেশের কাঁচা পোল্ট্রি মাংস রপ্তানির বাস্তবসম্মত প্রস্তুতিতে আমদানিকারক দেশের গ্রহণযোগ্য এইচপিএআইমুক্ত কম্পার্টমেন্টের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এটি গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি নথি, নজরদারি ও কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রয়োজন। নিজেদের ঘোষণা দিয়েই বিদেশি বাজারে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায় না।
টিকা দেওয়া এবং সংক্রমণমুক্ত থাকা আলাদা বিষয়
খামারে রোগ প্রতিরোধে টিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু টিকা দেওয়া হয়েছে বলেই একটি উৎপাদনব্যবস্থায় সংক্রমণ নেই—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
ডব্লিউওএএইচের মানদণ্ডে টিকা ব্যবহারের পাশাপাশি সংক্রমণের অনুপস্থিতি প্রমাণে যথাযথ নজরদারির গুরুত্ব রয়েছে। rr-
উপস্থাপনার সারসংক্ষেপেও বলা হয়েছে, টিকাদানের সঙ্গে এমন নজরদারি প্রয়োজন, যা সংক্রমণ নেই বলে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দিতে পারে। পাশাপাশি আমদানিকারক দেশকে সংশ্লিষ্ট টিকাদান কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
এখানে একবারের পরীক্ষায় নেতিবাচক ফল পেলেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কোন খামার থেকে, কখন, কীভাবে এবং কতগুলো নমুনা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত নজরদারির সঙ্গে মৃত্যুহার, রোগের লক্ষণ, পরীক্ষার ফল ও ব্যবস্থাপনার তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।
খামারের নথি হবে রপ্তানির প্রস্তুতির ভিত্তি
আমার দীর্ঘ কৃষি সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে মনে করি, রপ্তানির প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিত খামারের দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়ে। যে তথ্য আজ সাধারণ মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই একটি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের কাজে লাগতে পারে।
বাচ্চা কোথা থেকে এসেছে, কোন খাদ্য দেওয়া হয়েছে, কী ওষুধ ব্যবহার হয়েছে, কখন টিকা দেওয়া হয়েছে, কতটি মুরগি মারা গেছে এবং অসুস্থতার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
একইভাবে মুরগি খামার থেকে বের হওয়ার পর কোথায় জবাই ও প্রক্রিয়াজাত হলো, কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো এবং কোন চালানে পাঠানো হলো, সেই সংযোগও জানা দরকার। কোনো সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎস দ্রুত শনাক্ত করার জন্য এই ধারাবাহিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু নথির পরিমাণ বাড়ালে হবে না। নথি হতে হবে সঠিক, ব্যবহারযোগ্য এবং বাস্তবে যাচাই করা যায় এমন।
ছোট খামারিকে প্রস্তুতির অংশ করতে হবে
রপ্তানিমুখী ব্যবস্থা গড়তে বিনিয়োগ, পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষণ ও নজরদারির প্রয়োজন হবে। বড় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এসব ব্যবস্থা গড়ে তোলা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি খামারিদের জন্য আলাদা সহায়তা প্রয়োজন।
আমার বিবেচনায়, নির্বাচিত উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত খামারিদের জন্য সহজ নথি সংরক্ষণের ছক, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, যৌথ পরীক্ষাসেবা এবং স্পষ্ট ক্রয়চুক্তি তৈরি করা যেতে পারে।
খামারিকে বাড়তি নিয়ম মানতে বলা হলে তার খরচ ও সুফলের হিসাবও পরিষ্কার করতে হবে। মানসম্মত উৎপাদনের জন্য বাড়তি ব্যয় করে তিনি যদি ন্যায্য দাম না পান, তাহলে সেই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন হবে।
একটি পণ্য, একটি বাজার দিয়ে বাস্তব কাজ শুরু
সারসংক্ষেপে ধাপে ধাপে এগোনোর একটি প্রস্তাব রয়েছে—একটি পণ্য, একটি বাজার এবং নিরীক্ষাযোগ্য একটি রপ্তানি সরবরাহব্যবস্থা।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রস্তাবটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমে সম্ভাবনাময় একটি পণ্য ও বাজার নির্বাচন করতে হবে। তারপর সেই বাজারের স্বাস্থ্যগত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সনদসংক্রান্ত শর্ত অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে।
সরকারি প্রাণিস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, পরীক্ষাগার, উৎপাদক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয় এখানে জরুরি। সম্ভাব্য ক্রেতার আগ্রহকে কার্যকর রপ্তানিতে রূপ দিতে হলে পণ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কে আমদানিকারক দেশের আস্থা অর্জন করতে হবে।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতের সামনে তাই বড় কাজ হলো উৎপাদনের সঙ্গে প্রমাণ তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো। খামারে রোগনিয়ন্ত্রণ, কারখানায় যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুরো ব্যবস্থায় বিশ্বাসযোগ্য নথি—এই তিনটি জায়গায় ধারাবাহিক উন্নতি প্রয়োজন।
বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের পোল্ট্রি পণ্যের পরিচয় শক্ত হবে তখনই, যখন তার মান ও নিরাপত্তার দাবি যাচাইযোগ্য তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
তথ্যসূত্র: অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল হাসান সিকদারের উপস্থাপনার সারসংক্ষেপ, ডব্লিউপিএসএ বাংলাদেশ শাখার আন্তর্জাতিক কারিগরি সেমিনার, ৩ অক্টোবর ২০২৬; বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিরাপদ বাণিজ্যসংক্রান্ত নির্দেশনা এবং স্থলজ প্রাণিস্বাস্থ্য বিধির অধ্যায় ১০.৪।






















